ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল : মব ভায়োলেন্স দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা, ব্যবসা, বিনিয়োগ, আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা, এমনকি সামনের নির্বাচনকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে দিতে পারে—এ শঙ্কার কথা আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোরতার আহ্বান ছিল অন্তপ্রাণে। এ আহ্বান ও শঙ্কাটি কথার কথা বা মনগড়া ছিল না। কিছু ঘটনা ও নমুনা দৃষ্টেই ছিল আভাসটি।
সময়ের ব্যবধানে এখন আমাদের সেই শঙ্কারই বাস্তবতা। চারদিকে নানা কানাঘুষা।
ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। ছেড়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ট্রেনও।
রাজনীতি ও গণতন্ত্রের এমন চলতি পথে নানা ভজঘট পাকছে বা পাকানো হচ্ছে। আজ এখানে, কাল ওখানে নানা ধাঁচের মবকাণ্ড ঘটছে। যার বেশির ভাগ এলোমেলো বিক্ষিপ্ত, কূলকিনারাহীন। একটির ন্যূনতম নিষ্পত্তি ছাড়াই ঘটছে আরেকটি।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার আগেই প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, তাঁর কথা শুনতে হবে। আস্থা রাখতে হবে। নইলে তিনি দায়িত্ব নেবেন না। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কথা ছিল আরো লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরা ও শান্ত থাকার আহ্বানের সমান্তরালে বলেছিলেন, ‘আমার প্রতি ভরসা রাখুন।’
দেশকে গণতন্ত্রের অভিযাত্রার দিকে নিয়ে যেতে যত সহায়তা দরকার তাঁর বাহিনীকে নিয়ে সব করবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছেন। এমনকি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে করণীয় সব করার কথাও দিয়েছেন।
এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের ব্যাপারে তাঁর চেষ্টা ও আন্তরিকতার যাবতীয় সব স্পষ্ট করেছেন। নির্বাচন কমিশন কেবল ‘ফেব্রুয়ারিতে নয়, ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই’ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা নিয়ে ব্যস্ত। সেনাবাহিনীর দায়িত্বও প্রায় স্পষ্ট করা হয়েছে। অপেক্ষা কেবল ফেব্রুয়ারির। কিন্তু গত কদিন ধরে আজ এখানে, কাল ওখানে ভজঘট পাকানো হচ্ছে। ঘটনার চেয়ে কখনো কথার খই বেশি। ব্যাপক হম্বিতম্বি। কেউ নির্বাচনের আগেই এ সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করে আজই পারলে ফেলে দেয়। কেউ অযাচিত-অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনে সরকারকে। অকথ্য সব কথাবার্তা। সেই সঙ্গে মবের তেজে মাত্রা যোগ করার যত নোংরা আয়োজন।
সর্বশেষ রাজধানীর কাকরাইল-বিজয়নগর এপিসোড। এর আগে সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে। একই দিন দেশের আরো কয়েক জায়গায় সিরিজ মব। এর বিপরীতে উসকানি। আরেকটি ঘটনা ঘটানোর টোটকা উসকানি। আর এই চান্সে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা। সেনাবাহিনীকে উত্তেজিত করা। কাজে বা চেষ্টায় অকুলান হলেও সরকার সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে। সেনাবাহিনীর অবস্থানও পরিষ্কার। জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনতে সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তাদের। জননিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সেদিন কাকরাইল-বিজয়নগরে সর্বসাধ্য চেষ্টা করেছে। তাদের পাঁচজন সদস্য আহতও হয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করে। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চায়। তারা সেখানে গিয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলে। দেখা গেল ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে মববাজির প্রস্তুতি। পরিকল্পনামতো জনাকতেক লোক প্রথমে সেনাবাহিনী সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য ছোড়ে। এরপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর আক্রমণ। পরিণতিতে ইট মারলে পাটকেল খাওয়ার ঘটনা। একই সঙ্গে ইস্যু পয়দা। এ নিয়ে নানা ন্যারেটিভ। দোষারোপের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকেও টেনে আনার নোংরা উৎসব।
নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদ হোক, দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু একে ইস্যু করে ভজঘট পাকাপোক্ত করার নমুনা দেখা যাচ্ছে। তাই সব পদক্ষেপ নিতে হবে ভেবেচিন্তে। কারণ, আগুনে ঘি ঢালার জন্য অনেকে কাজ করছে।
এদিকে নানা ইস্যুতে রাজপথে ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা। অপেক্ষায় মতলবিরাও। সরকারবিরোধী মহল কিছু একটার ঘোর আশায়। চব্বিশের বিপ্লবের অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলো বিভাজিত। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের সংস্কারের প্রশ্ন প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দুই ক্ষেত্রেই জনগণ প্রতারণার শিকার হতে বসেছে। বলা হচ্ছিল, একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন আর চব্বিশে সেই স্বাধীনতা রক্ষা তথা বিনির্মাণ। সেই জায়গায়ও এখন দুঃখজনকভাবে ভিন্ন কথাবার্তা। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাকে ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের নেপথ্য খোঁজা জরুরি।
না বললেই নয়, জাতীয় পার্টিকে নিয়ে কিছু গুপ্ত রাজনীতি চলছে। যারা জাতীয় পার্টিকে নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তাদের মধ্যেও গুপ্ত হিসাব আছে। শেখ হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগীদের দুই ভাগ করে জি এম কাদেরের ভাগকে দমন বা আনিসুল ইসলাম-চুন্নুর ভাগকে নিজেদের কাছে টানার চেষ্টা কোনোটাই সুস্থতা নয়। এক বছর এগুলো লালন করে ভোটের আগে এসব দাবি তোলার গরল রাজনীতি সরল মানুষও বোঝে। এ ছাড়া কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি তো করতে হবে সরকারের কাছে। ওই দলের অফিসে গিয়ে নয়।
নীতির চেয়ে কৌশল গুরুত্বপূর্ণ, আর বুদ্ধিমান হওয়ার চেয়ে চালাক হওয়া প্রয়োজন, এটাই এখন সমাজের শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অদ্ভুত বিষণ্নতা গ্রাস করছে সাধারণ মানুষকে। এ কেমন সমাজ, যেখানে কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, কারো ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না। কীভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের আন্দোলনকে দমন করা যায় এবং আন্দোলনকারী মানুষ, মানুষের ওপর ভরসা রেখে পথে নেমে এলে কীভাবে শাসকের নিষ্ঠুর আক্রমণকে প্রতিহত ও পরাস্ত করা যায় তা জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে দেখেছে বাংলাদেশ। দুঃশাসকদের পতন ও পলায়নের পরও দেখতে হবে?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন