গ্রামের কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে উঠান বৈঠকে কিংবা বাজারের পাশে ছোট একটি এজেন্ট ব্যাংকিং
আউটলেটে— সবখানেই বদলে যাচ্ছে ব্যাংকিংয়ের চেনা দৃশ্য! কাউন্টারের এপারে যেমন নারী
গ্রাহক, ওপারেও নারী। লেনদেনের ভাষায় আছে আস্থা, তেমনি চোখে ও স্বরে স্বস্তির ছাপ।
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ‘তারা’ এজেন্ট বা
এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের স্বত্বাধিকারী নারী উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু নানা
কারণে দেশের নারীদের একটা বিরাট অংশ ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছেন। এই চ্যালেঞ্জ
মোকাবেলায় ব্র্যাক ব্যাংক ভিন্ন পথে হেঁটেছে। ব্যাংকটি শুধু নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো
নিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করেনি, বরং ব্যাংকিং সেবাদাতা হিসেবেই নারীদের সামনে নিয়ে
এসেছে।
এজেন্টও নারী, গ্রাহকও নারী
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্র্যাক ব্যাংকের ৯০টি ‘তারা’ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট
চালু রয়েছে। এই আউটলেটগুলোতে ৮১ জন নারী এজেন্ট সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে দায়িত্ব
পালন করার মাধ্যমে গ্রাহকদের দিয়ে যাচ্ছেন নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং সেবা।
শুধু তা-ই নয়, এই ‘তারা’ এজেন্টদের সহায়তা করতে মাঠপর্যায়ে আছেন প্রায় ৯০০ জন নারী
এজেন্ট ব্যাংকিং ফিল্ড অফিসার। এই নারীরা ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার বাইরে থাকা
প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন ব্যাংকিং সেবার প্রয়োজনীয়তা; বাড়াচ্ছেন
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি।
এমন উদ্যোগের ফলাফলও চোখে পড়ার মতো। ব্র্যাক ব্যাংকে ‘তারা’ এজেন্ট ব্যাংকিং
আউটলেটের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৬৮৫টি নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যাদের
অধিকাংশই প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছেন। এসব অ্যাকাউন্টে জমা
হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এটি কেবল একটি আশাজাগানিয়া সংখ্যাই নয়, নারীদের
সক্ষমতারও পরিচায়ক।
নারী গ্রাহকরা নারীদের সাথেই ব্যাংকিংয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য গ্রামবাংলার বাস্তবতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা এখনো পুরুষ ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গেকথা বলতে সংকোচবোধ করেন। ফলে, অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে এসে ব্যাংকিং সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
IMPACT STORY
ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’ এজেন্টরা এই প্রতিবন্ধকতা দূর করেছেন। নারী এজেন্টদের
আউটলেটের প্রায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহকই নারী। তাঁরা নারী ব্যাংকারদের কাছ থেকে
ব্যাংকিং সেবা নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’ এজেন্টরা
নারীদের কাছে হয়ে উঠেছেন আস্থার প্রতীক।
উঠান বৈঠক থেকে ব্যাংক হিসাব
নারী এজেন্ট এবং নারী ফিল্ড অফিসাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের সঞ্চয়ের গুরুত্ব,
অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম, বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স আনার সুবিধা, ডিপিএস এবং এফডিআর
খোলাসহ নানা আর্থিক বিষয়ে পরামর্শ দেন। উঠান বৈঠকের মতো আয়োজন হয়ে উঠেছে
ব্যাপক জনপ্রিয়, যা দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করছে।
এছাড়াও, আউটলেটে আর্থিক সাক্ষরতা নিয়ে পরিচালিত সেশনগুলোও দেশে ব্যাংকিং ও
আর্থিক সেবার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট
ব্যাংকিং দেশব্যাপী ৭২টি আর্থিক সাক্ষরতা সেশন পরিচালনা করে, যেখানে সরাসরি অংশ
নেয় ৫,৩১১ জন ব্যক্তি।
নারীদের জন্য নারীবান্ধব প্রোডাক্ট
ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোতে নারী গ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে
ডিজাইনকৃত প্রোডাক্ট ও সেবা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে ‘তারা’ প্রবাসী পরিবার সেভিংস
অ্যাকাউন্ট, ‘তারা’ সেভিংস ডিপোজিট, ‘তারা’ প্রথম অ্যাকাউন্ট, ‘তারা’ ট্রিপল বেনিফিটস
সেভিংস অ্যাকাউন্ট। এখানে নারী উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন ‘তারা’ উদ্যোক্তা এসএমই লোন।
এই প্রোডাক্টগুলো নারীদের কেবল ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যই ডিজাইন করা হয়নি,
বরং তাঁদের জীবনকে সহজ ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতেই তৈরি করা
হয়েছে। ‘তারা’ এজেন্টরা এই সেবাগুলো নারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
ঋণ মানেই উৎপাদন
‘তারা’ এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে ডিসবার্স হওয়া ঋণগুলোর বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে আয়বর্ধক
খাতে। কেউ গরু পালন করছেন, কেউ হাঁস-মুরগি পালন, আবার কেউ ছোট দোকান বা সেলাইয়ের কাজ শুরু করছেন। ঘরে বসে খাবার তৈরি করে বিক্রিও করছেন কেউ কেউ।
এই বিনিয়োগ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়াচ্ছে। সংসারের খরচে অংশ নেওয়ার
পাশাপাশি নারীরা এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছেন। এতে নারীদের আত্মবিশ্বাস
বাড়ছে, সামাজিক অবস্থানও বদলে যাচ্ছে।
IMPACT STORY
ঋণ দেওয়ার পর ‘তারা’ এজেন্ট ও নারী ফিল্ড অফিসাররা গ্রাহকের নিয়মিত খোঁজখবর রাখায়
ঋণের সঠিক ব্যবহার ও সময়মতো পরিশোধও নিশ্চিত হচ্ছে, যা দেশে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে।
নেতৃত্বেও নারী
‘তারা’ এজেন্টদের মাধ্যমে শুধু গ্রাহক পর্যায়েই নারীর সংখ্যা বাড়ছে না, বরং নেতৃত্বেও
নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’ এজেন্ট মানে তিনি শুধু ব্যাংকের প্রতিনিধিই
নন— তিনি একজন উদ্যোক্তা ও একজন স্থানীয় রোল মডেল, যার নেতৃত্বগুণে এগিয়ে যায়
একটি ব্যবসা।
ব্র্যাক ব্যাংক ব্রাহ্মণবাড়িয়া রিজিওনের বাঞ্ছারামপুর আউটলেটের ‘তারা’ এজেন্ট নাজমা
আক্তার বলেন, “এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত যে
অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি, তা আমার নেতৃত্বগুণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আমাকে দেখে
অনেক নারীই এখন ব্যাংকিং সেবায় আসতে চাচ্ছেন। আমি আশা করি, দেশের অন্যান্য এজেন্ট
ব্যাংকিং সেবাও ব্র্যাক ব্যাংকের মতো নারী নেতৃত্ব উন্নয়নে এগিয়ে আসবে।"
এভাবেই ব্র্যাক ব্যাংক দেখিয়ে যাচ্ছে, একজন নারী শুধু সেবাগ্রহীতাই নয়, তিনি একজন
সেবাদাতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীও হতে পারেন।
এভাবেই ব্র্যাক ব্যাংক দেখিয়ে যাচ্ছে, একজন নারী শুধু সেবাগ্রহীতাই নয়, তিনি একজন
সেবাদাতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীও হতে পারেন।
বদলে যাওয়ার গল্প
প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের মধ্যে যারা একসময় ব্যাংকে যেতেই অনাগ্রহী ছিলেন, ব্র্যাক
ব্যাংক ‘তারা’ এজেন্টের মাধ্যমে তাঁদের অনেকেই এখন কাউন্টারের ওপারে বসে অন্য
নারীদের ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছেন। এই বদলে যাওয়ার গল্পই বলে দেয়— সঠিক উদ্যোগ,
বিশ্বাস আর সুযোগ পেলে নারীরাই পারে অর্থনীতি ও সমাজ বদলে দিতে। নারীদের এই বদলে
যাওয়ার গল্পে পাশে আছে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং।








