হিমালয়ে বাড়ছে হিমবাহ ধসের ঝুঁকি, পরের বিপর্যয় কি আঁচ করা সম্ভব?

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়া ও ধসে পড়ার ঘটনা ভবিষ্যতে ভয়াবহ বন্যার রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলার গতি বাড়ায় একদিকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে আর অন্যদিকে নদীতীরবর্তী লাখ লাখ মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব কান্নি উইগনারাজা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হিমবাহ-হ্রদে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি নিচের দিকে বিশাল নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এসব এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে যে প্রযুক্তি প্রয়োজন তা ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথেষ্ট দ্রুত এগোতে পারছে না। তিনি জানান, হিমবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ‘কয়েক মিলিয়নে’ পৌঁছেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও সহযোগী সংস্থাগুলোর জুন মাসে সংকলিত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা জানান তিনি।

নেপালের ভয়াবহ বন্যা নতুন করে সতর্কবার্তা

গত সপ্তাহে নেপালে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের অংশ ধসে উপত্যকার তলদেশে পড়ে যায়। এতে ভূমিধসের সৃষ্টি হয় এবং ত্রিশূলী নদী দিয়ে সেই ধসের প্রবল ঢেউ নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ধরনের দুর্যোগের ধরন একটিই নয়। হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা বন্যাও হিমালয় অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া পানি কোনো প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমতে জমতে একসময় সেখানে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। বাঁধ ভেঙে গেলে বা পানি উপচে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে নদীর নিম্নপ্রবাহে নেমে আসতে পারে বিশাল বন্যার ঢল। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় এ দুই ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কাই বাড়ছে। বরফ গলার পাশাপাশি পাহাড়ের শিলাস্তর আলগা হয়ে যাচ্ছে এবং হিমবাহ-হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে।

ঝুঁকিতে হিমালয়ের হিমবাহ-হ্রদ

২০২০ সালে গবেষকেরা নেপাল, চীন ও ভারতে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ৪৭টি হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের প্রকৃত সংখ্যা ওই হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। উইগনারাজা বলেন, হিমালয় অঞ্চলের পাহাড়গুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো তুলনামূলকভাবে নবীন। ফলে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে এসব এলাকায় নড়াচড়া ও ভূমির পরিবর্তনের প্রবণতা বেশি। এতে হিমবাহ কিংবা হিমবাহ-হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। হিন্দুকুশ পর্বতমালা ঘিরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েও গবেষকেরা সম্ভাব্য বিপজ্জনক বহু হিমবাহ-হ্রদের সন্ধান পেয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি চাপে নেপাল

হিমবাহের ওপর নির্ভরশীলতার দিক থেকে হিমালয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় নেপালের ঝুঁকি বেশি বলে মনে করেন উইগনারাজা। পানি সরবরাহের পাশাপাশি মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশও পর্বত ও হিমবাহনির্ভর হওয়ায় দেশটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশের জন্য নিরাপদ উঁচু এলাকায় স্থানান্তরও সহজ হবে না। আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেই থেকে যেতে হতে পারে। এর পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা

নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতও হিমবাহজনিত বন্যার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বন্যায় চালু থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি নির্মাণাধীন ১৫টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা অচল হয়ে পড়েছে। উইগনারাজার মতে, নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তোলা সম্ভব। তবে গত সপ্তাহে নেপালে যে মাত্রার কাদা, বরফ ও পানির প্রবল স্রোত নেমে এসেছিল, তা প্রচলিত অধিকাংশ প্রতিরোধব্যবস্থার সক্ষমতার বাইরে ছিল। তার ভাষায়, ওই ধরনের প্রবল ধস ও পানির ঢল ঠেকানোর মতো কোনো প্রচলিত নির্মাণ বা অবকাঠামো ছিল না।  তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বিএনপি মানুষের স্বার্থে ও মানবতার পক্ষে রাজনীতি করে : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

» ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর সফর স্থগিত

» সংকট মোকাবিলায় সরকারের অদক্ষতা জাতির কাছে স্পষ্ট : হামিদুর রহমান

» স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই : মীর শাহে আলম

» গবেষণা পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় নেমে এলে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকবে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড

» র‌্যারের অভিযানে ৯২ রাউন্ড গুলি জব্দ

» স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আইআরআই প্রতিনিধিদলের বৈঠক

» সড়ক দুর্ঘটনায় নারী নিহত

» সিডনির মিন্টোতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অভিভাবকদের মিলনমেলা

» স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বচ্ছ হবে: প্রতিমন্ত্রী পুতুল

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

হিমালয়ে বাড়ছে হিমবাহ ধসের ঝুঁকি, পরের বিপর্যয় কি আঁচ করা সম্ভব?

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়া ও ধসে পড়ার ঘটনা ভবিষ্যতে ভয়াবহ বন্যার রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলার গতি বাড়ায় একদিকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে আর অন্যদিকে নদীতীরবর্তী লাখ লাখ মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব কান্নি উইগনারাজা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হিমবাহ-হ্রদে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি নিচের দিকে বিশাল নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এসব এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে যে প্রযুক্তি প্রয়োজন তা ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথেষ্ট দ্রুত এগোতে পারছে না। তিনি জানান, হিমবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ‘কয়েক মিলিয়নে’ পৌঁছেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও সহযোগী সংস্থাগুলোর জুন মাসে সংকলিত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা জানান তিনি।

নেপালের ভয়াবহ বন্যা নতুন করে সতর্কবার্তা

গত সপ্তাহে নেপালে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের অংশ ধসে উপত্যকার তলদেশে পড়ে যায়। এতে ভূমিধসের সৃষ্টি হয় এবং ত্রিশূলী নদী দিয়ে সেই ধসের প্রবল ঢেউ নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ধরনের দুর্যোগের ধরন একটিই নয়। হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা বন্যাও হিমালয় অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া পানি কোনো প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমতে জমতে একসময় সেখানে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। বাঁধ ভেঙে গেলে বা পানি উপচে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে নদীর নিম্নপ্রবাহে নেমে আসতে পারে বিশাল বন্যার ঢল। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় এ দুই ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কাই বাড়ছে। বরফ গলার পাশাপাশি পাহাড়ের শিলাস্তর আলগা হয়ে যাচ্ছে এবং হিমবাহ-হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে।

ঝুঁকিতে হিমালয়ের হিমবাহ-হ্রদ

২০২০ সালে গবেষকেরা নেপাল, চীন ও ভারতে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ৪৭টি হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের প্রকৃত সংখ্যা ওই হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। উইগনারাজা বলেন, হিমালয় অঞ্চলের পাহাড়গুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো তুলনামূলকভাবে নবীন। ফলে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে এসব এলাকায় নড়াচড়া ও ভূমির পরিবর্তনের প্রবণতা বেশি। এতে হিমবাহ কিংবা হিমবাহ-হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। হিন্দুকুশ পর্বতমালা ঘিরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েও গবেষকেরা সম্ভাব্য বিপজ্জনক বহু হিমবাহ-হ্রদের সন্ধান পেয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি চাপে নেপাল

হিমবাহের ওপর নির্ভরশীলতার দিক থেকে হিমালয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় নেপালের ঝুঁকি বেশি বলে মনে করেন উইগনারাজা। পানি সরবরাহের পাশাপাশি মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশও পর্বত ও হিমবাহনির্ভর হওয়ায় দেশটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশের জন্য নিরাপদ উঁচু এলাকায় স্থানান্তরও সহজ হবে না। আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেই থেকে যেতে হতে পারে। এর পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা

নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতও হিমবাহজনিত বন্যার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বন্যায় চালু থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি নির্মাণাধীন ১৫টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা অচল হয়ে পড়েছে। উইগনারাজার মতে, নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তোলা সম্ভব। তবে গত সপ্তাহে নেপালে যে মাত্রার কাদা, বরফ ও পানির প্রবল স্রোত নেমে এসেছিল, তা প্রচলিত অধিকাংশ প্রতিরোধব্যবস্থার সক্ষমতার বাইরে ছিল। তার ভাষায়, ওই ধরনের প্রবল ধস ও পানির ঢল ঠেকানোর মতো কোনো প্রচলিত নির্মাণ বা অবকাঠামো ছিল না।  তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com