বাজেটের ঝুঁকি কাটাতে মাঝি হতে পারে ব্যবসায়ী সমাজ

ছবি সংগৃহীত

 

মোস্তফা কামাল :রাজস্বসহ সরকারের সব আয়ই কমতির দিকে। এর মধ্যেই যথাসময়ে বাজেট প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে সদ্য ক্ষমতায় অভিষেক করা সরকারকে। বিদায় নেওয়া ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী ও শেখ হাসিনা সরকার—এই দুটি সরকারের দায়ই টানতে হচ্ছে সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকারকে। অনিবার্য দায়দেনাসহ বাস্তবতাটা বড় নিষ্ঠুর।

ঝুঁকিও অনেক। একদিকে বৈশ্বিক তাড়না, আরেকদিকে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি। তার ওপর রয়েছে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননসহ নানা ঘোষণা। এগুলো বাস্তবায়নে আগের তুলনায় টাকা লাগবে অনেক বেশি।

এসব কাজ সম্পন্ন করতে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই। রাতারাতি রাজস্ব আয় বাড়ানোও সম্ভব না। এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।

এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।
অর্থের এই টানাটানির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির বাড়তি দাম, গেল সরকারের বিদায়ের আগে ঘোষিত সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি বেতনও অগ্রাহ্যের সুযোগ নেই। নতুন পে স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাতাগোষ্ঠীর প্রকল্প অনুদান এবং বৈদেশিক সাহায্যের কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা নিয়েও রয়েছে নানা শঙ্কা। এ ক্ষেত্রে মোটাদাগে ভরসার জায়গায় রয়েছেন ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা।

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়, তা সময় থাকতে বোঝেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরিণতিতে দেশকে ভুগিয়েছে, নিজেরা ভুগেছে, গালমন্দ শুনেছে। এখন অবসরে এসে ব্যক্তিগত আলাপনে বলছে, রোমন্থন করছে ভুলের কথা। একেকজন অর্থনীতির বিশাল বিশারদ হয়েও সময়দৃষ্টে বাস্তবতা বোঝেননি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগ গড়েননি। উপরন্তু ব্যবসায়ীদের খলনায়ক বানিয়েছেন। নানাভাবে হেনস্তা করেছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের সময়োচিত নীতি প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের এভাবে উপেক্ষা না করলে শিল্প খাতে অস্থিরতা ভর করত না। বিনিয়োগ তলানিতে নামত না। স্থিতিশীল ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিবেশ ও দ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-সংলাপ করলে, তাঁদের পরামর্শ নিলে দেশের এবং নিজেদেরও এ পরিণতি হয় না। বিনিয়োগের খরা সামান্য কাটাতে পারলেও কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো। চাইলেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের খলনায়ক না বানিয়ে, তাঁদের পরামর্শ নিয়ে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির সুযোগ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তা করতে পারলে উপদেষ্টাদের এখন বদদোয়া পেতে হতো না, বরং প্রশংসা পেতেন। ব্যবসায়ীদের অংশীজন না করে সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হয় না, গেল সরকার তার টাটকা উদাহরণ রেখে গেছে। অনিবার্যভাবে সেই ক্ষত মোছার দায় বর্তেছে নির্বাচিত সরকারের ওপর। ওই ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়েই যথাসময়ে নতুন সরকারকে বাজেট দিতে হচ্ছে। একদিকে শত চেষ্টা করেও রিজার্ভ, রেমিট্যান্স দিয়ে অর্থনীতি হৃষ্টপুষ্ট রাখা যাচ্ছে না। উচ্চ  মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং বিনিয়োগ মন্দা মিলে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি উত্রানোর দাওয়াই মিলছে না। আবার বাজেটও দিতে হচ্ছে। রাজস্ব আহরণ, বাজেট প্রণয়নসহ নীতিমালা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। পরিস্থিতি বুঝে এখন সরকার আসন্ন অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমকে অধিকতর অর্থবহ, বিশ্লেষণধর্মী ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের অংশীজন করতে চায়। তাহলে বাজেটটি যদ্দুর সম্ভব অংশীদারিমূলক, গণমুখী, শিল্প, ব্যবসা ও করদাতাবান্ধব হবে বলে ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

এই ভাবনা সঠিক। কিন্তু ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ বলে একটা কথা আছে। নির্বাচিত সরকার এলে অর্থনীতিতে স্থিতি আসবে বলে অপেক্ষমাণ ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারের মেলবন্ধন-বোঝাপড়া এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। তাঁদের সঙ্গে সরকারের সুনির্দিষ্ট আলাপন-রসায়ন হয়নি। গণতান্ত্রিক দুনিয়ার কোনো দেশের ব্যবসায়ীরাই সরকারের পোষ্য, অধীন নন। অর্থনীতির প্রশ্নে তাঁরা সরকারের সহায়ক। সরকার বা সরকারের কোনো সংস্থা ব্যবসায়ীদের হুকুম জারি করলে তারা তা তামিল করে ফেলেন না। আবার যোগ-জিজ্ঞাসা, বোঝাপড়া থাকলে কেবল সহায়ক নন, ব্যবসায়ীরা সরকারের সহযোগীও হয়ে ওঠেন। আলাপ-আলোচনা, বোঝাপড়া ছাড়া বাহক বা ভায়া হয়ে জারি করা হুকুম বা আহবানকে ব্যবসায়ী কেন, কেউই সম্মানের সঙ্গে নেন না। কদিন আগে দেশের সব ব্যবসায়ী সংগঠনকে ১৫ মার্চের মধ্যে বাজেট প্রস্তাব দিতে বলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। তা-ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাজেট প্রস্তুতে সহায়তার লক্ষ্যে বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনকে তাদের স্ব স্ব বাজেট প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের কাছে লিখিতভাবে পাঠাতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া এখনো অস্পষ্ট। তারা কোন ধরনের প্রস্তাব-পরামর্শ দেয়, সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হয়।

বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা স্পষ্ট। এর সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। এরপর ব্যবসা সহজীকরণ, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের আবশ্যকতা রয়েছে। মৌলিক এ ক্ষেত্রগুলোতে স্বচ্ছতা থাকলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। সহযোগিতা প্রশ্নে সরকারের সারথিও হবেন। তখন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে অর্থনীতির সমস্যা নিরসনের নিশানাও পাবে সরকার। শিল্প ও বাণিজ্য খাতের ক্ষয়, বিনিয়োগে তলানি, বেসরকারি ঋণপ্রবাহে স্থবিরতায় ব্যবসায়ীরা নাকানিচুবানিতে। ব্যবসায়ীরা আয় না করতে পারলে রাজস্ব জোগান দেওয়া অসম্ভব। তাই বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতি চূড়ান্ত করার আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা-বোঝাপড়ার বিষয় রয়েছে।

অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বাজেট বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতি, রপ্তানি-আমদানির ভারসাম্য, বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। শিল্প-বিনিয়োগের প্রণোদনা, রপ্তানি খাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ অর্থনীতির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যবসায়ীরা সেখানে হতে পারেন সহযোগী। আর সহযোগিতা কখনোই একতরফা হয় না। আবার এর সমান্তরালে অর্থনীতি কেবল সরকারের নীতি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নির্ভর করে না। সেখানে কোরামিন বা টনিকের ভূমিকা রাখতে পারেন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা। তাঁরা আস্থায় থাকলে নতুন শিল্প ও ব্যবসা তৈরি হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে। উৎপাদন, রপ্তানি এবং আমদানিতে ভারসাম্য আসে। অর্থনীতি গতি পায়, যা বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দাওয়াই হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অগ্রাহ্য বা তাচ্ছিল্যের খাতায় থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা কাটার আশা থাকে না। রাজস্ব আয়ের শ্লথগতিও কাটে না। আর বাজেট পেশ সম্ভব হলেও বাস্তবায়ন থেকে যায় দুরাশায়। আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার মূল চাবি শুধু সরকার বা কোনো একক মহলের হাতে নেই। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার এবং বিনিয়োগকারীর সমন্বিত দায়িত্বের ফল-ফসল।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে বিএনপি: মির্জা ফখরুল

» গ্লোবাল সমুদ ফ্লোটিলা অভিযানে অংশ নিবে বাংলাদেশি জাহাজ

» সাদেক হোসেন খোকার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করলেন আব্দুস সালাম

» পৃথক চারটি অভিযানে মাদক, অবৈধ ওষুধ ও ভারতীয় পণ্য উদ্ধার

» যুবদল নেতা হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

» ২০ দিনের ছুটি পেলেন জাবি শিক্ষার্থীরা

» ঈদের আগে হোয়াটসঅ্যাপে বাড়ছে প্রতারণা, সুরক্ষিত থাকার উপায়

» স্টেডিয়ামের বিপরীত পাশের একটি বাণিজ্যিক ভবনে আগুন,উদ্ধার ১৬ জন

» মুক্তির আগেই বক্স অফিসে ঝড় ‘ধুরন্ধর ২’-এর

» নারীর ক্ষমতায়নে সবসময় কাজ করেছে বিএনপি: ডা. জাহিদ

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

বাজেটের ঝুঁকি কাটাতে মাঝি হতে পারে ব্যবসায়ী সমাজ

ছবি সংগৃহীত

 

মোস্তফা কামাল :রাজস্বসহ সরকারের সব আয়ই কমতির দিকে। এর মধ্যেই যথাসময়ে বাজেট প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে সদ্য ক্ষমতায় অভিষেক করা সরকারকে। বিদায় নেওয়া ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী ও শেখ হাসিনা সরকার—এই দুটি সরকারের দায়ই টানতে হচ্ছে সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকারকে। অনিবার্য দায়দেনাসহ বাস্তবতাটা বড় নিষ্ঠুর।

ঝুঁকিও অনেক। একদিকে বৈশ্বিক তাড়না, আরেকদিকে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি। তার ওপর রয়েছে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননসহ নানা ঘোষণা। এগুলো বাস্তবায়নে আগের তুলনায় টাকা লাগবে অনেক বেশি।

এসব কাজ সম্পন্ন করতে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই। রাতারাতি রাজস্ব আয় বাড়ানোও সম্ভব না। এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।

এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।
অর্থের এই টানাটানির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির বাড়তি দাম, গেল সরকারের বিদায়ের আগে ঘোষিত সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি বেতনও অগ্রাহ্যের সুযোগ নেই। নতুন পে স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাতাগোষ্ঠীর প্রকল্প অনুদান এবং বৈদেশিক সাহায্যের কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা নিয়েও রয়েছে নানা শঙ্কা। এ ক্ষেত্রে মোটাদাগে ভরসার জায়গায় রয়েছেন ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা।

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়, তা সময় থাকতে বোঝেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরিণতিতে দেশকে ভুগিয়েছে, নিজেরা ভুগেছে, গালমন্দ শুনেছে। এখন অবসরে এসে ব্যক্তিগত আলাপনে বলছে, রোমন্থন করছে ভুলের কথা। একেকজন অর্থনীতির বিশাল বিশারদ হয়েও সময়দৃষ্টে বাস্তবতা বোঝেননি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগ গড়েননি। উপরন্তু ব্যবসায়ীদের খলনায়ক বানিয়েছেন। নানাভাবে হেনস্তা করেছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের সময়োচিত নীতি প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের এভাবে উপেক্ষা না করলে শিল্প খাতে অস্থিরতা ভর করত না। বিনিয়োগ তলানিতে নামত না। স্থিতিশীল ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিবেশ ও দ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-সংলাপ করলে, তাঁদের পরামর্শ নিলে দেশের এবং নিজেদেরও এ পরিণতি হয় না। বিনিয়োগের খরা সামান্য কাটাতে পারলেও কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো। চাইলেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের খলনায়ক না বানিয়ে, তাঁদের পরামর্শ নিয়ে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির সুযোগ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তা করতে পারলে উপদেষ্টাদের এখন বদদোয়া পেতে হতো না, বরং প্রশংসা পেতেন। ব্যবসায়ীদের অংশীজন না করে সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হয় না, গেল সরকার তার টাটকা উদাহরণ রেখে গেছে। অনিবার্যভাবে সেই ক্ষত মোছার দায় বর্তেছে নির্বাচিত সরকারের ওপর। ওই ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়েই যথাসময়ে নতুন সরকারকে বাজেট দিতে হচ্ছে। একদিকে শত চেষ্টা করেও রিজার্ভ, রেমিট্যান্স দিয়ে অর্থনীতি হৃষ্টপুষ্ট রাখা যাচ্ছে না। উচ্চ  মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং বিনিয়োগ মন্দা মিলে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি উত্রানোর দাওয়াই মিলছে না। আবার বাজেটও দিতে হচ্ছে। রাজস্ব আহরণ, বাজেট প্রণয়নসহ নীতিমালা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। পরিস্থিতি বুঝে এখন সরকার আসন্ন অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমকে অধিকতর অর্থবহ, বিশ্লেষণধর্মী ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের অংশীজন করতে চায়। তাহলে বাজেটটি যদ্দুর সম্ভব অংশীদারিমূলক, গণমুখী, শিল্প, ব্যবসা ও করদাতাবান্ধব হবে বলে ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

এই ভাবনা সঠিক। কিন্তু ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ বলে একটা কথা আছে। নির্বাচিত সরকার এলে অর্থনীতিতে স্থিতি আসবে বলে অপেক্ষমাণ ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারের মেলবন্ধন-বোঝাপড়া এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। তাঁদের সঙ্গে সরকারের সুনির্দিষ্ট আলাপন-রসায়ন হয়নি। গণতান্ত্রিক দুনিয়ার কোনো দেশের ব্যবসায়ীরাই সরকারের পোষ্য, অধীন নন। অর্থনীতির প্রশ্নে তাঁরা সরকারের সহায়ক। সরকার বা সরকারের কোনো সংস্থা ব্যবসায়ীদের হুকুম জারি করলে তারা তা তামিল করে ফেলেন না। আবার যোগ-জিজ্ঞাসা, বোঝাপড়া থাকলে কেবল সহায়ক নন, ব্যবসায়ীরা সরকারের সহযোগীও হয়ে ওঠেন। আলাপ-আলোচনা, বোঝাপড়া ছাড়া বাহক বা ভায়া হয়ে জারি করা হুকুম বা আহবানকে ব্যবসায়ী কেন, কেউই সম্মানের সঙ্গে নেন না। কদিন আগে দেশের সব ব্যবসায়ী সংগঠনকে ১৫ মার্চের মধ্যে বাজেট প্রস্তাব দিতে বলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। তা-ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাজেট প্রস্তুতে সহায়তার লক্ষ্যে বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনকে তাদের স্ব স্ব বাজেট প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের কাছে লিখিতভাবে পাঠাতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া এখনো অস্পষ্ট। তারা কোন ধরনের প্রস্তাব-পরামর্শ দেয়, সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হয়।

বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা স্পষ্ট। এর সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। এরপর ব্যবসা সহজীকরণ, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের আবশ্যকতা রয়েছে। মৌলিক এ ক্ষেত্রগুলোতে স্বচ্ছতা থাকলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। সহযোগিতা প্রশ্নে সরকারের সারথিও হবেন। তখন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে অর্থনীতির সমস্যা নিরসনের নিশানাও পাবে সরকার। শিল্প ও বাণিজ্য খাতের ক্ষয়, বিনিয়োগে তলানি, বেসরকারি ঋণপ্রবাহে স্থবিরতায় ব্যবসায়ীরা নাকানিচুবানিতে। ব্যবসায়ীরা আয় না করতে পারলে রাজস্ব জোগান দেওয়া অসম্ভব। তাই বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতি চূড়ান্ত করার আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা-বোঝাপড়ার বিষয় রয়েছে।

অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বাজেট বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতি, রপ্তানি-আমদানির ভারসাম্য, বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। শিল্প-বিনিয়োগের প্রণোদনা, রপ্তানি খাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ অর্থনীতির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যবসায়ীরা সেখানে হতে পারেন সহযোগী। আর সহযোগিতা কখনোই একতরফা হয় না। আবার এর সমান্তরালে অর্থনীতি কেবল সরকারের নীতি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নির্ভর করে না। সেখানে কোরামিন বা টনিকের ভূমিকা রাখতে পারেন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা। তাঁরা আস্থায় থাকলে নতুন শিল্প ও ব্যবসা তৈরি হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে। উৎপাদন, রপ্তানি এবং আমদানিতে ভারসাম্য আসে। অর্থনীতি গতি পায়, যা বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দাওয়াই হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অগ্রাহ্য বা তাচ্ছিল্যের খাতায় থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা কাটার আশা থাকে না। রাজস্ব আয়ের শ্লথগতিও কাটে না। আর বাজেট পেশ সম্ভব হলেও বাস্তবায়ন থেকে যায় দুরাশায়। আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার মূল চাবি শুধু সরকার বা কোনো একক মহলের হাতে নেই। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার এবং বিনিয়োগকারীর সমন্বিত দায়িত্বের ফল-ফসল।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com