রানার কোথায়, কত সম্পদ?

বনানী থানার সদ্য বরখাস্ত হওয়া পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগ  মোটেও যেনতেন অভিযোগ নয়। পুলিশের ইউনিফর্ম গায়ে পরার পর থেকে অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছেন তিনি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে আত্মসাৎ করেছেন গ্রাহকের কয়েকশ’ কোটি টাকা। মাত্র কয়েক বছরের মাথায় গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। শুধু দেশেই নয়, এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের যাত্রা শুরু করে তার আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বিএনপি সরকারের সময়ে অনিয়মের কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন।

 

পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর চাকরিতে ফিরেন তিনি। এরপর থেকেই টাকা কামাতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি।

অবৈধভাবে অর্থ কামিয়ে তা বিনিয়োগ করে কিনেছেন অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি, গাড়ি। নামকরা কোম্পানির ডিলারশিপ, শো-রুম পরিচালনা করছিলেন। পর্যটন এলাকায় রিসোর্ট তৈরির জন্য বিনিয়োগ রয়েছে। বিদেশে মদের বার, স্পা সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, বহুমুখী প্রতিষ্ঠান ও পাঁচতারকা হোটেলে বিনিয়োগ করেছেন শত শত কোটি টাকা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তদন্ত থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এসব সম্পদ শুধু সোহেল রানার নামে নয়, তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের নামেও রয়েছে। একে একে বিয়ে করেছেন চারটি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলেছে, সোহেল রানা ই-অরেঞ্জের দু’টি ব্যাংক হিসাব থেকে ৩৪৯ কোটি টাকা সরিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এই টাকা তিনি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। তবে এই টাকার অঙ্ক আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। কারণ সোহেল রানা তার বোন, ভগ্নিপতি ও চতুর্থ স্ত্রীকে সামনে রেখে ই-অরেঞ্জের পরিচালনা করলেও ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল তার কাছে। গ্রাহকের টাকা থেকে অন্তত ৫০০ কোটির বেশি টাকা তিনি বেহাত করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্রমতে, দুটি বেসরকারি ব্যাংকে ই-অরেঞ্জের অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এরমধ্যে ২০শে জুলাই পর্যন্ত একটি ব্যাংকের হিসাবে জমা পড়ে ৬২০ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ৭২৯ টাকা। ব্যাংকের হিসাব বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬২০ কোটি ৪৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৯২ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। ওই হিসাব নম্বরে এখন মাত্র ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৭ টাকা জমা আছে। আরেকটি ব্যাংক হিসাবে ৩০শে জুন পর্যন্ত জমা পড়ে ৩৯১ কোটি ৬৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৯ টাকা। সেখানেও জমা আছে দুই কোটি ৮৯ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৯ টাকা। তুলে নেয়া হয়েছে বাকি ৩৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৫৯ টাকা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন গ্রাহকের এসব টাকা সোহেল রানা উত্তোলন করে বিনিয়োগ করেছেন ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যে।

সংশ্লিষ্টসূত্র বলছে, এই পুলিশ কর্মকর্তা মানুষের টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই ই-অরেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। প্রথমে ধারণা করেছিলেন নিজে পুলিশে চাকরি করেন তাই গ্রাহকরা তার তেমন কিছু করতে পারবেন না। মামলা হলে বছরের পর বছর মামলা আদালতে ঝুলে থাকবে। আর গ্রেপ্তার না হওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন। কিন্তু শেষমেশ পরিকল্পনা তার অনুকূলে যায়নি। তাই ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে নেপাল যেতে চেয়েছিলেন। কারণ নেপালে তার অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। তিনি মনে করেছিলেন ইউরোপের দেশে তার নাগরিকত্ব আছে। ভারত বা নেপাল যেতে পারলে সেখান থেকে সহজে ওই দেশগুলোতে পালাতে পারতেন। তবে পুলিশের গুলশান জোনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সামনে চলে আসলে এবং পরবর্তীতে কোম্পানির মালিক পক্ষের নামে মামলা হওয়ার পর সোহেল রানা বিভিন্নভাবে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন তদবির করেন। কিন্তু ওই তদবির কোনো কাজে আসেনি। যাদের কাছে তদবির করেছেন তারা তাকে কোনো আশ্বাস দেননি। এতে করে ভেঙে পড়েন সোহেল রানা। তাই নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাকে পালানোর পথ বেছে নিতে হয়।

সোহেল রানা এত বিত্ত-ভৈববের মালিক হলেও ই-অরেঞ্জ ঘটনা জনসম্মুখে আসার পর তিনিও আলোচনায় আসেন। আর পালিয়ে ভারত গিয়ে ধরা পড়ার পর থেকে চাকরি জীবনে তার করা বিভিন্ন অপকর্মও সামনে চলে আসছে। তার অপকর্মের বিষয়ে অবগত হয়ে কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে তাকে সাসপেন্ড করেছেন। তার কর্মস্থলের চেয়ারে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
তদন্ত সূত্রগুলো বলছে, ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক ছিলেন সোহেল রানা। টাকা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। যেখানেই চাকরি করেছেন সেখানে বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়াতেন। কামাতেন অবৈধভাবে টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে পুলিশে যোগ দেন। ক্যাম্পাসে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় জালিয়াতি করেছেন এমন অভিযোগও আছে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চাকরি হারান। কিছুদিন পর চাকরি ফেরত পান। তবে তার চাকরি জীবনের বেশির ভাগ সময় ঘুরেফিরে অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে কাটিয়েছেন। এতে করে গুলশান-বনানীকেন্দ্রিক অবৈধ ভিওআইপি কারবার, স্পা সেন্টার, হোটেল-বার ও বিভিন্ন দূতাবাস থেকে ভিসা পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সোহেল রানা পুলিশ পরিদর্শক হয়েছেন চার বছর আগে। এরআগে তিনি দীর্ঘদিন গুলশান ও বাড্ডা থানার এস আই ছিলেন। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গুলশান থানার এস আই থাকাকালে কূটনৈতিক অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশে চুক্তিতে লোক পাঠাতেন। গুলশানের পর দুই বছর মালিবাগে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) কর্মরত ছিলেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হলেও ২০২০ সালের ২০শে জানুয়ারি পর্যন্ত এসবিতে ছিলেন। এরপর চার মাস কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমে ছিলেন। ২০২০ সালের ২৮শে মে থেকে বনানী থানায় পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে যোগ দেন। চাকরি জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও বেপরোয়া ছিলেন তিনি। বিয়ে করেছেন চারটি। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ১০ বছর ধরে সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী একজন অভিনেত্রী। লন্ডনে পড়তে গিয়ে তৃতীয় বিয়ে করেন সোহেল। চতুর্থ স্ত্রীর নাম নাজনীন নাহার বীথি। তিনি ই-অরেঞ্জের অর্থ আত্মসাতের মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে পলাতক।

সম্পদের পাহাড়: সোহেল রানার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে সরকারের একাধিক সংস্থা। তদন্তে তার দেশে-বিদেশে পাহাড় সমান সম্পদের তথ্য মিলেছে। পরিদর্শক পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তার এত সম্পদ দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন খোদ তদন্ত কর্মকর্তারা। মাত্র কয়েক বছরে আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে তার। তবে তার সমস্ত সম্পদের হিসাব এখনি পাওয়া যায়নি। যেটুকু পাওয়া গেছে সেটিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সম্পদের পাহাড় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সোহেল রানা দেশে-বিদেশে সমানতালে বিনিয়োগ করেছেন। দেশে শুধুমাত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় তার এক ডজন ফ্ল্যাট রয়েছে। সবক’টি ফ্ল্যাটের বাজার মূল্য অর্ধশত কোটি টাকা। এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে অভিজাত এলাকা গুলশানের শাহজাদপুরের সুবাস্তু নজরভ্যালির ৩ নম্বর টাওয়ারে তার ১টি, গুলশান মডেল টাউনে ১টি, নিকেতনে ২টি ফ্ল্যাট ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ই-ব্লকে ১টি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাকিগুলো বনানী ও উত্তরা এলাকায় রয়েছে। গুলশানের একটি বাণিজ্যিক ভবনে ৯ কোটি টাকা দিয়ে জায়গা কিনেছেন। পূর্বাচলে তিন নম্বর সেক্টরে ১টি প্লট, কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন একটি আবাসিক এলাকার ই এবং আই ব্লকে দুটি প্লট। গুলশান, উত্তরা ও বনানীতে অন্তত ডজনখানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সোহেল রানার। কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা করছেন এমন তথ্যও পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গুলশান ২ নম্বরের ডিসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারের পেছনে তার একটি অফিস রয়েছে। সেখানে নিয়মিত বসতেন। গুলশান এলাকায় ব্যবসা করছে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ রয়েছে। টিঅ্যান্ডজি নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে যার একটি শাখা গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে ও অন্যটি উত্তরার গরীব-ই-নেওয়াজ অ্যাভিনিউয়ে। নিজ এলাকা গোপালগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫০০ বিঘা জমি কিনেছেন এই কর্মকর্তা। পর্যটন এলাকা খাগড়াছড়িতে একটি উন্নতমানের রিসোর্ট তৈরির জন্য জমি কিনেছেন। সম্প্রতি সেখানে কাজ শুরুর পরিকল্পনা করছিলেন। এজন্য প্রকৌশলী দিয়ে ডিজাইন তৈরি করাচ্ছিলেন।

দেশের বাইরে বিদেশেও রয়েছে সোহেল রানার শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। এরমধ্যে পর্তুগাল, ফ্রান্স, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশে বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ করেছেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে তার ১টি বড় সুপারশপ, ১টি বার ও ১টি রেস্টুরেন্ট আছে। ফ্রান্সের প্যারিসে ১টি রেস্টুরেন্ট ও বার আছে। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় কিনেছেন জমি। সেখানে তার ১টি ফ্ল্যাট ও ১টি সুপারশপ আছে। সেখানে হিলটন হোটেলের পাশে আরেকটি পাঁচতারকা হোটেলে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। সেখানে ১টি বড় প্রতিষ্ঠানেও প্রায় ১০ কোটি টাকা ও ফিলিপাইনের ম্যানিলায় রয়েছে স্ট্রিট বার। নেপালেও তার বিভিন্ন ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। নেপালে তার ১টি বার ও ১টি ক্যাসিনো রয়েছে। তবে দেশের বাইরে বিনিয়োগের মধ্যে থাইল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box
Share Button

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ডেমরা থেকে ১২ হাজার পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার

» ১৩ কোটি টাকার লটারি জিতলেন অটোচালক!

» সৌদিতে বয়লার বিস্ফোরণে বাংলাদেশি নিহত

» টাখনুর নিচে কাপড় পরা হারাম কেন?

» বেড়ে ওঠা শৈশবের হৃদয়

» নুডলস পাকোড়া বানানোর সহজ রেসিপি

» রানি ক্লিওপেট্রা কেন পানির নিচে রাজপ্রাসাদ গড়েছিলেন?

» ‘বাতাসেই দ্রুত ছড়াচ্ছে করোনা’

» কুষ্টিয়ায় সাব রেজিস্ট্রার হত্যায় ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড

» সাগরে ফের লঘুচাপ

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

রানার কোথায়, কত সম্পদ?

বনানী থানার সদ্য বরখাস্ত হওয়া পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগ  মোটেও যেনতেন অভিযোগ নয়। পুলিশের ইউনিফর্ম গায়ে পরার পর থেকে অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছেন তিনি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে আত্মসাৎ করেছেন গ্রাহকের কয়েকশ’ কোটি টাকা। মাত্র কয়েক বছরের মাথায় গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। শুধু দেশেই নয়, এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের যাত্রা শুরু করে তার আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বিএনপি সরকারের সময়ে অনিয়মের কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন।

 

পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর চাকরিতে ফিরেন তিনি। এরপর থেকেই টাকা কামাতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি।

অবৈধভাবে অর্থ কামিয়ে তা বিনিয়োগ করে কিনেছেন অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি, গাড়ি। নামকরা কোম্পানির ডিলারশিপ, শো-রুম পরিচালনা করছিলেন। পর্যটন এলাকায় রিসোর্ট তৈরির জন্য বিনিয়োগ রয়েছে। বিদেশে মদের বার, স্পা সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, বহুমুখী প্রতিষ্ঠান ও পাঁচতারকা হোটেলে বিনিয়োগ করেছেন শত শত কোটি টাকা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তদন্ত থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এসব সম্পদ শুধু সোহেল রানার নামে নয়, তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের নামেও রয়েছে। একে একে বিয়ে করেছেন চারটি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলেছে, সোহেল রানা ই-অরেঞ্জের দু’টি ব্যাংক হিসাব থেকে ৩৪৯ কোটি টাকা সরিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এই টাকা তিনি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। তবে এই টাকার অঙ্ক আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। কারণ সোহেল রানা তার বোন, ভগ্নিপতি ও চতুর্থ স্ত্রীকে সামনে রেখে ই-অরেঞ্জের পরিচালনা করলেও ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল তার কাছে। গ্রাহকের টাকা থেকে অন্তত ৫০০ কোটির বেশি টাকা তিনি বেহাত করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্রমতে, দুটি বেসরকারি ব্যাংকে ই-অরেঞ্জের অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এরমধ্যে ২০শে জুলাই পর্যন্ত একটি ব্যাংকের হিসাবে জমা পড়ে ৬২০ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ৭২৯ টাকা। ব্যাংকের হিসাব বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬২০ কোটি ৪৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৯২ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। ওই হিসাব নম্বরে এখন মাত্র ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৭ টাকা জমা আছে। আরেকটি ব্যাংক হিসাবে ৩০শে জুন পর্যন্ত জমা পড়ে ৩৯১ কোটি ৬৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৯ টাকা। সেখানেও জমা আছে দুই কোটি ৮৯ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৯ টাকা। তুলে নেয়া হয়েছে বাকি ৩৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৫৯ টাকা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন গ্রাহকের এসব টাকা সোহেল রানা উত্তোলন করে বিনিয়োগ করেছেন ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যে।

সংশ্লিষ্টসূত্র বলছে, এই পুলিশ কর্মকর্তা মানুষের টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই ই-অরেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। প্রথমে ধারণা করেছিলেন নিজে পুলিশে চাকরি করেন তাই গ্রাহকরা তার তেমন কিছু করতে পারবেন না। মামলা হলে বছরের পর বছর মামলা আদালতে ঝুলে থাকবে। আর গ্রেপ্তার না হওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন। কিন্তু শেষমেশ পরিকল্পনা তার অনুকূলে যায়নি। তাই ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে নেপাল যেতে চেয়েছিলেন। কারণ নেপালে তার অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। তিনি মনে করেছিলেন ইউরোপের দেশে তার নাগরিকত্ব আছে। ভারত বা নেপাল যেতে পারলে সেখান থেকে সহজে ওই দেশগুলোতে পালাতে পারতেন। তবে পুলিশের গুলশান জোনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সামনে চলে আসলে এবং পরবর্তীতে কোম্পানির মালিক পক্ষের নামে মামলা হওয়ার পর সোহেল রানা বিভিন্নভাবে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন তদবির করেন। কিন্তু ওই তদবির কোনো কাজে আসেনি। যাদের কাছে তদবির করেছেন তারা তাকে কোনো আশ্বাস দেননি। এতে করে ভেঙে পড়েন সোহেল রানা। তাই নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাকে পালানোর পথ বেছে নিতে হয়।

সোহেল রানা এত বিত্ত-ভৈববের মালিক হলেও ই-অরেঞ্জ ঘটনা জনসম্মুখে আসার পর তিনিও আলোচনায় আসেন। আর পালিয়ে ভারত গিয়ে ধরা পড়ার পর থেকে চাকরি জীবনে তার করা বিভিন্ন অপকর্মও সামনে চলে আসছে। তার অপকর্মের বিষয়ে অবগত হয়ে কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে তাকে সাসপেন্ড করেছেন। তার কর্মস্থলের চেয়ারে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
তদন্ত সূত্রগুলো বলছে, ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক ছিলেন সোহেল রানা। টাকা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। যেখানেই চাকরি করেছেন সেখানে বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়াতেন। কামাতেন অবৈধভাবে টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে পুলিশে যোগ দেন। ক্যাম্পাসে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় জালিয়াতি করেছেন এমন অভিযোগও আছে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চাকরি হারান। কিছুদিন পর চাকরি ফেরত পান। তবে তার চাকরি জীবনের বেশির ভাগ সময় ঘুরেফিরে অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে কাটিয়েছেন। এতে করে গুলশান-বনানীকেন্দ্রিক অবৈধ ভিওআইপি কারবার, স্পা সেন্টার, হোটেল-বার ও বিভিন্ন দূতাবাস থেকে ভিসা পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সোহেল রানা পুলিশ পরিদর্শক হয়েছেন চার বছর আগে। এরআগে তিনি দীর্ঘদিন গুলশান ও বাড্ডা থানার এস আই ছিলেন। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গুলশান থানার এস আই থাকাকালে কূটনৈতিক অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশে চুক্তিতে লোক পাঠাতেন। গুলশানের পর দুই বছর মালিবাগে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) কর্মরত ছিলেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হলেও ২০২০ সালের ২০শে জানুয়ারি পর্যন্ত এসবিতে ছিলেন। এরপর চার মাস কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমে ছিলেন। ২০২০ সালের ২৮শে মে থেকে বনানী থানায় পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে যোগ দেন। চাকরি জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও বেপরোয়া ছিলেন তিনি। বিয়ে করেছেন চারটি। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ১০ বছর ধরে সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী একজন অভিনেত্রী। লন্ডনে পড়তে গিয়ে তৃতীয় বিয়ে করেন সোহেল। চতুর্থ স্ত্রীর নাম নাজনীন নাহার বীথি। তিনি ই-অরেঞ্জের অর্থ আত্মসাতের মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে পলাতক।

সম্পদের পাহাড়: সোহেল রানার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে সরকারের একাধিক সংস্থা। তদন্তে তার দেশে-বিদেশে পাহাড় সমান সম্পদের তথ্য মিলেছে। পরিদর্শক পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তার এত সম্পদ দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন খোদ তদন্ত কর্মকর্তারা। মাত্র কয়েক বছরে আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে তার। তবে তার সমস্ত সম্পদের হিসাব এখনি পাওয়া যায়নি। যেটুকু পাওয়া গেছে সেটিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সম্পদের পাহাড় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সোহেল রানা দেশে-বিদেশে সমানতালে বিনিয়োগ করেছেন। দেশে শুধুমাত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় তার এক ডজন ফ্ল্যাট রয়েছে। সবক’টি ফ্ল্যাটের বাজার মূল্য অর্ধশত কোটি টাকা। এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে অভিজাত এলাকা গুলশানের শাহজাদপুরের সুবাস্তু নজরভ্যালির ৩ নম্বর টাওয়ারে তার ১টি, গুলশান মডেল টাউনে ১টি, নিকেতনে ২টি ফ্ল্যাট ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ই-ব্লকে ১টি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাকিগুলো বনানী ও উত্তরা এলাকায় রয়েছে। গুলশানের একটি বাণিজ্যিক ভবনে ৯ কোটি টাকা দিয়ে জায়গা কিনেছেন। পূর্বাচলে তিন নম্বর সেক্টরে ১টি প্লট, কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন একটি আবাসিক এলাকার ই এবং আই ব্লকে দুটি প্লট। গুলশান, উত্তরা ও বনানীতে অন্তত ডজনখানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সোহেল রানার। কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা করছেন এমন তথ্যও পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গুলশান ২ নম্বরের ডিসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারের পেছনে তার একটি অফিস রয়েছে। সেখানে নিয়মিত বসতেন। গুলশান এলাকায় ব্যবসা করছে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ রয়েছে। টিঅ্যান্ডজি নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে যার একটি শাখা গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে ও অন্যটি উত্তরার গরীব-ই-নেওয়াজ অ্যাভিনিউয়ে। নিজ এলাকা গোপালগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫০০ বিঘা জমি কিনেছেন এই কর্মকর্তা। পর্যটন এলাকা খাগড়াছড়িতে একটি উন্নতমানের রিসোর্ট তৈরির জন্য জমি কিনেছেন। সম্প্রতি সেখানে কাজ শুরুর পরিকল্পনা করছিলেন। এজন্য প্রকৌশলী দিয়ে ডিজাইন তৈরি করাচ্ছিলেন।

দেশের বাইরে বিদেশেও রয়েছে সোহেল রানার শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। এরমধ্যে পর্তুগাল, ফ্রান্স, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশে বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ করেছেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে তার ১টি বড় সুপারশপ, ১টি বার ও ১টি রেস্টুরেন্ট আছে। ফ্রান্সের প্যারিসে ১টি রেস্টুরেন্ট ও বার আছে। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় কিনেছেন জমি। সেখানে তার ১টি ফ্ল্যাট ও ১টি সুপারশপ আছে। সেখানে হিলটন হোটেলের পাশে আরেকটি পাঁচতারকা হোটেলে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। সেখানে ১টি বড় প্রতিষ্ঠানেও প্রায় ১০ কোটি টাকা ও ফিলিপাইনের ম্যানিলায় রয়েছে স্ট্রিট বার। নেপালেও তার বিভিন্ন ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। নেপালে তার ১টি বার ও ১টি ক্যাসিনো রয়েছে। তবে দেশের বাইরে বিনিয়োগের মধ্যে থাইল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box
Share Button

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com