সেই সালেক এখন কোথায়

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার মূল হোতা আবু সালেক। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে তোলা হয়েছিল এসব টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সালেকের বিরুদ্ধে মামলা করে। কিন্তু সোনালী ব্যাংকে ব্যক্তিক ও অব্যক্তিক হিসাব খোলার সময় সালেকের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল তার সঙ্গে চেহারার মিল থাকায় প্রায় তিন বছর জেলের ঘানি টানতে হয়েছে টাঙ্গাইলের নিরীহ জাহালমকে।

এই কাহিনী প্রকাশ হওয়ামাত্রই দেশময় সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই সালেক কোথায়? তার হদিস পাওয়া না গেলেও এবার তার বিপুল সম্পদের খোঁজ মিলেছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। ওই এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণমাধ্যমে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের খবর প্রকাশের পর হেলমেট মাথায় মোটরসাইকেলে ঘুরতেন সালেক। ৩-৪ মাস আগে তাকে বোদা উপজেলায় দেখা গিয়েছিল। তবে তার স্বজনরা বলছেন, এক বছর ধরে সালেকের এলাকায় কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, সালেক ভারত পালিয়ে গেছেন। রাতারাতি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়া সালেক বোদায় হঠাৎ খুলে বসেন স্যামসাং-এর শো-রুম। ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনাটি জানাজানি হলে ৮ মাস আগে সেটি বন্ধ করে দেন। বোদা পৌরসভার প্রামাণিক পাড়া এলাকায় প্রায় ২০ শতক জমির উপরে গড়েন একতলা বিশাল বাড়ি। আগে সেখানে ভাড়াটিয়া থাকলেও এখন সেই বাড়ির গেটেও ঝুলছে তালা। সিপাহিপাড়া এলাকায়ও ২০ শতক জমির ওপর সালেক স্থাপন করেন রুটি-বিস্কুটের কারখানা। নাম ‘ঢাকা বেকারি’। কারখানাটি তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন। কারখানার মালিকের সঙ্গে প্রতারণার করেন সালেক। ভাড়ার চুক্তিতে জামানত হিসেবে যে টাকার অংক লেখা থাকার কথা ছিল, সালেক তা লিখতে অস্বীকৃতি জানান।

জমির মালিক শাহীন আলম জানান, আবু সালেক তার জমিতে তাকে কারখানা তুলতে বলেন। তার কথামতো কারখানা করতে সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়। এই টাকা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে চুক্তিপত্রে উল্লেখ না করে দেখানো হয় মাত্র দেড় লাখ টাকা।  বোদায় হঠাৎ জমি কেনা এবং বাড়ি নির্মাণ করার টাকার উৎস কোথায়- এমন জানতে চাইলে সালেক তার পরিবারের লোকজনদের বলতেন, ঢাকায় তার শেয়ার ব্যবসা, দুধের ব্যবসা এবং গার্মেন্টের যন্ত্রাংশ সাপ্লাইয়ের ব্যবসা আছে।

এ প্রতিবেদকের কথা হয় সালেকের ভগ্নিপতি খাদেমুল ইসলাম রমজানের সঙ্গে। তিনি বোদার শমশেরনগর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক। রমজান বলেন, গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি সালেকের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়। এরপর সে আর বাড়িতে আসেনি।   জানা যায়, আবু সালেকের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ২০১২ সালের এপ্রিলে রাজধানীর মতিঝিল থানায় ৩৩টি মামলা হয়। কিন্তু এসব মামলায় আবু সালেকের বদলে জেল খাটেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলে দুদক। সোনালী ব্যাংকে সালেকের ১০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভুয়া ঠিকানাগুলোর একটি ছিল জাহালমের পাশের গ্রাম। ছবির সঙ্গে মিল থাকায় জাহালমের খোঁজ করতে থাকে পুলিশ। পরে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে তাকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিয়ে তার পরিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করলে অনুসন্ধানে নামে সংস্থাটি। গত বছরের ২২ এপ্রিল কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে জাহালমের সঙ্গে কথাও বলেন কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। মানবাধিকার কমিশনের তদন্দেই বেরিয়ে আসে আবু সালেক আর জাহালম একই ব্যক্তি নন। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে গত ৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাহালম মুক্ত হন। কমিশনের ওই তদন্তেই উঠে আসে আবু সালেকের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা। আবু সালেকের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া ইউনিয়নের সিঙ্গিয়া গ্রামে। তার বাবা আবদুল কুদ্দুস। আবু সালেক উচ্চমাধ্যমিক পাস। একসময় কাজ করতেন জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যাংক জালিয়াতি করেছেন। কয়েক বছর আগে ঠাকুরগাঁও শহরে ৫ শতক জমির পাশাপাশি দোকান-জমি করেন পঞ্চগড়েও।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» সাবেক স্ত্রীকে খুন করে যুবকের আত্মহত্যা

» প্রেমিককে জিম্মি করে কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণ, গ্রেফতার ৫

» নতুন এক শহরে যাবেন মাহি

» ক্যান্সার আক্রান্ত মেধাবী ছাত্রী নূপুর বাঁচতে চান

» আঠারো বছরেই হাজার চুরির রেকর্ড যার

» উপেক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চট্টগ্রামের গণপরিবহনে নেই চালক-হেলপারের তালিকা

» ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ ছাড়া বহুতল ভবন ব্যবহার করা যাবে না

» শবেবরাতের রাতে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা ৮ বছরেও বিচার হয়নি

» বনানী ট্র্যাজেডি ভাই নেই, তাই থেমে গেছে নেহার পড়াশোনা

» নুসরাত হত্যা কে এই রুহুল আমিন

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক

ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

সেই সালেক এখন কোথায়

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার মূল হোতা আবু সালেক। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে তোলা হয়েছিল এসব টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সালেকের বিরুদ্ধে মামলা করে। কিন্তু সোনালী ব্যাংকে ব্যক্তিক ও অব্যক্তিক হিসাব খোলার সময় সালেকের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল তার সঙ্গে চেহারার মিল থাকায় প্রায় তিন বছর জেলের ঘানি টানতে হয়েছে টাঙ্গাইলের নিরীহ জাহালমকে।

এই কাহিনী প্রকাশ হওয়ামাত্রই দেশময় সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই সালেক কোথায়? তার হদিস পাওয়া না গেলেও এবার তার বিপুল সম্পদের খোঁজ মিলেছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। ওই এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণমাধ্যমে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের খবর প্রকাশের পর হেলমেট মাথায় মোটরসাইকেলে ঘুরতেন সালেক। ৩-৪ মাস আগে তাকে বোদা উপজেলায় দেখা গিয়েছিল। তবে তার স্বজনরা বলছেন, এক বছর ধরে সালেকের এলাকায় কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, সালেক ভারত পালিয়ে গেছেন। রাতারাতি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়া সালেক বোদায় হঠাৎ খুলে বসেন স্যামসাং-এর শো-রুম। ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনাটি জানাজানি হলে ৮ মাস আগে সেটি বন্ধ করে দেন। বোদা পৌরসভার প্রামাণিক পাড়া এলাকায় প্রায় ২০ শতক জমির উপরে গড়েন একতলা বিশাল বাড়ি। আগে সেখানে ভাড়াটিয়া থাকলেও এখন সেই বাড়ির গেটেও ঝুলছে তালা। সিপাহিপাড়া এলাকায়ও ২০ শতক জমির ওপর সালেক স্থাপন করেন রুটি-বিস্কুটের কারখানা। নাম ‘ঢাকা বেকারি’। কারখানাটি তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন। কারখানার মালিকের সঙ্গে প্রতারণার করেন সালেক। ভাড়ার চুক্তিতে জামানত হিসেবে যে টাকার অংক লেখা থাকার কথা ছিল, সালেক তা লিখতে অস্বীকৃতি জানান।

জমির মালিক শাহীন আলম জানান, আবু সালেক তার জমিতে তাকে কারখানা তুলতে বলেন। তার কথামতো কারখানা করতে সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়। এই টাকা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে চুক্তিপত্রে উল্লেখ না করে দেখানো হয় মাত্র দেড় লাখ টাকা।  বোদায় হঠাৎ জমি কেনা এবং বাড়ি নির্মাণ করার টাকার উৎস কোথায়- এমন জানতে চাইলে সালেক তার পরিবারের লোকজনদের বলতেন, ঢাকায় তার শেয়ার ব্যবসা, দুধের ব্যবসা এবং গার্মেন্টের যন্ত্রাংশ সাপ্লাইয়ের ব্যবসা আছে।

এ প্রতিবেদকের কথা হয় সালেকের ভগ্নিপতি খাদেমুল ইসলাম রমজানের সঙ্গে। তিনি বোদার শমশেরনগর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক। রমজান বলেন, গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি সালেকের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়। এরপর সে আর বাড়িতে আসেনি।   জানা যায়, আবু সালেকের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ২০১২ সালের এপ্রিলে রাজধানীর মতিঝিল থানায় ৩৩টি মামলা হয়। কিন্তু এসব মামলায় আবু সালেকের বদলে জেল খাটেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলে দুদক। সোনালী ব্যাংকে সালেকের ১০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভুয়া ঠিকানাগুলোর একটি ছিল জাহালমের পাশের গ্রাম। ছবির সঙ্গে মিল থাকায় জাহালমের খোঁজ করতে থাকে পুলিশ। পরে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে তাকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিয়ে তার পরিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করলে অনুসন্ধানে নামে সংস্থাটি। গত বছরের ২২ এপ্রিল কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে জাহালমের সঙ্গে কথাও বলেন কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। মানবাধিকার কমিশনের তদন্দেই বেরিয়ে আসে আবু সালেক আর জাহালম একই ব্যক্তি নন। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে গত ৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাহালম মুক্ত হন। কমিশনের ওই তদন্তেই উঠে আসে আবু সালেকের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা। আবু সালেকের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া ইউনিয়নের সিঙ্গিয়া গ্রামে। তার বাবা আবদুল কুদ্দুস। আবু সালেক উচ্চমাধ্যমিক পাস। একসময় কাজ করতেন জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যাংক জালিয়াতি করেছেন। কয়েক বছর আগে ঠাকুরগাঁও শহরে ৫ শতক জমির পাশাপাশি দোকান-জমি করেন পঞ্চগড়েও।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক

ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Design & Developed BY ThemesBazar.Com