নারীদের কাছে জনপ্রিয় চিকিৎসা ‘ফ্যাট ফ্রিজিং’ নিয়ে বিতর্ক কেন?

ফ্যাট ফ্রিজিং হচ্ছে শরীরের মেদ কমানোর একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি এবং এরই মধ্যে সারা বিশ্বের ক্লিনিক ও স্পা-গুলোতে আনুমানিক ৮০ লক্ষেরও বেশি গ্রহীতাকে এই চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটি সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়ে উঠেছে অন্যরকম কিছু কারণে।

 

উনিশশো’ নব্বই-এর দশকের সুপার মডেলদের একজন হলেন কানাডিয়ান লিন্ডা ইভানজেলিস্টা। তিনি সম্প্রতি পাঁচ কোটি ডলারের একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করেছেন এই চিকিৎসার বিরুদ্ধে। তিনি দাবি করছেন, এই ফ্যাট ফ্রিজিং চিকিৎসা তার দেহসৌষ্ঠবের মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে।

 

লিন্ডা বলছেন, তার দেহে প্যারাডক্সিক্যাল অ্যাডিপোজ হাইপারপ্লাসিয়া (পিএএইচ) নামে এক বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এতে ওই চিকিৎসার ফলে ‘যা ঘটবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার বিপরীতটি ঘটেছে’ – তার দেহে মেদ কোষ বেড়ে গেছে, যে ঝুঁকির ব্যাপারে তাকে ওই চিকিৎসার আগে সচেতন করা হয়নি বলে তিনি দাবি করছেন।

 

যে কোম্পানিটি লিণ্ডা ব্যবহার করেছিলেন, এ ব্যাপারে তাদের মন্তব্য চেয়ে বিবিসি অনুরোধ করেছিল, তবে এখনও কোম্পানিটি কোন জবাব দেয়নি।

 

কোম্পানিটি এখন তাদের ওয়েবসাইটে বলছে, “কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এ চিকিৎসার ফল ভিন্ন হতে পারে” এবং “বিরল কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।” লিন্ডা ইভানজেলিস্টার পরামর্শকরা বলছেন, তিনি এই চিকিৎসা নেবার পর এসব কথা যোগ করা হয়েছে।

 

সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফ্যাট ফ্রিজিং চিকিৎসা কীভাবে হয় এবং এর ঝুঁকিগুলোই বা কী? এখানে তিন জন তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

 

যুক্তরাজ্যের এলসা বার্ন-মারডকের কাছে কসমেটিক সৌন্দর্য বর্ধনের প্রক্রিয়া নতুন কিছুই নয়।

 

টিনএজে পা দেবার পর থেকেই তিনি তার ‘বডি-ইমেজ’ নিয়ে দুর্ভাবনায় থাকতেন অর্থাৎ তাকে দেখতে কেমন লাগছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন। একুশ বছর বয়সে তিনি লাইপোসাকশন করান – যা দেহের অতিরিক্ত মেদ অপসারণের একটি প্রক্রিয়া। তিনি তার স্তনের আকার সুন্দর করতে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টও লাগিয়েছেন।

 

কিন্তু এসব প্রক্রিয়ার কথা তিনি তার বন্ধু ও পরিবারের কাছে তখন গোপন রেখেছিলেন।

 

“আমি ব্যাপকভাবে লাইপোসাকশন করিয়েছিলাম, কিন্তু আমার তখন খাদ্য গ্রহণ নিয়ে মানসিক সমস্যা ছিল, ডিসমর্ফিক ডিসঅর্ডারও ছিল” – যার অর্থ শারীরিক ত্রুটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মানসিক সমস্যা।

 

“আমাকে হয়তো তখন লাইপোসাকশন দেয়া উচিত হয়নি, কারণ আমি সে সময় খুবই ছোট ছিলাম,” বিবিসিকে বলছিলেন এলসা।

 

সেটা গত বছরের কথা । ক্যারিবিয়ানে যাবার একটা পরিকল্পনা ছিল এলসার। তার আগেই তার মধ্যে নিজের শরীর নিয়ে সেইসব পুরোনো ভয়গুলো আবার ফিরে এলো।

 

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ফ্যাট ফ্রিজিং চিকিৎসা করাবেন। তিন মাসে তিনটি সেশন করলেন তিনি। তিন দফায় তার পিঠে, পেটে, বাহুতে এবং উরুর ভেতর দিকে ফ্যাট ফ্রিজিং করা হলো।

 

এলসা আগে থেকেই বিস্তর পড়াশোনা করে এ চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সবচেয়ে সস্তা বিকল্পটি নেবার।

 

“দুটি জায়গা ছিল – এর একটি হলো এক হেয়ারড্রেসারের দোকানের নিচের তলায় একটি কক্ষে, যেখানে একজন মহিলা এটি চালান। অন্যটি হচ্ছে একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ভেতরে, বেশ সাজানো গোছানো রূপচর্চার ক্লিনিকের ভেতরে।”

 

“শেষ পর্যন্ত খরচের কথা চিন্তা করেই আমি সস্তা জায়গাটিতে গেলাম।”

 

এলসা তার এই চিকিৎসার জন্য ৬৫০ পাউন্ড খরচ করেছিলেন। যুক্তরাজ্যে ফ্যাট ফ্রিজিং-এর জন্য নানা বাজেটের সুযোগ আছে – যা নির্ভর করে দেহের কয়টি জায়গায় আপনি এটা করাবেন এবং এ জন্য কতগুলো ‘সেশন’ লাগবে।

 

একটি পুরো কোর্স আপনি ৪০০ পাউন্ডেও করাতে পারেন, আবার শুধু মাত্র একটি চিকিৎসার জন্য ৮০০ পাউন্ড খরচ হবে এমন জায়গাও আছে।

 

এলসা বলছেন, যিনি তাকে প্রথম দিন ফ্যাট ফ্রিজিং ট্রিটমেন্ট দিয়েছিলেন, তার সাথে সেদিনই তার প্রথম দেখা হয় – এর আগে চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তার সাথে কোন প্রাথমিক আলোচনা হয়নি।

 

শরীরের প্রতি অংশের জন্য একেকটি সেশন চলেছিল প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে। এ সময় তার দেহের নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে সাকশন ক্ল্যাম্প বা শোষক যন্ত্র বসানো হয় – যার সাথে সংযুক্ত ছিল আরেকটি যন্ত্র।

 

“আমার মনে হয়েছিল যেন একটি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আমাকে শুষে নিচ্ছে।” “আমার মনে আছে, আমার পেটটা এটা জমে যাওয়া মাখনের টুকরার মত দেখাচ্ছিল। স্পর্শ করলে বোঝা যাচ্ছিল, জায়গাটা ভীষণ ঠান্ডা আর পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে ।”

 

“আমার শরীরে চারকোণা কালো দাগ পড়ে গেল। সবচেয়ে খারাপ দাগটা ছিল পিঠে। বেশ কয়েকদিন ধরে ওটার রঙ ছিল গাঢ় বেগুনি, কিন্তু এতে কোন ব্যথাবেদনা ছিল না।”

 

এলসা বলছেন, তিনি যেমন ভেবেছিলেন, চিকিৎসা সেভাবেই হলো। কিন্তু তিনি তেমন কোন পরিবর্তন দেখতে পেলেন না।

 

“আমি প্রকৃতপক্ষেই তেমন কোন ফল পেলাম না। শেষ পর্যন্ত আমার মনে হলো আমি অকারণে ৬৫০ পাউণ্ড খরচ করেছি।”

 

এলসার সন্দেহ, তিনি সস্তায় চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন বলেই হয়তো কোন ফল পাননি। “আমি এখন ভাবি যদি আমি দামি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ক্লিনিকটাতে যেতাম তাহলে হয়তো চিকিৎসার ফল ভিন্ন হতো।”

তাহলে এলসার অবস্থা এখন কী?

“আমার এখন লজ্জা বোধ হয় যে আমি ‘ব্রা তুললে পিঠের মেদ দেখা যায় কিনা’ সেটা দিয়েই নিজের মূল্য নির্ধারণ করেছি,” বলেন তিনি। “আমি যে এখনও আমার রূপের এই দিকটার ওপর এত গুরুত্ব দিচ্ছি, এটা ভাবতে খারাপ লাগে।”

“আমি বুদ্ধিমতী, আমি জানি যে আমার দেহ কোন ইস্যু নয়- এবং আপনি যদি সার্বিকভাবে আপনার স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ দিতে চান তাহলে ওপরে ওপরে মেদ কমানোর চিকিৎসা করানোটা সঠিক পথ নয়।”

ফ্যাট ফ্রিজিং কী?

এটি হচ্ছে মানবদেহের ভেতরে কোন কিছু না ঢুকিয়ে মেদ অপসারণের একটি প্রক্রিয়া। এই কৌশলকে বলে ক্রায়োলিপোলাইসিস।

 

বলা হয়, এর মাধ্যমে দেহের যেসব মেদ কোষ সহজে দূর করা যায় না, সেগুলোকে খুব নিম্ন তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করে তাকে ধ্বংস করে ফেলা যায়।

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্লিনিকে এ প্রক্রিয়ার সুবিধা আছে। দাবি করা হয় যে দেহের যেসব জায়গায় মেদ জমে ফুলে যায় – যেমন চিবুকের নিচে, উরুর আশপাশে, তলপেটে, পিঠে বা বাহুর উর্ধ্বাংশে – এই চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সংকুচিত করে ফেলা যায়।

 

তবে যারা অতিরিক্ত মোটা এবং ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য এটা উপযোগী নয়।

এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আছে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া, জ্বালা-পোড়া, বা অনুভূতি অসাড় হয়ে যাওয়া। একটি বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে প্যারাডক্সিক্যাল অ্যাডিপোজ হাইপারপ্লাসিয়া বা পিএএইচ – যাতে মেদ কোষগুলোর আকার কমে না গিয়ে বরং তা উল্টো বড় হয়ে যায়।

 

সুপারমডেল লিন্ডা ইভানজেলিস্টা বলছেন, তার ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। পিএএইচের কেন হয় তার কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে বলা হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেই এটা বেশি হতে দেখা যায়।

‘এ চিকিৎসায় সত্যি কাজ হয়’

লন্ডনে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন জোয়ান মুহাম্মদ। তিনি চার বছর আগে ফ্যাট ফ্রিজিং করিয়েছিলেন। তারও আগে তিনি নিজে ১৫.৯ কেজি ওজন কমিয়েছিলেন।

“আমি লক্ষ্য করলাম, আমার একটা ছোট ভুঁড়ি হয়ে গেছে। ওখানে মেদ জমে গেছে এবং আমি যতই ডন-বৈঠক করি না কেন – কিছুতেই ওটা কমছিল না,” বিবিসিকে বলছিলেন জোয়ান।

“আমাকে কেমন দেখাচ্ছে, এবং আমি নিজেকে যেমন দেখতে চাই – এসব ভেবেই আমি ওই সিদ্ধান্ত নেই।”

তিনি জোর দিয়ে বলছেন যে তিনি কোন ‘আদর্শ নারীদেহ’ অর্জন করতে চাইছিলেন না, বরং নিজের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এই ফ্যাট ফ্রিজিং করিয়েছিলেন।

“ব্যাপারটা হচ্ছে এই রকম যে আমি যখন ঘুম থেকে উঠি এবং আয়নায় নিজেকে দেখি, তখন যাতে আমার ভালো লাগে, নিজের প্রতি নিজে চোখ টিপতে পারি।”

জোয়ান মুহাম্মদ তখন ফ্যাট ফ্রিজিং বিষয়ে জানার জন্য একটু গবেষণা করে নিলেন। তিনি তিনটি সেশন চিকিৎসা নিলেন। লন্ডনের একটি ক্লিনিকে বিশেষ মূল্যহ্রাসের ‘অফার’ পাওয়ায় এতে তার খরচ হলো ৪৫০ পাউণ্ডের মত।

প্রক্রিয়াটি করেছিলেন এমন একজন যিনি তখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, তবে সেশন চলার সময় তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

“প্রতিটি পর্যায়েই তারা ছিল অত্যন্ত সতর্ক। তারা এটা নিশ্চিত করেছিল যে প্রক্রিয়াটির আগে যেন একজন ডাক্তার আমার সাক্ষাৎকার নেন।”

“তারা ছিল অত্যন্ত যত্নবান, এবং আমাকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে সাবধান করা হয়েছিল। তারা এটাও বলেছিল যে তাদের ব্যবহৃত যন্ত্রের কারণে কোন সমস্যা হলে বা আমার পিএএইচ হলে আমার লাইপোসাকশনের খরচ তারাই দেবে,” বলেন জোয়ান।

“আমি সন্তানের মা এবং আমি অনুভব করলাম আমার ছোট ভুঁড়িটা চলে গেছে। চিকিৎসার ফলে আসলেই মেদ কোষগুলো অপসারিত হয়ে গিয়েছিল। আমার পেটটা তখন খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। কিন্তু তখনই শুরু হলো লকডাউন।”

জোয়ানের বয়স ৫০-এর কোঠায়, এবং ওই একই ক্লিনিকে তিনি আরও কিছু সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা করিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, এগুলোকে ‘চটজলদি সমাধান’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

“এসব চিকিৎসায় কাজ হয়, কিন্তু আপনাকে অন্য কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হবে – যেমন ব্যায়াম, প্রচুর পানি খাওয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন।”

‘নিজের শরীর নিয়ে যা করতে মন চায়, তা করতে পারা উচিত’

ঘানার আক্রায় থাকেন রেইনার জুয়াতি – তিনি হচ্ছেন একজন খনি প্রকৌশলী। তিনি চাপ অনুভব করছিলেন যে তিনি যেমন দেখতে, তাতে একটা পরিবর্তন আনা দরকার।

তিনি ফ্যাট ফ্রিজিং করানোর কথা ভাবছিলেন, কিন্তু এখন পিএএইচ এবং লিন্ডা ইভানজেলিস্টার মামলার কথা জানার পর তার মনে হচ্ছে যে এটা হয়তো তার জন্য সর্বোত্তম বিকল্প হবে না ।

বেড়ে ওঠার সময় রেইনার দেখছিলেন যে তার ওজন ওঠানামা করছে। স্কুলে প্রথমে তাকে ‘বেশি শুকনো’ বলে উত্যক্ত করা হতো, পরে তাকে আবার মোটা বলেও উত্যক্ত করা হয়েছে।

এক বছর ধরে ডায়েটিং এবং অনিয়মিত ব্যায়াম করার পর রেইনার অপেক্ষাকৃত সহজ সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করলেন।

“আমি আফ্রিকান পরিবার থেকে আসা, এবং সেখানে কিছু পরিবারের সদস্য থাকে যারা খোলাখুলিভাবেই আপনাকে ‘মোটা’ বলে তা নিয়ে মজা করবে, আপনাকে নিয়ে হাসবে,” বলছিলেন ২৯-বছর বয়স্ক রেইনার।

“ঘানায় টোয়াই ভাষায় একটা কথা আছে ‘ওবোলো’ – যা একটা অশিষ্ট শব্দ এবং এটা কারো ওজন বেড়ে গেলে বা মোটা হয়ে গেলে তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করতে ব্যবহার করা হয়।”

“আমি আমার শরীরকে ইতিবাচকভাবেই দেখি, কিন্তু আমি এটাও মনে করি যে সবারই নিজের শরীর নিয়ে যা মন চায় তা করতে পারা উচিত।”

“কারণ এক পর্যায়ে মানুষ কী বলছে, তা তার মনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, এবং তখন আপনি এ থেকে বেরিয়ে আসার একটা সহজ পথ খুঁজতে থাকবেন।”

রেইনার চাইছিলেন, তার দেহে পরিবর্তন আনার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে কীভাবে ওজন কমানো যায়।

ঘানায় এ ধরনের অপারেশন সচরাচর হতে দেখা যায়না, তবে রেইনার বলছেন, এখন এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে ওঠার পথে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

“এখন এটা আর অতটা নিষিদ্ধ ব্যাপার নয়। কারণ আগে কেউ অপারেশন নিয়ে কথা বলতে চাইতো না, কিন্তু দেখা যেতো যে আপনার পরিচিত কেউ একজন হয়তো বিদেশে গেল – আর ফিরে আসার পর দেখা গেল তাকে দেখতে একেবারে অন্যরকম লাগছে।”

রেইনার ফ্যাট ফ্রিজিং থেকে পিছিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি মনে করেন যে এর ঝুঁকি এবং জটিলতা নিয়ে সচেতনতা তৈরি হলেও বেশিরভাগ লোককেই এ থেকে নিবৃত্ত রাখা যাবে না।

বিশেষজ্ঞরা কী বলেন?

যুক্তরাজ্যের একজন প্লাস্টিক সার্জন এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্ক প্যাসিফিকো এ ব্যাপারে কথা বলেছেন।

এই সব প্রক্রিয়া – যেগুলো শুনতে অবিশ্বাস্য রকম আকর্ষণীয় মনে হয় – এবং যা করাচ্ছেন এমন লোকেরা, যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত নন, তার বিরুদ্ধে সতর্ক হতে বলছেন তিনি।

“এটা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে কেউ যদি কোন চিকিৎসা দেন – তাহলে তাকে রোগীর কাছে সততা দেখাতে হবে, কারণ এটি একটি মেডিক্যাল প্রক্রিয়া।”

প্যাসিফিকো বলছেন, যারা ফ্যাট ফ্রিজিং করানোর কথা চিন্তা করছেন তাদের মনে রাখতে হবে যে এটা ব্যথা-বিহীন নয়, এবং এর ফলে কী হবে তা সবসময় আগে থেকে জানা সম্ভব নয়।

ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনস বলছে, ফ্যাট ফ্রিজিংয়ের পরে জটিলতা দেখা দিয়েছে এমন ২১ জন রোগীকে তাদের সদস্য ডাক্তাররা দেখেছেন। একটি জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

“পিএএইচ সচরাচর হতে দেখা যায় না, কিন্তু সাধারণত এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। পিএএইচের চিকিৎসার জন্য রোগীদের লাইপোসাকশন করাতে হয়, বা অস্ত্রোপচার করাতে হয়। তা ছাড়া আমাদের ডাক্তাররা এমন রোগীর চিকিৎসা করেছেন, যারা ফ্যাট-ফ্রিজিংয়ের ফলে ডেড স্কিন নেক্রোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন।”

এই সংস্থাটি এসব চিকিৎসার প্রচারণার ক্ষেত্রে আরও উন্নত নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

“আমরা নন-সার্জিক্যাল প্রক্রিয়াকে যেভাবে বিপণন করা হচ্ছে তা দেখে উদ্বিগ্ন। একে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে যে এগুলো সার্জিক্যাল চিকিৎসার চাইতে অনেক সহজ কিন্তু এতে একই রকম বা আরও ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে বলে কোথাও কোথাও দাবি করা হচ্ছে,” বলছেন মেরি ও’ব্রায়েন।

একজন প্লাস্টিক সার্জন এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনসের এই প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “যখন আমরা নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসার কথা বলি – তার অর্থ এই নয় যে এগুলো ঝুঁকিমুক্ত। আমার মনে হয়, এটা একটা খুবই প্রচলিত ভুল ধারণা।”  বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» দুর্ভিক্ষের আগে দুর্বৃত্ত সরকারকে বিদায় দিতে হবে: নুর

» কলা হাতে কী বার্তা দিলেন শ্রীলেখা?

» ‘সুস্থ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম মাধ্যম খেলাধুলা’

» ভোটকেন্দ্র কমিটি করে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিন: ফারুক খান

» জনসভায় যাওয়ার চিন্তা থাকলে খালেদা জেলে যাবেন: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী

» কোম্পানীগঞ্জে আ.লীগের নেতৃত্বে কাদের মির্জা-বাদল

» পাড়া উৎস হবে ঢাকা শহরের সব এলাকায় : আতিক

» রাজধানীতে বাবার সঙ্গে অভিমানে ছেলের আত্মহত্যা

» পাঁচবিবিতে মেয়র কাপ মিনি ফুটবল নাইট টুর্নামেন্টের উদ্বোধন

» পাহাড়ের পরিবেশ অশান্ত করেছেন জিয়া: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

নারীদের কাছে জনপ্রিয় চিকিৎসা ‘ফ্যাট ফ্রিজিং’ নিয়ে বিতর্ক কেন?

ফ্যাট ফ্রিজিং হচ্ছে শরীরের মেদ কমানোর একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি এবং এরই মধ্যে সারা বিশ্বের ক্লিনিক ও স্পা-গুলোতে আনুমানিক ৮০ লক্ষেরও বেশি গ্রহীতাকে এই চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটি সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়ে উঠেছে অন্যরকম কিছু কারণে।

 

উনিশশো’ নব্বই-এর দশকের সুপার মডেলদের একজন হলেন কানাডিয়ান লিন্ডা ইভানজেলিস্টা। তিনি সম্প্রতি পাঁচ কোটি ডলারের একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করেছেন এই চিকিৎসার বিরুদ্ধে। তিনি দাবি করছেন, এই ফ্যাট ফ্রিজিং চিকিৎসা তার দেহসৌষ্ঠবের মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে।

 

লিন্ডা বলছেন, তার দেহে প্যারাডক্সিক্যাল অ্যাডিপোজ হাইপারপ্লাসিয়া (পিএএইচ) নামে এক বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এতে ওই চিকিৎসার ফলে ‘যা ঘটবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার বিপরীতটি ঘটেছে’ – তার দেহে মেদ কোষ বেড়ে গেছে, যে ঝুঁকির ব্যাপারে তাকে ওই চিকিৎসার আগে সচেতন করা হয়নি বলে তিনি দাবি করছেন।

 

যে কোম্পানিটি লিণ্ডা ব্যবহার করেছিলেন, এ ব্যাপারে তাদের মন্তব্য চেয়ে বিবিসি অনুরোধ করেছিল, তবে এখনও কোম্পানিটি কোন জবাব দেয়নি।

 

কোম্পানিটি এখন তাদের ওয়েবসাইটে বলছে, “কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এ চিকিৎসার ফল ভিন্ন হতে পারে” এবং “বিরল কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।” লিন্ডা ইভানজেলিস্টার পরামর্শকরা বলছেন, তিনি এই চিকিৎসা নেবার পর এসব কথা যোগ করা হয়েছে।

 

সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফ্যাট ফ্রিজিং চিকিৎসা কীভাবে হয় এবং এর ঝুঁকিগুলোই বা কী? এখানে তিন জন তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

 

যুক্তরাজ্যের এলসা বার্ন-মারডকের কাছে কসমেটিক সৌন্দর্য বর্ধনের প্রক্রিয়া নতুন কিছুই নয়।

 

টিনএজে পা দেবার পর থেকেই তিনি তার ‘বডি-ইমেজ’ নিয়ে দুর্ভাবনায় থাকতেন অর্থাৎ তাকে দেখতে কেমন লাগছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন। একুশ বছর বয়সে তিনি লাইপোসাকশন করান – যা দেহের অতিরিক্ত মেদ অপসারণের একটি প্রক্রিয়া। তিনি তার স্তনের আকার সুন্দর করতে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টও লাগিয়েছেন।

 

কিন্তু এসব প্রক্রিয়ার কথা তিনি তার বন্ধু ও পরিবারের কাছে তখন গোপন রেখেছিলেন।

 

“আমি ব্যাপকভাবে লাইপোসাকশন করিয়েছিলাম, কিন্তু আমার তখন খাদ্য গ্রহণ নিয়ে মানসিক সমস্যা ছিল, ডিসমর্ফিক ডিসঅর্ডারও ছিল” – যার অর্থ শারীরিক ত্রুটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মানসিক সমস্যা।

 

“আমাকে হয়তো তখন লাইপোসাকশন দেয়া উচিত হয়নি, কারণ আমি সে সময় খুবই ছোট ছিলাম,” বিবিসিকে বলছিলেন এলসা।

 

সেটা গত বছরের কথা । ক্যারিবিয়ানে যাবার একটা পরিকল্পনা ছিল এলসার। তার আগেই তার মধ্যে নিজের শরীর নিয়ে সেইসব পুরোনো ভয়গুলো আবার ফিরে এলো।

 

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ফ্যাট ফ্রিজিং চিকিৎসা করাবেন। তিন মাসে তিনটি সেশন করলেন তিনি। তিন দফায় তার পিঠে, পেটে, বাহুতে এবং উরুর ভেতর দিকে ফ্যাট ফ্রিজিং করা হলো।

 

এলসা আগে থেকেই বিস্তর পড়াশোনা করে এ চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সবচেয়ে সস্তা বিকল্পটি নেবার।

 

“দুটি জায়গা ছিল – এর একটি হলো এক হেয়ারড্রেসারের দোকানের নিচের তলায় একটি কক্ষে, যেখানে একজন মহিলা এটি চালান। অন্যটি হচ্ছে একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ভেতরে, বেশ সাজানো গোছানো রূপচর্চার ক্লিনিকের ভেতরে।”

 

“শেষ পর্যন্ত খরচের কথা চিন্তা করেই আমি সস্তা জায়গাটিতে গেলাম।”

 

এলসা তার এই চিকিৎসার জন্য ৬৫০ পাউন্ড খরচ করেছিলেন। যুক্তরাজ্যে ফ্যাট ফ্রিজিং-এর জন্য নানা বাজেটের সুযোগ আছে – যা নির্ভর করে দেহের কয়টি জায়গায় আপনি এটা করাবেন এবং এ জন্য কতগুলো ‘সেশন’ লাগবে।

 

একটি পুরো কোর্স আপনি ৪০০ পাউন্ডেও করাতে পারেন, আবার শুধু মাত্র একটি চিকিৎসার জন্য ৮০০ পাউন্ড খরচ হবে এমন জায়গাও আছে।

 

এলসা বলছেন, যিনি তাকে প্রথম দিন ফ্যাট ফ্রিজিং ট্রিটমেন্ট দিয়েছিলেন, তার সাথে সেদিনই তার প্রথম দেখা হয় – এর আগে চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তার সাথে কোন প্রাথমিক আলোচনা হয়নি।

 

শরীরের প্রতি অংশের জন্য একেকটি সেশন চলেছিল প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে। এ সময় তার দেহের নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে সাকশন ক্ল্যাম্প বা শোষক যন্ত্র বসানো হয় – যার সাথে সংযুক্ত ছিল আরেকটি যন্ত্র।

 

“আমার মনে হয়েছিল যেন একটি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আমাকে শুষে নিচ্ছে।” “আমার মনে আছে, আমার পেটটা এটা জমে যাওয়া মাখনের টুকরার মত দেখাচ্ছিল। স্পর্শ করলে বোঝা যাচ্ছিল, জায়গাটা ভীষণ ঠান্ডা আর পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে ।”

 

“আমার শরীরে চারকোণা কালো দাগ পড়ে গেল। সবচেয়ে খারাপ দাগটা ছিল পিঠে। বেশ কয়েকদিন ধরে ওটার রঙ ছিল গাঢ় বেগুনি, কিন্তু এতে কোন ব্যথাবেদনা ছিল না।”

 

এলসা বলছেন, তিনি যেমন ভেবেছিলেন, চিকিৎসা সেভাবেই হলো। কিন্তু তিনি তেমন কোন পরিবর্তন দেখতে পেলেন না।

 

“আমি প্রকৃতপক্ষেই তেমন কোন ফল পেলাম না। শেষ পর্যন্ত আমার মনে হলো আমি অকারণে ৬৫০ পাউণ্ড খরচ করেছি।”

 

এলসার সন্দেহ, তিনি সস্তায় চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন বলেই হয়তো কোন ফল পাননি। “আমি এখন ভাবি যদি আমি দামি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ক্লিনিকটাতে যেতাম তাহলে হয়তো চিকিৎসার ফল ভিন্ন হতো।”

তাহলে এলসার অবস্থা এখন কী?

“আমার এখন লজ্জা বোধ হয় যে আমি ‘ব্রা তুললে পিঠের মেদ দেখা যায় কিনা’ সেটা দিয়েই নিজের মূল্য নির্ধারণ করেছি,” বলেন তিনি। “আমি যে এখনও আমার রূপের এই দিকটার ওপর এত গুরুত্ব দিচ্ছি, এটা ভাবতে খারাপ লাগে।”

“আমি বুদ্ধিমতী, আমি জানি যে আমার দেহ কোন ইস্যু নয়- এবং আপনি যদি সার্বিকভাবে আপনার স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ দিতে চান তাহলে ওপরে ওপরে মেদ কমানোর চিকিৎসা করানোটা সঠিক পথ নয়।”

ফ্যাট ফ্রিজিং কী?

এটি হচ্ছে মানবদেহের ভেতরে কোন কিছু না ঢুকিয়ে মেদ অপসারণের একটি প্রক্রিয়া। এই কৌশলকে বলে ক্রায়োলিপোলাইসিস।

 

বলা হয়, এর মাধ্যমে দেহের যেসব মেদ কোষ সহজে দূর করা যায় না, সেগুলোকে খুব নিম্ন তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করে তাকে ধ্বংস করে ফেলা যায়।

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্লিনিকে এ প্রক্রিয়ার সুবিধা আছে। দাবি করা হয় যে দেহের যেসব জায়গায় মেদ জমে ফুলে যায় – যেমন চিবুকের নিচে, উরুর আশপাশে, তলপেটে, পিঠে বা বাহুর উর্ধ্বাংশে – এই চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সংকুচিত করে ফেলা যায়।

 

তবে যারা অতিরিক্ত মোটা এবং ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য এটা উপযোগী নয়।

এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আছে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া, জ্বালা-পোড়া, বা অনুভূতি অসাড় হয়ে যাওয়া। একটি বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে প্যারাডক্সিক্যাল অ্যাডিপোজ হাইপারপ্লাসিয়া বা পিএএইচ – যাতে মেদ কোষগুলোর আকার কমে না গিয়ে বরং তা উল্টো বড় হয়ে যায়।

 

সুপারমডেল লিন্ডা ইভানজেলিস্টা বলছেন, তার ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। পিএএইচের কেন হয় তার কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে বলা হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেই এটা বেশি হতে দেখা যায়।

‘এ চিকিৎসায় সত্যি কাজ হয়’

লন্ডনে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন জোয়ান মুহাম্মদ। তিনি চার বছর আগে ফ্যাট ফ্রিজিং করিয়েছিলেন। তারও আগে তিনি নিজে ১৫.৯ কেজি ওজন কমিয়েছিলেন।

“আমি লক্ষ্য করলাম, আমার একটা ছোট ভুঁড়ি হয়ে গেছে। ওখানে মেদ জমে গেছে এবং আমি যতই ডন-বৈঠক করি না কেন – কিছুতেই ওটা কমছিল না,” বিবিসিকে বলছিলেন জোয়ান।

“আমাকে কেমন দেখাচ্ছে, এবং আমি নিজেকে যেমন দেখতে চাই – এসব ভেবেই আমি ওই সিদ্ধান্ত নেই।”

তিনি জোর দিয়ে বলছেন যে তিনি কোন ‘আদর্শ নারীদেহ’ অর্জন করতে চাইছিলেন না, বরং নিজের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এই ফ্যাট ফ্রিজিং করিয়েছিলেন।

“ব্যাপারটা হচ্ছে এই রকম যে আমি যখন ঘুম থেকে উঠি এবং আয়নায় নিজেকে দেখি, তখন যাতে আমার ভালো লাগে, নিজের প্রতি নিজে চোখ টিপতে পারি।”

জোয়ান মুহাম্মদ তখন ফ্যাট ফ্রিজিং বিষয়ে জানার জন্য একটু গবেষণা করে নিলেন। তিনি তিনটি সেশন চিকিৎসা নিলেন। লন্ডনের একটি ক্লিনিকে বিশেষ মূল্যহ্রাসের ‘অফার’ পাওয়ায় এতে তার খরচ হলো ৪৫০ পাউণ্ডের মত।

প্রক্রিয়াটি করেছিলেন এমন একজন যিনি তখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, তবে সেশন চলার সময় তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

“প্রতিটি পর্যায়েই তারা ছিল অত্যন্ত সতর্ক। তারা এটা নিশ্চিত করেছিল যে প্রক্রিয়াটির আগে যেন একজন ডাক্তার আমার সাক্ষাৎকার নেন।”

“তারা ছিল অত্যন্ত যত্নবান, এবং আমাকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে সাবধান করা হয়েছিল। তারা এটাও বলেছিল যে তাদের ব্যবহৃত যন্ত্রের কারণে কোন সমস্যা হলে বা আমার পিএএইচ হলে আমার লাইপোসাকশনের খরচ তারাই দেবে,” বলেন জোয়ান।

“আমি সন্তানের মা এবং আমি অনুভব করলাম আমার ছোট ভুঁড়িটা চলে গেছে। চিকিৎসার ফলে আসলেই মেদ কোষগুলো অপসারিত হয়ে গিয়েছিল। আমার পেটটা তখন খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। কিন্তু তখনই শুরু হলো লকডাউন।”

জোয়ানের বয়স ৫০-এর কোঠায়, এবং ওই একই ক্লিনিকে তিনি আরও কিছু সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা করিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, এগুলোকে ‘চটজলদি সমাধান’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

“এসব চিকিৎসায় কাজ হয়, কিন্তু আপনাকে অন্য কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হবে – যেমন ব্যায়াম, প্রচুর পানি খাওয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন।”

‘নিজের শরীর নিয়ে যা করতে মন চায়, তা করতে পারা উচিত’

ঘানার আক্রায় থাকেন রেইনার জুয়াতি – তিনি হচ্ছেন একজন খনি প্রকৌশলী। তিনি চাপ অনুভব করছিলেন যে তিনি যেমন দেখতে, তাতে একটা পরিবর্তন আনা দরকার।

তিনি ফ্যাট ফ্রিজিং করানোর কথা ভাবছিলেন, কিন্তু এখন পিএএইচ এবং লিন্ডা ইভানজেলিস্টার মামলার কথা জানার পর তার মনে হচ্ছে যে এটা হয়তো তার জন্য সর্বোত্তম বিকল্প হবে না ।

বেড়ে ওঠার সময় রেইনার দেখছিলেন যে তার ওজন ওঠানামা করছে। স্কুলে প্রথমে তাকে ‘বেশি শুকনো’ বলে উত্যক্ত করা হতো, পরে তাকে আবার মোটা বলেও উত্যক্ত করা হয়েছে।

এক বছর ধরে ডায়েটিং এবং অনিয়মিত ব্যায়াম করার পর রেইনার অপেক্ষাকৃত সহজ সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করলেন।

“আমি আফ্রিকান পরিবার থেকে আসা, এবং সেখানে কিছু পরিবারের সদস্য থাকে যারা খোলাখুলিভাবেই আপনাকে ‘মোটা’ বলে তা নিয়ে মজা করবে, আপনাকে নিয়ে হাসবে,” বলছিলেন ২৯-বছর বয়স্ক রেইনার।

“ঘানায় টোয়াই ভাষায় একটা কথা আছে ‘ওবোলো’ – যা একটা অশিষ্ট শব্দ এবং এটা কারো ওজন বেড়ে গেলে বা মোটা হয়ে গেলে তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করতে ব্যবহার করা হয়।”

“আমি আমার শরীরকে ইতিবাচকভাবেই দেখি, কিন্তু আমি এটাও মনে করি যে সবারই নিজের শরীর নিয়ে যা মন চায় তা করতে পারা উচিত।”

“কারণ এক পর্যায়ে মানুষ কী বলছে, তা তার মনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, এবং তখন আপনি এ থেকে বেরিয়ে আসার একটা সহজ পথ খুঁজতে থাকবেন।”

রেইনার চাইছিলেন, তার দেহে পরিবর্তন আনার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে কীভাবে ওজন কমানো যায়।

ঘানায় এ ধরনের অপারেশন সচরাচর হতে দেখা যায়না, তবে রেইনার বলছেন, এখন এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে ওঠার পথে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

“এখন এটা আর অতটা নিষিদ্ধ ব্যাপার নয়। কারণ আগে কেউ অপারেশন নিয়ে কথা বলতে চাইতো না, কিন্তু দেখা যেতো যে আপনার পরিচিত কেউ একজন হয়তো বিদেশে গেল – আর ফিরে আসার পর দেখা গেল তাকে দেখতে একেবারে অন্যরকম লাগছে।”

রেইনার ফ্যাট ফ্রিজিং থেকে পিছিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি মনে করেন যে এর ঝুঁকি এবং জটিলতা নিয়ে সচেতনতা তৈরি হলেও বেশিরভাগ লোককেই এ থেকে নিবৃত্ত রাখা যাবে না।

বিশেষজ্ঞরা কী বলেন?

যুক্তরাজ্যের একজন প্লাস্টিক সার্জন এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্ক প্যাসিফিকো এ ব্যাপারে কথা বলেছেন।

এই সব প্রক্রিয়া – যেগুলো শুনতে অবিশ্বাস্য রকম আকর্ষণীয় মনে হয় – এবং যা করাচ্ছেন এমন লোকেরা, যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত নন, তার বিরুদ্ধে সতর্ক হতে বলছেন তিনি।

“এটা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ যে কেউ যদি কোন চিকিৎসা দেন – তাহলে তাকে রোগীর কাছে সততা দেখাতে হবে, কারণ এটি একটি মেডিক্যাল প্রক্রিয়া।”

প্যাসিফিকো বলছেন, যারা ফ্যাট ফ্রিজিং করানোর কথা চিন্তা করছেন তাদের মনে রাখতে হবে যে এটা ব্যথা-বিহীন নয়, এবং এর ফলে কী হবে তা সবসময় আগে থেকে জানা সম্ভব নয়।

ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনস বলছে, ফ্যাট ফ্রিজিংয়ের পরে জটিলতা দেখা দিয়েছে এমন ২১ জন রোগীকে তাদের সদস্য ডাক্তাররা দেখেছেন। একটি জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

“পিএএইচ সচরাচর হতে দেখা যায় না, কিন্তু সাধারণত এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। পিএএইচের চিকিৎসার জন্য রোগীদের লাইপোসাকশন করাতে হয়, বা অস্ত্রোপচার করাতে হয়। তা ছাড়া আমাদের ডাক্তাররা এমন রোগীর চিকিৎসা করেছেন, যারা ফ্যাট-ফ্রিজিংয়ের ফলে ডেড স্কিন নেক্রোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন।”

এই সংস্থাটি এসব চিকিৎসার প্রচারণার ক্ষেত্রে আরও উন্নত নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

“আমরা নন-সার্জিক্যাল প্রক্রিয়াকে যেভাবে বিপণন করা হচ্ছে তা দেখে উদ্বিগ্ন। একে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে যে এগুলো সার্জিক্যাল চিকিৎসার চাইতে অনেক সহজ কিন্তু এতে একই রকম বা আরও ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে বলে কোথাও কোথাও দাবি করা হচ্ছে,” বলছেন মেরি ও’ব্রায়েন।

একজন প্লাস্টিক সার্জন এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জনসের এই প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “যখন আমরা নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসার কথা বলি – তার অর্থ এই নয় যে এগুলো ঝুঁকিমুক্ত। আমার মনে হয়, এটা একটা খুবই প্রচলিত ভুল ধারণা।”  বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com