অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার

ছবি সংগৃহীত

 

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :রাজনীতিবিদরা যদি সত্য বলেন, তাহলে বোধ হয় রাজনীতিতে সফল হতে পারেন না। পবিত্র ধর্মগ্রন্থাদি- কোরআন, গীতা বা বাইবেল স্পর্শ করে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ উচ্চারণ করেও যে সমাজে অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়, প্রকৃত দোষী নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে বেকসুর খালাস পায়, সে সমাজে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সদাচারের আশা দুরাশা মাত্র। দেশে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন, তাঁদের শপথ উচ্চারণে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁদের শপথ পাঠ করতে হয় দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। তাঁরা যা উচ্চারণ করেন, তার মুখ্য বক্তব্য হচ্ছে : ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ যাঁরা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে নিয়োগ লাভ করেন, তাঁদেরও কমবেশি একই ধরনের শব্দমালা উচ্চারণ করে শপথ গ্রহণ করতে হয়।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, শপথ গ্রহণকারী কেউ কেউ তাঁদের শপথকে কেবল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিবেচনা করেন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁরা যে ধরনের কার্যকলাপে নিয়োজিত হন, তার সঙ্গে তাঁদের শপথের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীরা ইতোমধ্যে শপথ গ্রহণ করে তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সাফল্যে সাড়ে ১৫ বছর জাতির কাঁধে চেপে থাকা একটি ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর পতন না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো ২০২৯ সালে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সফলতাই সেই নির্বাচনকে তিন বছর এগিয়ে আনতে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্দোলনে বিজয়ীরা দেশের ছোটবড় সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করেছিল ‘জুলাই সনদ’ এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচসহ ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদ আদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের রায় জানার জন্য গণভোটেরও ব্যবস্থা ছিল। গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ভোটারদের বিপুল সম্মতি পাওয়া গেছে। কিন্তু দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপির সদস্যরা তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের’ শপথ পাঠ এড়িয়ে গেছেন। সাংবাদিকরা এ সম্পর্কে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা কোনো দ্বিধা না করেই বলেছেন যে ‘বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের সংবিধান সংস্কারের জন্য শপথ নেওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। তাঁরা শপথ নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের শপথের বৈধতা নিয়ে আইনগত চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।’ তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোটে রাজি না হলে নির্বাচন দিত না, তাই রাজি হওয়া।’ বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে : কাজের বেলায় কাজি, কাজ ফুরালেই পাজি,’ যার সরল অর্থ হচ্ছে : ‘স্বার্থ হাসিলের আগে নানাভাবে খাতির-তোয়াজ করা, আর স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে আসল মূর্তি ধারণ করা।’ সংবিধানে কী আছে, আর কী নেই, তা শপথ গ্রহণ করার দিনেই তাদের মাথায় এসেছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।

বিএনপি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করে সংবিধান ইচ্ছামতো কাটাছেঁড়া করার সুযোগ পেয়েছে। আওয়ামী লীগও ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের মর্জিমাফিক বহু আন্দোলনের পর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছিল এবং সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিল। শেখ হাসিনার সরকারের এই সংবিধান সংশোধনীগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁর ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন, স্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করা। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অর্থ জনমতকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অসততা প্রদর্শন করা নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা কবে কখন সততা প্রদর্শন করেছে এবং তাদের শপথের প্রতি সশ্রদ্ধ থেকেছে? আওয়ামী লীগ যে কখনো জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না, তা তারা ১৯৭৩ সালে সংসদীয় সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে সংসদীয় সরকাব্যবস্থার পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রতারণা করে ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে। শেখ হাসিনা সেই পথে হেঁটেছেন, যার ফলাফল তাঁর জন্য এবং দেশ ও জাতির জন্য শুভ হয়নি। বিএনপি দেশকে বাকশাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে এবং ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো আওয়ামী ধাঁচের স্বৈরাচারী আচরণ করেনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীসুলভ আচরণ করে তাদের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ করবে, এমন আশা করা যায় না। যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর তাৎক্ষণিক গণভোট অনুষ্ঠানের প্রতি বিএনপির আস্থা ছিল না, তারা আগেই তাদের যুক্তি কার্যকারণসহ জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারত। তাহলে একদিকে তাদের রাজনৈতিক সততা ও সংবিধানের প্রতি বিএনপির অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রমাণিত হতো এবং দেশের সর্ববৃহৎ দল হিসেবে বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতো বলে আমার মনে হয় না।

বিএনপির বর্তমান অবস্থানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সফল রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য সম্ভবত এটাই জরুরি যে মনের ভিতর যা আছে তা প্রকাশ না করা এবং উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ামাত্র নতুন সুরে কথা বলা। আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যালটে বাক্স বোঝাই করেছিল নির্বাচনের আগের রাতেই। এটা কি তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে করেছিল? দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনার ফল ছিল তাদের ‘নিশিরাতের ভোট’। বিএনপির জুলাই সনদ বাস্তবায়নে শপথ গ্রহণ না করাও তাদের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল। তারা জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠন করে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কৌশলে সফল হয়েছে।

রাজনীতি জটিল এক শাস্ত্র এবং রাজনীতিবিদরা সেই শাস্ত্রের অধ্যক্ষ ও মহাধ্যক্ষ। সাধারণ মানুষের কাজ ভোট দেওয়া এবং ‘তাদের দ্বারা নির্বাচিত’ শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়া। আমরা ধরেই নিতে পারি, ঘুরেফিরে দেশে পুরোনো রাজনীতিরই চর্চা হবে। সময়ের সঙ্গে দেশে কিছু উন্নয়ন হবে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে হাতে গোনা কিছু মানুষ। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়ন ও বিনিয়োগে ছিটেফোঁটা ভাগ পড়লে তা তাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের হবে। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশের জনগণ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে, গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চেয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে তারা কেবল শাসিতই হয়েছে, কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র পায়নি। পাকিস্তানি আমলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় পার করার পরও যদি ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানাতে হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইয়ে হাজারো তরুণকে জীবন দিতে হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কোনো কিছু হতে পারে না।

বিএনপি চেয়ারম্যান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার নির্বাচিত অধিকারী তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি তাঁর বাবা-মার মতোই জনপ্রিয়। জনগণ তাঁর প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে, তা কেবল বাংলাদেশে নয়, বহু দেশের ইতিহাসেও বিরল। একটি অপশক্তিকে বিদায় করে বাংলাদেশের জনগণ তাঁর প্রতি দৃঢ় আস্থা স্থাপন করেছে এবং তারা আশাবাদী যে তিনি তাদের আস্থার মূল্য দেবেন।  তারা বিশ্বাস করে যে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যা পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের জন্য অনুকরণীয় হবে। এজন্য তিনি তাঁর পারিষদবর্গের পরামর্শ অবশ্যই গ্রহণ করবেন, সেজন্য তো রয়েছে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ ও উপদেষ্টামণ্ডলী। তা সত্ত্বেও একজন সুশাসক হওয়ার জন্য রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে তাঁর চিন্তাপ্রসূত বিচক্ষণতা প্রদর্শন করতে হবে। নৈতিক গুণাবলির বিকাশও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর জন্য জরুরি, যা জনগণকে তাঁর প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে এবং দুর্যোগ মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ভূমিকম্প অনুভূত

» রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার নিয়ে জামায়াত-এনসিপি খেপল কেন?: নীলা ইস্রাফিলের প্রশ্ন

» ঢাকা ও নরসিংদীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জাতি স্তম্ভিত: জামায়াত আমির

» এবার ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

» ভুল জায়গায় রাউটার রাখলে কমতে পারে ইন্টারনেট স্পিড

» অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার

» গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে : তথ্যমন্ত্রী

» শেওড়াপাড়ায় মেট্রো স্টেশনের পাশের ভবনে আগুন

» হালিম তৈরির রেসিপি

» কত মাস পর বদলে ফেলা উচিত টুথব্রাশ?

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার

ছবি সংগৃহীত

 

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :রাজনীতিবিদরা যদি সত্য বলেন, তাহলে বোধ হয় রাজনীতিতে সফল হতে পারেন না। পবিত্র ধর্মগ্রন্থাদি- কোরআন, গীতা বা বাইবেল স্পর্শ করে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ উচ্চারণ করেও যে সমাজে অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়, প্রকৃত দোষী নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে বেকসুর খালাস পায়, সে সমাজে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সদাচারের আশা দুরাশা মাত্র। দেশে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন, তাঁদের শপথ উচ্চারণে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁদের শপথ পাঠ করতে হয় দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। তাঁরা যা উচ্চারণ করেন, তার মুখ্য বক্তব্য হচ্ছে : ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ যাঁরা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে নিয়োগ লাভ করেন, তাঁদেরও কমবেশি একই ধরনের শব্দমালা উচ্চারণ করে শপথ গ্রহণ করতে হয়।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, শপথ গ্রহণকারী কেউ কেউ তাঁদের শপথকে কেবল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিবেচনা করেন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁরা যে ধরনের কার্যকলাপে নিয়োজিত হন, তার সঙ্গে তাঁদের শপথের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীরা ইতোমধ্যে শপথ গ্রহণ করে তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সাফল্যে সাড়ে ১৫ বছর জাতির কাঁধে চেপে থাকা একটি ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর পতন না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো ২০২৯ সালে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সফলতাই সেই নির্বাচনকে তিন বছর এগিয়ে আনতে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্দোলনে বিজয়ীরা দেশের ছোটবড় সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করেছিল ‘জুলাই সনদ’ এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচসহ ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদ আদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের রায় জানার জন্য গণভোটেরও ব্যবস্থা ছিল। গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ভোটারদের বিপুল সম্মতি পাওয়া গেছে। কিন্তু দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপির সদস্যরা তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের’ শপথ পাঠ এড়িয়ে গেছেন। সাংবাদিকরা এ সম্পর্কে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা কোনো দ্বিধা না করেই বলেছেন যে ‘বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের সংবিধান সংস্কারের জন্য শপথ নেওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। তাঁরা শপথ নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের শপথের বৈধতা নিয়ে আইনগত চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।’ তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোটে রাজি না হলে নির্বাচন দিত না, তাই রাজি হওয়া।’ বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে : কাজের বেলায় কাজি, কাজ ফুরালেই পাজি,’ যার সরল অর্থ হচ্ছে : ‘স্বার্থ হাসিলের আগে নানাভাবে খাতির-তোয়াজ করা, আর স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে আসল মূর্তি ধারণ করা।’ সংবিধানে কী আছে, আর কী নেই, তা শপথ গ্রহণ করার দিনেই তাদের মাথায় এসেছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।

বিএনপি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করে সংবিধান ইচ্ছামতো কাটাছেঁড়া করার সুযোগ পেয়েছে। আওয়ামী লীগও ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের মর্জিমাফিক বহু আন্দোলনের পর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছিল এবং সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিল। শেখ হাসিনার সরকারের এই সংবিধান সংশোধনীগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁর ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন, স্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করা। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অর্থ জনমতকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অসততা প্রদর্শন করা নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা কবে কখন সততা প্রদর্শন করেছে এবং তাদের শপথের প্রতি সশ্রদ্ধ থেকেছে? আওয়ামী লীগ যে কখনো জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না, তা তারা ১৯৭৩ সালে সংসদীয় সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে সংসদীয় সরকাব্যবস্থার পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রতারণা করে ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে। শেখ হাসিনা সেই পথে হেঁটেছেন, যার ফলাফল তাঁর জন্য এবং দেশ ও জাতির জন্য শুভ হয়নি। বিএনপি দেশকে বাকশাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে এবং ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো আওয়ামী ধাঁচের স্বৈরাচারী আচরণ করেনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীসুলভ আচরণ করে তাদের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ করবে, এমন আশা করা যায় না। যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর তাৎক্ষণিক গণভোট অনুষ্ঠানের প্রতি বিএনপির আস্থা ছিল না, তারা আগেই তাদের যুক্তি কার্যকারণসহ জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারত। তাহলে একদিকে তাদের রাজনৈতিক সততা ও সংবিধানের প্রতি বিএনপির অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রমাণিত হতো এবং দেশের সর্ববৃহৎ দল হিসেবে বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতো বলে আমার মনে হয় না।

বিএনপির বর্তমান অবস্থানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সফল রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য সম্ভবত এটাই জরুরি যে মনের ভিতর যা আছে তা প্রকাশ না করা এবং উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ামাত্র নতুন সুরে কথা বলা। আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যালটে বাক্স বোঝাই করেছিল নির্বাচনের আগের রাতেই। এটা কি তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে করেছিল? দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনার ফল ছিল তাদের ‘নিশিরাতের ভোট’। বিএনপির জুলাই সনদ বাস্তবায়নে শপথ গ্রহণ না করাও তাদের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল। তারা জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠন করে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কৌশলে সফল হয়েছে।

রাজনীতি জটিল এক শাস্ত্র এবং রাজনীতিবিদরা সেই শাস্ত্রের অধ্যক্ষ ও মহাধ্যক্ষ। সাধারণ মানুষের কাজ ভোট দেওয়া এবং ‘তাদের দ্বারা নির্বাচিত’ শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়া। আমরা ধরেই নিতে পারি, ঘুরেফিরে দেশে পুরোনো রাজনীতিরই চর্চা হবে। সময়ের সঙ্গে দেশে কিছু উন্নয়ন হবে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে হাতে গোনা কিছু মানুষ। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়ন ও বিনিয়োগে ছিটেফোঁটা ভাগ পড়লে তা তাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের হবে। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশের জনগণ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে, গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চেয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে তারা কেবল শাসিতই হয়েছে, কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র পায়নি। পাকিস্তানি আমলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় পার করার পরও যদি ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানাতে হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইয়ে হাজারো তরুণকে জীবন দিতে হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কোনো কিছু হতে পারে না।

বিএনপি চেয়ারম্যান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার নির্বাচিত অধিকারী তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি তাঁর বাবা-মার মতোই জনপ্রিয়। জনগণ তাঁর প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে, তা কেবল বাংলাদেশে নয়, বহু দেশের ইতিহাসেও বিরল। একটি অপশক্তিকে বিদায় করে বাংলাদেশের জনগণ তাঁর প্রতি দৃঢ় আস্থা স্থাপন করেছে এবং তারা আশাবাদী যে তিনি তাদের আস্থার মূল্য দেবেন।  তারা বিশ্বাস করে যে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যা পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের জন্য অনুকরণীয় হবে। এজন্য তিনি তাঁর পারিষদবর্গের পরামর্শ অবশ্যই গ্রহণ করবেন, সেজন্য তো রয়েছে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ ও উপদেষ্টামণ্ডলী। তা সত্ত্বেও একজন সুশাসক হওয়ার জন্য রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে তাঁর চিন্তাপ্রসূত বিচক্ষণতা প্রদর্শন করতে হবে। নৈতিক গুণাবলির বিকাশও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর জন্য জরুরি, যা জনগণকে তাঁর প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে এবং দুর্যোগ মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

Design & Developed BY ThemesBazar.Com