এখনো কেউ কি কলকাঠি নাড়ছে?

ছবি সংগৃহীত

 

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :নির্বাচন নিয়ে উৎকণ্ঠার দিনগুলো যে এখনো শেষ হয়নি, গত শুক্রবার শাহবাগ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষের ঘটনা তার প্রমাণ। তিন দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে পরিস্থিতিকে হঠাৎ এভাবে অস্থিতিশীল করে তোলা নিয়ে অনেকের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। দাবিদাওয়া নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মতো বিক্ষোভে অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে কোনো পক্ষ কলকাঠি নাড়ছে কি না, এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির এটাই মোক্ষম সময় ভেবে যদি কোনো পক্ষ মাঠে নামে, তাহলে যে কেউ এ ধরনের উদ্যোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই বিবেচনা করবে। কদিন পরই দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারণকারী গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ও গণভোটের মতো তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে এবং কদিন পরই যে সরকার বিদায় নিতে যাচ্ছে, ঠিক তখন সেই সরকার যেকোনো পক্ষের দাবিদাওয়া নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো অবস্থায় থাকে না, বিক্ষোভকারীদের তা ভাবা উচিত ছিল। সরকারের সব কর্মকাণ্ড ও ব্যস্ততা এখন নির্বাচনমুখী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো জরুরি বিষয় ছাড়া সমগ্র প্রশাসন এখন ব্যাপক অর্থে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। যারাই বিক্ষোভের পরিকল্পনা করাসহ পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে তারা সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ করেনি। সবাই আশা করছে নির্বাচন নির্বিঘ্ন হোক।

নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ছাড়াও ফেব্রুয়ারি বাঙালি ও বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। অন্যান্য বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিবস থেকে বাংলা একাডেমির আয়োজনে ঢাকায় ‘অমর একুশের বইমেলা’ শুরু হয়। নির্বাচনের কারণে বইমেলা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি। প্রচলিত ঐতিহ্য হিসেবে প্রতি বছর বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান। নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করানোর সুযোগ পাবে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানের জন্যও উপলক্ষটি তাঁর পাঁচ বছর মেয়াদি রাষ্ট্র পরিচালনায় শুভারম্ভ হবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশে কিছু হত্যাকাণ্ড, কিছু সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার বাইরে বিক্ষিপ্ত ঘটনা এখনো ঘটে চলেছে। চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা এখনো চলছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও সবাই চায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর লঙ্ঘনের অপপ্রয়াসগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালোমন্দ মিলিয়ে হলেও নির্বাচন হয়ে যাক এবং নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে গত দেড় বছর দেশে যে অনিশ্চিত অবস্থা চলছে, সে অবস্থার দ্রুত অবসান ঘটানোর দায়িত্ব গ্রহণ করুক।

জনগণ এ আশাটুকু ছাড়া কী আর করতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা, সরকারে গিয়ে প্রতিটি দলের দুর্নীতিবাজদের জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের লাগামহীন প্রতিযোগিতা এবং জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত সব উপায় অবলম্বন করায় তারা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু যখনই নির্বাচন এসেছে, রাজনৈতিক দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি, মনভোলানো কথায় তারা বারবার নতুন আশায় বুক বেঁধেছে। তাদের আশা হয়তো ছিটেফোঁটা পূরণ হয়েছে, অপূর্ণ রয়ে গেছে বেশি। তবু তারা আশাহীন হয়নি। বাংলাদেশ যেমন সার্বক্ষণিক ক্রান্তিকাল ও সন্ধিক্ষণে থাকে, জনগণের ক্রান্তিকালেরও কখনো অবসান ঘটে না। এসবের মাঝেই আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দৈবদুর্বিপাক যত বেশি আসে, আশার মাত্রাও তত বেশি থাকে।

সেদিক থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি যুগসন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেড় বছর আগে ওই সময়ের শাসকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে নিদারুণ ক্ষত, যা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। স্বাধীন একটি দেশে সাজানো নির্বাচনে ক্ষমতায় চেপে বসা তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ জনগণের ওপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে বর্বরতম হত্যা ও ধ্বংসলীলা চাপিয়ে দিয়েছিল, উপমহাদেশের এ ভূখণ্ড পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল মিলিয়ে যে কবার সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কখনো জনগণ এমন ভয়াবহ নরকযন্ত্রণার মুখোমুখি হয়নি। জনগণই সর্বংসহা, তারা ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত হয়ে ওঠে নতুন করে সবকিছু সাজানোগোছানো দেখার আশায়।

এবারও তারা আশায় বুক বেঁধেছে। নতুন কিছু দেখার আশায়, নতুন কিছু পাওয়ার আশায় ১২ ফেব্রুয়ারি তারা ভোট দেবে। কিন্তু তারা কী মনস্থির করতে পেরেছে, কাকে ভোট দেবে? প্রতিশ্রুতির বন্যায় তারা ভাসছে। চব্বিশের পরিবর্তনে তারা নতুন কিছু দেখতে চেয়েছে। কিন্তু সেই পুরোনো মুখে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতিতে তারা বিভ্রান্ত। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে অতীতে ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করা একটি পুরোনো রাজনৈতিক দল। ভালোমন্দ মিলেই  তাদের অতীত। ক্ষমতার অপব্যবহার তারাও করেছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চক্র থেকে দলকে বের করে আনতে পারেনি। সামষ্টিক ও যৌথ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে যা ঘটার তা-ই ঘটেছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের কবরের মাটি শুকানোর আগেই এবং চিরতরে পঙ্গুত্ববরণকারী ও আহতদের কান্নার রেশ কাটতে না-কাটতেই দলটির আশীর্বাদপুষ্টরা তাদের ১৭ বছরের বঞ্চনার তাড়না ও লোভের ক্ষুধা মেটাতে চাঁদাবাজি ও দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে নিজেদেরই এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা করেছে। দেশজুড়ে এ তাণ্ডবে তাদেরই কমপক্ষে দেড় শ কর্মী-সমর্থক নিহত হয়েছে। চাঁদাবাজি ও জবরদখলের অভিযোগ ধামাচাপা দিতে অথবা মুখ রক্ষা করার স্বার্থে দলটি তাদের কিছু লোককে নামকাওয়াস্তে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, কারও কারও বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও নোটিস জারি করা হয়েছে। তাতে তাদের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।

বর্তমান মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হওয়ার সৌভাগ্যধন্য, তিনি দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁকে বীরোচিত অভ্যর্থনা জানানো হয়। তিনি জনগণের সামনে তাঁর প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার কথা জানান। মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনি মাঠে অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁর ভূমিকা ও কথাবার্তা এবং তাঁর দলের অনেক নেতার দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণে বিএনপিকে ঘিরে জনগণের আশাভরসার প্রাচীরে ফাটল ধরেছে। তবু জনগণ আশা করেছিল, ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক ধরে স্বৈরাচারী শাসকের সীমাহীন নিপীড়ন এবং চড়াইউতরাইয়ের শোধনাগারে পরিশোধিত হয়ে বিএনপির আমল-আখলাকে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নিপীড়িত হওয়ার বেদনাদায়ক ও তিক্ত অভিজ্ঞতাই অন্যের ওপর নিপীড়ন চালানোয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় কোনো ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। পরিস্থিতিদৃষ্টে এমন কিছু মনে হচ্ছে না।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুক্রবার ঘোষিত তাঁর দলের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘জবাবদিহিমূলক’ রাষ্ট্র বিনির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন। এটা নতুন কোনো অঙ্গীকার নয়। রাষ্ট্রের সংবিধানেই জবাবদিহি নিশ্চিত করা আছে যে সরকার জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ এবং তাদের জবাবদিহিও সংসদের কাছে। কিন্তু জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনক হলো, এ জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ কখনোই কোনো ক্ষমতাসীন মহলের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতীতের প্রতিটি সরকার ও দল ছিল ব্যক্তিপ্রধান। এখনো এর কোনো দৃশ্যমান ব্যত্যয় ঘটেনি। কোনো দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা নেই, বছরের পর বছর দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় না। দলের নেতা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না এবং দলে জবাবদিহির সংস্কৃতি চালু নেই। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রে জবাবদিহি আসমান থেকে নাজিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জবাবদিহি না থাকলে পরিণতি কী ঘটতে পারে তার সেরা দৃষ্টান্ত অসীম ক্ষমতার অধিকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর তাঁবেদার মন্ত্রিপরিষদ ও বশংবদ সংসদ সদস্যরা। তাঁর সরকার যদি শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারত, তাহলে তিনি তাঁর করুণ পরিণতি থেকে রক্ষা পেতেও পারতেন।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবেন, তাঁরা যদি সত্যিই দেশকে ভালোবাসেন এবং জনগণের প্রতি মমত্ব অনুভব করেন, তাহলে তাঁরা বিজিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি নির্বাচনপূর্ব এবং নির্বাচনকালীন ঈর্ষা-বিদ্বেষ, এতে পরস্পরকে দোষারূপ করার সংস্কৃতি ভুলে প্রকৃত অর্থেই দেশে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হবেন বলে আশা পোষণ করি। একটি কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করলেই জনগণ তাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে এবং সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তাদের  সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।  সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারকাদের কে কোথায় ভোট দেবেন?

» ২টি পিস্তুল, ৪টি ম্যাগজিনসহ ৩ রাউন্ড গুলি জব্দ

» এখন প্রচার চালালে প্রার্থিতা বাতিল, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ শনিবার পর্যন্ত

» তাৎক্ষণিক নয়, ধাপে ধাপে প্রকাশ হবে ফলাফল: ইসি সচিব

» জামায়াত আমিরের সঙ্গে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের সাক্ষাৎ

» কাইয়ুমের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নাহিদের আপিলের শুনানি নির্বাচনের পর

» বিশ্বকাপে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা দেবে ‘রোবট কুকুর’

» ন্যায্য ভাড়ার দাবি, দুই ঘণ্টা পর মহাসড়ক ছাড়লেন আন্দোলনকারীরা

» প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সাক্ষাৎ

» প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তুরস্কের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

এখনো কেউ কি কলকাঠি নাড়ছে?

ছবি সংগৃহীত

 

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :নির্বাচন নিয়ে উৎকণ্ঠার দিনগুলো যে এখনো শেষ হয়নি, গত শুক্রবার শাহবাগ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষের ঘটনা তার প্রমাণ। তিন দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে পরিস্থিতিকে হঠাৎ এভাবে অস্থিতিশীল করে তোলা নিয়ে অনেকের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। দাবিদাওয়া নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মতো বিক্ষোভে অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে কোনো পক্ষ কলকাঠি নাড়ছে কি না, এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির এটাই মোক্ষম সময় ভেবে যদি কোনো পক্ষ মাঠে নামে, তাহলে যে কেউ এ ধরনের উদ্যোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই বিবেচনা করবে। কদিন পরই দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারণকারী গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ও গণভোটের মতো তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে এবং কদিন পরই যে সরকার বিদায় নিতে যাচ্ছে, ঠিক তখন সেই সরকার যেকোনো পক্ষের দাবিদাওয়া নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো অবস্থায় থাকে না, বিক্ষোভকারীদের তা ভাবা উচিত ছিল। সরকারের সব কর্মকাণ্ড ও ব্যস্ততা এখন নির্বাচনমুখী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো জরুরি বিষয় ছাড়া সমগ্র প্রশাসন এখন ব্যাপক অর্থে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। যারাই বিক্ষোভের পরিকল্পনা করাসহ পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে তারা সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ করেনি। সবাই আশা করছে নির্বাচন নির্বিঘ্ন হোক।

নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ছাড়াও ফেব্রুয়ারি বাঙালি ও বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। অন্যান্য বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিবস থেকে বাংলা একাডেমির আয়োজনে ঢাকায় ‘অমর একুশের বইমেলা’ শুরু হয়। নির্বাচনের কারণে বইমেলা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি। প্রচলিত ঐতিহ্য হিসেবে প্রতি বছর বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান। নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করানোর সুযোগ পাবে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানের জন্যও উপলক্ষটি তাঁর পাঁচ বছর মেয়াদি রাষ্ট্র পরিচালনায় শুভারম্ভ হবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশে কিছু হত্যাকাণ্ড, কিছু সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার বাইরে বিক্ষিপ্ত ঘটনা এখনো ঘটে চলেছে। চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা এখনো চলছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও সবাই চায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর লঙ্ঘনের অপপ্রয়াসগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালোমন্দ মিলিয়ে হলেও নির্বাচন হয়ে যাক এবং নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে গত দেড় বছর দেশে যে অনিশ্চিত অবস্থা চলছে, সে অবস্থার দ্রুত অবসান ঘটানোর দায়িত্ব গ্রহণ করুক।

জনগণ এ আশাটুকু ছাড়া কী আর করতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা, সরকারে গিয়ে প্রতিটি দলের দুর্নীতিবাজদের জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের লাগামহীন প্রতিযোগিতা এবং জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত সব উপায় অবলম্বন করায় তারা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু যখনই নির্বাচন এসেছে, রাজনৈতিক দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি, মনভোলানো কথায় তারা বারবার নতুন আশায় বুক বেঁধেছে। তাদের আশা হয়তো ছিটেফোঁটা পূরণ হয়েছে, অপূর্ণ রয়ে গেছে বেশি। তবু তারা আশাহীন হয়নি। বাংলাদেশ যেমন সার্বক্ষণিক ক্রান্তিকাল ও সন্ধিক্ষণে থাকে, জনগণের ক্রান্তিকালেরও কখনো অবসান ঘটে না। এসবের মাঝেই আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দৈবদুর্বিপাক যত বেশি আসে, আশার মাত্রাও তত বেশি থাকে।

সেদিক থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি যুগসন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেড় বছর আগে ওই সময়ের শাসকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে নিদারুণ ক্ষত, যা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। স্বাধীন একটি দেশে সাজানো নির্বাচনে ক্ষমতায় চেপে বসা তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ জনগণের ওপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে বর্বরতম হত্যা ও ধ্বংসলীলা চাপিয়ে দিয়েছিল, উপমহাদেশের এ ভূখণ্ড পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল মিলিয়ে যে কবার সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কখনো জনগণ এমন ভয়াবহ নরকযন্ত্রণার মুখোমুখি হয়নি। জনগণই সর্বংসহা, তারা ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত হয়ে ওঠে নতুন করে সবকিছু সাজানোগোছানো দেখার আশায়।

এবারও তারা আশায় বুক বেঁধেছে। নতুন কিছু দেখার আশায়, নতুন কিছু পাওয়ার আশায় ১২ ফেব্রুয়ারি তারা ভোট দেবে। কিন্তু তারা কী মনস্থির করতে পেরেছে, কাকে ভোট দেবে? প্রতিশ্রুতির বন্যায় তারা ভাসছে। চব্বিশের পরিবর্তনে তারা নতুন কিছু দেখতে চেয়েছে। কিন্তু সেই পুরোনো মুখে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতিতে তারা বিভ্রান্ত। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে অতীতে ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করা একটি পুরোনো রাজনৈতিক দল। ভালোমন্দ মিলেই  তাদের অতীত। ক্ষমতার অপব্যবহার তারাও করেছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চক্র থেকে দলকে বের করে আনতে পারেনি। সামষ্টিক ও যৌথ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে যা ঘটার তা-ই ঘটেছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের কবরের মাটি শুকানোর আগেই এবং চিরতরে পঙ্গুত্ববরণকারী ও আহতদের কান্নার রেশ কাটতে না-কাটতেই দলটির আশীর্বাদপুষ্টরা তাদের ১৭ বছরের বঞ্চনার তাড়না ও লোভের ক্ষুধা মেটাতে চাঁদাবাজি ও দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে নিজেদেরই এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা করেছে। দেশজুড়ে এ তাণ্ডবে তাদেরই কমপক্ষে দেড় শ কর্মী-সমর্থক নিহত হয়েছে। চাঁদাবাজি ও জবরদখলের অভিযোগ ধামাচাপা দিতে অথবা মুখ রক্ষা করার স্বার্থে দলটি তাদের কিছু লোককে নামকাওয়াস্তে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, কারও কারও বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও নোটিস জারি করা হয়েছে। তাতে তাদের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।

বর্তমান মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হওয়ার সৌভাগ্যধন্য, তিনি দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁকে বীরোচিত অভ্যর্থনা জানানো হয়। তিনি জনগণের সামনে তাঁর প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার কথা জানান। মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনি মাঠে অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁর ভূমিকা ও কথাবার্তা এবং তাঁর দলের অনেক নেতার দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণে বিএনপিকে ঘিরে জনগণের আশাভরসার প্রাচীরে ফাটল ধরেছে। তবু জনগণ আশা করেছিল, ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক ধরে স্বৈরাচারী শাসকের সীমাহীন নিপীড়ন এবং চড়াইউতরাইয়ের শোধনাগারে পরিশোধিত হয়ে বিএনপির আমল-আখলাকে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নিপীড়িত হওয়ার বেদনাদায়ক ও তিক্ত অভিজ্ঞতাই অন্যের ওপর নিপীড়ন চালানোয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় কোনো ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। পরিস্থিতিদৃষ্টে এমন কিছু মনে হচ্ছে না।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুক্রবার ঘোষিত তাঁর দলের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘জবাবদিহিমূলক’ রাষ্ট্র বিনির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন। এটা নতুন কোনো অঙ্গীকার নয়। রাষ্ট্রের সংবিধানেই জবাবদিহি নিশ্চিত করা আছে যে সরকার জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ এবং তাদের জবাবদিহিও সংসদের কাছে। কিন্তু জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনক হলো, এ জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ কখনোই কোনো ক্ষমতাসীন মহলের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতীতের প্রতিটি সরকার ও দল ছিল ব্যক্তিপ্রধান। এখনো এর কোনো দৃশ্যমান ব্যত্যয় ঘটেনি। কোনো দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা নেই, বছরের পর বছর দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় না। দলের নেতা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না এবং দলে জবাবদিহির সংস্কৃতি চালু নেই। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রে জবাবদিহি আসমান থেকে নাজিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জবাবদিহি না থাকলে পরিণতি কী ঘটতে পারে তার সেরা দৃষ্টান্ত অসীম ক্ষমতার অধিকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর তাঁবেদার মন্ত্রিপরিষদ ও বশংবদ সংসদ সদস্যরা। তাঁর সরকার যদি শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারত, তাহলে তিনি তাঁর করুণ পরিণতি থেকে রক্ষা পেতেও পারতেন।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবেন, তাঁরা যদি সত্যিই দেশকে ভালোবাসেন এবং জনগণের প্রতি মমত্ব অনুভব করেন, তাহলে তাঁরা বিজিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি নির্বাচনপূর্ব এবং নির্বাচনকালীন ঈর্ষা-বিদ্বেষ, এতে পরস্পরকে দোষারূপ করার সংস্কৃতি ভুলে প্রকৃত অর্থেই দেশে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হবেন বলে আশা পোষণ করি। একটি কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করলেই জনগণ তাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে এবং সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তাদের  সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক।  সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com