‘হাফ বাটি ডাল এখানে বিক্রি হয় না’

সুলতানের বাপ। সুলায়মান আলী। গতর খেটে সংসার চালায়। দুই যুগ আগে ঘরবাড়ি যমুনা গিলে ফেলেছে। আবাদের জমি বিঘা পাঁচেক ছিল। সেগুলো এখন যমুনার বুকে। বর্ষাকালে পানিতে টইটমু্বর আর শুকনো মৌসুমে ধু-ধু বালি। সুলতানের বাপ যখন কিশোর তখন নদী তাদের নিঃস্ব করেছে।

 

যমুনার সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হয়ে সুলতানের বাপ বিশ বছর আগে শহরে চলে আসে। অসহায় মা-বাবা তখন আশ্রয় নেয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। খুপরি ঘরে। সুলতান শহরে এসে প্রথমে মুদির দোকানে কাজ নেয়। সামান্য মাইনে। সপ্তাহে দেড়শো টাকা। বিশ বছর আগে কোনো রকম চলতো ওই টাকায়। বাড়িতে মাঝেমধ্যে বাবা-মা’র জন্য খরচপাতি পাঠাতো। পরে রিকশা চালায় কিছুদিন। গায়ে গতরে খেটে ভালোই চলে সুলতানের বাপের। এক সময় একটা বিয়েও করে ফেলে। শহুরে উদ্বাস্তু। মেয়ের পরিবারও কোনো কারণে নিঃস্ব হয়ে শহরে আশ্রয় নিয়েছে। সুলতানের বাপ জগতের কোনো কিছুর দিকে নজর দেয় না। আপন মনে কাজ করে। এখন শহরের একটি গোডাউনে মালামাল খালাসির শ্রমিক।

মাঝেমধ্যে আবেগী হয়ে ওঠে সুলতানের বাপের মন। সেদিনের ঘর ভেঙে পানিতে পড়ার শব্দ শুনতে পায়। মন খারাপ হয়ে যায় তখন। রাত গভীর হলে সে শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। ঘুমাতে পারে না সুলতানের বাপ। বহু রাত ভাঙনের শব্দ তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তীব্র যন্ত্রণা হয়। কাঠের শক্ত বিছানার চকিতে গা বিছিয়ে এপাশ ওপাশ হয়ে রাত কাটায়। সকালে বিছানা ছেড়ে কাজে চলে যায়। বিকালে সুলতানের মায়ের ফোন। সুলতানের বাপ রিসিভ করে জানতে চায় ফোন দেয়ার কারণ। ওপাশ থেকে উত্তর আসে। ছোলডা অনেকদিন থেকে গোশত খাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে। ফেরার পথে আধা কেজি গোশত নিয়ে এসো। সুলতানের বাপের মুখটা শুকিয়ে যায়। পকেটে দুই তিনশো টাকা মাত্র। বিকাল হয়। সুলতানের বাপ কাজ শেষ করে। হাতে মুখে পানি দিয়ে তড়িঘড়ি করে গোডাউন থেকে বের হয়। সোজা চলে যায় ফতেহআলী বাজারে। বাজারের ঠিক এক কর্নারে করতোয়া নদীর তীরে গোশতের পশরা নিয়ে বসে আছে বেশ কয়কজন ব্যবসায়ী। প্রত্যেক দোকানের সামনে ভদ্রলোকরা দাঁড়িয়ে গোশত কিনছে। সুলতানের বাপ ভদ্রলোকদের পেছনে দাঁড়িয়ে লেনদেনের দৃশ্য দেখছে। প্রায় মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থেকে আগুন দরে গোশত বেচাকেনা দেখছে। দোকানিরা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। গোশত কেনার লোক মনে হচ্ছে না। সুলতানের বাপ ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। গোশত কতো টাকা কেজি জানতে চায়। দোকানি মাথা তুলে তাকায়। উত্তর দেয় না। অন্য কাস্টমারের গোশত কাটায় মনোযোগী হয়। আবার জিজ্ঞেস করে সুলতানের বাপ। ভাই কতো টাকা কেজি গোশত? দোকানি কিছুটা বিরক্তির সুরে বলেন ৬২০ টাকা কেজি। সুলতানের বাপ পকেটে হাত দেয়। আধাকেজি গোশত কেনার টাকাও নেই পকেটে। ছোলডার কথা ভেবে বুকের মধ্যে নড়েচড়ে উঠে। পুরুষের চোখ তাই পানি বের হয়নি। সব পুরুষ কাঁদতে পারে না। তবে চোখ ভিজে যায় ক্ষণিকের জন্য। খালি হাতে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় সুলতানের বাপ।

 

দুই. আব্দুল আউয়াল। বয়স ৩৬ থেকে ৩৮ হবে। শহরের একটি সুউচ্চ আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা কর্মী। কখনো দিনে ডিউটি আবার কখনো রাতে। ভবনের চুরাশিটি ইউনিটের প্রায় সবগুলোতেই পরিবার থাকে। কেউ ভাড়া থাকে আবার কারও নিজস্ব ফ্ল্যাট। এসব পরিবারের প্রত্যেকের সঙ্গে আউয়ালের ভালো সম্পর্ক। লিফট থেকে কেউ নামলেই সালাম দেয়া, কেমন আছেন জানতে চাওয়া আউয়ালের একটা ভালো গুণ। এ কারণেই ভবনের সবাই তাকে ভালোবাসেন। বছরখানেক পার হয়েছে আউয়ালের ওই ভবনে। মাইনে আট হাজার টাকা। একটি সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন গ্রামের বাড়ি থেকে যাতায়াত করে। আমার সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক। আমার বাইক নিচের গ্যারেজে ভালোভাবে রাখার জন্য আলাদা নজর রাখে সে। আমিও তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলি। খোঁজ নেই। তাতেই সে মহা প্রাপ্তির ঢেকুর তোলে। সেদিন আউয়ালের রাতে ডিউটি। আমি যথারীতি ১১টায় বাসার নিচে পৌঁছাই। বাইক গ্যারেজ করি। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে ধীরপায়ে উপরে উঠি। আউয়াল আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি উপরে উঠি। আউয়াল আমার সামনে আসে। আমতা আমতা স্বরে বলে ভাই একটু কথা বলবো আপনার সঙ্গে। সবার সঙ্গে তো সব কথা বলা যায় না। তবে আপনাকে আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারবো। আমি থামলাম। তাকে বলার অনুরোধ করলাম। আউয়ালের বুকে বরফের মতো জমে থাকা কথাগুলো বলা শুরু করলো। ভাই, প্রতিদিন সকালে আপনারা আপনাদের বাচ্চাদের কতো সুন্দর ড্রেস পরিয়ে স্কুলে দিয়ে আসেন। আপনাদের বাচ্চারদের দেখে আমার বেটার কথাও মনে হয়। মনটা চায় আমার বেটাকেও এভাবে সেজে স্কুলে দিয়ে আসি। কিন্তু পরিস্থিতি কোনো ভাবেই সেই সুযোগ দেয় না আমাকে। একথা বলতেই আউয়ালের চোখের কোণা দিয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে গালে এসে মিশে যায়। আমরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আউয়ালের কথায় আমি কিছুটা নির্বাক হয়ে যাই। পুনরায় আউয়াল বলতে থাকে। আমি মনে হয় পুরুষ হিসেবে ব্যর্থ। আমার বয়সী অনেকেই গাড়ি-বাড়ি করেছে। বিলাস বহুলভাবে চলাফেরা করছে। আর আমি বউ-বাচ্চাদের আয়েশ মেটাতে পারি না। মাত্র আট হাজার টাকায় কীভাবে চলি বলেন? বেটাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে মন চায়। সে সব স্কুলগুলোতে নাকি প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হতে দশ/বিশ হাজার টাকা লাগে। কেমনে এত টাকায় ভর্তি করাবো বলেন? খরচের কথা শুনলে শরীরের পানি শুকিয়ে যায়। পরিবারকে ভালো একটা বাড়িতে রাখতে পারিনি। টিনশেডের ঘর। বেড়ার এপাশ দিয়ে বিড়াল ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তারপর এখন বাজারে আগুন। ভালোমন্দ কিছুই কিনতে পারছি না। আউয়াল বলে জানেন, আমারো না খুব ইচ্ছা করে আপনাদের মতো পরিবারকে শান্তিতে রাখতে। টাকার কাছে বরাবরই হেরে যাই। কথাগুলো বলে আউয়াল আবারো আমাকে বলে ভাই কিছু মনে করবেন না। আপনাকে আমার ভালোলাগে বিধায় কথাগুলো বললাম। বুকটা হালকা হয়ে গেল। আমি নির্বাক আউয়ালের কথাগুলো তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। কথা শেষে বললাম আউয়াল ভাই আমিও কিন্তু ভালো নেই। যা দেখেন অনেকটা অভিনয়। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন হয়তো এক সময় আপনার মনের সবগুলো আশা পূরণ হবে। আমি লিফটে উঠে যাই। আউয়াল ডিউটিতে মনোযোগী হয়।

 

তিন. প্রত্যন্ত এক গ্রামের যুবক আব্দুস সবুর। উপজেলার একটি কলেজ থেকে বিয়ে পাস করেছে। বয়স ২৭/২৮ হবে। পিতা কৃষক। জমিতে ফসল ফলিয়ে পরিবার চলে সবুরদের। সবুরের বড় ভাই সামাদ তার পিতার সঙ্গে সারা বছর মাঠে কাজ করে। পড়ালেখা করতে পারেনি। ধান, আলু আর নানা ধরনের সবজি চাষ করে তারা। শরীর ঘামিয়ে ফসল ফলায় কৃষক। বাজারে বিক্রি করতে গেলে দাম পায় না। বাংলাদেশের কৃষকদের দুর্ভাগ্য এটি। তাদের পরিশ্রমের মূল্য আজ পর্যন্ত কেউ দিলো না। অথচ মধ্যস্বত্বভোগীরা শকুনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কৃষকের মাঠের দিকে। কখন ফসল তুলবে কৃষক সেই আশায়। একজন কৃষক আলু উৎপাদন করে দাম পায় আট টাকা কেজি। সেই আলু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা পনেরো কিলোমিটার দূরে শহরে এনে বিক্রি করছে কেজিপ্রতি বিশ টাকা। একই আলু রাজধানীর কাওরান বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে ত্রিশ টাকা। এমনি ভাবেই চোখের সামনে আমাদের কৃষকরা ঠকছে। কেউই এসব কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় না। তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছে স্যুট পরা ভদ্র ব্যবসায়ীরা। এটাই আমাদের বাংলাদেশ। সবুররাও প্রতি বছর এমন ভাবে ঠকে আসছে। তারপরও কিছু করার নেই। জমিতে ফসল না ফলালে চলবে কি করে? সবুরের পিতার ইচ্ছা তার মতো কৃষক যেন না হয় সবুর। কষ্ট করে পড়ালেখা করিয়েছে। একটা সরকারি চাকরি হবে। এমন স্বপ্ন লালন করে পিতা। পিতার স্বপ্ন পূরণের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সবুর। প্রতি সপ্তাহের চাকরির খবর কেনে। খুঁটেখুঁটে প্রত্যেকটি বিজ্ঞাপনে চোখ বুলায়। শহরে এসে অনলাইনে আবেদন করে। পরীক্ষার কার্ড পায়। পরীক্ষা দেয়। কিছু লিখিত পরীক্ষায় পাসও করে। বাদ সাধে ভাইভা বোর্ড। টেলিফোন কিংবা মোটা অংকের ঘুষ দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোনোবারই চাকরি হয় না সবুরের। মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে যায়। কি করবে ভেবে পায় না। বাড়ি থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় যেতে হয়। প্রতি পরীক্ষায় যাতায়াত, থাকা এবং খাওয়াতে দুই হাজারের কমে হয় না। রাস্তার ধারে শ্রমিকরা যে খাবারের দোকানে খায় সেসব হোটেলেই খেয়ে থাকে সবুর। এক বাটি ডাল ৫ টাকা, একটু আলুভর্তা ৫ টাকা, সঙ্গে দশ টাকার একটা শাক আর দেড় প্লেট ভাত। এ হলেই সবুরের এক বেলা হয়ে যায়। ৪০/৪৫ টাকাতে সেরে ফেলে খাওয়া। এবারও ঢাকায় গিয়েছে একটা চাকরির পরীক্ষার জন্য। যথারীতি খেতে গেছে চেনা-জানা হোটেলে। একটা বড় কাগজে মার্কার কলমে লেখায় চোখ আটকে যায় সবুরের। লেখা আছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রতি বাটি ডালের মূল্য বিশ টাকা ধার্য করা হয়েছে। পেটে ক্ষুধা। উপায় নেই। সবুর হোটেলে বসে এক প্লেট ভাত আর হাফ বাটি ডালের অর্ডার দেয়। হোটেলের বয় সবুরের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নেয়। তারপর বলে হাফ বাটি ডাল এখানে বিক্রি হয় না।

 

চার. সহকারী শিক্ষক নূরুল ইসলাম। গ্রামের একটি হাইস্কুলের মৌলভী পোস্টের মাস্টার। মধ্য বয়সী। স্কুল ছাড়া আর কিছু তার মাথায় কখনো কিছু ঢোকেনি। রাজনীতি, অর্থনীতি কিছুই বোঝেন না। স্কুলে গিয়ে ছাত্র পড়াতে হবে এটিই মাথায় ঘুরপাক খায়। ভালোই চলে যাচ্ছিল নূরুল ইসলামের সবকিছু। বাড়তি চিন্তা কখনো করতে হয়নি তাকে। বিগত এক দশকে নানান দিকের অসহায়ত্ব হঠাৎ করেই তাকে ঘিরে ফেলে। কখনো পিয়াজের বাজার, কখনো কাঁচামরিচ আবার কখনো সয়াবিন তেল তার মাথা ঘুরিয়ে দেয়। মাইনের টাকায় এখন আর মাস চলে না। ক্লাসে পড়াতে গিয়েও এখন টেনশন কাজ করে। মা- বাবাসহ পরিবারের সাত সদস্য তার মাইনের উপরেই পার হয়। দিন যায়। দেশের অস্থির পরিস্থিতি অক্টোপাশের মতো চারদিকে শক্ত করে ধরে ফেলে। রাতে আর নির্ভেজাল ঘুম হয় না। রক্তচাপ বাড়ে। মাথা অকেজো হয়ে যায় মাঝেমধ্যে। ক্লাসের মধ্যে ঝিমায়। ছাত্ররা দুষ্টুমি করে। নূরুল ইসলাম কিছুই বলে না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। একদিন হেড স্যার তার এমন অবস্থা দেখে তার রুমে নিয়ে যায়। নূরুল ইসলামের কাছে জানতে চায় কি হয়েছে। নূরুল ইসলাম নির্বাক। হেড স্যারের চোখের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। উত্তর দেয় না। কথা বলে না। আবারো হেড স্যারের জিজ্ঞাসা। চেতনা ফিরে আসে নূরুল ইসলামের। পরিবারের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছি। সব সময় চিন্তার দানা মাথায় নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। যেদিকে তাকাই সবদিকে কেবল হতাশা। অনাগত ভবিষ্যৎ এখন আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাবো। ঠিক তাই। বাজার পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে নূরুল ইসলাম এখন নিয়মিত মানসিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

 

পাঁচ. জমিলা বেওয়া। সেই কবে স্বামী মারা গেছে বলতে পারে না। বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়েরা কেউ খোঁজ রাখে না তার। শহরের রেলস্টেশন তার এখন স্থায়ী ঠিকানা। দিনের আলো ছড়িয়ে পড়লেই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। লাঠিতে ভর দিয়ে শহরের এগলি-ওগলি ঘুরে বেড়ায়। দোকানিদের কাছে হাত পাতে। ভদ্র মানুষদের দেখলে গুটিপায়ে এগিয়ে যায়। ভিক্ষা চায়। দশটা টাকা দেবেন? কিছু খাবো। এভাবেই ত্রিশ বছর ধরে ব্যস্ত শহরে দিনব্যাপী ঘোরেন। একেক দিন একেক হোটেলে গিয়ে চেয়ে খায়। সারাদিন ঘুরে এক দুই শ’ টাকা পায়। কোমরে কাপড়ের একটি ব্যাগ রশি দিয়ে বাঁধা আছে। সেই ব্যাগেই রাখে টাকা। জমিলা বেওয়ার মনে কোনো দুঃখ নেই। স্বাধীনভাবে ভিক্ষা করতে পেরে সে তৃপ্ত। কিছু দিন আগে এক পত্রিকা বিক্রেতা জোরে জোরে পত্রিকার শিরোনাম বলছে আর পত্রিকা বিক্রি করছে। ‘আজকের পত্রিকা, চমক লাগানো খবর। মন্ত্রী বলেছেন এদেশে এখন আর কোনো ভিক্ষুক দেখা যায় না’- ইত্যাদি বলে মানুষকে আকৃষ্ট করছে পত্রিকা কিনতে। জমিলা বেওয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হকারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে। খানিক পরে হকারের কাছে গিয়ে জানতে চায় বাবা মন্ত্রীটা কি জিনিস? সেকি কথা বলতে পারে? মানুষের মতো দেখতে? জমিলার কথায় হকার কিছুটা বিরক্ত হয়ে চোখ রাঙ্গায়। তারপর আবার উচ্চস্বরে পত্রিকার শিরোনাম পড়তে থাকে। ‘আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে গেছি, কোথাও ভিক্ষুকের দেখা পাওয়া যায় না’। জমিলা সামনের দিকে এগুতে থাকে- দশটা টাকা দেন কিছু খাবো বলতে বলতে।  সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» আবরার ফাহাদের স্মরণসভায় ছাত্রলীগের হামলা

» পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেককে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান : শিক্ষামন্ত্রীর

» অবাধ সন্ত্রাসে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না: জিএম কাদের

» জাতির পিতার সমাধিতে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা

» উন্নয়নের অগ্রগতিতে মুক্তি আনে নৌকা: নানক

» রাজধানীর বনানীর স্টার কাবাব ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে

» এক বা দুই বছর নয়, ৫০০ বছরেও বাড়ি ভাড়া বাড়েনি যে শহরে

» রাজধানীর বনানীর স্টার কাবাব ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ২ ইউনিট

» ডিসি-এসপিদের সঙ্গে শনিবার বৈঠকে বসবে ইসি

» আদিতমারী আ.লীগের সম্মেলন উপলক্ষে বর্ণিল সাজ

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

‘হাফ বাটি ডাল এখানে বিক্রি হয় না’

সুলতানের বাপ। সুলায়মান আলী। গতর খেটে সংসার চালায়। দুই যুগ আগে ঘরবাড়ি যমুনা গিলে ফেলেছে। আবাদের জমি বিঘা পাঁচেক ছিল। সেগুলো এখন যমুনার বুকে। বর্ষাকালে পানিতে টইটমু্বর আর শুকনো মৌসুমে ধু-ধু বালি। সুলতানের বাপ যখন কিশোর তখন নদী তাদের নিঃস্ব করেছে।

 

যমুনার সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হয়ে সুলতানের বাপ বিশ বছর আগে শহরে চলে আসে। অসহায় মা-বাবা তখন আশ্রয় নেয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। খুপরি ঘরে। সুলতান শহরে এসে প্রথমে মুদির দোকানে কাজ নেয়। সামান্য মাইনে। সপ্তাহে দেড়শো টাকা। বিশ বছর আগে কোনো রকম চলতো ওই টাকায়। বাড়িতে মাঝেমধ্যে বাবা-মা’র জন্য খরচপাতি পাঠাতো। পরে রিকশা চালায় কিছুদিন। গায়ে গতরে খেটে ভালোই চলে সুলতানের বাপের। এক সময় একটা বিয়েও করে ফেলে। শহুরে উদ্বাস্তু। মেয়ের পরিবারও কোনো কারণে নিঃস্ব হয়ে শহরে আশ্রয় নিয়েছে। সুলতানের বাপ জগতের কোনো কিছুর দিকে নজর দেয় না। আপন মনে কাজ করে। এখন শহরের একটি গোডাউনে মালামাল খালাসির শ্রমিক।

মাঝেমধ্যে আবেগী হয়ে ওঠে সুলতানের বাপের মন। সেদিনের ঘর ভেঙে পানিতে পড়ার শব্দ শুনতে পায়। মন খারাপ হয়ে যায় তখন। রাত গভীর হলে সে শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। ঘুমাতে পারে না সুলতানের বাপ। বহু রাত ভাঙনের শব্দ তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তীব্র যন্ত্রণা হয়। কাঠের শক্ত বিছানার চকিতে গা বিছিয়ে এপাশ ওপাশ হয়ে রাত কাটায়। সকালে বিছানা ছেড়ে কাজে চলে যায়। বিকালে সুলতানের মায়ের ফোন। সুলতানের বাপ রিসিভ করে জানতে চায় ফোন দেয়ার কারণ। ওপাশ থেকে উত্তর আসে। ছোলডা অনেকদিন থেকে গোশত খাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে। ফেরার পথে আধা কেজি গোশত নিয়ে এসো। সুলতানের বাপের মুখটা শুকিয়ে যায়। পকেটে দুই তিনশো টাকা মাত্র। বিকাল হয়। সুলতানের বাপ কাজ শেষ করে। হাতে মুখে পানি দিয়ে তড়িঘড়ি করে গোডাউন থেকে বের হয়। সোজা চলে যায় ফতেহআলী বাজারে। বাজারের ঠিক এক কর্নারে করতোয়া নদীর তীরে গোশতের পশরা নিয়ে বসে আছে বেশ কয়কজন ব্যবসায়ী। প্রত্যেক দোকানের সামনে ভদ্রলোকরা দাঁড়িয়ে গোশত কিনছে। সুলতানের বাপ ভদ্রলোকদের পেছনে দাঁড়িয়ে লেনদেনের দৃশ্য দেখছে। প্রায় মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থেকে আগুন দরে গোশত বেচাকেনা দেখছে। দোকানিরা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। গোশত কেনার লোক মনে হচ্ছে না। সুলতানের বাপ ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। গোশত কতো টাকা কেজি জানতে চায়। দোকানি মাথা তুলে তাকায়। উত্তর দেয় না। অন্য কাস্টমারের গোশত কাটায় মনোযোগী হয়। আবার জিজ্ঞেস করে সুলতানের বাপ। ভাই কতো টাকা কেজি গোশত? দোকানি কিছুটা বিরক্তির সুরে বলেন ৬২০ টাকা কেজি। সুলতানের বাপ পকেটে হাত দেয়। আধাকেজি গোশত কেনার টাকাও নেই পকেটে। ছোলডার কথা ভেবে বুকের মধ্যে নড়েচড়ে উঠে। পুরুষের চোখ তাই পানি বের হয়নি। সব পুরুষ কাঁদতে পারে না। তবে চোখ ভিজে যায় ক্ষণিকের জন্য। খালি হাতে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় সুলতানের বাপ।

 

দুই. আব্দুল আউয়াল। বয়স ৩৬ থেকে ৩৮ হবে। শহরের একটি সুউচ্চ আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা কর্মী। কখনো দিনে ডিউটি আবার কখনো রাতে। ভবনের চুরাশিটি ইউনিটের প্রায় সবগুলোতেই পরিবার থাকে। কেউ ভাড়া থাকে আবার কারও নিজস্ব ফ্ল্যাট। এসব পরিবারের প্রত্যেকের সঙ্গে আউয়ালের ভালো সম্পর্ক। লিফট থেকে কেউ নামলেই সালাম দেয়া, কেমন আছেন জানতে চাওয়া আউয়ালের একটা ভালো গুণ। এ কারণেই ভবনের সবাই তাকে ভালোবাসেন। বছরখানেক পার হয়েছে আউয়ালের ওই ভবনে। মাইনে আট হাজার টাকা। একটি সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন গ্রামের বাড়ি থেকে যাতায়াত করে। আমার সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক। আমার বাইক নিচের গ্যারেজে ভালোভাবে রাখার জন্য আলাদা নজর রাখে সে। আমিও তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলি। খোঁজ নেই। তাতেই সে মহা প্রাপ্তির ঢেকুর তোলে। সেদিন আউয়ালের রাতে ডিউটি। আমি যথারীতি ১১টায় বাসার নিচে পৌঁছাই। বাইক গ্যারেজ করি। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে ধীরপায়ে উপরে উঠি। আউয়াল আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি উপরে উঠি। আউয়াল আমার সামনে আসে। আমতা আমতা স্বরে বলে ভাই একটু কথা বলবো আপনার সঙ্গে। সবার সঙ্গে তো সব কথা বলা যায় না। তবে আপনাকে আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারবো। আমি থামলাম। তাকে বলার অনুরোধ করলাম। আউয়ালের বুকে বরফের মতো জমে থাকা কথাগুলো বলা শুরু করলো। ভাই, প্রতিদিন সকালে আপনারা আপনাদের বাচ্চাদের কতো সুন্দর ড্রেস পরিয়ে স্কুলে দিয়ে আসেন। আপনাদের বাচ্চারদের দেখে আমার বেটার কথাও মনে হয়। মনটা চায় আমার বেটাকেও এভাবে সেজে স্কুলে দিয়ে আসি। কিন্তু পরিস্থিতি কোনো ভাবেই সেই সুযোগ দেয় না আমাকে। একথা বলতেই আউয়ালের চোখের কোণা দিয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে গালে এসে মিশে যায়। আমরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আউয়ালের কথায় আমি কিছুটা নির্বাক হয়ে যাই। পুনরায় আউয়াল বলতে থাকে। আমি মনে হয় পুরুষ হিসেবে ব্যর্থ। আমার বয়সী অনেকেই গাড়ি-বাড়ি করেছে। বিলাস বহুলভাবে চলাফেরা করছে। আর আমি বউ-বাচ্চাদের আয়েশ মেটাতে পারি না। মাত্র আট হাজার টাকায় কীভাবে চলি বলেন? বেটাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে মন চায়। সে সব স্কুলগুলোতে নাকি প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হতে দশ/বিশ হাজার টাকা লাগে। কেমনে এত টাকায় ভর্তি করাবো বলেন? খরচের কথা শুনলে শরীরের পানি শুকিয়ে যায়। পরিবারকে ভালো একটা বাড়িতে রাখতে পারিনি। টিনশেডের ঘর। বেড়ার এপাশ দিয়ে বিড়াল ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তারপর এখন বাজারে আগুন। ভালোমন্দ কিছুই কিনতে পারছি না। আউয়াল বলে জানেন, আমারো না খুব ইচ্ছা করে আপনাদের মতো পরিবারকে শান্তিতে রাখতে। টাকার কাছে বরাবরই হেরে যাই। কথাগুলো বলে আউয়াল আবারো আমাকে বলে ভাই কিছু মনে করবেন না। আপনাকে আমার ভালোলাগে বিধায় কথাগুলো বললাম। বুকটা হালকা হয়ে গেল। আমি নির্বাক আউয়ালের কথাগুলো তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। কথা শেষে বললাম আউয়াল ভাই আমিও কিন্তু ভালো নেই। যা দেখেন অনেকটা অভিনয়। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন হয়তো এক সময় আপনার মনের সবগুলো আশা পূরণ হবে। আমি লিফটে উঠে যাই। আউয়াল ডিউটিতে মনোযোগী হয়।

 

তিন. প্রত্যন্ত এক গ্রামের যুবক আব্দুস সবুর। উপজেলার একটি কলেজ থেকে বিয়ে পাস করেছে। বয়স ২৭/২৮ হবে। পিতা কৃষক। জমিতে ফসল ফলিয়ে পরিবার চলে সবুরদের। সবুরের বড় ভাই সামাদ তার পিতার সঙ্গে সারা বছর মাঠে কাজ করে। পড়ালেখা করতে পারেনি। ধান, আলু আর নানা ধরনের সবজি চাষ করে তারা। শরীর ঘামিয়ে ফসল ফলায় কৃষক। বাজারে বিক্রি করতে গেলে দাম পায় না। বাংলাদেশের কৃষকদের দুর্ভাগ্য এটি। তাদের পরিশ্রমের মূল্য আজ পর্যন্ত কেউ দিলো না। অথচ মধ্যস্বত্বভোগীরা শকুনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কৃষকের মাঠের দিকে। কখন ফসল তুলবে কৃষক সেই আশায়। একজন কৃষক আলু উৎপাদন করে দাম পায় আট টাকা কেজি। সেই আলু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা পনেরো কিলোমিটার দূরে শহরে এনে বিক্রি করছে কেজিপ্রতি বিশ টাকা। একই আলু রাজধানীর কাওরান বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে ত্রিশ টাকা। এমনি ভাবেই চোখের সামনে আমাদের কৃষকরা ঠকছে। কেউই এসব কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় না। তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছে স্যুট পরা ভদ্র ব্যবসায়ীরা। এটাই আমাদের বাংলাদেশ। সবুররাও প্রতি বছর এমন ভাবে ঠকে আসছে। তারপরও কিছু করার নেই। জমিতে ফসল না ফলালে চলবে কি করে? সবুরের পিতার ইচ্ছা তার মতো কৃষক যেন না হয় সবুর। কষ্ট করে পড়ালেখা করিয়েছে। একটা সরকারি চাকরি হবে। এমন স্বপ্ন লালন করে পিতা। পিতার স্বপ্ন পূরণের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সবুর। প্রতি সপ্তাহের চাকরির খবর কেনে। খুঁটেখুঁটে প্রত্যেকটি বিজ্ঞাপনে চোখ বুলায়। শহরে এসে অনলাইনে আবেদন করে। পরীক্ষার কার্ড পায়। পরীক্ষা দেয়। কিছু লিখিত পরীক্ষায় পাসও করে। বাদ সাধে ভাইভা বোর্ড। টেলিফোন কিংবা মোটা অংকের ঘুষ দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোনোবারই চাকরি হয় না সবুরের। মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে যায়। কি করবে ভেবে পায় না। বাড়ি থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় যেতে হয়। প্রতি পরীক্ষায় যাতায়াত, থাকা এবং খাওয়াতে দুই হাজারের কমে হয় না। রাস্তার ধারে শ্রমিকরা যে খাবারের দোকানে খায় সেসব হোটেলেই খেয়ে থাকে সবুর। এক বাটি ডাল ৫ টাকা, একটু আলুভর্তা ৫ টাকা, সঙ্গে দশ টাকার একটা শাক আর দেড় প্লেট ভাত। এ হলেই সবুরের এক বেলা হয়ে যায়। ৪০/৪৫ টাকাতে সেরে ফেলে খাওয়া। এবারও ঢাকায় গিয়েছে একটা চাকরির পরীক্ষার জন্য। যথারীতি খেতে গেছে চেনা-জানা হোটেলে। একটা বড় কাগজে মার্কার কলমে লেখায় চোখ আটকে যায় সবুরের। লেখা আছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রতি বাটি ডালের মূল্য বিশ টাকা ধার্য করা হয়েছে। পেটে ক্ষুধা। উপায় নেই। সবুর হোটেলে বসে এক প্লেট ভাত আর হাফ বাটি ডালের অর্ডার দেয়। হোটেলের বয় সবুরের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নেয়। তারপর বলে হাফ বাটি ডাল এখানে বিক্রি হয় না।

 

চার. সহকারী শিক্ষক নূরুল ইসলাম। গ্রামের একটি হাইস্কুলের মৌলভী পোস্টের মাস্টার। মধ্য বয়সী। স্কুল ছাড়া আর কিছু তার মাথায় কখনো কিছু ঢোকেনি। রাজনীতি, অর্থনীতি কিছুই বোঝেন না। স্কুলে গিয়ে ছাত্র পড়াতে হবে এটিই মাথায় ঘুরপাক খায়। ভালোই চলে যাচ্ছিল নূরুল ইসলামের সবকিছু। বাড়তি চিন্তা কখনো করতে হয়নি তাকে। বিগত এক দশকে নানান দিকের অসহায়ত্ব হঠাৎ করেই তাকে ঘিরে ফেলে। কখনো পিয়াজের বাজার, কখনো কাঁচামরিচ আবার কখনো সয়াবিন তেল তার মাথা ঘুরিয়ে দেয়। মাইনের টাকায় এখন আর মাস চলে না। ক্লাসে পড়াতে গিয়েও এখন টেনশন কাজ করে। মা- বাবাসহ পরিবারের সাত সদস্য তার মাইনের উপরেই পার হয়। দিন যায়। দেশের অস্থির পরিস্থিতি অক্টোপাশের মতো চারদিকে শক্ত করে ধরে ফেলে। রাতে আর নির্ভেজাল ঘুম হয় না। রক্তচাপ বাড়ে। মাথা অকেজো হয়ে যায় মাঝেমধ্যে। ক্লাসের মধ্যে ঝিমায়। ছাত্ররা দুষ্টুমি করে। নূরুল ইসলাম কিছুই বলে না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। একদিন হেড স্যার তার এমন অবস্থা দেখে তার রুমে নিয়ে যায়। নূরুল ইসলামের কাছে জানতে চায় কি হয়েছে। নূরুল ইসলাম নির্বাক। হেড স্যারের চোখের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। উত্তর দেয় না। কথা বলে না। আবারো হেড স্যারের জিজ্ঞাসা। চেতনা ফিরে আসে নূরুল ইসলামের। পরিবারের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছি। সব সময় চিন্তার দানা মাথায় নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। যেদিকে তাকাই সবদিকে কেবল হতাশা। অনাগত ভবিষ্যৎ এখন আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাবো। ঠিক তাই। বাজার পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে নূরুল ইসলাম এখন নিয়মিত মানসিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

 

পাঁচ. জমিলা বেওয়া। সেই কবে স্বামী মারা গেছে বলতে পারে না। বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়েরা কেউ খোঁজ রাখে না তার। শহরের রেলস্টেশন তার এখন স্থায়ী ঠিকানা। দিনের আলো ছড়িয়ে পড়লেই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। লাঠিতে ভর দিয়ে শহরের এগলি-ওগলি ঘুরে বেড়ায়। দোকানিদের কাছে হাত পাতে। ভদ্র মানুষদের দেখলে গুটিপায়ে এগিয়ে যায়। ভিক্ষা চায়। দশটা টাকা দেবেন? কিছু খাবো। এভাবেই ত্রিশ বছর ধরে ব্যস্ত শহরে দিনব্যাপী ঘোরেন। একেক দিন একেক হোটেলে গিয়ে চেয়ে খায়। সারাদিন ঘুরে এক দুই শ’ টাকা পায়। কোমরে কাপড়ের একটি ব্যাগ রশি দিয়ে বাঁধা আছে। সেই ব্যাগেই রাখে টাকা। জমিলা বেওয়ার মনে কোনো দুঃখ নেই। স্বাধীনভাবে ভিক্ষা করতে পেরে সে তৃপ্ত। কিছু দিন আগে এক পত্রিকা বিক্রেতা জোরে জোরে পত্রিকার শিরোনাম বলছে আর পত্রিকা বিক্রি করছে। ‘আজকের পত্রিকা, চমক লাগানো খবর। মন্ত্রী বলেছেন এদেশে এখন আর কোনো ভিক্ষুক দেখা যায় না’- ইত্যাদি বলে মানুষকে আকৃষ্ট করছে পত্রিকা কিনতে। জমিলা বেওয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হকারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে। খানিক পরে হকারের কাছে গিয়ে জানতে চায় বাবা মন্ত্রীটা কি জিনিস? সেকি কথা বলতে পারে? মানুষের মতো দেখতে? জমিলার কথায় হকার কিছুটা বিরক্ত হয়ে চোখ রাঙ্গায়। তারপর আবার উচ্চস্বরে পত্রিকার শিরোনাম পড়তে থাকে। ‘আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে গেছি, কোথাও ভিক্ষুকের দেখা পাওয়া যায় না’। জমিলা সামনের দিকে এগুতে থাকে- দশটা টাকা দেন কিছু খাবো বলতে বলতে।  সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com