ফ্লোরিডা কিজ: প্রবাল দ্বীপ ও ৪২ সেতুর রহস্য

ছবি সংগৃহীত

 

ফিচার ডেস্ক :

শাহারিয়া নয়ন

দূর সমুদ্রের নীল জলে ছড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ বাঁকানো পথ, যার এক প্রান্ত আটলান্টিক, আরেক প্রান্ত মেক্সিকো উপসাগর। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই সাগরের বুকে এঁকে দিয়েছে এক অপূর্ব সেতু। এই জায়গার নাম ফ্লোরিডা কিজ, যুক্তরাষ্ট্রের এক অনন্য প্রবালদ্বীপমালা।

jagonews

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডায় অবস্থিত এই দ্বীপশৃঙ্খলটি মায়ামি ডেড এবং মনরো কাউন্টি জুড়ে বিস্তৃত। প্রায় ৩৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রবাল ও চুনাপাথরের দ্বীপপুঞ্জ শুরু হয়েছে ভার্জিনিয়া কী থেকে, শেষ হয়েছে ড্রাই টর্তুগাসের লজারহেড কী পর্যন্ত। পানির ওপর ভাসমান অসংখ্য ছোট বড় দ্বীপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অবিশ্বাস্য ভূদৃশ্য। ১৯৩৮ সালে নির্মিত এই সড়কে ৪২টি সেতু রয়েছে, যার মধ্যে একটি প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ।

ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে ক্যালুসা ও টেকুয়েস্তা নামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করত। ১৫১৩ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী হুয়ান পন্সে দে লেওন প্রথমবারের মতো এই এলাকায় আসেন। প্রথম স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে ১৮২২ সালের দিকে।

jagonewsতখন মূল অর্থনীতি ছিল মাছ ধরা এবং জাহাজডুবির মালামাল উদ্ধার বা সালভেজিং। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ওঠানামা করেছে। ১৮৯০-এর দশকে এখানে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন দেখা যায়। ১৯৩৫ সালের ভয়াবহ হারিকেন এই দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত, যেখানে শত শত মানুষের মৃত্যু হয় এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়।

এই দ্বীপগুলোর মাঝখানে বিস্কেইন বে এবং ফ্লোরিডা বে গুরুত্বপূর্ণ জলভাগ হিসেবে অবস্থান করছে। দ্বীপগুলোর বাঁকানো বিন্যাস সমুদ্রপথে তৈরি করেছে এক বিশেষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও খুব বেশি দেখা যায় না। মেইনল্যান্ড থেকে কী ওয়েস্ট পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করেছে ওভারসিজ হাইওয়ে, যেখানে একের পর এক সেতু জোড়া দিয়েছে দ্বীপগুলোকে।

jagonews

ইতিহাসে ফ্লোরিডা কিজের শুরু অনেক পুরোনো। এখানে একসময় বসবাস করত ক্যালুসা এবং টেকুয়েস্তা আদিবাসীরা। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা এই অঞ্চলে আসে। পরবর্তীতে উনবিংশ শতকে গড়ে ওঠে স্থায়ী জনবসতি। একসময় এখানকার অর্থনীতি দাঁড়িয়েছিল মাছ ধরা এবং সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা জাহাজের মালামালের ওপর।

ফ্লোরিডা কিজের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কী লার্গো। এখানে রয়েছে বিখ্যাত সমুদ্র সংরক্ষণ এলাকা, যেখানে দেখা যায় জীবন্ত প্রবাল প্রাচীর। ইসলামোরাদা, মেরাথন এবং লং কী অঞ্চল পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। এই পুরো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে জাতীয় উদ্যান এবং সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা। বিস্কেইন ন্যাশনাল পার্ক, এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্ক এবং ড্রাই টর্তুগাস ন্যাশনাল পার্ক এখানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

jagonews

ম্যানগ্রোভ বন, সীগ্রাস আর প্রবাল প্রাচীর মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। ৬০০ এর বেশি প্রজাতির মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ, ম্যানাটি এবং অ্যালিগেটর এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়। পর্যটন এবং বাণিজ্যিক মাছ ধরা এই এলাকার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এর আসল পরিচয় প্রকৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী, যেখানে সমুদ্র আর দ্বীপ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বিরল সৌন্দর্য। ফ্লোরিডা কিজ তাই শুধু একটি দ্বীপপুঞ্জ নয়, এটি প্রকৃতির হাতে আঁকা এমন এক চিত্র, যা যতবার দেখা হয় ততবারই নতুন করে বিস্ময় জাগায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিভাগ, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি । সূএ : জাগোনিউজ২৪.কম

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» খেলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

» ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে বন্দিদের জন্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

» নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে বাড়ছে ৫০০ শয্যা, কাল উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

» হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা

» ইরানের মাটির নিচে কী আছে? বিরল খনিজের খোঁজে যাচ্ছে চীনের বিজ্ঞানীরা

» ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়: হাইকোর্ট

» মাদক কারবারিদের ছুরিকাঘাতে যুবদল নেতা আহত

» শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭

» ডিমের ডজন ১৫০ টাকা, সবজিও এখনো চড়া

» কিশোর গ্যাং লিডার এলেক্স ইমন হত্যায় ৪জন গ্রেফতার

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ফ্লোরিডা কিজ: প্রবাল দ্বীপ ও ৪২ সেতুর রহস্য

ছবি সংগৃহীত

 

ফিচার ডেস্ক :

শাহারিয়া নয়ন

দূর সমুদ্রের নীল জলে ছড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ বাঁকানো পথ, যার এক প্রান্ত আটলান্টিক, আরেক প্রান্ত মেক্সিকো উপসাগর। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই সাগরের বুকে এঁকে দিয়েছে এক অপূর্ব সেতু। এই জায়গার নাম ফ্লোরিডা কিজ, যুক্তরাষ্ট্রের এক অনন্য প্রবালদ্বীপমালা।

jagonews

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডায় অবস্থিত এই দ্বীপশৃঙ্খলটি মায়ামি ডেড এবং মনরো কাউন্টি জুড়ে বিস্তৃত। প্রায় ৩৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রবাল ও চুনাপাথরের দ্বীপপুঞ্জ শুরু হয়েছে ভার্জিনিয়া কী থেকে, শেষ হয়েছে ড্রাই টর্তুগাসের লজারহেড কী পর্যন্ত। পানির ওপর ভাসমান অসংখ্য ছোট বড় দ্বীপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অবিশ্বাস্য ভূদৃশ্য। ১৯৩৮ সালে নির্মিত এই সড়কে ৪২টি সেতু রয়েছে, যার মধ্যে একটি প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ।

ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে ক্যালুসা ও টেকুয়েস্তা নামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করত। ১৫১৩ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী হুয়ান পন্সে দে লেওন প্রথমবারের মতো এই এলাকায় আসেন। প্রথম স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে ১৮২২ সালের দিকে।

jagonewsতখন মূল অর্থনীতি ছিল মাছ ধরা এবং জাহাজডুবির মালামাল উদ্ধার বা সালভেজিং। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ওঠানামা করেছে। ১৮৯০-এর দশকে এখানে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন দেখা যায়। ১৯৩৫ সালের ভয়াবহ হারিকেন এই দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত, যেখানে শত শত মানুষের মৃত্যু হয় এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়।

এই দ্বীপগুলোর মাঝখানে বিস্কেইন বে এবং ফ্লোরিডা বে গুরুত্বপূর্ণ জলভাগ হিসেবে অবস্থান করছে। দ্বীপগুলোর বাঁকানো বিন্যাস সমুদ্রপথে তৈরি করেছে এক বিশেষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও খুব বেশি দেখা যায় না। মেইনল্যান্ড থেকে কী ওয়েস্ট পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করেছে ওভারসিজ হাইওয়ে, যেখানে একের পর এক সেতু জোড়া দিয়েছে দ্বীপগুলোকে।

jagonews

ইতিহাসে ফ্লোরিডা কিজের শুরু অনেক পুরোনো। এখানে একসময় বসবাস করত ক্যালুসা এবং টেকুয়েস্তা আদিবাসীরা। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা এই অঞ্চলে আসে। পরবর্তীতে উনবিংশ শতকে গড়ে ওঠে স্থায়ী জনবসতি। একসময় এখানকার অর্থনীতি দাঁড়িয়েছিল মাছ ধরা এবং সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা জাহাজের মালামালের ওপর।

ফ্লোরিডা কিজের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কী লার্গো। এখানে রয়েছে বিখ্যাত সমুদ্র সংরক্ষণ এলাকা, যেখানে দেখা যায় জীবন্ত প্রবাল প্রাচীর। ইসলামোরাদা, মেরাথন এবং লং কী অঞ্চল পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। এই পুরো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে জাতীয় উদ্যান এবং সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা। বিস্কেইন ন্যাশনাল পার্ক, এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্ক এবং ড্রাই টর্তুগাস ন্যাশনাল পার্ক এখানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

jagonews

ম্যানগ্রোভ বন, সীগ্রাস আর প্রবাল প্রাচীর মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। ৬০০ এর বেশি প্রজাতির মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ, ম্যানাটি এবং অ্যালিগেটর এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়। পর্যটন এবং বাণিজ্যিক মাছ ধরা এই এলাকার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এর আসল পরিচয় প্রকৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী, যেখানে সমুদ্র আর দ্বীপ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বিরল সৌন্দর্য। ফ্লোরিডা কিজ তাই শুধু একটি দ্বীপপুঞ্জ নয়, এটি প্রকৃতির হাতে আঁকা এমন এক চিত্র, যা যতবার দেখা হয় ততবারই নতুন করে বিস্ময় জাগায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিভাগ, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি । সূএ : জাগোনিউজ২৪.কম

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com