ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল :পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য নতুন ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে পেশাদার শ্যুটাররা। আগের কোনো নির্বাচন ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ই শ্যুটারদের কদর ও অপতৎপরতা এই পর্যায়ে আসেনি। নির্বাচনের মাঠে বেশির ভাগ প্রার্থী নানা ওয়াদা-অঙ্গীকারে মানুষের মন কাড়তে যারপরনাই সচেষ্ট। শুধু সকাল-সন্ধ্যা নয়, রাতবিরাতেও ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে কড়া নাড়ছেন। সেখানে ঘটনাদৃষ্টে কিছু ব্যতিক্রম ধরা পড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখে। নির্বাচন কমিশনও বিষয়টিতে উদ্বিগ্ন।
দিন কয়েক আগ পর্যন্তও তাদের উদ্বেগের বেশির ভাগ জুড়ে ছিল এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও-অডিও ফুটেজ। সেখানে এখন যোগ হয়েছে শ্যুটারদের বাড়তি সন্ত্রাস, যা এত দিন সেভাবে বিবেচনার বিষয় ছিল না। এদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, এরা নির্ভুল নিশানায় সন্ত্রাসী কাজ সেরে দ্রুত সরে পড়ায় পারঙ্গম। শুধু খুনখারাবি নয়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর কাজেও এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ওসমান হাদির মাথায় গুলির পূর্বাপর থেকে তারিক সাইফ, মামুন হয়ে মোছাব্বির হত্যা পর্যন্ত এদের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলছে। নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের গান রানিংয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
সাম্প্রতিক সময়ের গুলির ঘটনার বিবরণ সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে না। এটি স্পষ্টভাবে টার্গেট কিলিং। আর এই টার্গেট কিলিং শুধু ব্যক্তিকে নয়, সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থা এবং আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি মিল চোখে পড়ে। বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে প্রকাশ্যে, কাছ থেকে গুলি করে, মুখোশধারী বা পেশাদার শ্যুটারদের মাধ্যমে। হামলার ধরন, সময় নির্বাচন, পালিয়ে যাওয়ার কৌশল- সবই বলে দেয়, এগুলো আবেগের বশে করা খুন নয়; বরং ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। রাজধানীর কয়েকটি ঘটনার জের ধরে রুবেল, ইব্রাহিমসহ পেশাদার কয়েকজন শ্যুটারকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ভেতরে ভেতরে এই পেশাদার শ্যুটারদের এভাবে মাঠে নামানোর তথ্য তাদের ধারণারও বাইরে। পেশাদার এই শ্যুটারদের তৎপরতা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো শক্ত অবস্থান নিলেও এদের মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করার ক্লু পাচ্ছে না। এক দিকে এআই দিয়ে ঘটনার ফেক ছবি, আরেক দিকে টার্গেট কিলিংয়ের শঙ্কা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য বাড়তি ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই দেশব্যাপী চলমান সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ কখনো কখনো অসহায়।
নির্বাচনের আগে পেশাদার খুনি ও অন্য অপরাধীদের কদর বাড়ার বিষয়টি নিয়ে পুলিশ অনেক দূর এগিয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ির মাঝে শ্যুটারদের প্রকাশ্যে কিলিংয়ে নামানোর ঘটনায় পুলিশ ভিন্ন কিছু সন্দেহ করছে। গড়ে প্রতিদিন ১১-১২টি হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য হানাহানির ঘটনা সামাল দিতে পুলিশ যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে যোগ হয়েছে নতুন এই আপদ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ে ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঘাপটি মেরে থাকা শ্যুটারদের প্রকাশ্যে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া, জামিনে বের হওয়া দাগি আসামিদের অপতৎপরতা, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির ঘটনা ছাড়াও ব্যক্তি আক্রোশেও সন্ত্রাসীদের ভাড়া করার বিষয়গুলো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক মাসে প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েকটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের দুর্ধর্ষতার জানান দিয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছায়াতলে থাকা শ্যুটাররা। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে শ্যুটারদের বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রের হালনাগাদ তথ্য বলছে, রাজধানীতে বর্তমানে অর্ধশত দক্ষ শ্যুটার রয়েছে। এরা নির্বাচনের আগে শুধু ভাড়ায় খুনাখুনিতে জড়ানোই নয়, বরং দেশে ভয়ানক ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে। তখন আরো খারাপ অবস্থায় চলে যেতে পারে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
সারা দেশে পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ এবং অন্যান্য সংস্থার সাঁড়াশি অভিযানে শ্যুটাররা এখনো টার্গেট হয়নি। এই অভিযানের মধ্যেও টার্গেট কিলিং বা অঘটন ঘটাচ্ছে তারা। শুধু পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতার জের, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে মাসে গড়ে ১৯-২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সেখানে এখন যোগ হয়েছে ভোটের রাজনীতির ডামাডোল। টার্গেট কিলিংয়ে জড়িতদের একটা তালিকা পুলিশ করেছে। তবে শ্যুটারদের নিয়ে এখনো তথ্যের আপডেট নেই। সবই ভাসা ভাসা। পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন তাদের কাজের ধরন পাল্টে পেশাদার শ্যুটারদের নিয়ন্ত্রণ করে তাদের দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা ছাড়া আরো ৯-১০টি ঘটনায় শ্যুটারদের সম্পৃক্ততার তথ্য একটু দেরিতে হলেও পুলিশ পেয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে এখন এদের দিয়ে কাজ করানোর ঠিকাদারি নিচ্ছে। এটি তাদের জন্য নিরাপদ। আড়ালে থেকে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। ঝুঁকি কম, খরচও কম। এই মুহূর্তে রাষ্ট্র টপ প্রায়োরিটিতে এসব শ্যুটার, পেশাদার কিলার, অবৈধ অস্ত্র ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।
সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন








