ইউরোপ যাত্রায় মৃত্যুফাঁদ

সুনামগঞ্জের ২৫ বছরের যুবক সাজ্জাদুর রহমান। সচ্ছল পরিবারের সন্তান। বাবা নুরুল আমিন তালুকদার সুনামগঞ্জে একটি হাইস্কুল কমিটির সভাপতি। চাচা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সাজ্জাদের এক ভাই আইনজীবী ও অন্য দুই ভাই স্নাতক অধ্যয়নরত। পরিবার থেকে বিদেশে পাঠাতে অনীহা। কারণ এখানে সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন। কিন্তু সাজ্জাদকে ইতালির প্রলোভন দেখায় স্থানীয় তিন দালাল। একেবারেই সহজ পথে নিশ্চিত ইতালির হাতছানি দেখানো হয় তাকে। ফলে সাজ্জাদ বিদেশ যাওয়ার জন্য হঠাৎ পাগলপ্রায় হয়ে যায়। পরিবার থেকে শত চেষ্টায়ও তাকে বোঝানো যায়নি। বিদেশ যাওয়ার টাকা দিয়ে দেশে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু সাজ্জাদকে বোঝানো যায়নি। বিদেশ না পাঠালে সে আত্মহত্যার হুমকিও দেয়। বাধ্য হয়ে রাজি হয় পরিবার।

 

সাজ্জাদ শিমুলবাক ইউনিয়নের দালাল রফিকুল ও সাজিদুর এবং জগন্নাথপুরের দালাল কাওছারের হাতে তুলে দেয় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। সেই টাকায় তাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়। গত নভেম্বরে সিলেট থেকে রওনা হয়ে দুবাই পৌঁছায় সাজ্জাদ। দুবাই থেকে তাকে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। এরপর দুই মাস থাকে লিবিয়াতেই। সেখান থেকে নৌকায় ভূমধ্যসাগরে মরণযাত্রা শুরু হয় গত ২৪ জানুয়ারি। সাজ্জাদের সঙ্গে ওই নৌকায় থাকা ভাতিজা জানান, নৌকা যাত্রা শুরুর পরই শুরু হয় তীব্র বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে সেই বৃষ্টিতে খোলা নৌকায় ভিজতে হয়। বৃষ্টির মধ্যেই পা মুড়িয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। একসময় সাজ্জাদকে ডাকলেও সাড়া মিলছিল না। পরে গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকানোর সঙ্গে সঙ্গে সাজ্জাদ বসা থেকে নৌকার মেঝেতে পড়ে যায়। বোঝা যায় সে বসে থাকতে থাকতেই মারা গেছে। তার হাত-পা পুরো শরীর ঠান্ডায় সাদা হয়ে গিয়েছিল।

 

ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডায় থাকার কারণে নৌকাতেই মারা যায় সুনামগঞ্জের সাজ্জাদসহ সাত বাংলাদেশি। অন্য ছয়জনের পাঁচজনই মাদারীপুরের। তারা হলেন- ইমরান হোসেন, রতন তালুকদার জয়, সাফায়েত, জহিরুল ও বাপ্পী। বাকিজন হলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সাইফুল। নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া বাকিরা এখন আছেন ইতালির ল্যাম্পেডুসা দীপের হটস্পট ক্যাম্পে। সেখানে তাদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে মৌখিকভাবে এই               সাতজনের নাম-পরিচয় জানতে পারেন বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর এরফানুল হক। শ্রম কাউন্সিলর এরফানুল হক গতকাল ইতালি থেকে  বলেন, মৃতদেহগুলো বর্তমানে রোম থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরের শহর আগ্রিজেন্টায় মর্গে রাখা আছে। সেখানে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হবে। পরে সরকারি খরচে দেশে পাঠানো হবে। ইতালিতে দাফন না করে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে। মৃতদেহের সঙ্গে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি তাই মৌখিকভাবে পাওয়া পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। দূতাবাসের দেওয়া পরিচয়ের সূত্র ধরে পক্ষ থেকে খোঁজখবর নিয়ে তাদের প্রত্যেকের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম পেয়ারপুর গ্রামের শাজাহান হাওলাদারের ছেলে ইমরান হোসেন, বড়াইবাড়ী গ্রামের প্রেমানন্দ তালুকদার পলাশের ছেলে রতন তালুকদার জয়, ঘটকচরের সাফায়েত, মোস্তফাপুরের জহিরুল ইসলাম এবং মাদারীপুর সদরের বাপ্পী। ইমরানের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ইমরানের বাবা পেশায় ভ্যানচালক। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে সুদে এবং এনজিও থেকে ঋণ করে ছেলেকে ইউরোপের পাঠাতে চেয়েছিলেন। গত বছর অক্টোবর মাসে ধারদেনা করে দালাল সামাদের কাছে প্রথম কিস্তিতে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে লিবিয়া পৌঁছানোর পরে আরও সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেন দালালের কাছে। কিন্তু মরণযাত্রার পথে মারা যায় ইমরান।

 

নিহত রতন তালুকদার জয়ের বাবা প্রেমানন্দ তালুকদার পলাশ পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে জয় মেজ। প্রেমানন্দ তালুকদার বলেন, ‘যে কাজ করি তা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়।  আমাগো এলাকার ছেলে জামাল (দালাল)। জামালই ইতালিতে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরে ওরে বিশ্বাস কইরা ধারদেনা আর জমি বেইচা ৭ লাখ টাকা জোগাড় করি। প্রথমে দালালরে ৫০ হাজার দিছি। পরে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরে সাড়ে ৬ লাখ দিছি। এতগুলা টাকা গেল, তবু যদি পোলাডা বাঁইচা থাকত, তাহলে দুঃখ থাকত না। আমাগো সব শ্যাষ হইয়া গেল। এহন আমি কী যে করমু, কিছুই বুঝতে পারতেছি না। আমার পোলার লাশটা যেন পাই। আর কোনো আবদার নাই।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় দালাল জামাল খান বড়াইলবাড়ী এলাকার সোনা মিয়া খানের ছেলে। ইতালিতে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে জামাল ৭ লাখ করে টাকা নেন। জয়ের মৃত্যুর খবরের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে জামাল মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদারীপুর সদর থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা রয়েছে। এ মামলায় তিনি দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বের হন। আবার শুরু করেন দালালি পেশা।

 

জয়ের পরিবারের সদস্যরা বলেন, জয়েরা চার চাচাতো ভাই একসঙ্গে ইউরোপ যাওয়ার আশায় মেতেছিলেন। দালালের প্রলোভনে গত ২৮ নভেম্বর জয় তালুকদার ও তারই চাচাতো ভাই প্রদীপ তালুকদার, মিঠু তালুকদার, তন্ময় তালুকদারসহ ছয় তরুণ ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মাদারীপুর ছাড়েন। তারা দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় প্রায় দেড় মাস বন্দী থাকেন।

 

এখন ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে আহাজারি করছেন মা লক্ষ্মী তালুকদার। ছেলের মুখ দেখার জন্য সবার কাছে আকুতি জানাচ্ছেন। সাগরপথে যাত্রা হওয়ার আগে গত ২২ জানুয়ারি সকালে জয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। ছেলের সঙ্গে সবশেষ বলা কথা স্মরণ করে তিনি বলেন,  ‘ও কইছিল, ইতালি গিয়া ফোন দিব। ওরে একবার ফোন দিতে কও। আমি বাজানের মুখটা একটু দেখতে চাই।’ ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান  বলেন, মৃতদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে পাঠানোর লক্ষ্যে দূতাবাস কাজ করছে। রবিবার বন্ধের দিন থাকায় প্রক্রিয়া একদিন পিছিয়েছে। কিন্তু মৌখিকভাবে যোগাযোগ করে রাখা হয়েছে। মৃতদেহ ইতালিতে দাফনের যে কথা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটা সত্য নয়। দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর এরফানুল হক  বলেন, মৃহদেহ দেশে পাঠাতে হলে পরিচয় নিশ্চিত করার কাগজপত্রের প্রয়োজন আছে। যেহেতু মৃতদেহের সঙ্গে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি তাই মৌখিকভাবে পাওয়া পরিচয় জানিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের ইমেইলে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সাজ্জাদসহ কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের মাধ্যমে বাকিদের পাসপোর্টের কপিসহ পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সবার পরিচয় নিশ্চিত হলে মৃতদেহ সরকারি খরচে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ দূতাবাস। ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, সেই নৌকায় ছিলেন ২৮৭ জন। এরমধ্যে ২৭৩ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। বাকি ১৪ জন ছিলেন মিসরীয়। এই অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় করে লিবিয়ার উপকূল থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। যাত্রা শুরুর এক দিন পরে ভূমধ্যসাগরে প্রচ- ঝড় বাতাসের পর টানা বৃষ্টি হয়। নৌকাটি ভাসতে ভাসতে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে ইতালিয়ান কোস্টগার্ডের সদস্যরা মৃতদেহ ও জীবিতদের উদ্ধার করে।সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বাংলাদেশ যেন দুর্ভিক্ষের কবলে না পড়ে: সচিবদের প্রধানমন্ত্রী

» ২ মিনিটেই গোল দিয়ে শুরু করলো কানাডা

» শেখ হাসিনা কখনো বলেননি জোর করে ক্ষমতায় থাকবেন: শাজাহান খান

» সরকার ও জনগণের সম্পত্তি হেফাজত করতে হবে: ডিএমপি কমিশনার

» বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা দেশের মানুষকে তাদের প্রজা বানাতে চায়: আইনমন্ত্রী

» মানুষের অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম: শিক্ষামন্ত্রী

» দুই ক্যাটাগরিতে ‘মাস্টারকার্ড এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২২’ পেল নগদ

» কোনো ষড়যন্ত্রই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে থামাতে পারবে না -ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

» নারায়ণগঞ্জে কবিতা বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত 

» বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না: রওশন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ইউরোপ যাত্রায় মৃত্যুফাঁদ

সুনামগঞ্জের ২৫ বছরের যুবক সাজ্জাদুর রহমান। সচ্ছল পরিবারের সন্তান। বাবা নুরুল আমিন তালুকদার সুনামগঞ্জে একটি হাইস্কুল কমিটির সভাপতি। চাচা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সাজ্জাদের এক ভাই আইনজীবী ও অন্য দুই ভাই স্নাতক অধ্যয়নরত। পরিবার থেকে বিদেশে পাঠাতে অনীহা। কারণ এখানে সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন। কিন্তু সাজ্জাদকে ইতালির প্রলোভন দেখায় স্থানীয় তিন দালাল। একেবারেই সহজ পথে নিশ্চিত ইতালির হাতছানি দেখানো হয় তাকে। ফলে সাজ্জাদ বিদেশ যাওয়ার জন্য হঠাৎ পাগলপ্রায় হয়ে যায়। পরিবার থেকে শত চেষ্টায়ও তাকে বোঝানো যায়নি। বিদেশ যাওয়ার টাকা দিয়ে দেশে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু সাজ্জাদকে বোঝানো যায়নি। বিদেশ না পাঠালে সে আত্মহত্যার হুমকিও দেয়। বাধ্য হয়ে রাজি হয় পরিবার।

 

সাজ্জাদ শিমুলবাক ইউনিয়নের দালাল রফিকুল ও সাজিদুর এবং জগন্নাথপুরের দালাল কাওছারের হাতে তুলে দেয় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। সেই টাকায় তাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়। গত নভেম্বরে সিলেট থেকে রওনা হয়ে দুবাই পৌঁছায় সাজ্জাদ। দুবাই থেকে তাকে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। এরপর দুই মাস থাকে লিবিয়াতেই। সেখান থেকে নৌকায় ভূমধ্যসাগরে মরণযাত্রা শুরু হয় গত ২৪ জানুয়ারি। সাজ্জাদের সঙ্গে ওই নৌকায় থাকা ভাতিজা জানান, নৌকা যাত্রা শুরুর পরই শুরু হয় তীব্র বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে সেই বৃষ্টিতে খোলা নৌকায় ভিজতে হয়। বৃষ্টির মধ্যেই পা মুড়িয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। একসময় সাজ্জাদকে ডাকলেও সাড়া মিলছিল না। পরে গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকানোর সঙ্গে সঙ্গে সাজ্জাদ বসা থেকে নৌকার মেঝেতে পড়ে যায়। বোঝা যায় সে বসে থাকতে থাকতেই মারা গেছে। তার হাত-পা পুরো শরীর ঠান্ডায় সাদা হয়ে গিয়েছিল।

 

ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডায় থাকার কারণে নৌকাতেই মারা যায় সুনামগঞ্জের সাজ্জাদসহ সাত বাংলাদেশি। অন্য ছয়জনের পাঁচজনই মাদারীপুরের। তারা হলেন- ইমরান হোসেন, রতন তালুকদার জয়, সাফায়েত, জহিরুল ও বাপ্পী। বাকিজন হলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সাইফুল। নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া বাকিরা এখন আছেন ইতালির ল্যাম্পেডুসা দীপের হটস্পট ক্যাম্পে। সেখানে তাদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে মৌখিকভাবে এই               সাতজনের নাম-পরিচয় জানতে পারেন বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর এরফানুল হক। শ্রম কাউন্সিলর এরফানুল হক গতকাল ইতালি থেকে  বলেন, মৃতদেহগুলো বর্তমানে রোম থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরের শহর আগ্রিজেন্টায় মর্গে রাখা আছে। সেখানে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হবে। পরে সরকারি খরচে দেশে পাঠানো হবে। ইতালিতে দাফন না করে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে। মৃতদেহের সঙ্গে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি তাই মৌখিকভাবে পাওয়া পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। দূতাবাসের দেওয়া পরিচয়ের সূত্র ধরে পক্ষ থেকে খোঁজখবর নিয়ে তাদের প্রত্যেকের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম পেয়ারপুর গ্রামের শাজাহান হাওলাদারের ছেলে ইমরান হোসেন, বড়াইবাড়ী গ্রামের প্রেমানন্দ তালুকদার পলাশের ছেলে রতন তালুকদার জয়, ঘটকচরের সাফায়েত, মোস্তফাপুরের জহিরুল ইসলাম এবং মাদারীপুর সদরের বাপ্পী। ইমরানের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ইমরানের বাবা পেশায় ভ্যানচালক। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে সুদে এবং এনজিও থেকে ঋণ করে ছেলেকে ইউরোপের পাঠাতে চেয়েছিলেন। গত বছর অক্টোবর মাসে ধারদেনা করে দালাল সামাদের কাছে প্রথম কিস্তিতে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে লিবিয়া পৌঁছানোর পরে আরও সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেন দালালের কাছে। কিন্তু মরণযাত্রার পথে মারা যায় ইমরান।

 

নিহত রতন তালুকদার জয়ের বাবা প্রেমানন্দ তালুকদার পলাশ পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে জয় মেজ। প্রেমানন্দ তালুকদার বলেন, ‘যে কাজ করি তা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়।  আমাগো এলাকার ছেলে জামাল (দালাল)। জামালই ইতালিতে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরে ওরে বিশ্বাস কইরা ধারদেনা আর জমি বেইচা ৭ লাখ টাকা জোগাড় করি। প্রথমে দালালরে ৫০ হাজার দিছি। পরে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরে সাড়ে ৬ লাখ দিছি। এতগুলা টাকা গেল, তবু যদি পোলাডা বাঁইচা থাকত, তাহলে দুঃখ থাকত না। আমাগো সব শ্যাষ হইয়া গেল। এহন আমি কী যে করমু, কিছুই বুঝতে পারতেছি না। আমার পোলার লাশটা যেন পাই। আর কোনো আবদার নাই।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় দালাল জামাল খান বড়াইলবাড়ী এলাকার সোনা মিয়া খানের ছেলে। ইতালিতে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে জামাল ৭ লাখ করে টাকা নেন। জয়ের মৃত্যুর খবরের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে জামাল মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদারীপুর সদর থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা রয়েছে। এ মামলায় তিনি দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বের হন। আবার শুরু করেন দালালি পেশা।

 

জয়ের পরিবারের সদস্যরা বলেন, জয়েরা চার চাচাতো ভাই একসঙ্গে ইউরোপ যাওয়ার আশায় মেতেছিলেন। দালালের প্রলোভনে গত ২৮ নভেম্বর জয় তালুকদার ও তারই চাচাতো ভাই প্রদীপ তালুকদার, মিঠু তালুকদার, তন্ময় তালুকদারসহ ছয় তরুণ ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মাদারীপুর ছাড়েন। তারা দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় প্রায় দেড় মাস বন্দী থাকেন।

 

এখন ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে আহাজারি করছেন মা লক্ষ্মী তালুকদার। ছেলের মুখ দেখার জন্য সবার কাছে আকুতি জানাচ্ছেন। সাগরপথে যাত্রা হওয়ার আগে গত ২২ জানুয়ারি সকালে জয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। ছেলের সঙ্গে সবশেষ বলা কথা স্মরণ করে তিনি বলেন,  ‘ও কইছিল, ইতালি গিয়া ফোন দিব। ওরে একবার ফোন দিতে কও। আমি বাজানের মুখটা একটু দেখতে চাই।’ ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান  বলেন, মৃতদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে পাঠানোর লক্ষ্যে দূতাবাস কাজ করছে। রবিবার বন্ধের দিন থাকায় প্রক্রিয়া একদিন পিছিয়েছে। কিন্তু মৌখিকভাবে যোগাযোগ করে রাখা হয়েছে। মৃতদেহ ইতালিতে দাফনের যে কথা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটা সত্য নয়। দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর এরফানুল হক  বলেন, মৃহদেহ দেশে পাঠাতে হলে পরিচয় নিশ্চিত করার কাগজপত্রের প্রয়োজন আছে। যেহেতু মৃতদেহের সঙ্গে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি তাই মৌখিকভাবে পাওয়া পরিচয় জানিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের ইমেইলে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সাজ্জাদসহ কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের মাধ্যমে বাকিদের পাসপোর্টের কপিসহ পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সবার পরিচয় নিশ্চিত হলে মৃতদেহ সরকারি খরচে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ দূতাবাস। ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, সেই নৌকায় ছিলেন ২৮৭ জন। এরমধ্যে ২৭৩ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। বাকি ১৪ জন ছিলেন মিসরীয়। এই অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় করে লিবিয়ার উপকূল থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। যাত্রা শুরুর এক দিন পরে ভূমধ্যসাগরে প্রচ- ঝড় বাতাসের পর টানা বৃষ্টি হয়। নৌকাটি ভাসতে ভাসতে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে ইতালিয়ান কোস্টগার্ডের সদস্যরা মৃতদেহ ও জীবিতদের উদ্ধার করে।সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com