সংগৃহীত ছবি
মোস্তফা কামাল :জাতীয়, স্থানীয় বা পেশাজীবী যেকোনো নির্বাচন যে একটা উৎসব-আনন্দের বিষয় হতে পারে, সেটি ভুলিয়ে দিয়ে গেছে বিগত সরকার। জাতীয়, এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একজন ওপরওয়ালার হাতেই ছিল সব দণ্ডমুণ্ড। এ ছিলছিলায় বাজার কমিটি, হকার কমিটির নেতা ঠিক করে দিতেন স্থানীয় দলীয় ওপরওয়ালারা। নির্বাচনকে তারা একটা সার্কাস-তামাশায় নিয়ে ঠেকিয়েছে। দীর্ঘদিনের একতরফা নির্বাচন, ভোটাধিকার হরণ, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারা, মৃত ব্যক্তিরও ভোট দেওয়ার কলঙ্ক কাটিয়ে এবার সেখানে একটা তাল-লয় ফিরবে বলে অপেক্ষা। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাউন্টডাউন চলছে। আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছে ভোটের বীজতলা। এখন ফলন রোপণের পালা। বহুদিন পর প্রথমবারের মতো বহুদলীয় নির্বাচন ও ভোটের লড়াইয়ের আয়োজন। জমুক লড়াইটা। হোক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। রাজধানী ঢাকা থেকে শহর, বন্দর, গ্রামসহ সব জনপদেই ভোটারদের দুয়ারে যেতে হচ্ছে প্রার্থীদের। ভোট দিলে দিক, না দিলেও পাস-সেই ভাবনার দিন শেষ। এ দৃশ্য ফিরিয়ে এনেছে পুরোনো দিনের রাজনৈতিক আমেজ। ভোটারদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে স্বস্তি ও প্রত্যাশা। কত বছর ভোট দিতে না পারার একটা বেদনা অবসানের আশা তাদের মনে। রাজনৈতিক দলগুলোও সেই আলোকে হোমওয়ার্ক শেষে এখন মাঠের এক্সামে।
আসছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এবার ১৩ কোটি মানুষ ভোটার হয়েছে। প্রায় ৪৪ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। সেখানে একদিকে প্রার্থীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনে একটি উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে কর্মযজ্ঞ। মাঠপর্যায়ে কিছু গুজব ও সংশয়ের ডালপালা মেললেও সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় কিংবা অনিশ্চয়তা নেই। বহু বছর পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বহুমাত্রিক এবং ভোটকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ দেখছে বাংলাদেশ। এবার নিয়ন্ত্রিত, একতরফা, ডামি-আমি দেখতে হচ্ছে না ভোটারদের। ভোট দিতে না পারার বঞ্চনা, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ না পাওয়া এবং ভোটারদের গুরুত্বহীন করে তোলার ক্ষোভের অবসান ঘটতে যাচ্ছে তাদের। রাজনৈতিক দলগুলোও বুঝতে পারছে নির্বাচন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের মাঠে বেশ সক্রিয়। সবাই যে যার মতো করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। ভোটাররা ও তাদের চাহিদার কথা বলছেন। এটি ভালো দিক। যেখানে মিলছে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে তৈরি হওয়া জাতীয় ঐক্যের ছাপ। তাঁরা লড়বেন, কিন্তু জোরজবরদস্তিতে নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, শত্রুতা নয়। ক্ষমতার উৎস ভাববেন জনগণকে। সব দলের কর্মী-সমর্থকদেরও জন্যও এটি একটি হোমওয়ার্ক। তাঁরাও নিজেদের আগামীর নেতা বা প্রার্থী ভাবার ক্লাস করতে পারছেন। ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ মানে মাঠেঘাটে নিজেও পরিচিত হওয়া।
তথ্যপ্রযুক্তির আশীর্বাদে এবার বিভিন্ন জায়গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার-প্রচারণা বেশ জমেছে। কেউ লাইভে কথা বলছেন, কেউ ভিডিওবার্তা দিচ্ছেন। আবার অনেক প্রার্থী পুরোনো রাজনৈতিক রীতিতে উঠান বৈঠক, এলাকার সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি, ভোটারদের ব্যক্তিগত খোঁজ নেওয়ার মতো কার্যক্রম বাড়িয়েছে। ফেসবুকে নানা ধরনের কনটেন্ট দিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। আগামী নির্বাচনে তাঁদের ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভোটযুদ্ধে নামতে চান তাঁরা। নিজেদের প্রচারণার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের নানান বিষয় নিয়ে অপপ্রচার চালানো শুরু হয়েছে ফেসবুকে। এর বাইরে বয়সে তরুণ ও সমাজমাধ্যম সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে এমন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ে টিম তৈরি করছেন অনেক প্রার্থী। তাদের মাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিজেদের নানা ধরনের নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড । এ ছাড়া ছড়িয়ে দিচ্ছেন ব্যানার, পোস্টারও। বেশির ভাগ মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী দলীয় প্রতীকের সঙ্গে নিজেদের ফটোকার্ড তৈরি করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সমাজমাধ্যমে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আবার গণ অভ্যুত্থানকেউ প্রতিদিন এসব প্রচারণা বদলাচ্ছেন।
নিত্য নতুন আইডিয়া দিয়ে তৈরির চেষ্টা করছেন নানান ধরনের প্রচারণার কৌশল। দেশের এবারের এ ভোটের তাপ প্রবাসেও। প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ ভোটার নিবন্ধন করেছেন। প্রবাসীদের ভোট পেতে ফেসবুককে বিশেষ করে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আলাদা নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন তাঁরা। প্রবাসীদের উন্নয়নে নানা ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তুতি দিচ্ছেন সমাজমাধ্যমে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর কাজও হচ্ছে। এটি মোকাবিলায় পুলিশের সাইবার ইউনিটকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। বিভিন্ন দল ও প্রার্থীরা চাইলে নির্বাচনি মাঠের শান্তিশৃঙ্খলা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে এবারের নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে।
এ আশাবাদ বাস্তব করতে সতর্কতারও দরকার আছে। বিশেষ করে জাতীয় ঐক্য যেন নষ্ট না হয়, সেই লক্ষ্য স্থির করতে হবে সব দলকেই। নির্বাচনে তারা কেউ জিতবে, কেউ হারবে, তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। তাঁদের এ ঐক্য নষ্টের অপচেষ্টা থাকবে, মহলবিশেষ এ কাজে তৎপর রয়েছে তা বিবেচনায় রাখতেই হবে। কেবল রাজনীতি নয়, অর্থনীতি-কূটনীতি সবকিছুতেই স্থিতিশীলতার জন্য একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন জরুরি। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামাজিক স্থিতিশীলতা আশা করা যায় না। দেশের অর্থনীতির ভিতরগত অবস্থা শোচনীয়। সামনের মাসে জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে এ অবস্থা কাটতে থাকবে বলে আশায় বুক বাঁধছেন ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক টালমাটাল অবস্থাও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনাগুলো বিনিয়োগ পরিবেশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিনিয়োগ পরিবেশে এটি এখন একটি বড় ‘বিষফোড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর এই আস্থার জায়গা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সেখানে মেরামত তথা আস্থা ফেরানোর বিষয় রয়েছে। মোটা দাগে বর্তমানে ব্যবসার প্রধান তিন প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট।
এর বাইরে লজিস্টিক, এনবিআরের দুর্নীতি, ট্যাক্স ও ভ্যাটের সমস্যা ও অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। এগুলো নিয়ে এ সরকার কাজ করেও সুফল ঘরে তুলতে পারেনি। নির্বাচিত নতুন সরকার তা পারবে। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কারখানার উৎপাদন লাইনে। একদিকে অবিক্রীত পণ্যের মজুত, আরেকদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে কারখানার শিফট কমিয়ে দিয়েছেন, এমনকি উৎপাদন খরচ পোষাতে না পেরে কোনো কোনো ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। পোশাকশিল্পের বহু কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। তা গোটা শিল্প খাতকে ব্যথা-বেদনায় ভোগাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তা এ ব্যথায় একটু উপশম দিতে পারে। সেই সঙ্গে ভালোয় ভালোয় নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে। নতুন করে গতিশীল হবে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক। নির্বাচিত সরকার বেসরকারি খাতের পুনর্গঠনে উদ্যোগ নেওয়ার পরিবেশ পাবে। তা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আস্থার সংকট কাটাবে।
সাকল্যে অর্থনীতিও গতি পাবে। আর অর্থনীতি ঠিক থাকলে আরও নীতি বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যায়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন বছর এগোলে এ প্রত্যাশা সফল হওয়ার আশা একটু বেশিই জাগে। আর আশা আছে বলেই তো বিভিন্ন মহলের বিশ্বাস ২০২৬ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বছর। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রাজনীতিতে হতে যাচ্ছে এই পরিবর্তন; যার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ হবে। এর মাধ্যমে রাজনীতিকে আবার সুষ্ঠু চর্চার মধ্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। রাজনীতির প্রতি সাধারণের বিশ্বাস ও আস্থাও ফিরে আসবে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








