ভেনেজুয়েলা, মাদুরো ও ক্ষমতার কঠিন পাঠ

সংগৃহীত ছবি

 

জিল্লুুর রহমান : ১. বিদায়, বেগম খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ, জটিল ও আবেগময় অধ্যায়ের নীরব সমাপ্তি। চার দশকের বেশি সময় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, ক্ষমতার বাইরে ছিলেন, লড়েছেন, নিঃশব্দ থেকেছেন, অপমান সহ্য করেছেন, দীর্ঘ কারাবাস করেছেন, অসুস্থতা বয়ে বেড়িয়েছেন কিন্তু খুব কম সময়ই উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন। অপমানের জবাবে কটু ভাষা ব্যবহার করেননি, প্রতিশোধের রাজনীতিকে হাতিয়ার বানাননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের সংযম শুধু বিরল নয়, প্রায় ব্যতিক্রম।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র-যাঁর জীবন ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের উত্থানপতনের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মৃত্যুর পর যে দৃশ্য আমরা দেখেছি-দেশজুড়ে মানুষের ঢল, সাধারণ মানুষের চোখে জল, প্রবাসীদের স্মৃতিচারণা, রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে এক ধরনের মানবিক নীরবতা, তা রাষ্ট্রীয় আয়োজনের ফল নয়। এটি ছিল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া।

রাজনীতিতে জনসমর্থন অনেক সময় সংগঠিত করা যায়, কিন্তু শোক সংগঠিত করা যায় না। শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না; তা অর্জন করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের মন থেকে বিচ্ছিন্ন হননি-এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সত্য।

সব রাজনীতিবিদের মতো তাঁর শাসনকালও বিতর্কমুক্ত ছিল না। ভুল ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, সমালোচনা ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল সংযমের-কারাগারে থেকেও কটু উচ্চারণ নয়, অসুস্থ শরীর নিয়েও প্রতিহিংসার ভাষা নয়, রাজনৈতিক নিঃশেষের মুখেও হিংসা নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি শুয়ে পড়লেন তাঁর সঙ্গীর পাশে নিভৃত, শান্ত, ব্যক্তিগত এক ঠিকানায়। ক্ষমতার কোলাহল সেখানে পৌঁছায়নি। রাজনীতি যেমন উচ্চকণ্ঠে শুরু হয়, শেষ পর্যন্ত তেমনই নীরবে থামে। মানুষ যেমন আসে, তেমনই চলে যায় শুধু রেখে যায় স্মৃতি। এই স্মৃতির জায়গা থেকেই আমাদের তাকাতে হয় ক্ষমতা ব্যবহারের ভিন্ন ভিন্ন পথের দিকে।

২. একই সময়, দুই নারী, দুই পথ

২০২৬-এর শুরুতে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ একই সঙ্গে দেখেছে দুই প্রভাবশালী নারী নেতৃত্ব-একই সময়রেখায়, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। এই দুই পথ আসলে ক্ষমতা ব্যবহারের দুই ভিন্ন দর্শন।

একটি পথ ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ক্ষমতাই হয়ে উঠেছিল রাজনীতির ভাষা ও লক্ষ্য। কথাবার্তা ছিল কঠোর, আচরণ ছিল প্রতিহিংসামূলক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু পরাজিত নয়, ব্যক্তিগতভাবে অপমান ও দমন করার প্রবণতা সেখানে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি ও পরিবারের ছায়ায় ঢুকে পড়েছিল। গণতন্ত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্র আর নাগরিকদের যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়নি; তা যেন ক্ষমতাধরদের একচেটিয়া বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পথের পরিণতি এসেছে জনতার জাগরণে- হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান ও নীরবতার বিস্ফোরণে।

অন্য পথটি ছিল সংযমের। কম কথা, কম দাবি, কম উচ্চারণ। ক্ষমতার বাইরে থেকেও একটি নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা। অপমানের জবাবে নীরবতা, আক্রমণের জবাবে সংযম। রাজনৈতিকভাবে এ পথ সব সময় সফল ছিল না, কিন্তু সামাজিকভাবে এর প্রভাব গভীর।

এই দুই পথের তুলনা কেবল রাজনীতির জন্য নয়; এটি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্যও প্রাসঙ্গিক। পরিবারে, অফিসে, সমাজে-আমরা প্রায়ই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে সম্মান ভেবে ভুল করি। ভয়কে শৃঙ্খলা বলে ধরে নিই। অথচ অভিজ্ঞতা বলে, ভয় আনুগত্য আনে, ভালোবাসা নয়। ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু হৃদয় জয় করা যায় না। এই সত্য শুধু বাংলাদেশের ভিতরেই নয়, বিশ্বের অন্য প্রান্তেও বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

৩. ভেনেজুয়েলা, মাদুরো ও ক্ষমতার কঠিন পাঠ

নিজেদের বাস্তবতা বোঝার জন্য কখনো কখনো দূরের আয়নায় তাকাতে হয়। ভেনেজুয়েলা সেই আয়নাগুলোর একটি। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা আজ আর কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি ক্ষমতা ও বৈধতার সম্পর্ক নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও নিকোলাস মাদুরোর শাসনে দেশটি কার্যত ভেঙে পড়া এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মুদ্রা মূল্যহীন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা নেই, স্বাস্থ্য ও খাদ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চরম সংকটে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে-এটি শুধু অর্থনৈতিক বিপর্যয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ফল।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কেবল মানবাধিকার বা আদর্শের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সরকার যদি দীর্ঘদিন জনগণের সম্মতি ছাড়া টিকে থাকে, নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকতায় নামিয়ে আনে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ম উপেক্ষা করে বিশ্ব অর্থনীতির অংশ থাকতে চায়-তাহলে সেই সরকার শুধু নিজের জনগণের জন্য নয়, বাইরের বিশ্বের জন্যও অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে ওঠে।

এ কারণেই মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন ওঠে ক্ষমতা আর দায়মুক্তির সীমা কোথায়। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু বৈধতা ছাড়া তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ভেনেজুয়েলার জন্য নয়; যেকোনো দেশের জন্যই প্রাসঙ্গিক, যেখানে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল।

এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

৪. তারেক রহমান, বিএনপি এবং দায়িত্বের ভার

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বাস্তবতা আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই-বিএনপি শুধু একজন নেত্রীকে হারায়নি, হারিয়েছে একটি ঐতিহাসিক ছায়া। সেই ছায়ার বাইরে এসে এখন দল ও রাজনীতির ভার কার্যত যাঁর হাতে, তিনি তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন আর প্রতীকের রাজনীতি যথেষ্ট নয়। মায়ের জীবদ্দশায় যেটুকু আবেগ, স্মৃতি ও নৈতিক অবস্থান দলকে ধরে রেখেছিল, সেই অধ্যায় শেষ। সামনে এখন দায়িত্বের সময়।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে আজ মূল প্রশ্ন আর ‘কে ক্ষমতায় আসবে’ নয়; প্রশ্ন হলো ‘ক্ষমতায় এসে কী ধরনের রাজনীতি করা হবে।’ ক্ষমতা কি আবার প্রতিহিংসার হাতিয়ার হবে, নাকি প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হবে-এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে শুধু বিএনপির ভবিষ্যৎ নয়, দেশের রাজনৈতিক গতিপথও।

তারেক রহমানের সামনে এখন দুটি বাস্তবতা। একদিকে একটি বড় দল, যার ভিতরে প্রত্যাশা, হতাশা ও অতীতের বোঝা-সবই আছে। অন্যদিকে একটি দেশ-যে দেশ ক্লান্ত, সন্দিহান এবং নতুন করে আস্থা রাখতে চাইছে না শুধু কথায়, আচরণে। আজকের তরুণ প্রজন্ম স্লোগান শুনে উত্তেজিত হয় না। তারা দেখে, ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে কেউ বদলায় কি না। তারা দেখে, বিরোধী অবস্থানে থাকলে কেউ সংযম দেখাতে পারে কি না। এই প্রজন্ম প্রতিশ্রুতি নয়, দৃষ্টান্ত খোঁজে।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় যে সংযম, নীরবতা ও ব্যক্তিগত মর্যাদার শিক্ষা রেখে গেছে, সেটি এখন তাঁর দলের সামনে সবচেয়ে বড় নৈতিক মানদণ্ড। ক্ষমতা নয় আচরণ। দখল নয় দায়িত্ব। উত্তরাধিকার নয় যোগ্যতা।

শেষ কথা

২০২৬-এর শুরুতে দাঁড়িয়ে কিছু নীরব ভাবনা আমাদের ঘিরে ধরে। ক্ষমতা অর্জন করা যায়, সম্মান নয়। প্রভাব তৈরি করা যায়, ভালোবাসা নয়। উত্তরাধিকার ঘোষণা করা যায়, কিন্তু চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন, দুই নারীর দুই পথ, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা এবং তারেক রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতা-সবকিছু মিলিয়ে একটি কথাই স্পষ্ট হয় ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় গিয়ে নয়, ক্ষমতা ব্যবহারে।

রাজনীতিতে বিচার আমরা করি উচ্চকণ্ঠে, কিন্তু ইতিহাস কথা বলে নীরবে। ব্যক্তি হোক বা রাষ্ট্র-টিকে থাকে সেই পথই, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে বিনয় থাকে, শক্তির সঙ্গে সংযম থাকে। বাংলাদেশের গল্প এখনো লেখা হচ্ছে। এই গল্প লেখা হচ্ছে প্রতিদিন-আমাদের আচরণে, সিদ্ধান্তে ও নীরবতায়। চতুর্মাত্রা সেই প্রশ্নটাই রেখে যায় আমাদের সামনে। লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না, ডিএনএ শনাক্তকরণ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা

» যারা বিতাড়িত হয়েছে তারা বসে নেই : এম সাখাওয়াত

» তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

» ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ অনড়: আসিফ নজরুল

» বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বনপাড়া পৌরশহরে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল

» সহকর্মীদের প্রতিবন্ধী সন্তানের শিক্ষা সহায়তায় স্কলারশিপ চালু করল ব্র্যাক ব্যাংক

» ভিভো এক্স৩০০ প্রো: সবার প্রিয় ফ্ল্যাগশিপ

» ২০২৬ সালে তরুণদের দৈনন্দিন ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলো

» মাওলানা ভাসানীর কবর জিয়ারতের মধ্যদিয়ে কর্মসূচি শুরু করবেন তারেক রহমান

» জকসুর ১৪ কেন্দ্রের ফল: ভিপি পদে ২৪৯ ভোটে এগিয়ে ছাত্রদল

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ভেনেজুয়েলা, মাদুরো ও ক্ষমতার কঠিন পাঠ

সংগৃহীত ছবি

 

জিল্লুুর রহমান : ১. বিদায়, বেগম খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ, জটিল ও আবেগময় অধ্যায়ের নীরব সমাপ্তি। চার দশকের বেশি সময় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, ক্ষমতার বাইরে ছিলেন, লড়েছেন, নিঃশব্দ থেকেছেন, অপমান সহ্য করেছেন, দীর্ঘ কারাবাস করেছেন, অসুস্থতা বয়ে বেড়িয়েছেন কিন্তু খুব কম সময়ই উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন। অপমানের জবাবে কটু ভাষা ব্যবহার করেননি, প্রতিশোধের রাজনীতিকে হাতিয়ার বানাননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের সংযম শুধু বিরল নয়, প্রায় ব্যতিক্রম।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র-যাঁর জীবন ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের উত্থানপতনের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মৃত্যুর পর যে দৃশ্য আমরা দেখেছি-দেশজুড়ে মানুষের ঢল, সাধারণ মানুষের চোখে জল, প্রবাসীদের স্মৃতিচারণা, রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে এক ধরনের মানবিক নীরবতা, তা রাষ্ট্রীয় আয়োজনের ফল নয়। এটি ছিল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া।

রাজনীতিতে জনসমর্থন অনেক সময় সংগঠিত করা যায়, কিন্তু শোক সংগঠিত করা যায় না। শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না; তা অর্জন করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের মন থেকে বিচ্ছিন্ন হননি-এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সত্য।

সব রাজনীতিবিদের মতো তাঁর শাসনকালও বিতর্কমুক্ত ছিল না। ভুল ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, সমালোচনা ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল সংযমের-কারাগারে থেকেও কটু উচ্চারণ নয়, অসুস্থ শরীর নিয়েও প্রতিহিংসার ভাষা নয়, রাজনৈতিক নিঃশেষের মুখেও হিংসা নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি শুয়ে পড়লেন তাঁর সঙ্গীর পাশে নিভৃত, শান্ত, ব্যক্তিগত এক ঠিকানায়। ক্ষমতার কোলাহল সেখানে পৌঁছায়নি। রাজনীতি যেমন উচ্চকণ্ঠে শুরু হয়, শেষ পর্যন্ত তেমনই নীরবে থামে। মানুষ যেমন আসে, তেমনই চলে যায় শুধু রেখে যায় স্মৃতি। এই স্মৃতির জায়গা থেকেই আমাদের তাকাতে হয় ক্ষমতা ব্যবহারের ভিন্ন ভিন্ন পথের দিকে।

২. একই সময়, দুই নারী, দুই পথ

২০২৬-এর শুরুতে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ একই সঙ্গে দেখেছে দুই প্রভাবশালী নারী নেতৃত্ব-একই সময়রেখায়, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। এই দুই পথ আসলে ক্ষমতা ব্যবহারের দুই ভিন্ন দর্শন।

একটি পথ ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ক্ষমতাই হয়ে উঠেছিল রাজনীতির ভাষা ও লক্ষ্য। কথাবার্তা ছিল কঠোর, আচরণ ছিল প্রতিহিংসামূলক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু পরাজিত নয়, ব্যক্তিগতভাবে অপমান ও দমন করার প্রবণতা সেখানে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি ও পরিবারের ছায়ায় ঢুকে পড়েছিল। গণতন্ত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্র আর নাগরিকদের যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়নি; তা যেন ক্ষমতাধরদের একচেটিয়া বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পথের পরিণতি এসেছে জনতার জাগরণে- হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান ও নীরবতার বিস্ফোরণে।

অন্য পথটি ছিল সংযমের। কম কথা, কম দাবি, কম উচ্চারণ। ক্ষমতার বাইরে থেকেও একটি নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা। অপমানের জবাবে নীরবতা, আক্রমণের জবাবে সংযম। রাজনৈতিকভাবে এ পথ সব সময় সফল ছিল না, কিন্তু সামাজিকভাবে এর প্রভাব গভীর।

এই দুই পথের তুলনা কেবল রাজনীতির জন্য নয়; এটি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্যও প্রাসঙ্গিক। পরিবারে, অফিসে, সমাজে-আমরা প্রায়ই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে সম্মান ভেবে ভুল করি। ভয়কে শৃঙ্খলা বলে ধরে নিই। অথচ অভিজ্ঞতা বলে, ভয় আনুগত্য আনে, ভালোবাসা নয়। ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু হৃদয় জয় করা যায় না। এই সত্য শুধু বাংলাদেশের ভিতরেই নয়, বিশ্বের অন্য প্রান্তেও বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

৩. ভেনেজুয়েলা, মাদুরো ও ক্ষমতার কঠিন পাঠ

নিজেদের বাস্তবতা বোঝার জন্য কখনো কখনো দূরের আয়নায় তাকাতে হয়। ভেনেজুয়েলা সেই আয়নাগুলোর একটি। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা আজ আর কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি ক্ষমতা ও বৈধতার সম্পর্ক নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও নিকোলাস মাদুরোর শাসনে দেশটি কার্যত ভেঙে পড়া এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মুদ্রা মূল্যহীন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা নেই, স্বাস্থ্য ও খাদ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চরম সংকটে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে-এটি শুধু অর্থনৈতিক বিপর্যয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ফল।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কেবল মানবাধিকার বা আদর্শের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সরকার যদি দীর্ঘদিন জনগণের সম্মতি ছাড়া টিকে থাকে, নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকতায় নামিয়ে আনে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ম উপেক্ষা করে বিশ্ব অর্থনীতির অংশ থাকতে চায়-তাহলে সেই সরকার শুধু নিজের জনগণের জন্য নয়, বাইরের বিশ্বের জন্যও অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে ওঠে।

এ কারণেই মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন ওঠে ক্ষমতা আর দায়মুক্তির সীমা কোথায়। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু বৈধতা ছাড়া তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ভেনেজুয়েলার জন্য নয়; যেকোনো দেশের জন্যই প্রাসঙ্গিক, যেখানে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল।

এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

৪. তারেক রহমান, বিএনপি এবং দায়িত্বের ভার

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বাস্তবতা আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই-বিএনপি শুধু একজন নেত্রীকে হারায়নি, হারিয়েছে একটি ঐতিহাসিক ছায়া। সেই ছায়ার বাইরে এসে এখন দল ও রাজনীতির ভার কার্যত যাঁর হাতে, তিনি তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন আর প্রতীকের রাজনীতি যথেষ্ট নয়। মায়ের জীবদ্দশায় যেটুকু আবেগ, স্মৃতি ও নৈতিক অবস্থান দলকে ধরে রেখেছিল, সেই অধ্যায় শেষ। সামনে এখন দায়িত্বের সময়।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে আজ মূল প্রশ্ন আর ‘কে ক্ষমতায় আসবে’ নয়; প্রশ্ন হলো ‘ক্ষমতায় এসে কী ধরনের রাজনীতি করা হবে।’ ক্ষমতা কি আবার প্রতিহিংসার হাতিয়ার হবে, নাকি প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হবে-এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে শুধু বিএনপির ভবিষ্যৎ নয়, দেশের রাজনৈতিক গতিপথও।

তারেক রহমানের সামনে এখন দুটি বাস্তবতা। একদিকে একটি বড় দল, যার ভিতরে প্রত্যাশা, হতাশা ও অতীতের বোঝা-সবই আছে। অন্যদিকে একটি দেশ-যে দেশ ক্লান্ত, সন্দিহান এবং নতুন করে আস্থা রাখতে চাইছে না শুধু কথায়, আচরণে। আজকের তরুণ প্রজন্ম স্লোগান শুনে উত্তেজিত হয় না। তারা দেখে, ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে কেউ বদলায় কি না। তারা দেখে, বিরোধী অবস্থানে থাকলে কেউ সংযম দেখাতে পারে কি না। এই প্রজন্ম প্রতিশ্রুতি নয়, দৃষ্টান্ত খোঁজে।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় যে সংযম, নীরবতা ও ব্যক্তিগত মর্যাদার শিক্ষা রেখে গেছে, সেটি এখন তাঁর দলের সামনে সবচেয়ে বড় নৈতিক মানদণ্ড। ক্ষমতা নয় আচরণ। দখল নয় দায়িত্ব। উত্তরাধিকার নয় যোগ্যতা।

শেষ কথা

২০২৬-এর শুরুতে দাঁড়িয়ে কিছু নীরব ভাবনা আমাদের ঘিরে ধরে। ক্ষমতা অর্জন করা যায়, সম্মান নয়। প্রভাব তৈরি করা যায়, ভালোবাসা নয়। উত্তরাধিকার ঘোষণা করা যায়, কিন্তু চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন, দুই নারীর দুই পথ, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা এবং তারেক রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতা-সবকিছু মিলিয়ে একটি কথাই স্পষ্ট হয় ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় গিয়ে নয়, ক্ষমতা ব্যবহারে।

রাজনীতিতে বিচার আমরা করি উচ্চকণ্ঠে, কিন্তু ইতিহাস কথা বলে নীরবে। ব্যক্তি হোক বা রাষ্ট্র-টিকে থাকে সেই পথই, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে বিনয় থাকে, শক্তির সঙ্গে সংযম থাকে। বাংলাদেশের গল্প এখনো লেখা হচ্ছে। এই গল্প লেখা হচ্ছে প্রতিদিন-আমাদের আচরণে, সিদ্ধান্তে ও নীরবতায়। চতুর্মাত্রা সেই প্রশ্নটাই রেখে যায় আমাদের সামনে। লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com