15 August shok banner

ঘরের ইঁদুর বাঁশ কাটলে ধরে রাখে কে

সৈয়দ বোরহান কবীর: একেকটা বাংলা প্রবচন যেন সত্যভাষণ। এসব প্রবচনের উৎপত্তি হাজার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী। তাই তাঁর বক্তৃতা, লেখায় প্রায় সব সময়ই কবিতা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় বাংলা প্রবচন। এই তো সেদিন জাতীয় সংসদেও শীতকালীন অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সে ভাষণে একপর্যায়ে বললেন, ‘ঘরের ইঁদুর বাঁশ কাটলে ধরে রাখে কে?’ বিএনপি-জামায়াতের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ওই মন্তব্য করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত সদস্যের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বেঞ্চের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সংসদে খোলামেলা এবং স্পষ্ট বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য বিএনপি-যুদ্ধাপরাধীরা যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে। তাদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি-যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী কীভাবে এ টাকা পাঠিয়েছে তার তদন্ত হবে। অর্থের উৎস খুঁজে বের করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী যেটা বলতে চেয়েছেন তার সার কথা হলো, দেশের ভিতরের রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছে। এ প্রসঙ্গেই তিনি ওই প্রবচনটি উল্লেখ করেন। এ প্রবচনটির সরাসরি অর্থ হলো, ঘরের শত্রু অনিষ্ট করলে তার হাত থেকে বাঁচা কঠিন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য ও প্রবচন উদ্ধৃতি তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি-জামায়াত, যুদ্ধাপরাধীদের বাইরেও অনেক ঘরের শত্রু সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সতর্কবার্তাটি দিয়েছেন বলেই আমি মনে করি। শেখ হাসিনা একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি আজকের জায়গায় এসেছেন। ভালো করেই জানেন ঘরের শত্রুরা কতটা ভয়ংকর।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময় দেখা গেছে ছদ্মবেশী বিশ্বস্ত ও কাছের মানুষই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিএনপি-যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ সরকারের চেনা শত্রু। কিন্তু এ চেনা শত্রুর চেয়ে বন্ধুরূপে থাকা বিভীষণরাই আসল ক্ষতি করে। ১৯৭৫-এ খুনি মোশতাক জাতির পিতার কাছের মানুষ ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর একাধিক ভাষণে ১৯৭৫-এর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন, এসব খুনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আসত। এরা অনেকেই ‘ঘরের ইঁদুর’ হয়ে বাঁশ কেটেছে। জিয়া মুক্তিযোদ্ধা কাউকে সেনাপ্রধান করে ঝুঁকি নিতে চাননি। জেনারেল মঞ্জুর, জেনারেল শওকতকে বিশ্বাস না করে জিয়া আস্থা রেখেছিলেন পাকিস্তান-ফেরত এরশাদের ওপর। কিন্তু জিয়ার রক্তের ওপর দিয়ে এরশাদই সিংহাসন দখলের নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এরশাদ ক্ষমতা বিপন্মুক্ত করতে যাদের ওপর নির্ভর করেছিলেন শেষ মুহূর্তে কেউ তাঁর পাশে থাকেননি। না তৎকালীন সেনাপ্রধান, না আমলারা। ১৯৯১-এ ক্ষমতায় এসে বেগম জিয়া যাদের বিশ্বাস করেছিলেন তারাই তাঁকে ভুল পথে নিয়ে গেছেন। তাদের কারণেই বেগম জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেননি, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেননি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পালাবদলের পর এরা অনেকেই রং বদলেছেন। ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে দীর্ঘ ২১ বছর পর। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি পদ নিরপেক্ষ রাখার এক মহতী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছিলেন এই তথাকথিত নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপতি। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেগম জিয়া অনেক পেছনে থাকা মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। ফলাফল ব্যাখার প্রয়োজন নেই। এভাবেই ঘরের ইঁদুরের হাতে সবার সর্বনাশ হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বেও ছদ্মবেশী একান্ত কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার উদাহরণ ভূরিভূরি। ১৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগের ঘরে এখন ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে। দেশে কে আওয়ামী লীগ নয় এটাই খুুঁজে বের করা দুরূহ। এত আওয়ামী লীগ, মুজিবভক্তের মধ্যে কে যে ইঁদুর হয়ে বাঁশ কাটছে কে জানে? শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে এ ব্যাপারেই কি সতর্ক করলেন?

 

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কদিন পর আওয়ামী লীগের তুমুল জনপ্রিয় নেতা মির্জা আজমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর। কমাস আগেই আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে একটি সাজানো মামলায় জামিন নিতে জামালপুরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হবেন মির্জা আজম। সে সময় জামালপুরের জেলা প্রশাসক নাসিমুল গনি, কট্টর বিএনপিপন্থি আমলা। জামালপুরের সব ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে তিনি বসলেন। মির্জা আজম হাজিরা দিতে এলেই তাঁকে গ্রেফতার করতে হবে। পরদিন মনোনয়নপত্র দাখিল। মির্জা আজমকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এ ফন্দি আঁটা হয়। তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটদের কেউই রাজি নন। একজন বিএনপিপন্থি ম্যাজিস্ট্রেট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মির্জা আজমকে জেলে পাঠানোর দায়িত্ব নিলেন। মির্জা আজম ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলেন বিএনপিপন্থি শিশু আমলা। ম্যাজিস্ট্রেটের এ সিদ্ধান্তে ফেটে পড়ল মির্জা আজমের নির্বাচনী এলাকার জনগণ। পরে বাধ্য হয়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলো।

 

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। এলাকার এক কাজে আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক গেছেন সচিবালয়ে। একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করতে। ওই সচিবের নামধাম না দেখেই রুমে ঢুকে পড়লেন। কথা বলতে বলতে মির্জা আজমের মনে হলো এই লোককে কোথায় যেন দেখেছি। এরপর ওই সচিব আর মির্জা আজমের কথোপকথন এ রকম-

মির্জা আজম : আপনাকে চেনাচেনা লাগছে। আগে কি আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে?

সচিব : (বিগলিত হাসিতে) জি, আমি তো জামালপুরে চাকরি করেছি।

মির্জা আজম : ওহ, আপনি সেই ম্যাজিস্ট্রেট না। ২০০১ সালে আমাকে গ্রেফতারের চক্রান্ত করেছিলেন।

সচিব : (এবার একটু বিচলিত ভঙ্গিতে) কী যে বলেন স্যার।

মির্জা আজম আর অপেক্ষা করলেন না। সচিবের রুম থেকে বেরিয়ে রাগে-ক্ষোভে দেখা করলেন মন্ত্রীর সঙ্গে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে ঘটনা বললেন। মন্ত্রী বললেন, তাই নাকি!

 

এভাবেই দুর্বৃত্ত ইঁদুরেরা আওয়ামী লীগ সরকারের অন্দরমহলে ঢুকে যাচ্ছে। ২০১৮-এর নির্বাচনের পর আমলারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশে এখন দুই ধরনের আইন আছে। একটা সাধারণ মানুষের, অন্যটা আমলাদের জন্য। একজন স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদ দুর্নীতি করলে তা নিয়ে হইচই হয়। তার কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যায় জেলে। গত দুই বছরে ৩৭ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বর দুর্নীতির দায়ে পদ হারিয়েছেন। তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিচার হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে এসব তৃণমূলের জনপ্রতিনিধির দুর্নীতির খতিয়ানগুলো পড়লাম। দুর্নীতির অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৯ টাকা ৯০ পয়সা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি নিয়েছে সরকার। কাজেই ১ টাকা চুরি করলেও তা অপরাধ। কিন্তু আমলারা করলে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনাকে মোটেও কষ্ট করতে হবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনেই চমকে যাওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়। ভূমিহীনদের জন্য সরকারের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের প্রায় ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন গাইবান্ধা উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণায়লের তদন্তে তার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এজন্য অবশ্য ওই সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জেলে যেতে হয়নি। কোমরে দড়িও বাঁধা হয়নি। তার শাস্তি হয়েছে পদাবনতি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ১২ জানুয়ারি এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- ‘শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে গুরুদণ্ড হিসেবে তাকে পদাবনতির শাস্তি দেওয়া হলো। সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী এখন থেকে তাকে দুই বছর সপ্তম গ্রেডে থাকতে হবে। এ বছর পর আবার তিনি আগের পদ ফিরে পাবেন।’ অকল্পনীয়! ৪ লাখ টাকা আত্মসাতের কারণে ৩৭ জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হলেন। তাঁদের জেলে যেতে হলো। আর ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে খুদে আমলার শাস্তি হলো পদাবনতি। দুই বছর পর আবার তিনি স্বপদে বহাল হবেন। এ দুই বছরে তিনি প্রভাবশালী আমলাদের ঘনিষ্ঠ হবেন। তাদের প্রিয় ও আস্থাভাজন হবেন। তারপর তিনি তরতর করে আগের মতো এগিয়ে যাবেন। এ খুদে আমলার জন্য গাছের এবং তলার ফল খাওয়ার দারুণ এক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কখনো সরকার পরিবর্তন হলেই হলো। তিনি হয়ে যাবেন নির্যাতিত। আওয়ামী লীগ সরকার তার প্রতি কী অমানবিক আচরণ করেছে তার ফিরিস্তি দেবেন। এবার তিনি হয়ে ওঠবেন প্রবল প্রভাবশালী আমলা। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কেন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা হবে না। কেন তিনি চাকরিতে বহাল থাকবেন? এ প্রশ্নের উত্তর সত্যিই আমি খুঁজে পাই না। শুধু এ আমলা নন, এ রকম বহু উদাহরণ আছে। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের ভূমি ও গৃহহীনদের জন্য ঘর বরাদ্দের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দেশের সাত এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ওএসডি করা হয়েছিল। চূড়ান্ত বিচারে তাদের পাঁচজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একজনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তার বেতন গ্রেড এক ধাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজনকে তিরস্কার করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাঠক ভাবুন তো। একজন চুরি করল, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে হাতেনাতে ধরা পড়ল তার শাস্তি হলো যাঃ দুষ্টু। এসব করে না। ছি! এরপর কান মলে দেব কিন্তু। এসব আমলাই এখন সরকারের প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। প্রায়ই শুনি এরাই নাকি দেশ চালায়। এদের চাচা, খালা, নানা, দাদা, দাদার ভাই ইত্যাদি নানা কিসিমের আত্মীয় কবে আওয়ামী লীগের কোন ইউনিয়ন কমিটিতে ছিলেন তার ফিরিস্তি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। আওয়ামী পরিবারের সন্তানে দেশের আমলাতন্ত্র এখন ভরে গেছে। আমলাতন্ত্রের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এখন বাঁশ কাটার ইঁদুর কিলবিল করছে। এদের সামলাবে কে? শুধু দেশে নয়, বিদেশে যারা রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন তাদের কজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন? প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দেশবিরোধী অপপ্রচার নিয়ে কথা বলেছেন। এসব অপপ্রচার বন্ধে আমাদের সিভিল সার্ভিসের সবচেয়ে চৌকশ কর্মকর্তারা (ফরেন সার্ভিস) কতটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন? সে প্রশ্নটিও এখন নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাল না। রাষ্ট্রদূত কী করলেন? বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত কর্মকর্তার ওপর মার্কিন ট্রেজারি বেঞ্চ নিষেধাজ্ঞা জারি করল। বাংলাদেশ দূতাবাস কী করল। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতৃত্বে ছিলেন। আশির দশকের ছাত্র রাজনীতির ঠিকুজি তাঁর মগজে। এক বিকালে ফোন করে বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে কী জানেন? আমি বললাম, তেমন কিছু না। উনি চুক্তিতে আছেন। পরে তিনি যা বললেন তা ভিরমি খাওয়ার মতো। ওই ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করতেন। ছাত্রদলের ব্যানারে হল সংসদে নির্বাচন করেছিলেন। তাঁর ছোট ভাই বুয়েটে ছাত্রশিবিরের ব্যানারে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করেছেন দুবার। একবার এজিএস পদে। পরেরবার জিএস পদে। এ ধরনের একজন অনিরাপদ ব্যক্তি কীভাবে এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান? বিএনপি-জামায়াতের কিংবা যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীদের তো বাইরের লবিস্ট লাগার কথা নয়। এরাই বিএনপি-যুদ্ধাপরাধীদের লবিস্ট হিসেবে কাজ করছেন কি না খতিয়ে দেখা জরুরি।

 

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এক প্রতিবেদনে বলেছেন, জমি অধিগ্রহণের আগেই গত এক বছরে ওই এলাকার জমি অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে কেনাবেচা হয়েছে। এতে সরকারকে ২০ গুণ বেশি দামে জমি কিনতে হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মন্ত্রীর ভাই এবং নিকটজনরা এ জমি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে আগে দুর্নীতির অভিযোগ শুনিনি। তাই বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখার ইচ্ছা হলো। একটু গভীরে গিয়েই দেখলাম এ যেন আরেক পদ্মা সেতুর দুর্নীতির গল্প। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দৃঢ়তার সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর জন্য এখনো ১ টাকাও খরচ হয়নি। কাউকে কাজই দেওয়া হয়নি। তাহলে দুর্নীতিটা হলো কোথায়। এ নিয়ে বহু নাটক হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার একক ও সাহসী সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে। আজ পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২ দশমিক ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনেকটা সে রকম। এখনো জমি অধিগ্রহণই হলো না। তাহলে দুর্নীতি হলো কোথায়? সরকার যখন ভূমি অধিগ্রহণ করে তখন তার মূল্য নির্ধারণ করেন জেলা প্রশাসক। এখানে জমির মালিকদের মূল্য নির্ধারণের কোনো সুযোগ নেই। প্রথমে ১৯৪ কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণ কে করল আর পরে ৫৫৩ কোটি টাকা মূল্যই বা কে নির্ধারণ করল? দুটিই তো জেলা প্রশাসকের অফিস থেকেই হয়েছে। তাহলে মূল্যবৃদ্ধির দায় শিক্ষামন্ত্রীর ওপর বর্তাবে কেন? আমি অঙ্কে বরাবরই কাঁচা। এজন্য সারা জীবন মানবিক শাখায় পড়েছি। ১৯৪ কোটি টাকার ২০ গুণ কি ৫৫৩ কোটি টাকা হয়? এখনই যখন একজন জেলা প্রশাসক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের একজন নেতার বিরুদ্ধে অযাচিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন তখন ভবিষ্যতে বিশেষ করে নির্বাচনের সময় আরও কজন যে কী করবেন তা ভাবার কি কেউ আছে। যে জেলা প্রশাসকের দ্বারা এ কাজটি হয়েছে তিনি আওয়ামী পরিবারের সন্তান- এমন একটি প্রচারণা তীব্রভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা হচ্ছে। আবার সেই ঘরের ইঁদুরের প্রবচনটি সামনে আসে। ‘নিজের লোক’ যে ক্ষতি করতে পারে বাইরের লোক কি ততটা পারে। এ অভিযোগ তো শুধু ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। যেমনভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া মানুষের তালিকা করে, তাদের সবাইকে গুম বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেভাবে বাংলাদেশে মানবাধিকার হরণের কল্পকাহিনি ছড়ানো হচ্ছে। তেমনি ডা. দীপু মনির ঘটনা আওয়ামী লীগকে দুর্নীতিবাজ দেখানোর এক নীরব প্রয়াস কি না কে জানে।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ধৃত একটি প্রবচন দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। এ প্রবাদের মতোই একটি সংস্কৃত শ্লোক আছে। শ্লোকটি এ রকম, ‘ঘরে আওয়ে আনঘেরী বাত কহে বনায়, জানিও পুরো বেরী’ অর্থাৎ ‘অচেনা লোক ঘরে এসে চাটুকারিতা করলে জানবে সে পুরোমাত্রায় শত্রু’।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

Email : [email protected]   সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» দেশে উন্নয়নের নামে ঘুস ও দুর্নীতির জোয়ার বইছে : জিএম কাদের

» জাতির মুক্তির জন্য গণভবন দখল করতে হবে : নুর

» রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ কবরস্থানে দুঃস্থদের জন্য ফি ১০০ টাকা

» আগস্ট মাস এলেই বিএনপি উন্মাদ হয়ে যায়: নাছিম

» বিএনপি সহিংসতা করলে রাজপথে মোকাবিলা করা হবে: ওবায়দুল কাদের

» বিএনপিসহ কিছু দল জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী

» জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে :বেনজীর আহমেদ

» জনগণের দুর্ভোগ যেন না হয় সেটি বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে হবে : মেয়র আতিক

» ইসলামপুরে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর রাস্তা নির্মান কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন

» লালমনিরহাটে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শিশুর মৃত্যু

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ঘরের ইঁদুর বাঁশ কাটলে ধরে রাখে কে

সৈয়দ বোরহান কবীর: একেকটা বাংলা প্রবচন যেন সত্যভাষণ। এসব প্রবচনের উৎপত্তি হাজার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী। তাই তাঁর বক্তৃতা, লেখায় প্রায় সব সময়ই কবিতা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় বাংলা প্রবচন। এই তো সেদিন জাতীয় সংসদেও শীতকালীন অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সে ভাষণে একপর্যায়ে বললেন, ‘ঘরের ইঁদুর বাঁশ কাটলে ধরে রাখে কে?’ বিএনপি-জামায়াতের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ওই মন্তব্য করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত সদস্যের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বেঞ্চের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সংসদে খোলামেলা এবং স্পষ্ট বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য বিএনপি-যুদ্ধাপরাধীরা যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে। তাদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি-যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী কীভাবে এ টাকা পাঠিয়েছে তার তদন্ত হবে। অর্থের উৎস খুঁজে বের করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী যেটা বলতে চেয়েছেন তার সার কথা হলো, দেশের ভিতরের রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছে। এ প্রসঙ্গেই তিনি ওই প্রবচনটি উল্লেখ করেন। এ প্রবচনটির সরাসরি অর্থ হলো, ঘরের শত্রু অনিষ্ট করলে তার হাত থেকে বাঁচা কঠিন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য ও প্রবচন উদ্ধৃতি তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি-জামায়াত, যুদ্ধাপরাধীদের বাইরেও অনেক ঘরের শত্রু সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সতর্কবার্তাটি দিয়েছেন বলেই আমি মনে করি। শেখ হাসিনা একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি আজকের জায়গায় এসেছেন। ভালো করেই জানেন ঘরের শত্রুরা কতটা ভয়ংকর।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময় দেখা গেছে ছদ্মবেশী বিশ্বস্ত ও কাছের মানুষই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিএনপি-যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ সরকারের চেনা শত্রু। কিন্তু এ চেনা শত্রুর চেয়ে বন্ধুরূপে থাকা বিভীষণরাই আসল ক্ষতি করে। ১৯৭৫-এ খুনি মোশতাক জাতির পিতার কাছের মানুষ ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর একাধিক ভাষণে ১৯৭৫-এর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন, এসব খুনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আসত। এরা অনেকেই ‘ঘরের ইঁদুর’ হয়ে বাঁশ কেটেছে। জিয়া মুক্তিযোদ্ধা কাউকে সেনাপ্রধান করে ঝুঁকি নিতে চাননি। জেনারেল মঞ্জুর, জেনারেল শওকতকে বিশ্বাস না করে জিয়া আস্থা রেখেছিলেন পাকিস্তান-ফেরত এরশাদের ওপর। কিন্তু জিয়ার রক্তের ওপর দিয়ে এরশাদই সিংহাসন দখলের নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এরশাদ ক্ষমতা বিপন্মুক্ত করতে যাদের ওপর নির্ভর করেছিলেন শেষ মুহূর্তে কেউ তাঁর পাশে থাকেননি। না তৎকালীন সেনাপ্রধান, না আমলারা। ১৯৯১-এ ক্ষমতায় এসে বেগম জিয়া যাদের বিশ্বাস করেছিলেন তারাই তাঁকে ভুল পথে নিয়ে গেছেন। তাদের কারণেই বেগম জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেননি, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেননি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পালাবদলের পর এরা অনেকেই রং বদলেছেন। ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে দীর্ঘ ২১ বছর পর। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি পদ নিরপেক্ষ রাখার এক মহতী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছিলেন এই তথাকথিত নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপতি। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেগম জিয়া অনেক পেছনে থাকা মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। ফলাফল ব্যাখার প্রয়োজন নেই। এভাবেই ঘরের ইঁদুরের হাতে সবার সর্বনাশ হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বেও ছদ্মবেশী একান্ত কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার উদাহরণ ভূরিভূরি। ১৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগের ঘরে এখন ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে। দেশে কে আওয়ামী লীগ নয় এটাই খুুঁজে বের করা দুরূহ। এত আওয়ামী লীগ, মুজিবভক্তের মধ্যে কে যে ইঁদুর হয়ে বাঁশ কাটছে কে জানে? শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে এ ব্যাপারেই কি সতর্ক করলেন?

 

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কদিন পর আওয়ামী লীগের তুমুল জনপ্রিয় নেতা মির্জা আজমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর। কমাস আগেই আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে একটি সাজানো মামলায় জামিন নিতে জামালপুরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হবেন মির্জা আজম। সে সময় জামালপুরের জেলা প্রশাসক নাসিমুল গনি, কট্টর বিএনপিপন্থি আমলা। জামালপুরের সব ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে তিনি বসলেন। মির্জা আজম হাজিরা দিতে এলেই তাঁকে গ্রেফতার করতে হবে। পরদিন মনোনয়নপত্র দাখিল। মির্জা আজমকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এ ফন্দি আঁটা হয়। তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটদের কেউই রাজি নন। একজন বিএনপিপন্থি ম্যাজিস্ট্রেট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মির্জা আজমকে জেলে পাঠানোর দায়িত্ব নিলেন। মির্জা আজম ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলেন বিএনপিপন্থি শিশু আমলা। ম্যাজিস্ট্রেটের এ সিদ্ধান্তে ফেটে পড়ল মির্জা আজমের নির্বাচনী এলাকার জনগণ। পরে বাধ্য হয়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলো।

 

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। এলাকার এক কাজে আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক গেছেন সচিবালয়ে। একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করতে। ওই সচিবের নামধাম না দেখেই রুমে ঢুকে পড়লেন। কথা বলতে বলতে মির্জা আজমের মনে হলো এই লোককে কোথায় যেন দেখেছি। এরপর ওই সচিব আর মির্জা আজমের কথোপকথন এ রকম-

মির্জা আজম : আপনাকে চেনাচেনা লাগছে। আগে কি আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে?

সচিব : (বিগলিত হাসিতে) জি, আমি তো জামালপুরে চাকরি করেছি।

মির্জা আজম : ওহ, আপনি সেই ম্যাজিস্ট্রেট না। ২০০১ সালে আমাকে গ্রেফতারের চক্রান্ত করেছিলেন।

সচিব : (এবার একটু বিচলিত ভঙ্গিতে) কী যে বলেন স্যার।

মির্জা আজম আর অপেক্ষা করলেন না। সচিবের রুম থেকে বেরিয়ে রাগে-ক্ষোভে দেখা করলেন মন্ত্রীর সঙ্গে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে ঘটনা বললেন। মন্ত্রী বললেন, তাই নাকি!

 

এভাবেই দুর্বৃত্ত ইঁদুরেরা আওয়ামী লীগ সরকারের অন্দরমহলে ঢুকে যাচ্ছে। ২০১৮-এর নির্বাচনের পর আমলারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশে এখন দুই ধরনের আইন আছে। একটা সাধারণ মানুষের, অন্যটা আমলাদের জন্য। একজন স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদ দুর্নীতি করলে তা নিয়ে হইচই হয়। তার কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যায় জেলে। গত দুই বছরে ৩৭ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বর দুর্নীতির দায়ে পদ হারিয়েছেন। তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিচার হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে এসব তৃণমূলের জনপ্রতিনিধির দুর্নীতির খতিয়ানগুলো পড়লাম। দুর্নীতির অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৯ টাকা ৯০ পয়সা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি নিয়েছে সরকার। কাজেই ১ টাকা চুরি করলেও তা অপরাধ। কিন্তু আমলারা করলে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনাকে মোটেও কষ্ট করতে হবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনেই চমকে যাওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়। ভূমিহীনদের জন্য সরকারের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের প্রায় ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন গাইবান্ধা উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণায়লের তদন্তে তার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এজন্য অবশ্য ওই সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জেলে যেতে হয়নি। কোমরে দড়িও বাঁধা হয়নি। তার শাস্তি হয়েছে পদাবনতি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ১২ জানুয়ারি এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- ‘শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে গুরুদণ্ড হিসেবে তাকে পদাবনতির শাস্তি দেওয়া হলো। সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী এখন থেকে তাকে দুই বছর সপ্তম গ্রেডে থাকতে হবে। এ বছর পর আবার তিনি আগের পদ ফিরে পাবেন।’ অকল্পনীয়! ৪ লাখ টাকা আত্মসাতের কারণে ৩৭ জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হলেন। তাঁদের জেলে যেতে হলো। আর ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে খুদে আমলার শাস্তি হলো পদাবনতি। দুই বছর পর আবার তিনি স্বপদে বহাল হবেন। এ দুই বছরে তিনি প্রভাবশালী আমলাদের ঘনিষ্ঠ হবেন। তাদের প্রিয় ও আস্থাভাজন হবেন। তারপর তিনি তরতর করে আগের মতো এগিয়ে যাবেন। এ খুদে আমলার জন্য গাছের এবং তলার ফল খাওয়ার দারুণ এক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কখনো সরকার পরিবর্তন হলেই হলো। তিনি হয়ে যাবেন নির্যাতিত। আওয়ামী লীগ সরকার তার প্রতি কী অমানবিক আচরণ করেছে তার ফিরিস্তি দেবেন। এবার তিনি হয়ে ওঠবেন প্রবল প্রভাবশালী আমলা। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কেন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা হবে না। কেন তিনি চাকরিতে বহাল থাকবেন? এ প্রশ্নের উত্তর সত্যিই আমি খুঁজে পাই না। শুধু এ আমলা নন, এ রকম বহু উদাহরণ আছে। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের ভূমি ও গৃহহীনদের জন্য ঘর বরাদ্দের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দেশের সাত এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ওএসডি করা হয়েছিল। চূড়ান্ত বিচারে তাদের পাঁচজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একজনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তার বেতন গ্রেড এক ধাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজনকে তিরস্কার করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাঠক ভাবুন তো। একজন চুরি করল, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে হাতেনাতে ধরা পড়ল তার শাস্তি হলো যাঃ দুষ্টু। এসব করে না। ছি! এরপর কান মলে দেব কিন্তু। এসব আমলাই এখন সরকারের প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। প্রায়ই শুনি এরাই নাকি দেশ চালায়। এদের চাচা, খালা, নানা, দাদা, দাদার ভাই ইত্যাদি নানা কিসিমের আত্মীয় কবে আওয়ামী লীগের কোন ইউনিয়ন কমিটিতে ছিলেন তার ফিরিস্তি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। আওয়ামী পরিবারের সন্তানে দেশের আমলাতন্ত্র এখন ভরে গেছে। আমলাতন্ত্রের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এখন বাঁশ কাটার ইঁদুর কিলবিল করছে। এদের সামলাবে কে? শুধু দেশে নয়, বিদেশে যারা রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন তাদের কজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন? প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দেশবিরোধী অপপ্রচার নিয়ে কথা বলেছেন। এসব অপপ্রচার বন্ধে আমাদের সিভিল সার্ভিসের সবচেয়ে চৌকশ কর্মকর্তারা (ফরেন সার্ভিস) কতটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন? সে প্রশ্নটিও এখন নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাল না। রাষ্ট্রদূত কী করলেন? বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত কর্মকর্তার ওপর মার্কিন ট্রেজারি বেঞ্চ নিষেধাজ্ঞা জারি করল। বাংলাদেশ দূতাবাস কী করল। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতৃত্বে ছিলেন। আশির দশকের ছাত্র রাজনীতির ঠিকুজি তাঁর মগজে। এক বিকালে ফোন করে বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে কী জানেন? আমি বললাম, তেমন কিছু না। উনি চুক্তিতে আছেন। পরে তিনি যা বললেন তা ভিরমি খাওয়ার মতো। ওই ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করতেন। ছাত্রদলের ব্যানারে হল সংসদে নির্বাচন করেছিলেন। তাঁর ছোট ভাই বুয়েটে ছাত্রশিবিরের ব্যানারে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করেছেন দুবার। একবার এজিএস পদে। পরেরবার জিএস পদে। এ ধরনের একজন অনিরাপদ ব্যক্তি কীভাবে এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান? বিএনপি-জামায়াতের কিংবা যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীদের তো বাইরের লবিস্ট লাগার কথা নয়। এরাই বিএনপি-যুদ্ধাপরাধীদের লবিস্ট হিসেবে কাজ করছেন কি না খতিয়ে দেখা জরুরি।

 

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এক প্রতিবেদনে বলেছেন, জমি অধিগ্রহণের আগেই গত এক বছরে ওই এলাকার জমি অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে কেনাবেচা হয়েছে। এতে সরকারকে ২০ গুণ বেশি দামে জমি কিনতে হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মন্ত্রীর ভাই এবং নিকটজনরা এ জমি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে আগে দুর্নীতির অভিযোগ শুনিনি। তাই বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখার ইচ্ছা হলো। একটু গভীরে গিয়েই দেখলাম এ যেন আরেক পদ্মা সেতুর দুর্নীতির গল্প। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দৃঢ়তার সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর জন্য এখনো ১ টাকাও খরচ হয়নি। কাউকে কাজই দেওয়া হয়নি। তাহলে দুর্নীতিটা হলো কোথায়। এ নিয়ে বহু নাটক হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার একক ও সাহসী সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে। আজ পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২ দশমিক ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনেকটা সে রকম। এখনো জমি অধিগ্রহণই হলো না। তাহলে দুর্নীতি হলো কোথায়? সরকার যখন ভূমি অধিগ্রহণ করে তখন তার মূল্য নির্ধারণ করেন জেলা প্রশাসক। এখানে জমির মালিকদের মূল্য নির্ধারণের কোনো সুযোগ নেই। প্রথমে ১৯৪ কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণ কে করল আর পরে ৫৫৩ কোটি টাকা মূল্যই বা কে নির্ধারণ করল? দুটিই তো জেলা প্রশাসকের অফিস থেকেই হয়েছে। তাহলে মূল্যবৃদ্ধির দায় শিক্ষামন্ত্রীর ওপর বর্তাবে কেন? আমি অঙ্কে বরাবরই কাঁচা। এজন্য সারা জীবন মানবিক শাখায় পড়েছি। ১৯৪ কোটি টাকার ২০ গুণ কি ৫৫৩ কোটি টাকা হয়? এখনই যখন একজন জেলা প্রশাসক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের একজন নেতার বিরুদ্ধে অযাচিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন তখন ভবিষ্যতে বিশেষ করে নির্বাচনের সময় আরও কজন যে কী করবেন তা ভাবার কি কেউ আছে। যে জেলা প্রশাসকের দ্বারা এ কাজটি হয়েছে তিনি আওয়ামী পরিবারের সন্তান- এমন একটি প্রচারণা তীব্রভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা হচ্ছে। আবার সেই ঘরের ইঁদুরের প্রবচনটি সামনে আসে। ‘নিজের লোক’ যে ক্ষতি করতে পারে বাইরের লোক কি ততটা পারে। এ অভিযোগ তো শুধু ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। যেমনভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া মানুষের তালিকা করে, তাদের সবাইকে গুম বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেভাবে বাংলাদেশে মানবাধিকার হরণের কল্পকাহিনি ছড়ানো হচ্ছে। তেমনি ডা. দীপু মনির ঘটনা আওয়ামী লীগকে দুর্নীতিবাজ দেখানোর এক নীরব প্রয়াস কি না কে জানে।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ধৃত একটি প্রবচন দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। এ প্রবাদের মতোই একটি সংস্কৃত শ্লোক আছে। শ্লোকটি এ রকম, ‘ঘরে আওয়ে আনঘেরী বাত কহে বনায়, জানিও পুরো বেরী’ অর্থাৎ ‘অচেনা লোক ঘরে এসে চাটুকারিতা করলে জানবে সে পুরোমাত্রায় শত্রু’।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

Email : [email protected]   সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com