ছবি সংগৃহীত
গোলাম মাওলা রনি : লালুপ্রসাদ যাদবের একটি বক্তব্য ইন্টারনেটে রীতিমতো ভাইরাল আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব পাক-ভারত উপমহাদেশের অত্যন্ত আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ঘটনার দিন তিনি ভারতীয় লোকসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন। কংগ্রেস জামানায় যদিও প্রধানমন্ত্রীরূপে মনমোহন সিং দায়িত্ব পালন করছিলেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে সব ক্ষমতার মালিক ছিলেন সোনিয়া গান্ধী।
আর সোনিয়া গান্ধীকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে যে নয়া চাটুকার শ্রেণির দাপট শুরু হয়েছিল তা প্রকাশ করার জন্য জনাব লালু পার্লামেন্টে যেভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন তা আধুনিক গণতন্ত্রের সমালোচনার ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলস্টোন স্থাপন করেছে।
লালু বলেছিলেন, ম্যাডামজি! প্লিজ! টিটিএমপি থেকে সাবধান হোন, তা না হলে ওরা আপনার সর্বনাশ করে ছাড়বে। পুরো পার্লামেন্ট লালুর মুখে টিটিএমপি শব্দ শুনে প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। তারা মনে করল টিটিএমপি সম্ভবত পাকিস্তানের কোনো সন্ত্রাসবাদী নতুন সংগঠন।
স্বয়ং সোনিয়া গান্ধীও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে লালুর প্রতি তাকালেন। তখন লালু বললেন, টিটিএমপি হলো তেল তোড়কে মালিশ পার্টি—যাদের কাজই হলো তেলের শিশি নিয়ে আপনার পেছনে ছুটে বেড়ানো। লালুর কথা শুনে পুরো পার্লামেন্ট হাসিতে ফেটে পড়ল। সোনিয়া গান্ধীও খুব হাসলেন।
লালু এরপর বললেন— আমারও অনেক টিটিএমপি আছে, কিন্তু আমি তাদের ব্যাপারে সচেতন থাকার কারণে তারা সর্বনাশ ঘটাতে পারে না। কিন্তু আপনাকে নিয়ে যে তেলবাজি চলছে, তা ইতিহাসের সব সীমা অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত তেল মালিশ পার্টির দাপট জ্যামিতিক হারে কিভাবে বেড়েছে এবং কিভাবে রাজনীতির সব সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করেছে তা নিয়ে আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে প্রাচীন দুনিয়ার দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা আপনাদেরকে বর্ণনা করতে চাই। দুটো ঘটনার সময়কাল প্রায় কাছাকাছি।
একটি ঘটেছিল ভারত সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজদরবারে, অন্যটি ঘটেছিল আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের দরবারে। হর্ষবর্ধনের ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরুর ‘দ্য গ্লিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ বইয়ে এবং খলিফা মনসুরের কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন ইমাম গাজ্জালী তাঁর পৃথিবী বিখ্যাত বই ‘ইয়াহইয়ায়ে উলুমুদ্দিন’-এ।
তেলবাজির রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট!নেহরুর বর্ণনায় জানা যায়, সম্রাট হর্ষবর্ধন একদিন তাঁর সভাকবি বানভট্টকে প্রকাশ্য রাজদরবারে ডেকে পাঠান। বানভট্ট দুনিয়ার সর্বকালের মশহুর কবিদের মধ্যে অন্যতম। কালিদাস-ইমরুল কায়েস-শেখ সাদি-ওমর খৈয়াম-ফেরদৌসি-হোমার কিংবা ঋষি বেদব্যাসের মতো মহাকবিদের তালিকায় বানভট্টের নাম রয়েছে। তাঁর লিখিত হর্ষচরিত ইতিহাসের এক অনন্য কবি হিসেবে বানভট্টের যেমন সুনাম রয়েছে, তেমনি চরিত্রহীন লম্পট হিসেবেও তাঁর কুখ্যাতি কম নয়। আর আমি যে জামানার কথা বলছি তখন জ্ঞানী-গুণী-দার্শনিকদের সম্মান ছিল রাজার চেয়েও বেশি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে কবি ও পর্যটকদের আকর্ষণ ছিল সর্বোচ্চ। আজকের দিনে রাজনীতি-চলচ্চিত্রের সুপারস্টারদের নিয়ে লোকজন যেমন আদিখ্যেতা দেখায় তার চেয়েও বেশি আদিখ্যেতা প্রাচীন দুনিয়ার মানুষ দেখাতেন কবিদের নিয়ে। ফলে রাজা হওয়ার পরও অনেকে চেষ্টা করতেন কবি হওয়ার জন্য, আর সেই বোধ থেকেই সম্রাট হর্ষবর্ধন মাঝেমধ্যে দু-চারটি কবিতা লিখে বানভট্টকে দেখাতেন এবং নিজের কাব্য প্রতিভার বাহাদুরির চেষ্টা করতেন। বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচার আলহাজ কবি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মতো।
এরশাদের কবি হওয়ার অপচেষ্টা যেভাবে বাংলার কবিরা রুখে দিয়েছিল এবং তাঁর কাব্যপ্রতিভা নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করে কবি মোহাম্মদ রফিক যেভাবে লিখেছিলেন—‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,/দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই’। ঠিক তদ্রূপ সম্রাট হর্ষবর্ধনকে নিয়েও শুরু হলো প্রাচীন উত্তর ভারতে ঠাট্টা-মশকরার তাণ্ডব। এরশাদকে উদ্ধার করার জন্য যেভাবে কবি আবুল ফজল, ফজল শাহাবুদ্দিনের মতো প্রতিষ্ঠিত কবিরা এগিয়ে এলেন এবং নিজেরা মানসম্পন্ন কবিতা লিখে এরশাদের নামে চালিয়ে দিলেন, ঠিক তদ্রূপ বানভট্টও এগিয়ে এলেন সম্রাট হর্ষকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়।
এরশাদের জামানার মতো হর্ষের জামানা ছিল না। আর এরশাদের কবিদের তুলনায় হর্ষের কবি ছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিতে আকাশের তারকার মতো। দ্বিতীয়ত, কবিদের কুকর্ম সম্পর্কে এরশাদ ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং তাঁর আশকারা পেয়েই কবিরা কবিতার বলাৎকার করেছিল। অন্যদিকে সম্রাট হর্ষ ছিলেন মহাকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট। কাজেই হর্ষের নামে কবিতা লিখে বানভট্ট সেটা প্রচার করবেন তা সম্রাট হর্ষবর্ধনের জামানার সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং শিক্ষা-সভ্যতার সঙ্গে বেমানান। সম্রাট মরে গেলেও এমন কর্ম করবেন না এবং তেলবাজ কবি বানভট্ট সাহস করে সম্রাটের কাছে পূর্বানুমতি নিয়ে নিজের লিখিত কবিতা সম্রাটের নামে চালিয়ে দেবেন, তা কল্পনাও করা যেত না।
উল্লিখিত বাস্তবতায় বানভট্ট গোপনে ভালো ভালো কবিতা লিখে তা সম্রাটের লিখিত কবিতা শিরোনামে সাম্রাজ্যের বড় বড় শহর বন্দর নগরে রাতের আঁধারে সেঁটে দিলেন। ফলে উত্তর ভারতজুড়ে হৈচৈ পড়ে গেল। সব কবিরা বিদ্রোহ করলেন এবং সম্রাটকে প্রকাশ্য রাজদরবারে তাঁদের সামনে কাব্য প্রতিভা জাহিরের চ্যালেঞ্জ জানালেন। খবর যখন সম্রাটের কানে এলো তখন তিনি ভারি বিপদে পড়লেন। প্রথমত, তিনি স্বীকার করলেন যে কবিতাগুলো তাঁর লিখিত নয় এবং তিনি জানেনও না যে অপকর্মটি কে করেছে। বিদ্রোহী কবিরা রাষ্ট্রীয় তদন্ত দাবি করলেন এবং সম্রাট তাঁর গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে জানালেন যে তাঁর সভাকবি বানভট্ট কুকাজটি করেছে। প্রকাশ্য রাজদরবারে বিচার বসল এবং বানভট্টকে দোষী সাব্যস্ত করে সম্রাট তাঁকে সভাকবির পদ থেকে পদচ্যুত করলেন এবং রাজদরবার থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন। তারপর সম্রাট তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করলেন, রাজার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো চাটুকার আর রাজা ও রাজনীতির জন্য নির্মম বাস্তবতা হলো কোনো রাজা এবং কোনো রাজনীতি চাটুকার ছাড়া চলে না।
হর্ষবর্ধনের পর আমরা খলিফা আল মনসুরের দরবারের কাহিনি বলব। খলিফা মনসুর চাটুকারদের যন্ত্রণায় মাঝেমধ্যে অতিষ্ঠ হয়ে রাজদরবার ছেড়ে বেরিয়ে যেতেন, তেলবাজদের উপর্যুপরি অপমান করে তাড়িয়ে দিতেন এবং মিথ্যা শুনতে শুনতে হয়রান হয়ে সত্য ভাষণ শোনার জন্য অস্থির হয়ে পড়তেন। তো এমনি এক দিনে তিনি তাঁর পরিষদবর্গকে হুকুম করলেন, অবিলম্বে একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় জ্ঞানী-গুণীকে আমার সামনে নিয়ে আসো, যিনি খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলতে ভয় পাবেন না।
খলিফার লোকজন রাজধানী বাগদাদে তন্নতন্ন করে উল্লিখিত চরিত্রের আলেম খুঁজতে লাগলেন এবং মদিনার অধিবাসী ওয়াসিল ইবনে আতাকে নিয়ে যখন রাজদরবারে হাজির হলেন তখন রাজদরবারে একটি বিচারকার্য চলছিল মদিনার গভর্নর এবং মদিনার সবচেয়ে প্রভাবশালী গোত্রের বিরোধ নিয়ে। উভয় পক্ষই সর্বোচ্চ কায়দা-কানুন করে মিথ্যা বলে খলিফাকে বিভ্রান্ত করছিল। রাজদরবারে ওয়াসিল ইবনে আতাকে দেখে বিবদমান উভয় পক্ষই খলিফাকে বলল—ওয়াসিল ইবনে আতা নির্ভীক ও সত্যবাদী। আমরা তাকে সাক্ষী মানি। খলিফা মদিনার গোত্রপ্রধানদের সম্পর্কে আতার মতামত জানতে চাইলেন।
আতা বললেন, ওরা খুবই বজ্জাত প্রকৃতির মানুষ। সারাক্ষণ দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ করে এবং অপরাধ করতে করতে ওরা মানুষের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছে। আতার কথা শুনে গোত্রপ্রধানরা মাথা নিচু করে রইল। খলিফা রাগান্বিত হয়ে তাদের বললেন—এতক্ষণ কেন মিথ্যা বলছিলি। অন্যদিকে মদিনার গভর্নর উল্লসিত হয়ে বললেন, ইয়া আমিরুল মুমেনিন, শুনলেন তো! আপনি অযথাই আমার ওপর রাগ করছিলেন। এ অবস্থায় গোত্রপ্রধানরা বললেন, হে আমিরুল মুমেনিন, এবার আপনি আতার কাছ থেকে আপনার গভর্নর সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করুন।
খলিফা যখন মদিনার গভর্নর সম্পর্কে জানতে চাইলেন, তখন আতা বললেন, আপনার গভর্নর শয়তানের সর্দার। সে তার দরবারে মদিনার সব শয়তানকে নিয়ে মজমা তৈরি করে। মদ্যপান এবং অশ্লীল কর্মে লিপ্ত থেকে হারামিপনার নিকৃষ্ট সব উদাহরণ তৈরি করে। তার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের অত্যাচারে মদিনাবাসী অতিষ্ঠ। এই গভর্নরের চেয়ে খারাপ ব্যক্তি মদিনায় দ্বিতীয়টি নেই। আতার কথা শুনে খলিফা গর্জে উঠলেন এবং গভর্নরকে বললেন— বলো! বলো! এখন বলো যে আতা মিথ্যা বলেছে।
উল্লিখিত অবস্থায় গভর্নর বললেন, আতা সত্য বলেছেন। তবে আপনার সম্পর্কে আতা কী বলেন তা একটু জিজ্ঞেস করেন। খলিফা মনসুর অনেকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, এবার বলো তো আমি আসলে লোকটা কেমন। আতা বললেন, আপনার প্রশাসনে যত শয়তান রয়েছে নিশ্চয়ই আপনি সেই সব শয়তানের মধ্যে নিকৃষ্টতর, ধুরন্ধর এবং নিষ্ঠুর। আপনি শয়তানের নিয়োগকর্তা-মদদদাতা এবং ভণ্ড, প্রতারণার নিকৃষ্ট উদাহরণ। আপনার শাসনে প্রজারা যে কি কষ্টে আছে তা এই রাজপ্রাসাদে বসে আপনি কোনো দিন শুনতে পাবেন না।
ওয়াসিল ইবনে আতার কথা শুনে খলিফা মনসুর চিৎকার করে বললেন, ‘ওকে সরিয়ে নাও। আমি আর শুনতে পারছি না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছি না।’
আমরা আজকের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। খলিফা মনসুর এবং সম্রাট হর্ষবর্ধনের ঐতিহাসিক কাহিনির প্রেক্ষাপট, লালুপ্রসাদ যাদবের বক্তব্য এবং বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান হালহকিকত যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে সোনার বাংলায় কী হচ্ছে তা বোধ করি বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই।
লেখক : রাজনীতিবিদ ও লেখক








