ছবি সংগৃহীত
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :স্বাধীনতা লাভের অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় কেটে গেলেও বাংলাদেশ কেন একটি ‘আদর্শ রাষ্ট্র’ হয়ে উঠতে পারছে না। কারণ যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেছে তারা ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতে যতটা ব্যতিব্যস্ত ছিল, দেশকে ‘আদর্শ রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে তাদের ততটাই অনীহা ছিল। রাষ্ট্রক্ষমতা তাদের অধিকাংশের মুনাফা লোটার ও ভাগ্য গড়ার মাধ্যম ছিল মাত্র। যুদ্ধে অনেক রক্ত ঝরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে।
আয়তনের দিক থেকে যত ক্ষুদ্র ভূখণ্ডই হোক না কেন, বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সীমানা চিহ্নিত দেশ। এ দেশের পৃথক একটি পতাকা আছে, সরকার আছে এবং সার্বভৌমত্বও আছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের ৬০টি দূতাবাস ও হাইকমিশনসহ মোট ৮৩টি মিশন দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে।
পৃথিবীর সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অন্যতম অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীগুলো প্রায় চার দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নসহ বাংলাদেশের বিকাশও চোখে পড়ার মতো। এমনকি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন সূচকের উন্নয়ন স্ফীত উল্লম্ফন দেখিয়ে দাবি করতে শুরু করেছিল যে বাংলাদেশ অচিরেই ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (এলডিসি) থেকে ‘মাঝারি আয়ের দেশে’ পরিণত হতে যাচ্ছে।
আওয়ামী ঘরানার বাইরের অর্থনীতিবিদরা সন্দিহান ছিলেন বাস্তব কারণেই। কারণ বাংলাদেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কখনোই ছিল না এবং রপ্তানি পণ্য ছিল হাতেগোনা। পাকিস্তান আমলে দেশটির পূর্বাঞ্চলের একমাত্র রপ্তানি পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। সত্তরের দশকের শুরুতে কৃত্রিম আঁশ পণ্যের বহুল ব্যবহারে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা প্রায় ফুরিয়েই গিয়েছিল। কাঁচা পাটের মূল্যও বিশ্ববাজারে কমে গিয়েছিল।
এক দশক পর রপ্তানি আয়ের ঘাটতি হ্রাস পায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি এবং আরও এক দশক পর এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইউরোপ ও আমেরিকায় তৈরি পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায়। বর্তমানে এ দুটি খাতই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এ দুটি খাত সামান্য চাপের মুখে পড়লেই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানির দিকে চলে যায়।
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বভুক্ত দরিদ্র দেশ থেকে জাতিসংঘের ‘এলডিসি’ দেশের তালিকায় উঠে এসেছিল ১৯৭৫ সালে এবং ২০২৬ সালে ‘মাঝারি আয়ের দেশ’ এবং ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করত, তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি আয়ের স্ফীতিতে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ‘নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে’ পরিণত হয়েছে এবং দেশে ১৯৯১ সালে দারিদ্র্যের হার ৪১.৯ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে ১৩.৫ শতাংশে নামিয়ে তারা সফল হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের নিজস্ব মূল্যায়ন ছিল এর বিপরীত এবং কিছুটা ভিন্ন ধরনের।
জাতিসংঘের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ‘মাঝারি আয়ের দেশে’ উন্নীত হওয়ার উপযোগী নয় মুখ্যত তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যরে দুর্বলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং সম্ভাব্য বাজার ধরায় প্রাধান্য না দেওয়ার কারণে। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের অনেক ঢাকঢোল পেটালেও তাদের টানা চতুর্থ মেয়াদের প্রথম বছরে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১০.৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অর্থাৎ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগের মাসে খাদ্যমূল্য স্ফীতি ছিল রেকর্ড পরিমাণ ১৪.১ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে বর্তমান সরকার-পূর্ব দেড় বছরে এ বিষয়ে কোনো মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসীন বিএনপি সরকার এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের মাঝারি আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ভবিষ্যৎ। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে কোনো সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসেনি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেনি এবং একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি বজায় থাকায় গত তিন বছরে উৎপাদনশীলতায় মন্থর অবস্থা বিরাজ করছে। নতুন সরকারের পক্ষে সবকিছু সামলে উঠতে যে সময়ের প্রয়োজন হবে, তত দিনে সরকার তাদের মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে চলে আসবে।
বাংলাদেশের অস্তিত্বের গত সাড়ে পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করে, পরবর্তী সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দল যদি সরকার গঠন করে তাহলে পূর্ববর্তী সরকারের সবকিছুতে তারা ভুল, দুর্নীতি অথবা বহু প্রকল্প সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে গৃহীত হিসেবে দেখতে পায় এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়ে যাওয়া প্রকল্পগুলো বাতিল করে। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে খুব কমসংখ্যক প্রকল্প চালু রাখা হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার পেছনে এটাও বড় একটি কারণ।
৫৫ বছরে খুব কম সরকার এসেছে, যারা জনগণকে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড বা চালিকাশক্তি হিসেবে এবং রাষ্ট্রের আইন ও শাসন যে জনগণের জন্যই সে হিসেবে বিবেচনা করেছে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে তারা নিজেদের জমিদার বা সামন্ত প্রভু ভেবেছে এবং জনগণকে তাদের প্রজা বা হুকুমের দাস হিসেবে দেখেছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার যেহেতু রাজনৈতিক দলপ্রধান বা ব্যক্তিনির্ভর ছিল এবং এখনো আছে, অতএব ফেলে আসা সময়ের কোনো পর্যায়েই তারা উপলব্ধি করেনি যে সরকার রাষ্ট্রের একটি সাংগঠনিক কাঠামো, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ করে, জনসেবা নিশ্চিত করে এবং বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করে।
বাংলাদেশে এটি প্রায় প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গেছে যে সরকারপ্রধান, তাঁর মর্জি অনুযায়ী সবকিছু করবেন এবং মেয়াদের নির্ধারিত পাঁচটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই পরের মেয়াদে কীভাবে সরকারে ফিরে আসা যায়, সেই ফন্দিফিকির ও কৌশল রচনা করবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো তক্কে তক্কে থাকে যে সরকার কখন তাদের বড় ভুলগুলো করে। তারা সরকারের সঙ্গে জরুরি জাতীয় ইস্যুতেও কখনো একাত্ম অনুভব করে না, বা সরকারও তাদের তোয়াক্কা করে না।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ১০ ট্রাক অস্ত্র এবং শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার অভিযোগের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিচারপতি কে এম হাসানকে কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান নিয়োগ করার জন্য উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ বছরে উন্নীত করে সংবিধান সংশোধন করা। আওয়ামী লীগ সরকারের তো ভুল ও অপরাধের সীমাপরিসীমা ছিল না। বরং বলা যায়, তারা এই বিশ্বাস থেকে অপরাধ করত যে রাষ্ট্রই তাদের অপরাধ সংঘটনের অধিকার প্রদান করেছে। কিন্তু কারও দিন সমান যায় না এবং তাদের অপকর্মই তাদের জন্য কাল ও সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আওয়ামী লীগের লজ্জাজনক পতন ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সংহতি ও ঐক্যের ঘাটতির অভাব দেশে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে রেখেছে এবং এজন্য যদি একক কোনো দলকে দায়ী করা হয়, সেটি অনিবার্যভাবেই আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশে তারা তাদের প্রতিপক্ষ ছোটবড় প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে হয় ছলেবলে নিজেদের পক্ষে নিয়েছে এবং যারা আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলোকে ধ্বংস করতে এবং দলগুলোর নেতাদের উদ্দেশে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও তাদের নামে কুৎসা রটনা করতে, হত্যা, গুম করতে, মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে দ্বিধা করেনি। তা সত্ত্বেও তারা দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতে সক্ষম হয়নি। কারণ তারা তাদের দলের সূচনাকাল থেকে সব সময় অস্থিতিশীলতাকে পুঁজি করেই রাজনীতিতে তাণ্ডব সৃষ্টি করে রেখেছে।
আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করেছে, তখন বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদসহ প্রতিটি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগপ্রধানের মর্জির অধীন করতে চেষ্টা করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এসব কাজে তাদের পথে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাকে তারা একচেটিয়া করে নিয়েছিল। ফলে সার্বিক অর্থে জাতি-গঠন প্রক্রিয়া কখনো শুরুই হতে পারেনি। অতএব রাষ্ট্রের সব বৈধ উপাদান-স্থায়ী জনগোষ্ঠী, সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ একটি ‘আদর্শ রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারেনি বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে গণভোট, জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের ওপর বিতর্ক চলছে, রাজপথে আন্দোলন চলছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটে প্রায় নিশ্চিতই ছিল যে সংবিধানের আমূল সংস্কার সাধিত হবে। কিন্তু এখন আর তা মনে হচ্ছে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল স্পষ্ট করেছে যে তারা যেভাবে চাইবে, সেভাবে সংবিধান সংশোধন করবে। কোনো সংস্কার নয়। সংবিধানের কী সংশোধন আনা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে প্রণীত সংসদীয় পদ্ধতির সংবিধানের খোলনলচে পাল্টে সেটিকে একদলীয় প্রেসিডেন্টশাসিত সংবিধানে রূপ দিয়েছিলেন। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে জাতি শেখ মুজিবকে এই ম্যান্ডেট দেয়নি। আব্রাহামিক ধর্মগুলোকে আদিকাল থেকে অপরিবর্তনীয় বিবেচনা করা হয়। তা সত্ত্বেও অনেকে খ্রিস্টধর্ম ও চার্চকে পুরোপুরি সংস্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার ধর্ম ও রাষ্ট্র দুটিকেই সংস্কার করতে বলেছিলেন ‘অবশ্যই চার্চকে সংশোধন করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্র সংস্কার করতে হবে!’ অতীতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে না পারলে বাংলাদেশের পক্ষে নিকট-ভবিষ্যতে ‘আদর্শ রাষ্ট্রে’ পরিণত করা সম্ভব হবে না এবং জাতি গঠন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর অতীতের সব সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে-এখনো একই ভুলের ধারাবাহিকতা চলছে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








