ছবি সংগৃহীত
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : বাংলাদেশ কি খুব ভালোভাবে চলছে? যাঁরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তাঁরা দায়িত্ব নিয়েছেন দেশের এক দুঃসময়ে। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে রেখে যাওয়া জঞ্জাল সাফ করার কাজ অত্যন্ত জটিল এবং এই জটিল কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ওপর। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৪৭ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এখনই বলা সম্ভব নয় যে সরকার ভালোভাবে অথবা মন্দভাবে চলছে।
বিএনপি ৪৮ বছরের পুরোনো একটি রাজনৈতিক দল এবং সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। মাঝেমধ্যে বিরতিসহ বিএনপি অতীতে পাঁচ দফা বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা করেছে। তবে এবার তারা ক্ষমতায় এসেছে ১৭ বছরের এক বিরাট ব্যবধানের পর। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বড় দলকে প্রায়ই ভেঙে যেতে দেখা যায়। কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এ কথা সত্য যে বিএনপির অতীতের অভিজ্ঞ নেতাদের অধিকাংশই এখন আর বেঁচে নেই। নবীন ও প্রবীণ নেতাদের সমন্বয় ঘটেছে এবারের বিএনপি সরকারে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ টানা জবরদস্তিমূলক শাসনে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী নিপীড়িত হয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের মাঝে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের তাগিদ কাজ করবে এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের লুটপাটের ক্ষেত্রগুলো হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সফলভাবে সরকার পরিচালনা করতে হলে বিএনপিকে হিসাব করে পা ফেলতে হবে, যাতে তাদের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ না করেন। সবকিছুর ওপর স্থান দিতে হবে জাতীয় স্বার্থকে।
বহু বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আটাশতম প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন (১৯১৩-১৯২১) বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যদি জাতীয় স্বার্থে কোনো কাজই না করে, তাহলে সেটি ভালো রাজনৈতিক দল হয় কীভাবে? আমাদের দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে উড্রো উইলসনের কথাটি সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য। সরকার ও দলগুলো জাতিকে সেবা করার সুযোগ পায়, কিন্তু বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের খুব কমসংখ্যক সরকার ও রাজনৈতিক দল জাতির প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল দেশের কল্যাণে যে প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করেছে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি কখনো শ্রদ্ধাশীল ছিল না বলে পঞ্চান্ন বছর বয়সি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এখনো ধুঁকে ধুঁকে চলছে।
রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, সংবিধান রক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি বিস্মৃত হয়েছেন। ক্ষমতার মোহ ও দম্ভে তাঁরা এত দিশাহারা হয়ে গেছেন যে দেশকে তাঁরা কোন পথে নিয়ে যাবেন তা স্থির করতে পারেননি। আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর এক কবিতায় বলেছেন, ‘বনের মধ্যে দুটি পথ দুদিকে চলে গেছে, আমি একটি পথ বেছে নিয়েছি, যে পথে খুব কমসংখ্যক লোক চলাচল করেছে, এবং এই সিদ্ধান্তই এনে দিয়েছে পার্থক্য।’ কেউ যদি তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি অটল থাকেন, তাহলে তিনি যে পথেই যান না কেন, সে পথেই তাঁর দৃঢ় পদচারণের ছাপ রাখতে পারেন। বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এসেছেন, যাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতার পাশাপাশি অনেক অবদানও রেখেছেন।
কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য হলো, দেশের প্রতি ভালোবাসা পোষণের পরিবর্তে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নেতাদের কখনো মহানায়ক, আবার কখনো খলনায়কে পরিণত করে। এটা নির্ভর কখন কোন দল ক্ষমতায় আছে তার ওপর। তারা সমগ্র জাতিকে এমনভাবে বিভাজিত করেছে যে কোনো জাতীয় নেতাই সামগ্রিকভাবে সবার সম্মানের পাত্র নন। তাঁরা কখনো পরম শ্রদ্ধেয়, কখনো চরম নিন্দনীয় ও ঘৃণার্হ্য। যাঁর যখন সুযোগ আসে তাঁরা তাঁদের বেহেশতবাসী নেতার পূজা করেন, সুযোগ শেষ হলে আরেক দল প্রতিদ্বন্দ্বী দলের পূজিত নেতার অবদানকে এত খাটোভাবে চিত্রিত করেন যে তাঁর ভালো কাজগুলোকেও জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপকর্মের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করতে কেউ কার্পণ্য করে না।
বিগত ৫৫ বছর ধরে এই টানাহ্যাঁচড়াই চলে আসছে। এই দীর্ঘ সাড়ে ৫ দশক কি প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয় যে আমরা এমনকি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতেও অনাদিকাল পর্যন্ত ঐকমত্যে না পৌঁছার গোঁ-ধরে বসে আছি! এমন একটি মানসিক বিভাজনের মধ্যে দেশ ও জাতির উন্নয়ন কি আকাশ ফেঁড়ে পড়বে?
ব্যক্তিনির্ভর কোনো দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়, দলের সব পর্যায় থেকে সেই ব্যক্তির প্রশংসার প্লাবন বইতে শুরু করে তখন তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে পারেন না। শেখ মুজিবও পারেননি, তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও পারেননি। এর পরিণতি কী হতে পারে, তা জাতির সামনে এখনো দৃশ্যমান। সবাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার জ্ঞান দান করতে পটু, কিন্তু কেউ ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করেন না। অতএব পতনের সিঁড়ি তাঁরা নিজেরাই তৈরি করেন। যে শ্রম-সাধনায়, কৌশল ও অপকৌশলে তাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন, দম্ভ ও প্রতিপক্ষকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে গিয়ে একটি পর্যায়ে পতনের সেই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত পিছলে পড়েন। এ পরিণতি যে অবশ্যম্ভাবী, তাঁরা তা জানেন। তবু শেষ পর্যন্ত সব শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চেষ্টা করেন।
কিন্তু কে তাঁর অনিবার্য পরিণতি ঠেকাতে পেরেছেন? পাকিস্তান আমলে সামরিক ‘লৌহমানব’ খ্যাত আইউব খান পারেননি। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা খ্যাত শেখ মুজিবুর রহমান, সামরিক শাসক এরশাদ এবং ‘আয়রন লেডি’ খ্যাত শেখ হাসিনাও পারেননি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা ক্ষমতার আভিজাত্যের স্বাদ নিতে গিয়ে দেশকে উন্নয়নের পথ থেকে বহু দূরে ঠেলে দিয়েছেন।
আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না কেন? কারণ আমাদের রাজনীতিবিদরা জনগণকে আর ক্ষমতার উৎস বলে বিশ্বাস করেন না। জনগণকে নানা প্রলোভনে প্রলুব্ধ করে তাদের সম্মিলিত শক্তিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার অধিকাংশ রাজনীতিবিদ নিজেদেরকেই ক্ষমতার উৎস বলে বিবেচনা করেন। তাঁরা তাঁদের চেতনায়, রাজনৈতিক বিশ্বাসে, তাঁদের অন্তর্দৃষ্টিতে নিজেদের কৃতিত্ব ছাড়া আর কিছু দেখতে পান না। তাঁরা জনগণের ঐক্যবদ্ধ জাতীয় শক্তির গভীরতম উৎসকে সম্মান দিতে পারেন না। এই শক্তি যে অনেক রূপ নিতে পারে, ক্ষমতার মদমত্ততায় তাঁরা তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন। তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না যে তাঁরা ক্ষমতা ব্যবহার করেন, নাকি ক্ষমতা তাঁদের ব্যবহার করে। তাঁদের এই বুঝে না ওঠার কারণে এমন একটি সময় আসে যখন জনগণ রাজনীতিবিদদের, বিশেষ করে যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁদের প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক, দুর্নীতিগ্রস্ত বিবেচনা করে তাঁদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ ও ‘১৯৮৪’-এর রচয়িতা ইংলিশ ঔপন্যাসিক ও কবি জর্জ অরওয়েল বলেছেন, ‘প্রতারণা যখন সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তখন সত্য কথা বলাই এক ধরনের বিপ্লব।’ বারবার প্রতারণার চাদরে ঢাকা একটি রাজনৈতিক কাঠামোর সত্যকে তুলে ধরার জন্য এবং প্রতারক রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার আসন থেকে টেনে নামানোর উদ্দেশ্যে প্রতারিত জনগণ রাজপথে নেমে আসে। ক্ষমতার দাপটে ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গড়ে তোলা প্রতিটি প্রতীক ধ্বংস করার মাঝে তারা শাসকের ওপর প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করার আনন্দ লাভ করে। বাংলাদেশে বারবার এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অগণন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়েছে।
জাতীয় ঐক্য, চেতনা ও সংহতির কথা সবাই বলেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এসব শব্দ ব্যবহার করে যার যার অবস্থান ও প্রেক্ষাপট থেকে। প্রতিটি দলের কাছে শব্দগুলোর অর্থ ও প্রয়োগ ভিন্ন ভিন্ন। ফলে কোনো দল যখন ক্ষমতায় যায় তখন এসব শব্দই তাদের ঔদ্ধত্যের দিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে বিরাজমান চির-সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করা সত্ত্বেও বিদ্বজনদের অধিকাংশই সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন না।
তাঁদের অনেকে কাউকে বুঝতেও দেন না যে তাঁরা কোন দলকে সমর্থন করেন। এমনকি তাঁরা নির্বাচনে ভোটও দেন না। তাঁরা ‘রাজনীতি বদমাশদের শেষ আশ্রয়’ মর্মে পুরোনো প্রবাদ বিশ্বাস করেন। তাঁরা শুধু আশা পোষণ করেন, যে দলই সরকার গঠন করুক, তারা যাতে দেশের জন্য কাজ করে এবং লুটপাট করে দেশকে সাবেক আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অভিহিত না করে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








