সাঁড়াশি সেনা অ্যাকশনই মবের মোক্ষম দাওয়াই!

সংগৃহীত ছবি

 

 মোস্তফা কামাল : সরকারের কোনো ডাকদোহাই, হুঁশিয়ারি শুনছে না মবকারীরা। করোনা-ডেঙ্গুর ভয়ও করছে না। সেনাবাহিনী যে মাঠে আছে, তা-ও যেন গায়ে মাখার বিষয় নয়। এমনকি মব সম্বোধন করলে অপমানিত হয়, মাইন্ড করে। আরো বেশি উদ্যমে হামলে পড়ে। সেনাবাহিনীর কয়েকটি অ্যাকশনের মাঝে কিছুদিন দম নিলেও মবেরা আসলে দমেনি। সম্প্রতি নতুন তেজে নামছে। আজ এখানে, কাল ওখানে। নিত্যনতুন স্টাইলে।

 

ঘটনা বিশ্লেষণে এখন আর ধারণা নয়, জনমনে বিশ্বাস, সেনাবাহিনীর বিশেষ অ্যাকশন ছাড়া মব নামের এ বিপদ রোখা যাচ্ছে না। এ প্রশ্নে সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে মাঠে থাকা সেনাবাহিনী এর আগে মব বিষয়ে তাদের ম্যাসেজ পরিষ্কার করেছে। তাতেও কাজ হচ্ছিল না। ঢাকা-রংপুরসহ কয়েক জায়গায় অন দ্য স্পটে কয়েকটি অ্যাকশন নিলে কয়েক দিন পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়। সরে সরে থাকে মবপাণ্ডারা। এতে আশাবাদী হয়ে ওঠে মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবার বাজে বার্তা দিচ্ছে।

রোগদৃষ্টে সচেতনদের বোধগম্য যে বিচ্ছিন্ন অ্যাকশন নয়, আর হুমকি-ধমকির মেডিসিনও নয়। বিশেষায়িত সেনা পদক্ষেপের বিকল্প কোনো দাওয়াইতে মব রোগ সারবে না। আবার এ কথাও সত্য, সেনা সদস্যরা মাঠে থাকাতেই মব সন্ত্রাসীরা কিছুটা হলেও এদিক-ওদিক চেয়েচিন্তে এগোয়। বেশিদিন এভাবে চলতে দিলে ওরা তা-ও করবে না। তখন রোখা কঠিন হবে। এর আগেই সাঁড়াশি অ্যাকশন জরুরি। মবের বিরুদ্ধে সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারির মর্যাদা রক্ষাও জরুরি।

 

মব বরদাশত না করার কথা সেনাপ্রধান কঠোর ভাষায় অনেক আগেই দিয়েছেন। সেনা সদর থেকেও ‘মব ভায়োলেন্স’-এর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে রাখা হয়েছে। হুমকি-ধমকি বা কঠোর ভাষার সঙ্গে এখন দরকার আর পেছনে না তাকিয়ে কড়া পদক্ষেপ। মানুষ সেই অপেক্ষাই করছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে ঠেকেছে, মবের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অ্যাকশন দেখলে মানুষ শুধু বর্তমান নিয়ে নয়, ভবিষ্যতের জন্যও আশাবাদী হবে।

 

এরই মধ্যে অফিস, আদালত, থানাসহ সমাজ ও দেশের বিভিন্ন স্তরে মবকাণ্ড যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফেরার লক্ষণ নেই। সেনাবাহিনীর সুবিধা হচ্ছে, একে একে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অকার্যকর অবস্থা ভর করলেও পেশাদারিত্ব-প্রশিক্ষণ-গ্রহণযোগ্যতা মিলিয়ে এ বাহিনীটির মর্যাদা ক্রমে উচ্চাসনে। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে এবং জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে সাহায্য করে। সেনাবাহিনীও মব বিষয়ে তাদের অবস্থান বদলায়নি।

 

সেনা সদরের সর্বশেষ ব্রিফিংয়েও জানানো হয়েছে, মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সোচ্চার ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। পটিয়ার ঘটনায় সেনাবাহিনী ত্বরিতগতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ টানা হয়েছে ব্রিফিংয়ে। মববাজ আটকের পর আইনি প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে হস্তান্তর করা হয় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে কেউ জামিন পেয়ে গেলে সেনাবাহিনীর কিছু করার নেই।

 

সেনাবাহিনী ধরবে, থানায় বা আদালতে সোপর্দ করবে, এরপর কোনো মববাজের জামিন পেয়ে যাবে—এমনটি কাম্য নয় মানুষের। কারণ সেনাবাহিনী বিচারিক ক্ষমতা নিয়েই মাঠে আছে। তাই সেনাবাহিনীর কাছে আরো বেশি অ্যাকশন বা পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। শুধু দেশ রক্ষা নয়, যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সশস্ত্র বাহিনীর জনগণের পাশে দাঁড়ানোর নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে বলেই জনমানুষের এমন প্রত্যাশা। ৫ আগস্ট তো ওই প্রত্যাশার পারদে আরো পালক যোগ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনা-জনতা একাকার হয়ে কিভাবে একটি কঠিন পরিস্থিতিকে আয়ত্তে আনা যায়, গোটা বিশ্ব তা দেখেছে। সেই অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে মব নামের কতিপয় উচ্ছৃঙ্খলের হাতে? এরা মোটেই দেশের কোনো দল বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে শক্তিধর নয়। ভয়-আতঙ্ক, বোপরোয়াপনাই তাদের পুঁজি। সামপ্রতিক সময়ে এরা ভয়াবহ সামাজিকব্যাধি।

 

এই দুষ্টুচক্র একদিকে বিচারহীনতার প্রতীক, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন কদাকার রূপ। প্রকাশ বিভিন্নতায়। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা অর্থনৈতিক নানা উত্তেজনার সুযোগ নেয়। গত ১০ মাসে দেশে মব সন্ত্রাসের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ৩ জুলাই বৃহস্পতিবার কুমিল্লার মুরাদনগরে এক মা, ছেলে ও মেয়েকে চুরির অভিযোগে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকায় আল আমিন, গাজীপুরে হৃদয় নামের এক যুবক, লালমনিরহাটে এক সেলুনকর্মী এবং সিরাজগঞ্জে এক মানসিক প্রতিবন্ধীসহ গত এক সপ্তাহে অন্তত ছয়জন মানুষ মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

 

মানুষকে শুধু পিটিয়ে মারলেই সেটা মব সন্ত্রাস না—এর সঙ্গে ঘরবাড়ি দখল, প্রতিষ্ঠানে হামলা এগুলোও মব সন্ত্রাস। এ ১০ মাসে মব জাস্টিসের নামে ব্যক্তির ওপর হামলা, অফিস ও ঘরবাড়ি লুটপাট, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, মাজার, আখড়া ভাঙা, এমনকি নারীদের ফুটবল ম্যাচ পর্যন্ত বন্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। মানুষের কাছে এসবের পরিসংখ্যান অসহ্য ও বড় বেদনার। সরকার কি আসলেই মব ঠেকাতে চায়, নাকি তারাও মবে ভয় পায় বা সাইড কেটে থাকে? এসব প্রশ্নও আর শুনতে চায় না মানুষ।

 

বিবেকসম্পন্ন যেকোনো মানুষই এর অবসান চায়। সেই সঙ্গে স্মরণ করছে সেনাপ্রধানের আশ্বাসের কথা। তিনি একাধিকবার এই নতুন উপদ্রব কঠোর হাতে দমনের কথা বলেছিলেন। রংপুরে মব সন্ত্রাসীদের ডেকে ‘শরীরে রক্ত থাকতে এটা বরদাশত করা হবে না’ বলে এক সেনা কর্মকর্তার কঠোর বার্তা মানুষকে আশার আলো দেখালেও কেন তা দীর্ঘায়িত হলো না—মানুষের মধ্যে এ জিজ্ঞাসা ঘুরছে। আমাদের সেনাবাহিনী আফ্রিকার জঙ্গলে শান্তি আনতে পারলে নিজ দেশে পারবে না, তা ভাবাই যায় না। এক বছর আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জমান বলেছিলেন আমার ওপর ভরসা রাখুন। মানুষ তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।

 

এখানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে উসকানি আছে, মানুষকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা আছে, তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও এই বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থাও তো আছে। আবার জিজ্ঞাসাও আছে, মেজিস্ট্রেসি পাওয়ার থাকার পরও মবের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ হচ্ছে না কেন? চব্বিশের প্রাপ্তি ও সেনা-জনতার সম্মিলন হাত ছাড়া হয়ে গেলে মব সন্ত্রাসের মতো রোগ নানা উপসর্গ নিয়ে আরো শক্তিশালী হবে। এখনো মানুষের কাছে বড় ভরসার জায়গা সেনাবাহিনী ও তার ম্যাজিস্ট্রেসি।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» আ.লীগ আমলেও নুরের ওপর এমন হামলা হয়নি, এর দায় সরকারকে নিতে হবে : উপদেষ্টা আসিফ

» ইসলামপুরে সাংবাদিদের সাথে জামায়াতের এমপি প্রার্ধী ড. ছামিউল হক ফারুকীর মত বিনিময়

» বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই স্বাধীনভাবে কার্ড ইস্যু করতে পারবে দেশের ব্যাংকগুলো

» রাজশাহীতে নতুন জিপিসি উদ্বোধন করলো গ্রামীণফোন

» ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৭০ বস্তা সার জব্দ, ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা

» দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর হিসেবে সবুজ জ্বালানি ব্যবহার করে ডেটা সেন্টার চালু করল বাংলালিংক

» সৎ নেতৃত্ব ছাড়া সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় …. ইঞ্জিনিয়ার মুহসীন আহমেদ

» ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ পবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের

» শতকোটি ছাড়াল পাগলা মসজিদের দানের টাকা

» আইএসপিআরের বিবৃতি প্রত্যাখ্যান গণঅধিকার পরিষদের

  

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

সাঁড়াশি সেনা অ্যাকশনই মবের মোক্ষম দাওয়াই!

সংগৃহীত ছবি

 

 মোস্তফা কামাল : সরকারের কোনো ডাকদোহাই, হুঁশিয়ারি শুনছে না মবকারীরা। করোনা-ডেঙ্গুর ভয়ও করছে না। সেনাবাহিনী যে মাঠে আছে, তা-ও যেন গায়ে মাখার বিষয় নয়। এমনকি মব সম্বোধন করলে অপমানিত হয়, মাইন্ড করে। আরো বেশি উদ্যমে হামলে পড়ে। সেনাবাহিনীর কয়েকটি অ্যাকশনের মাঝে কিছুদিন দম নিলেও মবেরা আসলে দমেনি। সম্প্রতি নতুন তেজে নামছে। আজ এখানে, কাল ওখানে। নিত্যনতুন স্টাইলে।

 

ঘটনা বিশ্লেষণে এখন আর ধারণা নয়, জনমনে বিশ্বাস, সেনাবাহিনীর বিশেষ অ্যাকশন ছাড়া মব নামের এ বিপদ রোখা যাচ্ছে না। এ প্রশ্নে সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে মাঠে থাকা সেনাবাহিনী এর আগে মব বিষয়ে তাদের ম্যাসেজ পরিষ্কার করেছে। তাতেও কাজ হচ্ছিল না। ঢাকা-রংপুরসহ কয়েক জায়গায় অন দ্য স্পটে কয়েকটি অ্যাকশন নিলে কয়েক দিন পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়। সরে সরে থাকে মবপাণ্ডারা। এতে আশাবাদী হয়ে ওঠে মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবার বাজে বার্তা দিচ্ছে।

রোগদৃষ্টে সচেতনদের বোধগম্য যে বিচ্ছিন্ন অ্যাকশন নয়, আর হুমকি-ধমকির মেডিসিনও নয়। বিশেষায়িত সেনা পদক্ষেপের বিকল্প কোনো দাওয়াইতে মব রোগ সারবে না। আবার এ কথাও সত্য, সেনা সদস্যরা মাঠে থাকাতেই মব সন্ত্রাসীরা কিছুটা হলেও এদিক-ওদিক চেয়েচিন্তে এগোয়। বেশিদিন এভাবে চলতে দিলে ওরা তা-ও করবে না। তখন রোখা কঠিন হবে। এর আগেই সাঁড়াশি অ্যাকশন জরুরি। মবের বিরুদ্ধে সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারির মর্যাদা রক্ষাও জরুরি।

 

মব বরদাশত না করার কথা সেনাপ্রধান কঠোর ভাষায় অনেক আগেই দিয়েছেন। সেনা সদর থেকেও ‘মব ভায়োলেন্স’-এর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে রাখা হয়েছে। হুমকি-ধমকি বা কঠোর ভাষার সঙ্গে এখন দরকার আর পেছনে না তাকিয়ে কড়া পদক্ষেপ। মানুষ সেই অপেক্ষাই করছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে ঠেকেছে, মবের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অ্যাকশন দেখলে মানুষ শুধু বর্তমান নিয়ে নয়, ভবিষ্যতের জন্যও আশাবাদী হবে।

 

এরই মধ্যে অফিস, আদালত, থানাসহ সমাজ ও দেশের বিভিন্ন স্তরে মবকাণ্ড যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফেরার লক্ষণ নেই। সেনাবাহিনীর সুবিধা হচ্ছে, একে একে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অকার্যকর অবস্থা ভর করলেও পেশাদারিত্ব-প্রশিক্ষণ-গ্রহণযোগ্যতা মিলিয়ে এ বাহিনীটির মর্যাদা ক্রমে উচ্চাসনে। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে এবং জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে সাহায্য করে। সেনাবাহিনীও মব বিষয়ে তাদের অবস্থান বদলায়নি।

 

সেনা সদরের সর্বশেষ ব্রিফিংয়েও জানানো হয়েছে, মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সোচ্চার ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। পটিয়ার ঘটনায় সেনাবাহিনী ত্বরিতগতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ টানা হয়েছে ব্রিফিংয়ে। মববাজ আটকের পর আইনি প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে হস্তান্তর করা হয় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে কেউ জামিন পেয়ে গেলে সেনাবাহিনীর কিছু করার নেই।

 

সেনাবাহিনী ধরবে, থানায় বা আদালতে সোপর্দ করবে, এরপর কোনো মববাজের জামিন পেয়ে যাবে—এমনটি কাম্য নয় মানুষের। কারণ সেনাবাহিনী বিচারিক ক্ষমতা নিয়েই মাঠে আছে। তাই সেনাবাহিনীর কাছে আরো বেশি অ্যাকশন বা পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। শুধু দেশ রক্ষা নয়, যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সশস্ত্র বাহিনীর জনগণের পাশে দাঁড়ানোর নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে বলেই জনমানুষের এমন প্রত্যাশা। ৫ আগস্ট তো ওই প্রত্যাশার পারদে আরো পালক যোগ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনা-জনতা একাকার হয়ে কিভাবে একটি কঠিন পরিস্থিতিকে আয়ত্তে আনা যায়, গোটা বিশ্ব তা দেখেছে। সেই অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে মব নামের কতিপয় উচ্ছৃঙ্খলের হাতে? এরা মোটেই দেশের কোনো দল বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে শক্তিধর নয়। ভয়-আতঙ্ক, বোপরোয়াপনাই তাদের পুঁজি। সামপ্রতিক সময়ে এরা ভয়াবহ সামাজিকব্যাধি।

 

এই দুষ্টুচক্র একদিকে বিচারহীনতার প্রতীক, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন কদাকার রূপ। প্রকাশ বিভিন্নতায়। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা অর্থনৈতিক নানা উত্তেজনার সুযোগ নেয়। গত ১০ মাসে দেশে মব সন্ত্রাসের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ৩ জুলাই বৃহস্পতিবার কুমিল্লার মুরাদনগরে এক মা, ছেলে ও মেয়েকে চুরির অভিযোগে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকায় আল আমিন, গাজীপুরে হৃদয় নামের এক যুবক, লালমনিরহাটে এক সেলুনকর্মী এবং সিরাজগঞ্জে এক মানসিক প্রতিবন্ধীসহ গত এক সপ্তাহে অন্তত ছয়জন মানুষ মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

 

মানুষকে শুধু পিটিয়ে মারলেই সেটা মব সন্ত্রাস না—এর সঙ্গে ঘরবাড়ি দখল, প্রতিষ্ঠানে হামলা এগুলোও মব সন্ত্রাস। এ ১০ মাসে মব জাস্টিসের নামে ব্যক্তির ওপর হামলা, অফিস ও ঘরবাড়ি লুটপাট, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, মাজার, আখড়া ভাঙা, এমনকি নারীদের ফুটবল ম্যাচ পর্যন্ত বন্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। মানুষের কাছে এসবের পরিসংখ্যান অসহ্য ও বড় বেদনার। সরকার কি আসলেই মব ঠেকাতে চায়, নাকি তারাও মবে ভয় পায় বা সাইড কেটে থাকে? এসব প্রশ্নও আর শুনতে চায় না মানুষ।

 

বিবেকসম্পন্ন যেকোনো মানুষই এর অবসান চায়। সেই সঙ্গে স্মরণ করছে সেনাপ্রধানের আশ্বাসের কথা। তিনি একাধিকবার এই নতুন উপদ্রব কঠোর হাতে দমনের কথা বলেছিলেন। রংপুরে মব সন্ত্রাসীদের ডেকে ‘শরীরে রক্ত থাকতে এটা বরদাশত করা হবে না’ বলে এক সেনা কর্মকর্তার কঠোর বার্তা মানুষকে আশার আলো দেখালেও কেন তা দীর্ঘায়িত হলো না—মানুষের মধ্যে এ জিজ্ঞাসা ঘুরছে। আমাদের সেনাবাহিনী আফ্রিকার জঙ্গলে শান্তি আনতে পারলে নিজ দেশে পারবে না, তা ভাবাই যায় না। এক বছর আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জমান বলেছিলেন আমার ওপর ভরসা রাখুন। মানুষ তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।

 

এখানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে উসকানি আছে, মানুষকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা আছে, তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও এই বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থাও তো আছে। আবার জিজ্ঞাসাও আছে, মেজিস্ট্রেসি পাওয়ার থাকার পরও মবের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ হচ্ছে না কেন? চব্বিশের প্রাপ্তি ও সেনা-জনতার সম্মিলন হাত ছাড়া হয়ে গেলে মব সন্ত্রাসের মতো রোগ নানা উপসর্গ নিয়ে আরো শক্তিশালী হবে। এখনো মানুষের কাছে বড় ভরসার জায়গা সেনাবাহিনী ও তার ম্যাজিস্ট্রেসি।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



  

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

Design & Developed BY ThemesBazar.Com