চিকিৎসক ও হাসপাতালের অবহেলায় অপমৃত্যু

ছবি সংগৃহীত

 

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক  : সম্প্রতি দুটি হাসপাতালে খতনা করানোর সময় দুজন বালকের অপমৃত্যু ঘটলে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই জনমনে ক্ষোভ এবং সংশয় উতলে ওঠে। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছন্দের মাধ্যমে এই অমোঘ সত্যটি প্রচার করেছিলেন। মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে হলে তার বিরুদ্ধে কারও কিছু বলা-কওয়ার থাকে না; কিন্তু অপমৃত্যু অগ্রহণযোগ্য হওয়াই স্বাভাবিক। অপমৃত্যুর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে অপচিকিৎসার কারণে প্রাণবলি। একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন আরোগ্য লাভের আশায়। আর সেই চিকিৎসকের কারণেই যদি তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় তাহলে সেটি আশ্রয়দাতার হাতে খুন হওয়ারই শামিল।

 

আমার অভিজ্ঞতা বলছে একজন চিকিৎসকের হাতে রোগীর অপমৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- (১) চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব, (২) রোগী যে রোগে ভুগছেন, সে রোগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অজ্ঞতা, (৩) চিকিৎসকের অবহেলা। চল্লিশ দশকের বাঙালি চিকিৎসক ডা. বিধান চন্দ্র রায়, যিনি পরে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাকে একজন ধন্বন্তরি চিকিৎসক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। তিনি এমনভাবে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা করতেন যা অনেকটা অলৌকিক ছিল বলে জানা যায়। তার মানবিক অনুভূতিও ছিল অসাধারণ। তারপরও তিনি বলতেন রোগ নিরাময় করতে পারবেন- এমন নিশ্চয়তা কোনো চিকিৎসকই দিতে পারেন না; কিন্তু একজন চিকিৎসকের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে এমন চিকিৎসা পন্থা বেছে নেওয়া যার দ্বারা রোগমুক্তির সম্ভাবনা অধিক হবে। তিনি আরও বলেছেন, প্রতিটি চিকিৎসকেরই দায়িত্ব মানবিক চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রোগীর চিকিৎসা করা। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালেও তিনি বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন। এমনকি ৮১ বছর বয়সে তার মৃত্যুর দিনও ১ ঘণ্টা রোগী দেখেছিলেন।

 

অতীতকালে মানুষ চিকিৎসক হতে চাইতেন মূলত মানুষের সেবা করার মানসিকতা নিয়ে। দুঃখজনকভাবে এখন ‘সে যুগ হয়েছে বাসি।’ এখনো যে বহুজন মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন না তা নয়; কিন্তু এটা বলা ভুল হবে না যে, বর্তমানে অনেকেই চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিত্ত-বৈভব অর্জনের জন্য। অনেকে ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রশাসনে চলে যাওয়ার জন্য বিসিএস পরীক্ষা দেন, যা প্রমাণ করে তারা মানবতার সেবা করার জন্য চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেননি। অর্থ উপার্জনের জন্য যারা চিকিৎসক হয়েছেন তাদের হাতে রোগীর মৃত্যু হলে অবাক হওয়া বাতুলতা মাত্র।

 

এরই মধ্যে দেশে গড়ে উঠেছে শত শত বেসরকারি চিকিৎসালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সিংহভাগ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আর মুনাফা অর্জন করাই তাদের একমাত্র পাথেয়। এরা রোগীদের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের থেকে গলাকাটা হারে পয়সা আদায় করে মানবতা নামক তত্ত্বকে ভূলুণ্ঠিত করছেন। ন্যায়নীতিতো দূরের কথা, তারা আইনের তোয়াক্কাও করেন না। রোগী মরে যাওয়ার পরেও তারা বিল বাড়ানোর জন্য রোগীকে অযথা বাঁচিয়ে রাখার ভান করে হাসপাতালে রেখে দেন। এমনকি পয়সা আদায় করার জন্য মৃত রোগীর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর না করে লাশ জিম্মি করে রাখেন, যা আমাদের বিভিন্ন ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক হাসপাতালে নার্সদের নিয়ে ডাক্তারদের কাজ চালানো হয়। অ্যানেসথেসিয়ায় বিশেষজ্ঞ নন, এমন লোকদের দ্বারা অ্যানেসথেসিয়া করানো হয়। দেশে শত শত লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল রয়েছে।

খতনাকালে একটি অপমৃত্যু ঘটেছে অভিজাত গুলশান এলাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে। খতনা করানোর জন্য যে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রক্রিয়ায় তার পূর্ণ দেহ নিস্তেজ করা হয়েছিল সে কথা কেউ অস্বীকার করেননি। অন্য ঘটনায়ও একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রদান করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো মেডিকেল ইতিহাস পর্যালোচনা করা যে অপরিহার্য, চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেননি এমন মানুষও তা জানেন। রোগীর হাঁপানি ও অ্যালার্জিজনিত সমস্যা থাকাসহ বহু কারণেই জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করা যায় না বিধায় এটি প্রয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো মেডিকেল ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হয়। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে ব্যক্তিবিশেষকে সম্পূর্ণ অবচেতন না করে, লোকাল অ্যানেসথেসিয়ার মাধ্যমে শুধু সংশ্লিষ্ট এলাকা অবশ করে মুসলমানি করানো যেতে পারে বলে সবার জানা রয়েছে। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়ায় যেসব ঝুঁকি থাকে, লোকাল অ্যানেসথেসিয়ায় সেগুলো অনুপস্থিত। এতে ব্যক্তিবিশেষ সম্পূর্ণ সজাগ থাকেন। শুধু অপারেশন করা এলাকা অনুভূতিশূন্য হয়ে যায়। বহু দশক আগে আমার নিজের মুসলমানির সময় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ডাক্তার লোকাল অ্যানেসথেসিয়ারই আশ্রয় নিয়েছিলেন। পুরো সময়টা আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা নিয়ে আলাপ করেছেন। বছর দশক আগে আমার এক বিলেতপ্রবাসী বন্ধুর ছেলের মুসলমানির সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। সেই ছেলের ওপরও লোকাল (স্থানীয়) অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করা হয়েছিল। অতীতকালে যখন হাজাম শ্রেণির লোক গতানুগতিক পন্থায় মুসলমানি করাতেন তারাতো কোনো ধরনেরই অ্যানেসথেসিয়াই প্রয়োগ করতেন না। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে মুসলমানির জন্য পুরো দেহ অচৈতন্য করার জন্য আদৌ জেনারেল অ্যানেসথেসিয়ার দরকার ছিল কি না, নাকি শুধু অধিক মুনাফা লাভের জন্য অথবা পরিপূর্ণ জ্ঞানের অভাবের কারণে এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল- সেটি একটি বড় প্রশ্ন। তা ছাড়া অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগকারী ডাক্তারের স্বল্প বিদ্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মহামান্য হাই কোর্ট এরই মধ্যে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি তদন্ত বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন, যে বোর্ডে একজন আইন বিশারদও রয়েছেন। আশা করা যায় তাদের তদন্তে আসল ঘটনা পরিষ্কার হলে মহামান্য হাই কোর্ট উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। ভুলে গেলে চলবে না যে, মহামান্য হাই কোর্টের হাত অনেক লম্বা।

 

আমি হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকাকালে অবহেলাজনিত কারণে কয়েকটি অপমৃত্যুর জন্য দায়ীদের সাজা প্রদান করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এর একটি ঘটেছিল ল্যাবএইড নামক এক বেসরকারি হাসপাতালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রভাষক মৃণাল চক্রবর্তী উদরাময়ে (ডায়রিয়া) আক্রান্ত হয়ে ল্যাবএইড হাসপাতালে গেলে তাকে ২ ঘণ্টার অধিক সময় বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়েছিল দর কষাকষির কারণে। বিলম্বের কারণে জলশূন্যতায় তার অপমৃত্যু হয়েছিল। খবরটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে আমি স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে ল্যাবএইডের চেয়ারম্যান, পরিচালকবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আদালতে তলব করেছিলাম। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীর স্বজনদের উপস্থিত থাকতে বলেছিলাম। ভুক্তভোগী মৃণাল চক্রবর্তীর ডাক্তার ভাগিনা আমাদের এই মর্মে জানিয়েছিলেন যে, তার মামাকে ২ ঘণ্টা ফেলে না রাখলে তিনি সম্ভবত মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তেন না। আমি সেদিন ল্যাবএইডের চেয়ারম্যান, পরিচালকবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের হাই কোর্টের আসামির কাঠগড়ায় দিনভর আটক রেখে এই মর্মে আদেশ দিয়েছিলাম যে, ভুক্তভোগী মৃণাল চক্রবর্তীর পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা নগদে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের হাই কোর্টের কাঠগড়ায় বন্দি থাকতে হবে এবং পরে নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানায় পাঠানো হবে। বিকালের দিকে ল্যাবএইডের চেয়ারম্যান, যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, ভুক্তভোগী পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা প্রদান করার পর আমি তাদের খালাস দিয়েছিলাম। একই সঙ্গে পুলিশকেও নির্দেশ দিয়েছিলাম তাদের বিরুদ্ধে ৩০৪ ধারায় মামলা করতে। ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছিলেন যে রোগীকে বিভিন্ন কারণে ২ ঘণ্টা চিকিৎসাশূন্য রাখা হয়েছিল। উপরোক্ত স্বীকারোক্তির কারণে আমাকে আর সাক্ষী প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি, তাই আমি তাৎক্ষণিকভাবেই আদেশ দিতে পেরেছিলাম, অন্যথায় পুরো শুনানি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।

 

আরেক ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর হাসপাতাল ইবনে সিনায় অপচিকিৎসার কারণে একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে- এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সেই হাসপাতালের চেয়ারম্যান, মীর কাসেম আলিসহ অন্যান্য পরিচালক এবং ডাক্তারদের তলব করে পুলিশকে এই মর্মে আদেশ প্রদান করেছিলাম যে, আদালত কক্ষ ত্যাগ করা মাত্রই যেন তাদের গ্রেফতারসহ সংশ্লিষ্ট ধারায় ফৌজদারি মামলা করা হয়। সেভাবেই মীর কাসেম আলি আমার আদেশেই প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন। ইবনে সিনা কর্তৃপক্ষ অবহেলার অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল বিধায় সেখানেও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার প্রশ্ন আসেনি।  পরে অবশ্য তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল।

 

কোনো ডাক্তার বা সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে কারও অপমৃত্যু হলে দন্ডবিধির ৩০৪ ধারা মতে তাদের সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদন্ড হতে পারে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে টর্টের আইনে ক্ষতিপূরণের মামলাও হতে পারে। আমাদের মহামান্য হাই কোর্ট গতানুগতিকভাবেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আসছেন। মহামান্য হাই কোর্ট সচেতন থাকলে এ ধরনের অবহেলাজনিত অপরাধ নিশ্চয়ই কমে যাবে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমেরও গুরু দায়িত্ব রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে গণসচেতনতার। তবে সবারই খেয়াল রাখতে হবে কোনো নিরপরাধ চিকিৎসক যেন অযথা লাঞ্ছনার শিকার না হন। ডা. বিধান রায়ের কথা উল্লেখ করে বলতে হয়- গোটা বিশ্বে এমন কোনো চিকিৎসক নেই যিনি মৃত্যুকে ঠেকাতে পারেন, তিনি যত বড় চিকিৎসকই হন আর যত সচেতনতা নিয়েই চিকিৎসা করেন না কেন। তাদের দায়িত্ব সচেতনতা এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া, এর বেশি কিছু করা তাদের সক্ষমতার বাইরে। তা ছাড়া এটা মনে রাখতে হবে যে, অ্যানেসথেসিয়াজনিত কারণে অপমৃত্যু হলে তার দায় অপারেশনকারী শৈল্য চিকিৎসক বা সার্জনের নয়, বরং অ্যানেসথেসিয়া প্রদানকারী ডাক্তারের। সার্জন অ্যানেসথেসিয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নন। তিনি শুধু অপারেশন করেন। অ্যানেসথেসিয়ার ভুল প্রয়োগ হলে তার দায় অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তারের, অপারেশন করা শৈল্য চিকিৎসকের নয়। কয়েকদিন আগে অ্যান্ডোস্কপি নামক একটি মেডিকেল পন্থা অবলম্বনের সময় জনৈক রোগীর মৃত্যু হলে দেশের এক খ্যাতিমান চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা চাউর হয়েছে, তার অনেকটাই ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত বলে মনে হচ্ছে। সেই মৃত্যু যদি অ্যানেসথেসিয়ার কারণে হয়ে থাকে যা সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে মনে হচ্ছে তাহলে তার দায় এন্ডোস্কপি করা চিকিৎসকের নয়, বরং অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তারের। যার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর, তিনি অ্যানেসথেসিয়ার ডাক্তার নন, বরং যকৃত রোগের আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞ। একজন মানবিক ব্যক্তি হিসেবে তার বেশ সুনাম রয়েছে। শোনা যায় বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নেই এবং এদের অনেকেই প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী নন। আরও শোনা যায় অ্যানেসথেসিয়ার বিশেষজ্ঞ নন, এমন অনেকেই নাকি অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে রোগীদের অপমৃত্যু ঘটাচ্ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টির ওপর অবশ্যই ঈগল পাখির চোখ দিয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। অপচিকিৎসা এবং বেআইনি হাসপাতালের বিরুদ্ধে র‌্যাব বাহিনী অনেক সফল অভিযান চালিয়ে অনেককেই আইনের আওতায় আনতে পারায় তারা নিশ্চিতভাবে সাধুবাদের দাবিদার। তাদের অভিযান চলতে থাকলে জাতি নিশ্চয়ই উপকৃত হবে। চিকিৎসাকালে অপমৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনার জন্য দায়ী চিকিৎসকদের অবহেলা। হেন অবহেলার পেছনেও মূল কারণ অর্থলোভ। অনেক সময় চিকিৎসক দর কষাকষি করে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। তা ছাড়াও মানসিক এবং শারীরিকভাবে তারা যতজন রোগী দেখতে সক্ষম তার চেয়েও অনেক বেশি রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। প্রতিটি রক্তমাংসের মানুষেরই কর্মক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা থাকে। একপর্যায়ে তিনি মানসিক এবং শারীরিকভাবে ক্লান্ত হতে বাধ্য আর ক্লান্ত মন এবং দেহ নিয়ে চিকিৎসা চালালে সেখানে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যবশত সেটিই অহরহ ঘটছে। অপচিকিৎসায় মৃত্যুজনিত ঘটনায় ইউনাইটেড হাসপাতালের রেকর্ড বেশ উঁচুর দিকেই। অপচিকিৎসার কারণে সেই হাসপাতালে অপমৃত্যুর খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। বেশ কয়েক বছর আগে এই হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের বিরুদ্ধে ৩০৪ ধারায় মামলা করা হয়েছিল বলে সংবাদপত্রে প্রকাশ। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই মামলা কোথায় হারিয়ে গেল তার আর খবর নেই। বহু যুগ আগে আমি একজন ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত থাকাকালে সে সময়ের পুলিশের এক ডিআইজি একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এ অভিযোগে মামলা করতে চেয়েছিলেন যে, অপচিকিৎসার কারণেই সেই অতিরিক্ত ডিআইজির এক নিকটাত্মীয়ের অপমৃত্যু হয়েছিল। আমি সব প্রস্তুতি নেওয়ার পর ভদ্রলোক একদিন এসে বললেন, মামলা করাটা ঠিক হবে না, কেননা জীবন-মরণ সৃষ্টিকর্তার হাতে। এ ধারণা নিয়েও অনেকে অপমৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করেন না বলে অবহেলাজনিত অপমৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে। ফৌজদারি মামলা ছাড়াও অভিযুক্ত চিকিৎসক এবং তাদের প্রয়োগ দেওয়া চিকিৎসালয়গুলোর বিরুদ্ধে টর্টের আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। সৌভাগ্যজনকভাবে আমাদের মহামান্য হাই কোর্ট টর্টের এ বিধানবলে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিচ্ছেন, যে পন্থা অবলম্বন করে আমি ল্যাবএইড এবং ইবনে সিনা হাসপাতালকে আদেশ দিয়েছিলাম ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে। অপচিকিৎসা বন্ধে জনসচেতনতা এবং আইনি বিষয়ে জ্ঞান খুবই জরুরি; কিন্তু চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যু সত্যিই অপচিকিৎসার কারণে ঘটেছে কি না সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

শেষ করার আগে বলতে হয় চিকিৎসা একটি মহৎ পেশা, মানবতার সেবার জন্য যে পেশার লোকদের কোনো জুরি নেই। এক সময়ে শুধু পশ্চিম বাংলার নিলরতন সরকার বা বিধান চন্দ্র রায়ই নন, পূর্ব বাংলার ডা. ইব্রাহিম, ডা. নুরুল ইসলামের মতো নিবেদিত ব্যক্তিরাও নিজেদের সর্বময় শক্তি এবং সাধনা প্রয়োগ করেছিলেন চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে মানবতার সেবায়। পয়সা উপার্জনের মোহ কখনো তাদের তাড়া করতে পারেনি। ’৭১ সালে সিলেট শহরে এক রোগীর শরীরে অপারেশন চালানোকালে ডা. সামসুদ্দিন নামক এক মহাপ্রাণ সার্জনকে (শৈল্য চিকিৎসক) হত্যা করতে এসেছিল পাকিস্তানি অসুর সৈন্যরা। কারণ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছিলেন। তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে গুলি কর; কিন্তু তার আগে আমাকে অপারেশনটি করে একজন রোগীকে বাঁচাতে দাও।” অপারেশন শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানি দানবরা তাকে হত্যা করেছিল। কথাটি আমি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যকৃত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুন মাহতাব স্বপ্নিলের কাছ থেকে জেনেছি। সরকার সিলেট শহরে ডা. সামসুদ্দিনের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি হাসপাতালের নামকরণ করেছেন ‘ডা. সামসুদ্দিন হাসপাতাল’ নামে। এ ছাড়াও দেশের আনাচে-কানাচে বহু চিকিৎসক ছিলেন যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মানবতার সেবা। ঢাকা শহরে ডা. নন্দি, পুরান ঢাকায় ডা. সুফিয়ানি, আমাদের গ্রামে ডা. ধীরেন্দ্রনাথ কুন্ডুসহ অনেকেই মানব সেবাকে পরমধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। দুঃখজনক হলো এই যে, ডা. ইব্রাহিম, ডা. নুরুল ইসলাম, ডা. সামসুদ্দিন, ডা. রাব্বি, ডা. আলিম চৌধুরীদের মতো মানবতার সেবায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চিকিৎসকের সংখ্যা আজ অনেক কমে গেছে। কিন্তু এ ধরনের ডাক্তার একেবারেই নেই, সে কথাও ঠিক নয়। আমরা প্রায়ই এমন সব ডাক্তারের খবর পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাই যারা বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসকের পেশা বেছে নিয়েছেন, নিজেদের জীবন বিপন্ন করে চিকিৎসা দিচ্ছেন, যার অনেক উদাহরণ পাওয়া গিয়েছিল করোনা মহামারিকালে। সেই সময়ে যেকটি গোষ্ঠী সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে মানুষ বাঁচানোর দায়িত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, চিকিৎসক সম্প্রদায় ছিলেন তাদের অন্যতম। অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের মতো আরও অনেকেই রয়েছেন মানবসেবাই যাদের ব্রত। আমার নিকটাত্মীয়দের মধ্যেও এ ধরনের অনেক মানবতাসেবী চিকিৎসক রয়েছেন। এ ধরনের নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক সরব থাকলে, মহামান্য হাই কোর্ট তীক্ষè দৃষ্টি চালিয়ে গেলে, গণমাধ্যম সচেতন থাকলে, পুলিশ এবং র‌্যাব বাহিনী সজাগ থাকলে অপচিকিৎসার হার অবশ্যই কমবে। গণসচেতনতারও প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে উদ্দেশ্যমূলক এবং জিঘাংসাপূর্ণ অপপ্রচার যেন না হয়, যাতে নিরপরাধ কোনো চিকিৎসককে হেনস্তা করা না হয়।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» পাসওয়ার্ড তৈরির গোপন কৌশল জানুন

» উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, মনোনয়ন জমার শেষ দিন সোমবার

» বিয়েবাড়ির মতো খাসির মাংস ভুনা করবেন যেভাবে

» বাংলাদেশ এখন দুর্নীতি চাষের উর্বর ভূমি: রিজভী

» ইলিশের দামে নববর্ষের হাওয়া

» ধর্ষণ মামলায় প্রধান পলাতক আসামি গ্রেফতার

» বাংলা নববর্ষ উদযাপন : হামলা-নাশকতা ঠেকাতে প্রস্তুত র‍্যাব

» হঠাৎ কেন মেজাজ হারালেন শ্বেতা?

» মুস্তাফিজের চেন্নাইকে টপকে অনন্য রেকর্ড মুম্বাইয়ের

» ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে ইউরোপের তিন দেশ

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

চিকিৎসক ও হাসপাতালের অবহেলায় অপমৃত্যু

ছবি সংগৃহীত

 

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক  : সম্প্রতি দুটি হাসপাতালে খতনা করানোর সময় দুজন বালকের অপমৃত্যু ঘটলে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই জনমনে ক্ষোভ এবং সংশয় উতলে ওঠে। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছন্দের মাধ্যমে এই অমোঘ সত্যটি প্রচার করেছিলেন। মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে হলে তার বিরুদ্ধে কারও কিছু বলা-কওয়ার থাকে না; কিন্তু অপমৃত্যু অগ্রহণযোগ্য হওয়াই স্বাভাবিক। অপমৃত্যুর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে অপচিকিৎসার কারণে প্রাণবলি। একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন আরোগ্য লাভের আশায়। আর সেই চিকিৎসকের কারণেই যদি তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় তাহলে সেটি আশ্রয়দাতার হাতে খুন হওয়ারই শামিল।

 

আমার অভিজ্ঞতা বলছে একজন চিকিৎসকের হাতে রোগীর অপমৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- (১) চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব, (২) রোগী যে রোগে ভুগছেন, সে রোগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অজ্ঞতা, (৩) চিকিৎসকের অবহেলা। চল্লিশ দশকের বাঙালি চিকিৎসক ডা. বিধান চন্দ্র রায়, যিনি পরে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাকে একজন ধন্বন্তরি চিকিৎসক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। তিনি এমনভাবে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা করতেন যা অনেকটা অলৌকিক ছিল বলে জানা যায়। তার মানবিক অনুভূতিও ছিল অসাধারণ। তারপরও তিনি বলতেন রোগ নিরাময় করতে পারবেন- এমন নিশ্চয়তা কোনো চিকিৎসকই দিতে পারেন না; কিন্তু একজন চিকিৎসকের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে এমন চিকিৎসা পন্থা বেছে নেওয়া যার দ্বারা রোগমুক্তির সম্ভাবনা অধিক হবে। তিনি আরও বলেছেন, প্রতিটি চিকিৎসকেরই দায়িত্ব মানবিক চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রোগীর চিকিৎসা করা। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালেও তিনি বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন। এমনকি ৮১ বছর বয়সে তার মৃত্যুর দিনও ১ ঘণ্টা রোগী দেখেছিলেন।

 

অতীতকালে মানুষ চিকিৎসক হতে চাইতেন মূলত মানুষের সেবা করার মানসিকতা নিয়ে। দুঃখজনকভাবে এখন ‘সে যুগ হয়েছে বাসি।’ এখনো যে বহুজন মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন না তা নয়; কিন্তু এটা বলা ভুল হবে না যে, বর্তমানে অনেকেই চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিত্ত-বৈভব অর্জনের জন্য। অনেকে ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রশাসনে চলে যাওয়ার জন্য বিসিএস পরীক্ষা দেন, যা প্রমাণ করে তারা মানবতার সেবা করার জন্য চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেননি। অর্থ উপার্জনের জন্য যারা চিকিৎসক হয়েছেন তাদের হাতে রোগীর মৃত্যু হলে অবাক হওয়া বাতুলতা মাত্র।

 

এরই মধ্যে দেশে গড়ে উঠেছে শত শত বেসরকারি চিকিৎসালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সিংহভাগ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আর মুনাফা অর্জন করাই তাদের একমাত্র পাথেয়। এরা রোগীদের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের থেকে গলাকাটা হারে পয়সা আদায় করে মানবতা নামক তত্ত্বকে ভূলুণ্ঠিত করছেন। ন্যায়নীতিতো দূরের কথা, তারা আইনের তোয়াক্কাও করেন না। রোগী মরে যাওয়ার পরেও তারা বিল বাড়ানোর জন্য রোগীকে অযথা বাঁচিয়ে রাখার ভান করে হাসপাতালে রেখে দেন। এমনকি পয়সা আদায় করার জন্য মৃত রোগীর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর না করে লাশ জিম্মি করে রাখেন, যা আমাদের বিভিন্ন ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক হাসপাতালে নার্সদের নিয়ে ডাক্তারদের কাজ চালানো হয়। অ্যানেসথেসিয়ায় বিশেষজ্ঞ নন, এমন লোকদের দ্বারা অ্যানেসথেসিয়া করানো হয়। দেশে শত শত লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল রয়েছে।

খতনাকালে একটি অপমৃত্যু ঘটেছে অভিজাত গুলশান এলাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে। খতনা করানোর জন্য যে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রক্রিয়ায় তার পূর্ণ দেহ নিস্তেজ করা হয়েছিল সে কথা কেউ অস্বীকার করেননি। অন্য ঘটনায়ও একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রদান করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো মেডিকেল ইতিহাস পর্যালোচনা করা যে অপরিহার্য, চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেননি এমন মানুষও তা জানেন। রোগীর হাঁপানি ও অ্যালার্জিজনিত সমস্যা থাকাসহ বহু কারণেই জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করা যায় না বিধায় এটি প্রয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো মেডিকেল ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হয়। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে ব্যক্তিবিশেষকে সম্পূর্ণ অবচেতন না করে, লোকাল অ্যানেসথেসিয়ার মাধ্যমে শুধু সংশ্লিষ্ট এলাকা অবশ করে মুসলমানি করানো যেতে পারে বলে সবার জানা রয়েছে। জেনারেল অ্যানেসথেসিয়ায় যেসব ঝুঁকি থাকে, লোকাল অ্যানেসথেসিয়ায় সেগুলো অনুপস্থিত। এতে ব্যক্তিবিশেষ সম্পূর্ণ সজাগ থাকেন। শুধু অপারেশন করা এলাকা অনুভূতিশূন্য হয়ে যায়। বহু দশক আগে আমার নিজের মুসলমানির সময় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ডাক্তার লোকাল অ্যানেসথেসিয়ারই আশ্রয় নিয়েছিলেন। পুরো সময়টা আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা নিয়ে আলাপ করেছেন। বছর দশক আগে আমার এক বিলেতপ্রবাসী বন্ধুর ছেলের মুসলমানির সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। সেই ছেলের ওপরও লোকাল (স্থানীয়) অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করা হয়েছিল। অতীতকালে যখন হাজাম শ্রেণির লোক গতানুগতিক পন্থায় মুসলমানি করাতেন তারাতো কোনো ধরনেরই অ্যানেসথেসিয়াই প্রয়োগ করতেন না। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে মুসলমানির জন্য পুরো দেহ অচৈতন্য করার জন্য আদৌ জেনারেল অ্যানেসথেসিয়ার দরকার ছিল কি না, নাকি শুধু অধিক মুনাফা লাভের জন্য অথবা পরিপূর্ণ জ্ঞানের অভাবের কারণে এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল- সেটি একটি বড় প্রশ্ন। তা ছাড়া অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগকারী ডাক্তারের স্বল্প বিদ্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মহামান্য হাই কোর্ট এরই মধ্যে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি তদন্ত বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন, যে বোর্ডে একজন আইন বিশারদও রয়েছেন। আশা করা যায় তাদের তদন্তে আসল ঘটনা পরিষ্কার হলে মহামান্য হাই কোর্ট উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। ভুলে গেলে চলবে না যে, মহামান্য হাই কোর্টের হাত অনেক লম্বা।

 

আমি হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকাকালে অবহেলাজনিত কারণে কয়েকটি অপমৃত্যুর জন্য দায়ীদের সাজা প্রদান করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এর একটি ঘটেছিল ল্যাবএইড নামক এক বেসরকারি হাসপাতালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রভাষক মৃণাল চক্রবর্তী উদরাময়ে (ডায়রিয়া) আক্রান্ত হয়ে ল্যাবএইড হাসপাতালে গেলে তাকে ২ ঘণ্টার অধিক সময় বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়েছিল দর কষাকষির কারণে। বিলম্বের কারণে জলশূন্যতায় তার অপমৃত্যু হয়েছিল। খবরটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে আমি স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে ল্যাবএইডের চেয়ারম্যান, পরিচালকবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আদালতে তলব করেছিলাম। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীর স্বজনদের উপস্থিত থাকতে বলেছিলাম। ভুক্তভোগী মৃণাল চক্রবর্তীর ডাক্তার ভাগিনা আমাদের এই মর্মে জানিয়েছিলেন যে, তার মামাকে ২ ঘণ্টা ফেলে না রাখলে তিনি সম্ভবত মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তেন না। আমি সেদিন ল্যাবএইডের চেয়ারম্যান, পরিচালকবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের হাই কোর্টের আসামির কাঠগড়ায় দিনভর আটক রেখে এই মর্মে আদেশ দিয়েছিলাম যে, ভুক্তভোগী মৃণাল চক্রবর্তীর পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা নগদে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের হাই কোর্টের কাঠগড়ায় বন্দি থাকতে হবে এবং পরে নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানায় পাঠানো হবে। বিকালের দিকে ল্যাবএইডের চেয়ারম্যান, যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, ভুক্তভোগী পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা প্রদান করার পর আমি তাদের খালাস দিয়েছিলাম। একই সঙ্গে পুলিশকেও নির্দেশ দিয়েছিলাম তাদের বিরুদ্ধে ৩০৪ ধারায় মামলা করতে। ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছিলেন যে রোগীকে বিভিন্ন কারণে ২ ঘণ্টা চিকিৎসাশূন্য রাখা হয়েছিল। উপরোক্ত স্বীকারোক্তির কারণে আমাকে আর সাক্ষী প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি, তাই আমি তাৎক্ষণিকভাবেই আদেশ দিতে পেরেছিলাম, অন্যথায় পুরো শুনানি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।

 

আরেক ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর হাসপাতাল ইবনে সিনায় অপচিকিৎসার কারণে একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে- এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সেই হাসপাতালের চেয়ারম্যান, মীর কাসেম আলিসহ অন্যান্য পরিচালক এবং ডাক্তারদের তলব করে পুলিশকে এই মর্মে আদেশ প্রদান করেছিলাম যে, আদালত কক্ষ ত্যাগ করা মাত্রই যেন তাদের গ্রেফতারসহ সংশ্লিষ্ট ধারায় ফৌজদারি মামলা করা হয়। সেভাবেই মীর কাসেম আলি আমার আদেশেই প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন। ইবনে সিনা কর্তৃপক্ষ অবহেলার অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল বিধায় সেখানেও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার প্রশ্ন আসেনি।  পরে অবশ্য তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল।

 

কোনো ডাক্তার বা সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে কারও অপমৃত্যু হলে দন্ডবিধির ৩০৪ ধারা মতে তাদের সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদন্ড হতে পারে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে টর্টের আইনে ক্ষতিপূরণের মামলাও হতে পারে। আমাদের মহামান্য হাই কোর্ট গতানুগতিকভাবেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আসছেন। মহামান্য হাই কোর্ট সচেতন থাকলে এ ধরনের অবহেলাজনিত অপরাধ নিশ্চয়ই কমে যাবে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমেরও গুরু দায়িত্ব রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে গণসচেতনতার। তবে সবারই খেয়াল রাখতে হবে কোনো নিরপরাধ চিকিৎসক যেন অযথা লাঞ্ছনার শিকার না হন। ডা. বিধান রায়ের কথা উল্লেখ করে বলতে হয়- গোটা বিশ্বে এমন কোনো চিকিৎসক নেই যিনি মৃত্যুকে ঠেকাতে পারেন, তিনি যত বড় চিকিৎসকই হন আর যত সচেতনতা নিয়েই চিকিৎসা করেন না কেন। তাদের দায়িত্ব সচেতনতা এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া, এর বেশি কিছু করা তাদের সক্ষমতার বাইরে। তা ছাড়া এটা মনে রাখতে হবে যে, অ্যানেসথেসিয়াজনিত কারণে অপমৃত্যু হলে তার দায় অপারেশনকারী শৈল্য চিকিৎসক বা সার্জনের নয়, বরং অ্যানেসথেসিয়া প্রদানকারী ডাক্তারের। সার্জন অ্যানেসথেসিয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নন। তিনি শুধু অপারেশন করেন। অ্যানেসথেসিয়ার ভুল প্রয়োগ হলে তার দায় অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তারের, অপারেশন করা শৈল্য চিকিৎসকের নয়। কয়েকদিন আগে অ্যান্ডোস্কপি নামক একটি মেডিকেল পন্থা অবলম্বনের সময় জনৈক রোগীর মৃত্যু হলে দেশের এক খ্যাতিমান চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা চাউর হয়েছে, তার অনেকটাই ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত বলে মনে হচ্ছে। সেই মৃত্যু যদি অ্যানেসথেসিয়ার কারণে হয়ে থাকে যা সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে মনে হচ্ছে তাহলে তার দায় এন্ডোস্কপি করা চিকিৎসকের নয়, বরং অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তারের। যার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর, তিনি অ্যানেসথেসিয়ার ডাক্তার নন, বরং যকৃত রোগের আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞ। একজন মানবিক ব্যক্তি হিসেবে তার বেশ সুনাম রয়েছে। শোনা যায় বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নেই এবং এদের অনেকেই প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী নন। আরও শোনা যায় অ্যানেসথেসিয়ার বিশেষজ্ঞ নন, এমন অনেকেই নাকি অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে রোগীদের অপমৃত্যু ঘটাচ্ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টির ওপর অবশ্যই ঈগল পাখির চোখ দিয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। অপচিকিৎসা এবং বেআইনি হাসপাতালের বিরুদ্ধে র‌্যাব বাহিনী অনেক সফল অভিযান চালিয়ে অনেককেই আইনের আওতায় আনতে পারায় তারা নিশ্চিতভাবে সাধুবাদের দাবিদার। তাদের অভিযান চলতে থাকলে জাতি নিশ্চয়ই উপকৃত হবে। চিকিৎসাকালে অপমৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনার জন্য দায়ী চিকিৎসকদের অবহেলা। হেন অবহেলার পেছনেও মূল কারণ অর্থলোভ। অনেক সময় চিকিৎসক দর কষাকষি করে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। তা ছাড়াও মানসিক এবং শারীরিকভাবে তারা যতজন রোগী দেখতে সক্ষম তার চেয়েও অনেক বেশি রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। প্রতিটি রক্তমাংসের মানুষেরই কর্মক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা থাকে। একপর্যায়ে তিনি মানসিক এবং শারীরিকভাবে ক্লান্ত হতে বাধ্য আর ক্লান্ত মন এবং দেহ নিয়ে চিকিৎসা চালালে সেখানে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যবশত সেটিই অহরহ ঘটছে। অপচিকিৎসায় মৃত্যুজনিত ঘটনায় ইউনাইটেড হাসপাতালের রেকর্ড বেশ উঁচুর দিকেই। অপচিকিৎসার কারণে সেই হাসপাতালে অপমৃত্যুর খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। বেশ কয়েক বছর আগে এই হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের বিরুদ্ধে ৩০৪ ধারায় মামলা করা হয়েছিল বলে সংবাদপত্রে প্রকাশ। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই মামলা কোথায় হারিয়ে গেল তার আর খবর নেই। বহু যুগ আগে আমি একজন ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত থাকাকালে সে সময়ের পুলিশের এক ডিআইজি একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এ অভিযোগে মামলা করতে চেয়েছিলেন যে, অপচিকিৎসার কারণেই সেই অতিরিক্ত ডিআইজির এক নিকটাত্মীয়ের অপমৃত্যু হয়েছিল। আমি সব প্রস্তুতি নেওয়ার পর ভদ্রলোক একদিন এসে বললেন, মামলা করাটা ঠিক হবে না, কেননা জীবন-মরণ সৃষ্টিকর্তার হাতে। এ ধারণা নিয়েও অনেকে অপমৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করেন না বলে অবহেলাজনিত অপমৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে। ফৌজদারি মামলা ছাড়াও অভিযুক্ত চিকিৎসক এবং তাদের প্রয়োগ দেওয়া চিকিৎসালয়গুলোর বিরুদ্ধে টর্টের আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। সৌভাগ্যজনকভাবে আমাদের মহামান্য হাই কোর্ট টর্টের এ বিধানবলে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিচ্ছেন, যে পন্থা অবলম্বন করে আমি ল্যাবএইড এবং ইবনে সিনা হাসপাতালকে আদেশ দিয়েছিলাম ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে। অপচিকিৎসা বন্ধে জনসচেতনতা এবং আইনি বিষয়ে জ্ঞান খুবই জরুরি; কিন্তু চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যু সত্যিই অপচিকিৎসার কারণে ঘটেছে কি না সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

শেষ করার আগে বলতে হয় চিকিৎসা একটি মহৎ পেশা, মানবতার সেবার জন্য যে পেশার লোকদের কোনো জুরি নেই। এক সময়ে শুধু পশ্চিম বাংলার নিলরতন সরকার বা বিধান চন্দ্র রায়ই নন, পূর্ব বাংলার ডা. ইব্রাহিম, ডা. নুরুল ইসলামের মতো নিবেদিত ব্যক্তিরাও নিজেদের সর্বময় শক্তি এবং সাধনা প্রয়োগ করেছিলেন চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে মানবতার সেবায়। পয়সা উপার্জনের মোহ কখনো তাদের তাড়া করতে পারেনি। ’৭১ সালে সিলেট শহরে এক রোগীর শরীরে অপারেশন চালানোকালে ডা. সামসুদ্দিন নামক এক মহাপ্রাণ সার্জনকে (শৈল্য চিকিৎসক) হত্যা করতে এসেছিল পাকিস্তানি অসুর সৈন্যরা। কারণ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছিলেন। তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে গুলি কর; কিন্তু তার আগে আমাকে অপারেশনটি করে একজন রোগীকে বাঁচাতে দাও।” অপারেশন শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানি দানবরা তাকে হত্যা করেছিল। কথাটি আমি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যকৃত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুন মাহতাব স্বপ্নিলের কাছ থেকে জেনেছি। সরকার সিলেট শহরে ডা. সামসুদ্দিনের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি হাসপাতালের নামকরণ করেছেন ‘ডা. সামসুদ্দিন হাসপাতাল’ নামে। এ ছাড়াও দেশের আনাচে-কানাচে বহু চিকিৎসক ছিলেন যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মানবতার সেবা। ঢাকা শহরে ডা. নন্দি, পুরান ঢাকায় ডা. সুফিয়ানি, আমাদের গ্রামে ডা. ধীরেন্দ্রনাথ কুন্ডুসহ অনেকেই মানব সেবাকে পরমধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। দুঃখজনক হলো এই যে, ডা. ইব্রাহিম, ডা. নুরুল ইসলাম, ডা. সামসুদ্দিন, ডা. রাব্বি, ডা. আলিম চৌধুরীদের মতো মানবতার সেবায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চিকিৎসকের সংখ্যা আজ অনেক কমে গেছে। কিন্তু এ ধরনের ডাক্তার একেবারেই নেই, সে কথাও ঠিক নয়। আমরা প্রায়ই এমন সব ডাক্তারের খবর পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাই যারা বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসকের পেশা বেছে নিয়েছেন, নিজেদের জীবন বিপন্ন করে চিকিৎসা দিচ্ছেন, যার অনেক উদাহরণ পাওয়া গিয়েছিল করোনা মহামারিকালে। সেই সময়ে যেকটি গোষ্ঠী সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে মানুষ বাঁচানোর দায়িত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, চিকিৎসক সম্প্রদায় ছিলেন তাদের অন্যতম। অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের মতো আরও অনেকেই রয়েছেন মানবসেবাই যাদের ব্রত। আমার নিকটাত্মীয়দের মধ্যেও এ ধরনের অনেক মানবতাসেবী চিকিৎসক রয়েছেন। এ ধরনের নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক সরব থাকলে, মহামান্য হাই কোর্ট তীক্ষè দৃষ্টি চালিয়ে গেলে, গণমাধ্যম সচেতন থাকলে, পুলিশ এবং র‌্যাব বাহিনী সজাগ থাকলে অপচিকিৎসার হার অবশ্যই কমবে। গণসচেতনতারও প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে উদ্দেশ্যমূলক এবং জিঘাংসাপূর্ণ অপপ্রচার যেন না হয়, যাতে নিরপরাধ কোনো চিকিৎসককে হেনস্তা করা না হয়।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com