অন্যের খাবার পৌঁছে দেয়াই তাদের পেশা

নিজের ঘরের খাবার যোগাতে ওরা অন্যের ঘরে পৌঁছে দেন খাবার। শিক্ষিত, বেকার এমন অসংখ্য যুবক এখন এ কাজে জড়িত। কেউ সাইকেল নিয়ে, কেউবা মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। ওরা খাবার ডেলিভারীম্যান। দেশে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা খাবারের অর্ডার নেয়। আবার এ খাবার ভোক্তার ঘরে পৌঁছে দেয়। এরমধ্যে অন্যতম একটি হলো ফুডপান্ডা। যেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি রেজিস্টার্ড ব্যক্তি কাজ করছেন ।

খাবার সরবরাহের এ কাজ করে অনেক শিক্ষাথী কিছুটা হলেও নিজের জীবনে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। আবার কেউ সংসার চালাচ্ছেন এ কাজ করে। এমনই একজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তুষার হাওলাদার। প্রতিদিন বিকালে বেরিয়ে পড়েন সাইকেল নিয়ে। করেন খাবার পরিবহন। হাত খরচের টাকাটা উঠে যায় তার। তুষার বলেন, পরিবারের ওপর চাপ কমাতে কি করা যায় ভাবছিলাম। স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য ভালো মাধ্যম মনে হলো খাবার পরিবহন। তুষার বলেন, ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয় প্রতিদিন। এই টাকা দিয়ে আমার হাত খরচ খুব ভালো ভাবেই উঠে যায়।

 

রাকিব হাসান সদ্য আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। তিনি মোহাম্মাদপুর এলাকায় ফুডপান্ডার ডেলিভারি ম্যানের কাজ করেন। তিনি তার মেসের এক ভাইয়ের মাধ্যমে এ পেশায় যোগ দেন। বাইকের তেলের খরচের টাকাসহ তার হাত খরচের টাকা এতে উঠে আসে। এতে করে পরিবারের উপর থেকে চাপ কমে গেছে অনেকটা। প্রথমে রাকিব তার পরিবারের কাউকে জানাতে চাননি। কাজ করতেন বাবার মোটরসাইকেল নিয়ে। বাবা মোটারসাইকেল ফেরত চাইলে এই কাজের কথা বলেন। রাকিব বলেন, এটা শোনার পর ভেবেছিলাম বাবা রাগ হবে। কিন্তু না বাবা সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি বলেন, সব সময় এক রকম ডেলিভারি হয় না। তবে তিনি বলেন, গড়ে প্রতি মাসে ৮-১০ হাজার টাকা আয় হয়। কাজ করি দৈনিক ৩ ঘণ্টা। অনেকে আবার আছেন যারা আগে চালক বা রিকশাচালক ছিলেন, তারা এখন পুরোদমে এ পেশায় কাজ করেন। তাদের মাসিক সর্বোচ্চ আয় ৪০ হাজার টাকার মতো।

 

শুধু শিক্ষার্থী নয়, এসব অনলাইন প্ল্যাটফরমে আয়ের উৎস করে নিয়েছেন অনেক বেকার। বসুন্ধরায় একটি জুয়েলার্সে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন আলী আকবর। করোনাকালে চাকরি হারিয়েছেন তিনি। বলেন, করোনার সময় চাকরি হারিয়ে খুব ঝামেলায় পড়ে যাই। এরপর বন্ধুর একটা মোটরসাইকেল ধারে কিনে খাবার সরবরাহ করা শুরু করি। এরপর থেকে এটাই করে যাচ্ছি। মাঝে কয়েকদিন রাইড শেয়ারিং করেছিলাম। কিন্তু মোটরসাইকেলের অবস্থা খুব একটা ভালো না হওয়ায় নানা সমস্যা দেখা দেয়। এরপর ফের খাবার পরিবহন করা শুরু করি। তিনি জানান, মাসে তার ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হয়।

 

আবার ফুডপান্ডায় কাজ করে অসহায় বোনের সম্বল হয়েছিলেন এক ভাই। ছোট দুই সন্তানকে রেখে করোনায় মৃত্যুবরণ করেন আবুল বাশার। অসহায় বোনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রবিউল ইসলাম। খুলনা থেকে বোনের পাশে দাঁড়াতে আসেন ঢাকায়। উপায়ান্ত না দেখে নেমে পড়েন খাবার পরিবহনের কাজে। এখন তার বোনের চাকরি হয়েছে। কিন্তু চাকরি হওয়ার আগে বেশ কয়েক মাস নিদারুণ অভাবে ছিল পরিবারটি। হাঁড়ির চাল থেকে ছোট ছেলের দুধ সবই যে ফুরিয়ে যাচ্ছিল সহসাই। এই সময়টায় প্রায় চার মাস ফুডপান্ডায় কাজ করে চালিয়েছেন সংসার।

 

এসব খাবার পরিবহন করতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকারও হন তারা। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাদ আহমেদ বলেন, একবার গ্রিনরোডে এক বাড়িতে খাবার দিতে গিয়েছি। নিচে গিয়ে কল দিয়েছি তারা আমাকে বলেন, ১০ মিনিট দাঁড়ান লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি। এরপর প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা। ফোন দিলেও ফোন ধরেন না। তারপর আমি খাবার নিয়েই চলে আসি। এরপর রাস্তায় থাকা অবস্থায় কল দেন। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। অভিযোগ জানান। এরপর খাবার নিয়ে যাবার পরও নানা বাজে কথা বলেন। যা মেনে নেয়ার মতো না। তার খাবারের বিল হয়েছিল ২৯০ টাকা। আমাকে বলে, যা তোরে দিলাম এটা। আমি ১০ টাকা তার সামনে রেখে চলে এসেছিলাম। সেদিন কান্না চলে এসেছিল আমার।

 

নিয়মিত ফুডপান্ডা, হাংরিনাকি, পাঠাও, সহজ ডটকম এসব অনলাইন প্লাটফরমে খাবার অর্ডার করেন গণমাধ্যমকর্মী অনিম আরাফাত। তিনি বলেন, আমি বাসাতে যেসব খাবার তৈরি করতে পারি না সেসব খাবার অর্ডার করি। তাদের এলগারিদম অনেক ভালো। আমার পছন্দের যেসব খাবার আছে তারা সেগুলোই প্রদর্শন করে। আর তাদের খাবার খুবই কম সময়ে ও তুলনামূলক অনেক কমদামে মেলে। তাই নিয়মিত অর্ডার করা হয়।
এ ছাড়াও অনলাইনে করোনাকালে পোশাক বিক্রি করে বেশ নাম কুড়িয়েছেন আফরোজা জাহান শান্তা। তিনি বলেন, দুই বাচ্চাকে সামলিয়ে আমার ব্যবসা সামলাতে হয়। ফলে প্রায়শই রান্নার দিকে তেমন নজর দেয়া হয় না। আমি রেস্তরাঁয় খেতে গেলে আমার খরচ ধরেন ৩০০ টাকা। আমি অর্ডার করলে লাগে ২৫০ টাকা। অধিকাংশ সময় লাগে না কোনো সার্ভিস চার্জ।

 

এসব অনলাইন খাবার অর্ডারে প্রায়শই অনেক ছাড় মেলে। কিন্তু কীভাবে মেলে এই ছাড়! এই বিষয়ে জানতে ধানমণ্ডির পাইন অ্যাপল রেস্তরাঁর স্বত্বাধিকারী মো. সুমন খান বলেন, আমার রেস্তরাঁয় একসঙ্গে খেতে পারেন সর্বোচ্চ ৩০ জন। একজন খেতে বসে সর্বনিম্ন ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করেন। আমার এখানে পাস্তা বিক্রি করা হয় এক প্লেট ১৫০ টাকায়। আমি অনলাইনে এই খাবার ২০ টাকা ছাড় দিচ্ছি। এতে আমার গ্রাহক যেমন বাড়ছে। এ ছাড়াও লাগছে না বিদ্যুৎ বিল, কর্মী ইত্যাদি। ফলে ছাড় দেয়ার পরও অনেক সময় পরিবহন বিলও ছাড় দেয়া সম্ভব হয়।

 

এই রেস্তরাঁটি পাস্তার জন্য বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। সুমন আরও বলেন, আমি দিনে এখন গড়ে ৩০০ প্লেট পাস্তার অর্ডার পাই। কিন্তু রেস্তরাঁয় এসে সারা দিনে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১২০ প্লেট পাস্তা বিক্রি হয়।
আবার এসব শিক্ষার্থী আয়ের সুযোগ পেলেও ক্ষোভও আছে তাদের। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্রেতা ডেলিভারি বাতিল করলেও সফটওয়ারের সমস্যার কারণে অনেক সময় পরিবহনকারীর আইডি স্থগিত করা হয়। এই স্থতিগাদেশ তুলতে হয় তাদের অফিসে গিয়ে। এতে ভোগান্তি  পোহাতে হয় তাদের। অপেক্ষা করতে হয় এক ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত। নানা কারণে দেয়া হয় স্থগিতাদেশ। এরমধ্যে টাকা জমা দিতে দেরি হওয়া অন্যতম। খাবার ডেলিভারিতে দেরি হলে গ্রহকরা অভিযোগ করেন। অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়।

 

আবার অনেক সময় ডেলিভারির তথ্য গায়েব হয়ে যায়। অনেক সময় ১৫টি ডেলিভারি দিলেও তার দেখানো হয় ২ থেকে ৩টি কম। সে সময় অফিসে গিয়ে গুগল ম্যাপের প্রমাণ দেখালে সে অর্থ মেলে। প্রমাণের পর মেলে অর্ধেক অর্থ।

 

নতুন রাইডারদের খাবার ডেলিভারি রেইট আগে ২০ টাকা করে দিলেও তাদের দাবির মুখে এখন ২৫ টাকা কওে দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে তরুণদের কাজের শিফট মেলেনা সুবিধামতো সময়ে। আর অভিজ্ঞদের ডেলিভারি চার্জও দেয়া হয় বেশি। ফলে পার্ট টাইম চাকরির আশায় আশা শিক্ষার্থীরা পোহান ভোগান্তি।

 

আবার কাজের শুরুতে ব্যাগ ও টি-শার্ট দেয়া হয়। যার জন্য তাদের কাছে রাখা হয় ২৬০০ টাকা। যা প্রতি সপ্তাহে ৪০০ টাকা করে কেটে নেয়া হয়। এটিকে সকলেই বাড়তি বলেই উল্লেখ করেন। আবার ডেলিভারি চার্জের টাকা অধিকাংশই বিকাশে দেন। অথচ এসব কোম্পানি ক্যাশ আউট করার কোনো খরচ বহন করে না।  ক্রেতা যে খাবার কিনে সেই টাকা আবার ফুডপান্ডাকে বিকাশে পেমেন্ট করা যায় না। এর জন্য আবার তাকে নগদের এজেন্টের দোকানে যেতে হয়। আবার সব নগদের দোকানের এজেন্ট ফুডপান্ডার টাকা নেয় না। ফলে ৫ থেকে ১০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয়। আবার অনেক সময় ক্রেতা ডেলিভারি বাতিল করলেও সফটওয়ারের সমস্যার কারণে তা আপডেট হয় না। তখন ফুডপান্ডার অফিসে যেয়ে এই সাসপেন তুলে আসতে হয়।

 

আইনুদ্দীন আল আজাদ কুষ্টিয়ার রবিন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কাজ করতেন কুষ্টিয়াতেই। তবে রাজধানীর মতো আয় হয় না সেখানে। ৩ ঘণ্টা কাজ করলে আয় হতো ১০০ থেকে ১৭৫ টাকা। ফলে কাজ করা ছেড়ে দেন তিনি।

 

মামুন হোসেন মোহাম্মাদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে বিবিএ’তে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২০ সালের প্রথমদিকে তিনি যখন এ পেশায় কাজ শুরু করেন তখন প্রতি ডেলিভারিতে ৩৫ টাকা করে দেয়া হলেও এখন ২৫ টাকা করে দেয়া হয়। তার ইচ্ছামতো শিফটে খাবার সরবরাহ করেন। মাসিক হাত খরচের জন্য ৮ হাজার টাকা খুব সহজেই আয় করেন তিনি। তবে বিষয়টি এখনো জানে না বাসায়। কাজ করতে গিয়ে মামুন তার সাইকেল হারিয়ে ফেলেন রেস্তরাঁর সামনে থেকে। সাইকেল না থাকায় মাঝে দু’সপ্তাহ কাজ করা হয়নি। জানতে চাইলে ফুডপান্ডার অপারেশনস অফিসার ও হেড অব মার্কেটিং সৌরভ দে বলেন, আমাদের ওয়ার্কিং মডেলটা এভাবেই সাজানো যাতে অধিক মানুষ কাজ করতে পারেন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী এর দ্বারা উপকার পাচ্ছেন।  আমরা চাই এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে যারা আগ্রহী তারা সকলেই উপকৃত হউক। আমরা গ্রাহকের কাছে সর্বোচ্চ সেবাটা পৌঁছে দিতে চাই। আমরা তাদের নানা ট্রেনিং পর্যন্ত দিয়ে থাকি। আমাদের যে অর্থটা নেয়া হয় এটা একটা সার্ভিস চার্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা তাদের কাছে অর্থটা ভেঙে নেই যাতে চাপ না হয়। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের এসব নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, এসব অভিযোগ খুব দ্রুতই সমাধান হবে।

সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» “বিডিএস বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করুন” জেডএসওদের প্রতি ভূমিমন্ত্রী

» রিয়েলমি নোট ৫০ কিনতে আউটলেটগুলোতে গ্রাহকের উপচে পড়া ভীড়

» কৃষিখাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব-সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, এমপি

» পিপিএম পদক পেলেন নওগাঁর এসপি রাশিদুল হক

» সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সব ধরনের ফি দেওয়া যাবে নগদ-এ

» শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে-ধর্মমন্ত্রী

» প্রথম ছবিতেই বাবার সঙ্গে অভিনয় করবেন সুহানা!

» বাসচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

» সাগর-রুনি হত্যা মামলার প্রতিবেদন ১০৬ বারের মতো পেছাল

» নিরাপদ-পরিবেশবান্ধব শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে: রাষ্ট্রপতি

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

অন্যের খাবার পৌঁছে দেয়াই তাদের পেশা

নিজের ঘরের খাবার যোগাতে ওরা অন্যের ঘরে পৌঁছে দেন খাবার। শিক্ষিত, বেকার এমন অসংখ্য যুবক এখন এ কাজে জড়িত। কেউ সাইকেল নিয়ে, কেউবা মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। ওরা খাবার ডেলিভারীম্যান। দেশে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা খাবারের অর্ডার নেয়। আবার এ খাবার ভোক্তার ঘরে পৌঁছে দেয়। এরমধ্যে অন্যতম একটি হলো ফুডপান্ডা। যেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি রেজিস্টার্ড ব্যক্তি কাজ করছেন ।

খাবার সরবরাহের এ কাজ করে অনেক শিক্ষাথী কিছুটা হলেও নিজের জীবনে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। আবার কেউ সংসার চালাচ্ছেন এ কাজ করে। এমনই একজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তুষার হাওলাদার। প্রতিদিন বিকালে বেরিয়ে পড়েন সাইকেল নিয়ে। করেন খাবার পরিবহন। হাত খরচের টাকাটা উঠে যায় তার। তুষার বলেন, পরিবারের ওপর চাপ কমাতে কি করা যায় ভাবছিলাম। স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য ভালো মাধ্যম মনে হলো খাবার পরিবহন। তুষার বলেন, ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয় প্রতিদিন। এই টাকা দিয়ে আমার হাত খরচ খুব ভালো ভাবেই উঠে যায়।

 

রাকিব হাসান সদ্য আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। তিনি মোহাম্মাদপুর এলাকায় ফুডপান্ডার ডেলিভারি ম্যানের কাজ করেন। তিনি তার মেসের এক ভাইয়ের মাধ্যমে এ পেশায় যোগ দেন। বাইকের তেলের খরচের টাকাসহ তার হাত খরচের টাকা এতে উঠে আসে। এতে করে পরিবারের উপর থেকে চাপ কমে গেছে অনেকটা। প্রথমে রাকিব তার পরিবারের কাউকে জানাতে চাননি। কাজ করতেন বাবার মোটরসাইকেল নিয়ে। বাবা মোটারসাইকেল ফেরত চাইলে এই কাজের কথা বলেন। রাকিব বলেন, এটা শোনার পর ভেবেছিলাম বাবা রাগ হবে। কিন্তু না বাবা সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি বলেন, সব সময় এক রকম ডেলিভারি হয় না। তবে তিনি বলেন, গড়ে প্রতি মাসে ৮-১০ হাজার টাকা আয় হয়। কাজ করি দৈনিক ৩ ঘণ্টা। অনেকে আবার আছেন যারা আগে চালক বা রিকশাচালক ছিলেন, তারা এখন পুরোদমে এ পেশায় কাজ করেন। তাদের মাসিক সর্বোচ্চ আয় ৪০ হাজার টাকার মতো।

 

শুধু শিক্ষার্থী নয়, এসব অনলাইন প্ল্যাটফরমে আয়ের উৎস করে নিয়েছেন অনেক বেকার। বসুন্ধরায় একটি জুয়েলার্সে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন আলী আকবর। করোনাকালে চাকরি হারিয়েছেন তিনি। বলেন, করোনার সময় চাকরি হারিয়ে খুব ঝামেলায় পড়ে যাই। এরপর বন্ধুর একটা মোটরসাইকেল ধারে কিনে খাবার সরবরাহ করা শুরু করি। এরপর থেকে এটাই করে যাচ্ছি। মাঝে কয়েকদিন রাইড শেয়ারিং করেছিলাম। কিন্তু মোটরসাইকেলের অবস্থা খুব একটা ভালো না হওয়ায় নানা সমস্যা দেখা দেয়। এরপর ফের খাবার পরিবহন করা শুরু করি। তিনি জানান, মাসে তার ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হয়।

 

আবার ফুডপান্ডায় কাজ করে অসহায় বোনের সম্বল হয়েছিলেন এক ভাই। ছোট দুই সন্তানকে রেখে করোনায় মৃত্যুবরণ করেন আবুল বাশার। অসহায় বোনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রবিউল ইসলাম। খুলনা থেকে বোনের পাশে দাঁড়াতে আসেন ঢাকায়। উপায়ান্ত না দেখে নেমে পড়েন খাবার পরিবহনের কাজে। এখন তার বোনের চাকরি হয়েছে। কিন্তু চাকরি হওয়ার আগে বেশ কয়েক মাস নিদারুণ অভাবে ছিল পরিবারটি। হাঁড়ির চাল থেকে ছোট ছেলের দুধ সবই যে ফুরিয়ে যাচ্ছিল সহসাই। এই সময়টায় প্রায় চার মাস ফুডপান্ডায় কাজ করে চালিয়েছেন সংসার।

 

এসব খাবার পরিবহন করতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকারও হন তারা। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাদ আহমেদ বলেন, একবার গ্রিনরোডে এক বাড়িতে খাবার দিতে গিয়েছি। নিচে গিয়ে কল দিয়েছি তারা আমাকে বলেন, ১০ মিনিট দাঁড়ান লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি। এরপর প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা। ফোন দিলেও ফোন ধরেন না। তারপর আমি খাবার নিয়েই চলে আসি। এরপর রাস্তায় থাকা অবস্থায় কল দেন। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। অভিযোগ জানান। এরপর খাবার নিয়ে যাবার পরও নানা বাজে কথা বলেন। যা মেনে নেয়ার মতো না। তার খাবারের বিল হয়েছিল ২৯০ টাকা। আমাকে বলে, যা তোরে দিলাম এটা। আমি ১০ টাকা তার সামনে রেখে চলে এসেছিলাম। সেদিন কান্না চলে এসেছিল আমার।

 

নিয়মিত ফুডপান্ডা, হাংরিনাকি, পাঠাও, সহজ ডটকম এসব অনলাইন প্লাটফরমে খাবার অর্ডার করেন গণমাধ্যমকর্মী অনিম আরাফাত। তিনি বলেন, আমি বাসাতে যেসব খাবার তৈরি করতে পারি না সেসব খাবার অর্ডার করি। তাদের এলগারিদম অনেক ভালো। আমার পছন্দের যেসব খাবার আছে তারা সেগুলোই প্রদর্শন করে। আর তাদের খাবার খুবই কম সময়ে ও তুলনামূলক অনেক কমদামে মেলে। তাই নিয়মিত অর্ডার করা হয়।
এ ছাড়াও অনলাইনে করোনাকালে পোশাক বিক্রি করে বেশ নাম কুড়িয়েছেন আফরোজা জাহান শান্তা। তিনি বলেন, দুই বাচ্চাকে সামলিয়ে আমার ব্যবসা সামলাতে হয়। ফলে প্রায়শই রান্নার দিকে তেমন নজর দেয়া হয় না। আমি রেস্তরাঁয় খেতে গেলে আমার খরচ ধরেন ৩০০ টাকা। আমি অর্ডার করলে লাগে ২৫০ টাকা। অধিকাংশ সময় লাগে না কোনো সার্ভিস চার্জ।

 

এসব অনলাইন খাবার অর্ডারে প্রায়শই অনেক ছাড় মেলে। কিন্তু কীভাবে মেলে এই ছাড়! এই বিষয়ে জানতে ধানমণ্ডির পাইন অ্যাপল রেস্তরাঁর স্বত্বাধিকারী মো. সুমন খান বলেন, আমার রেস্তরাঁয় একসঙ্গে খেতে পারেন সর্বোচ্চ ৩০ জন। একজন খেতে বসে সর্বনিম্ন ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করেন। আমার এখানে পাস্তা বিক্রি করা হয় এক প্লেট ১৫০ টাকায়। আমি অনলাইনে এই খাবার ২০ টাকা ছাড় দিচ্ছি। এতে আমার গ্রাহক যেমন বাড়ছে। এ ছাড়াও লাগছে না বিদ্যুৎ বিল, কর্মী ইত্যাদি। ফলে ছাড় দেয়ার পরও অনেক সময় পরিবহন বিলও ছাড় দেয়া সম্ভব হয়।

 

এই রেস্তরাঁটি পাস্তার জন্য বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। সুমন আরও বলেন, আমি দিনে এখন গড়ে ৩০০ প্লেট পাস্তার অর্ডার পাই। কিন্তু রেস্তরাঁয় এসে সারা দিনে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১২০ প্লেট পাস্তা বিক্রি হয়।
আবার এসব শিক্ষার্থী আয়ের সুযোগ পেলেও ক্ষোভও আছে তাদের। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্রেতা ডেলিভারি বাতিল করলেও সফটওয়ারের সমস্যার কারণে অনেক সময় পরিবহনকারীর আইডি স্থগিত করা হয়। এই স্থতিগাদেশ তুলতে হয় তাদের অফিসে গিয়ে। এতে ভোগান্তি  পোহাতে হয় তাদের। অপেক্ষা করতে হয় এক ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত। নানা কারণে দেয়া হয় স্থগিতাদেশ। এরমধ্যে টাকা জমা দিতে দেরি হওয়া অন্যতম। খাবার ডেলিভারিতে দেরি হলে গ্রহকরা অভিযোগ করেন। অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়।

 

আবার অনেক সময় ডেলিভারির তথ্য গায়েব হয়ে যায়। অনেক সময় ১৫টি ডেলিভারি দিলেও তার দেখানো হয় ২ থেকে ৩টি কম। সে সময় অফিসে গিয়ে গুগল ম্যাপের প্রমাণ দেখালে সে অর্থ মেলে। প্রমাণের পর মেলে অর্ধেক অর্থ।

 

নতুন রাইডারদের খাবার ডেলিভারি রেইট আগে ২০ টাকা করে দিলেও তাদের দাবির মুখে এখন ২৫ টাকা কওে দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে তরুণদের কাজের শিফট মেলেনা সুবিধামতো সময়ে। আর অভিজ্ঞদের ডেলিভারি চার্জও দেয়া হয় বেশি। ফলে পার্ট টাইম চাকরির আশায় আশা শিক্ষার্থীরা পোহান ভোগান্তি।

 

আবার কাজের শুরুতে ব্যাগ ও টি-শার্ট দেয়া হয়। যার জন্য তাদের কাছে রাখা হয় ২৬০০ টাকা। যা প্রতি সপ্তাহে ৪০০ টাকা করে কেটে নেয়া হয়। এটিকে সকলেই বাড়তি বলেই উল্লেখ করেন। আবার ডেলিভারি চার্জের টাকা অধিকাংশই বিকাশে দেন। অথচ এসব কোম্পানি ক্যাশ আউট করার কোনো খরচ বহন করে না।  ক্রেতা যে খাবার কিনে সেই টাকা আবার ফুডপান্ডাকে বিকাশে পেমেন্ট করা যায় না। এর জন্য আবার তাকে নগদের এজেন্টের দোকানে যেতে হয়। আবার সব নগদের দোকানের এজেন্ট ফুডপান্ডার টাকা নেয় না। ফলে ৫ থেকে ১০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয়। আবার অনেক সময় ক্রেতা ডেলিভারি বাতিল করলেও সফটওয়ারের সমস্যার কারণে তা আপডেট হয় না। তখন ফুডপান্ডার অফিসে যেয়ে এই সাসপেন তুলে আসতে হয়।

 

আইনুদ্দীন আল আজাদ কুষ্টিয়ার রবিন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কাজ করতেন কুষ্টিয়াতেই। তবে রাজধানীর মতো আয় হয় না সেখানে। ৩ ঘণ্টা কাজ করলে আয় হতো ১০০ থেকে ১৭৫ টাকা। ফলে কাজ করা ছেড়ে দেন তিনি।

 

মামুন হোসেন মোহাম্মাদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে বিবিএ’তে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২০ সালের প্রথমদিকে তিনি যখন এ পেশায় কাজ শুরু করেন তখন প্রতি ডেলিভারিতে ৩৫ টাকা করে দেয়া হলেও এখন ২৫ টাকা করে দেয়া হয়। তার ইচ্ছামতো শিফটে খাবার সরবরাহ করেন। মাসিক হাত খরচের জন্য ৮ হাজার টাকা খুব সহজেই আয় করেন তিনি। তবে বিষয়টি এখনো জানে না বাসায়। কাজ করতে গিয়ে মামুন তার সাইকেল হারিয়ে ফেলেন রেস্তরাঁর সামনে থেকে। সাইকেল না থাকায় মাঝে দু’সপ্তাহ কাজ করা হয়নি। জানতে চাইলে ফুডপান্ডার অপারেশনস অফিসার ও হেড অব মার্কেটিং সৌরভ দে বলেন, আমাদের ওয়ার্কিং মডেলটা এভাবেই সাজানো যাতে অধিক মানুষ কাজ করতে পারেন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী এর দ্বারা উপকার পাচ্ছেন।  আমরা চাই এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে যারা আগ্রহী তারা সকলেই উপকৃত হউক। আমরা গ্রাহকের কাছে সর্বোচ্চ সেবাটা পৌঁছে দিতে চাই। আমরা তাদের নানা ট্রেনিং পর্যন্ত দিয়ে থাকি। আমাদের যে অর্থটা নেয়া হয় এটা একটা সার্ভিস চার্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা তাদের কাছে অর্থটা ভেঙে নেই যাতে চাপ না হয়। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের এসব নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, এসব অভিযোগ খুব দ্রুতই সমাধান হবে।

সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com