নয় সমস্যায় দুর্বিষহ ঢাকা

স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ক্রমেই অনুপযোগী হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, ভয়াবহ যানজট, মশার উৎপাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অনিরাপদ জীবন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে নগরজীবন। এ ছাড়া বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি, হাঁটার অনুপযোগী ফুটপাথ, ভুতুড়ে ইউটিলিটি বিল, খেলার মাঠ ও পার্কের অভাবসহ অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন ঢাকা ছাড়ার সুযোগ খুঁজছেন। আবার প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কাজের খোঁজে ভিড় করছে রাজধানীতে।

 

শব্দদূষণে শীর্ষে : বায়ুদূষণের পর শব্দদূষণেও বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করেছে ঢাকা। সম্প্রতি জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপির প্রকাশ করা ‘ফ্রন্টিয়ার্স ২০২২ : নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ শব্দদূষণের নগরী ঢাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের জন্য ঘরের ভিতর শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল। আর ঘরের বাইরে বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবেল। অথচ ঢাকায় এ মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল। প্রতিবেদনে বলা হয়- নির্ধারিত সীমার চেয়ে উচ্চমাত্রার শব্দ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিপদে ফেলে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বধিরতা, ঘুমে ব্যাঘাতসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি করে।

 

ভয়াবহ বায়ুদূষণ : দু-এক দিন পরপরই বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকায় ১ নম্বরে উঠে আসছে ঢাকা। অধিকাংশ সময়ই ঢাকার বাতাসে দূষণের মূল উপাদান পিএম ২.৫ (অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া নিরাপদ সীমার চেয়ে অন্তত ১৫ গুণ বেশি থাকছে। শীতকালে তা বেড়ে যাচ্ছে ৩৪ গুণ পর্যন্ত। বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউ এয়ারের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর ও বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ দূষিত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আবু রায়হান বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুর তৃতীয় কারণ সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ)। এ রোগের সঙ্গে বায়ুদূষণ ওতপ্রোত জড়িত।
পানি সমস্যা : ঢাকায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পানিবাহিত রোগ। কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২০০-এর বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছেন আাইসিডিডিআরবিতে। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিকে। রাজধানীর অনেক এলাকায় ওয়াসার লাইনে সবুজাভ, হলুদ ও বাদামি রঙের দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। ২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। একই বছর ওয়াসা পরীক্ষা করে দেখতে পায় পাইপলাইনে ত্রুটির কারণে ৫৭ এলাকায় সরবরাহকৃত পানিতে দূষণ ঘটছে। পাইপলাইন উন্নয়নে ওয়াসা বিভিন্ন প্রকল্প নিলেও বর্তমানে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ফের ওয়াসার পানিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

 

ভয়াবহ যানজট : বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর অন্যতম সমস্যা যানজট। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতিবেগ ১০ বছর আগে ছিল ২১ কিলোমিটার। এখন তা নেমেছে ৭ কিলোমিটারে, যা হাঁটার গতির চেয়ে কিছুটা বেশি। এভাবে চললে ২০৩৫ সাল নাগাদ গতিবেগ ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসবে। ‘দ্য ফিউচার প্লানিং অব আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টার অপচয় ঘটছে। এর আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটের কারণে যাত্রীদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়, অস্থিরতা দেখা দেয়।

 

মশার উৎপাত : মশার যন্ত্রণায় নাভিশ্বাস উঠেছে রাজধানীবাসীর। দুই সিটি করপোরেশন থেকে প্রতি বছর আশ্বাস মিললেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলছে না। সর্বশেষ অর্থবছরেও দুই সিটি করপোরেশন মশা মারতে ১০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখে। বারবার বদলানো হচ্ছে ওষুধ, কেনা হচ্ছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। তবু মিলছে না মশা থেকে মুক্তি। চলতি মার্চে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে মশার ঘনত্ব আরও চার গুণ বাড়বে বলে সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

 

আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অনিরাপদ জীবন : রাজধানীতে হঠাৎই বেড়ে গেছে খুন-খারাবি। সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলি করে আওয়ামী লীগ নেতাসহ জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে। ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে এক চিকিৎসককে। ২৬ মার্চ খিলগাঁওয়ে বাসায় ঢুকে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২২ মার্চ উত্তরায় এক পোশাকশ্রমিককে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। গত এক মাসেই ১০-১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। এতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

 

অপরিকল্পিত নগরায়ণ : রাজধানীর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। যেখানে সেখানে গড়ে উঠছে ভবন। আবাসিক এলাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে অননুমোদিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ফলে এ নগরীতে নিরিবিলি শান্ত পরিবেশে বসবাস এখন স্বপ্নের মতো।

 

গণপরিবহন সংকট : রাজধানীবাসীর অন্যতম সমস্যা পর্যাপ্ত ও মানসম্মত গণপরিবহন না থাকা। রাস্তাগুলো যানজটে ঠাসা থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়েও মিলছে না বাস। এর ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে ভাড়া। এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ঢাকার রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার যথাক্রমে ৪৯ ও ১৮ শতাংশ বাড়লেও গণপরিবহন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ।

 

জীবযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি : ১৯৯৭ সালে রাজধানীতে যে ফ্ল্যাটের ভাড়া ছিল ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা, ২০২২ সালে সেই ফ্ল্যাটের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া দিতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে নগরবাসীর বেতনের অর্ধেক বা তারও বেশি। সেই সঙ্গে নিত্যপণ্য, শিক্ষাব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ফলে টাকার অঙ্কে আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্চে মানুষ।

 

হাঁটার অনুপযোগী ফুটপাথ : বারবার হকার উচ্ছেদের পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না রাজধানীর ফুটপাথ। ফুটপাথেই রাখা হচ্ছে রিকশা, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন। বসছে অস্থায়ী দোকান। নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়। হুটহাট মোটরসাইকেল উঠে যাচ্ছে ফুটপাথে।

 

বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি : বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতায় রাজধানীজুড়ে সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ি লেগেই আছে। এক মাসের ব্যবধানে একই রাস্তা আবার খোঁড়া হচ্ছে। দফায় দফায় সমন্বয় সভা করেও এর সমাধান মেলেনি। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে যানজট, জলাবদ্ধতা, চলাচলে ভোগান্তি, ধুলাদূষণ থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর।

 

ভুতুড়ে ইউটিলিটি বিল : রাজধানীবাসীর আরেকটি বড় সমস্যা বিদ্যুৎ-পানির ভুতুড়ে বিল। এমনকি খোদ বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তার বাসায়ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে অনেকবার, যা নিয়ে তদন্ত কমিটিও হয়। গতকাল মহাখালী ডিওএইচএসের এক বাসিন্দা জানান, তার তিন তলা বাড়িতে প্রতি মাসে পানির বিল আসে ১০-১৫ হাজার টাকা। গত মাসে কোনো কারণ ছাড়াই ৫০ হাজার টাকা বিল এসেছে। এ নিয়ে তিনি ওয়াসায় যোগাযোগ করবেন বলে জানান।

 

বসবাসযোগ্য নগরীর তলানিতে : ২০২১ সালে বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরগুলোর যে নতুন তালিকা প্রকাশ করে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ), তাতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান নিচের দিক থেকে ৪ নম্বর। বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে ১৪০ দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো এ পাঁচ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

 

খেলার মাঠ ও পার্কের অভাব : শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য রাজধানীতে নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক। ফলে শিশুকাল থেকেই শরীরে নানা রোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।   সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» নাশকতার মামলায় র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতার ২২৮

» নাশকতাকারী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

» মৃত্যুযন্ত্রণা সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

» চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৩৫ ‌

» নাইকো দুর্নীতি মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য ২০ আগস্ট

» বিতর্ক আর শঙ্কা নিয়ে শুরু হচ্ছে প্যারিস অলিম্পিক

» নাশকতাকারীরা যেন ঢাকা না ছাড়তে পারে সেই পরিকল্পনা করছে ডিএমপি : বিপ্লব কুমার

» দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে: নৌবাহিনী প্রধান

» হামলার নীলনকশা আগেই প্রস্তুত করে রেখেছিল বিএনপি: কাদের

» সহিংস আন্দোলনের জন্য অহিংস আন্দোলনকে ব্যবহার করেছে বিএনপি-জামায়াত: জয়

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

নয় সমস্যায় দুর্বিষহ ঢাকা

স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ক্রমেই অনুপযোগী হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, ভয়াবহ যানজট, মশার উৎপাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অনিরাপদ জীবন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে নগরজীবন। এ ছাড়া বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি, হাঁটার অনুপযোগী ফুটপাথ, ভুতুড়ে ইউটিলিটি বিল, খেলার মাঠ ও পার্কের অভাবসহ অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন ঢাকা ছাড়ার সুযোগ খুঁজছেন। আবার প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কাজের খোঁজে ভিড় করছে রাজধানীতে।

 

শব্দদূষণে শীর্ষে : বায়ুদূষণের পর শব্দদূষণেও বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করেছে ঢাকা। সম্প্রতি জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপির প্রকাশ করা ‘ফ্রন্টিয়ার্স ২০২২ : নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ শব্দদূষণের নগরী ঢাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের জন্য ঘরের ভিতর শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল। আর ঘরের বাইরে বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবেল। অথচ ঢাকায় এ মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল। প্রতিবেদনে বলা হয়- নির্ধারিত সীমার চেয়ে উচ্চমাত্রার শব্দ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিপদে ফেলে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বধিরতা, ঘুমে ব্যাঘাতসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি করে।

 

ভয়াবহ বায়ুদূষণ : দু-এক দিন পরপরই বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকায় ১ নম্বরে উঠে আসছে ঢাকা। অধিকাংশ সময়ই ঢাকার বাতাসে দূষণের মূল উপাদান পিএম ২.৫ (অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া নিরাপদ সীমার চেয়ে অন্তত ১৫ গুণ বেশি থাকছে। শীতকালে তা বেড়ে যাচ্ছে ৩৪ গুণ পর্যন্ত। বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউ এয়ারের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর ও বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ দূষিত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আবু রায়হান বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুর তৃতীয় কারণ সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ)। এ রোগের সঙ্গে বায়ুদূষণ ওতপ্রোত জড়িত।
পানি সমস্যা : ঢাকায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পানিবাহিত রোগ। কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২০০-এর বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছেন আাইসিডিডিআরবিতে। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিকে। রাজধানীর অনেক এলাকায় ওয়াসার লাইনে সবুজাভ, হলুদ ও বাদামি রঙের দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। ২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। একই বছর ওয়াসা পরীক্ষা করে দেখতে পায় পাইপলাইনে ত্রুটির কারণে ৫৭ এলাকায় সরবরাহকৃত পানিতে দূষণ ঘটছে। পাইপলাইন উন্নয়নে ওয়াসা বিভিন্ন প্রকল্প নিলেও বর্তমানে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ফের ওয়াসার পানিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

 

ভয়াবহ যানজট : বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর অন্যতম সমস্যা যানজট। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতিবেগ ১০ বছর আগে ছিল ২১ কিলোমিটার। এখন তা নেমেছে ৭ কিলোমিটারে, যা হাঁটার গতির চেয়ে কিছুটা বেশি। এভাবে চললে ২০৩৫ সাল নাগাদ গতিবেগ ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসবে। ‘দ্য ফিউচার প্লানিং অব আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টার অপচয় ঘটছে। এর আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটের কারণে যাত্রীদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়, অস্থিরতা দেখা দেয়।

 

মশার উৎপাত : মশার যন্ত্রণায় নাভিশ্বাস উঠেছে রাজধানীবাসীর। দুই সিটি করপোরেশন থেকে প্রতি বছর আশ্বাস মিললেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলছে না। সর্বশেষ অর্থবছরেও দুই সিটি করপোরেশন মশা মারতে ১০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখে। বারবার বদলানো হচ্ছে ওষুধ, কেনা হচ্ছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। তবু মিলছে না মশা থেকে মুক্তি। চলতি মার্চে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে মশার ঘনত্ব আরও চার গুণ বাড়বে বলে সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

 

আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে অনিরাপদ জীবন : রাজধানীতে হঠাৎই বেড়ে গেছে খুন-খারাবি। সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলি করে আওয়ামী লীগ নেতাসহ জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে। ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে এক চিকিৎসককে। ২৬ মার্চ খিলগাঁওয়ে বাসায় ঢুকে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২২ মার্চ উত্তরায় এক পোশাকশ্রমিককে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। গত এক মাসেই ১০-১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। এতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

 

অপরিকল্পিত নগরায়ণ : রাজধানীর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। যেখানে সেখানে গড়ে উঠছে ভবন। আবাসিক এলাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে অননুমোদিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ফলে এ নগরীতে নিরিবিলি শান্ত পরিবেশে বসবাস এখন স্বপ্নের মতো।

 

গণপরিবহন সংকট : রাজধানীবাসীর অন্যতম সমস্যা পর্যাপ্ত ও মানসম্মত গণপরিবহন না থাকা। রাস্তাগুলো যানজটে ঠাসা থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়েও মিলছে না বাস। এর ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে ভাড়া। এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ঢাকার রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার যথাক্রমে ৪৯ ও ১৮ শতাংশ বাড়লেও গণপরিবহন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ।

 

জীবযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি : ১৯৯৭ সালে রাজধানীতে যে ফ্ল্যাটের ভাড়া ছিল ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা, ২০২২ সালে সেই ফ্ল্যাটের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া দিতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে নগরবাসীর বেতনের অর্ধেক বা তারও বেশি। সেই সঙ্গে নিত্যপণ্য, শিক্ষাব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ফলে টাকার অঙ্কে আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্চে মানুষ।

 

হাঁটার অনুপযোগী ফুটপাথ : বারবার হকার উচ্ছেদের পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না রাজধানীর ফুটপাথ। ফুটপাথেই রাখা হচ্ছে রিকশা, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন। বসছে অস্থায়ী দোকান। নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়। হুটহাট মোটরসাইকেল উঠে যাচ্ছে ফুটপাথে।

 

বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি : বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতায় রাজধানীজুড়ে সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ি লেগেই আছে। এক মাসের ব্যবধানে একই রাস্তা আবার খোঁড়া হচ্ছে। দফায় দফায় সমন্বয় সভা করেও এর সমাধান মেলেনি। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে যানজট, জলাবদ্ধতা, চলাচলে ভোগান্তি, ধুলাদূষণ থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর।

 

ভুতুড়ে ইউটিলিটি বিল : রাজধানীবাসীর আরেকটি বড় সমস্যা বিদ্যুৎ-পানির ভুতুড়ে বিল। এমনকি খোদ বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তার বাসায়ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে অনেকবার, যা নিয়ে তদন্ত কমিটিও হয়। গতকাল মহাখালী ডিওএইচএসের এক বাসিন্দা জানান, তার তিন তলা বাড়িতে প্রতি মাসে পানির বিল আসে ১০-১৫ হাজার টাকা। গত মাসে কোনো কারণ ছাড়াই ৫০ হাজার টাকা বিল এসেছে। এ নিয়ে তিনি ওয়াসায় যোগাযোগ করবেন বলে জানান।

 

বসবাসযোগ্য নগরীর তলানিতে : ২০২১ সালে বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরগুলোর যে নতুন তালিকা প্রকাশ করে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ), তাতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান নিচের দিক থেকে ৪ নম্বর। বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে ১৪০ দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো এ পাঁচ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

 

খেলার মাঠ ও পার্কের অভাব : শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য রাজধানীতে নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক। ফলে শিশুকাল থেকেই শরীরে নানা রোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।   সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com