ব্যাংকের আমানত কমে অর্ধেক

করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলেও উল্টো পথে দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি হার। আমানতকে বলা হয়- ব্লাড ফ্লো অব দ্যা ব্যাংক। সেই আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে আমানত কমেছে ৫১ শতাংশ। এদিকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের সেই দায়িত্ব
পড়েছে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের ওপর। ব্যাংক শুধু যে আমানত সংগ্রহের জন্যই কর্মীদের চাপ বা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়, তা নয়। ঋণ দেয়া, কার্ড বিক্রি বা অন্যান্য সেবার বিক্রির জন্যও লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। ব্যাংকের বেঁধে দেয়া লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে তার বছর শেষের মূল্যায়নে প্রভাব ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চাকরির ওপর।

ফলে চাপে দিশাহারা ব্যাংকের কর্মীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছিল ৮৬ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। ওই সময় আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৮ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু ২০২১ সালের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকায়। ওই হিসাবে এ সময়ের মধ্যে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ কমেছে ৫১ শতাংশ। ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলোয় মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের একই সময়ে মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪১ শতাংশ।
সূত্র জানায়, ২০২০ সাল করোনার প্রাদুর্ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হলেও ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে এক বছরের মধ্যেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলেও থমকে দাঁড়িয়েছে আমানতের প্রবৃদ্ধি হার।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ২০২০ সালে ব্যাংক খাতে আমানতের গতি আশাব্যঞ্জক হয়েছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে শুরু করেছে তখন আমানতের প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া প্রশ্নবোধক। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের আড়ালে দেশ থেকে টাকা পাচার বাড়ছে। আর মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করছেন বলে সন্দেহ তাদের। সমপ্রতি দেশে খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম ৯২ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অথচ ব্যাংক খাতে প্রতি ডলার বিনিময় হচ্ছে ৮৬ টাকায়। ব্যাংক খাতের সঙ্গে খুচরা বাজারে ডলারের দামের বড় ধরনের তারতম্যের পেছনে দেশ থেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে নিয়ে আসার কারণে আমানতের সুদহারও কমে গেছে। বর্তমানে আমানত ও ঋণের হার ৬-৯। কোনো কোনো ব্যাংকে আরও কম। ফলে ঋণের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ থাকলেও বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখতে সাধারণ গ্রাহকরা আগ্রহী হন না।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালে বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ব্যাংকে জমা ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে মনোযোগী হয়েছে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমাসহ বেশ কয়েকটি কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। তবে কোন কারণে এত বেশি কমেছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের নভেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মেয়াদি ও তলবি আমানতের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা ছিল মেয়াদি আমানত। আর তলবি আমানত ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর মেয়াদে ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৯ শতাংশেরও বেশি। আর ২০২১ সালের একই সময়ে মেয়াদি আমানতের এ প্রবৃদ্ধি ৪১.১৩ শতাংশ কমেছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ১১৮ কোটি টাকা।
জানা গেছে, আমানতের বড় উল্লম্ফন হওয়ায় গত বছরের মাঝামাঝিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অলস তারল্যের চাপ সামলাতে ওই সময় মেয়াদি আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নামিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। ওই সময় কোনো কোনো ব্যাংক তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার ৩ শতাংশে নামিয়ে আনে। এ পরিস্থিতিতে আমানতের সুদহারে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মেয়াদি আমানতের সুদহার দেশের মূল্যস্ফীতির নিচে হবে না বলে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনটি জারি হওয়ার পর ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার বাড়াতে বাধ্য হয়। সুদহার বাড়ানোর পরও ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি থমকে গিয়েছে।
ওদিকে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আমানত সংগ্রহের সেই দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের ওপর।

 

ব্যাংকের একজন কর্মী জানান, আমাদের ব্যাংক এই বছর ১৮০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করার লক্ষ্য দিয়েছে। আমাদের ব্রাঞ্চে কয়েক কোটি টাকার টার্গেট পড়েছে। আমার ভাগে পড়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার আমানত সংগ্রহ করার। আর এত ব্যাংক- মানুষ আর ব্যাংকে আমানত রাখতে চায় না। ব্যাংকের কাজ করি আর সারাক্ষণ চিন্তা করি, কোথায় কার কাছ থেকে এত টাকা ব্যাংকে আনবো। তিনি বলেন, প্রথম দিকে আত্মীয়স্বজনদের ধরে ব্যাংকে আমানত সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখন আর ঘনিষ্ঠদের কেউ নেই যে, নতুন করে টাকা জমা রাখবে। কারণ যারা আগে বেশি সুদের আশায় ব্যাংকে টাকা রাখতেন, তারাও সেই টাকা তুলে অন্যত্র বিনিয়োগ করেছেন। কেননা আমানতের সুদ হার খুবই কম। কিন্তু ব্যাংকের বেঁধে দেয়া লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে তার বছর শেষের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলবে, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে চাকরির ওপরেও।

 

এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ব্যাংকের ব্যবসাই হলো আমানত সংগ্রহ করার পর সেটাকে ঋণ হিসেবে বিতরণ করে মুনাফা করা। এ জন্য ব্যাংককে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। আর সেই লক্ষ্য পূরণের দায়িত্ব কর্মীদের ওপর পড়ে।
এদিকে সরকারি ব্যাংকগুলোয় আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হলে, সেটা পূরণ না হলেও কর্মীদের বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধার ওপরে কোনো প্রভাব পড়ে না। অথচ বেসরকারি ব্যাংকের বেলায় এই চিত্র একেবারে উল্টো। সেখানে কর্মীদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা হয় ‘কেপিআই’ বা ‘কি পারফরমেন্স ইনডেক্স’ নামের একটি পদ্ধতিতে।

 

ব্যাংকের কর্মীরা জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে কর্মী লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমানত সংগ্রহ করতে পেরেছেন কিনা, কতোটা ঋণ বিতরণ করতে পেরেছেন, বাড়তি কোনো অবদান রেখেছেন কিনা ইত্যাদি বিষয় বিচার করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে বছর শেষে তার প্রমোশন, বোনাস, বেতন বৃদ্ধি, পোস্টিং ইত্যাদি নির্ভর করে। কেউ যদি টার্গেট পূরণ করতে না পারে, বছর শেষে হয়তো তার ইনক্রিমেন্ট হবে না বা বোনাস কম পাবেন। অনেক সময় দূরে বা গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন শাখা বা বিভাগে বদলি করে দেয়া হয়।

 

কর্মীদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া না দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা নেই। প্রতিটা ব্যাংক তাদের নিজস্ব নীতি বিবেচনায় এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অতীতে কোনো পর্যবেক্ষণও দেয়নি। সমপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনায় বলেছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা ও কাজের অদক্ষতা প্রদর্শন সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোকে নিচের দিকের সব কর্মী, সাপোর্ট স্টাফ, অফিসার, ক্যাশ অফিসার এদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও প্রমোশন চালিয়ে যেতে হবে। সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» হাওরে কৃষকদের বোরো ধানের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হবে: কৃষিমন্ত্রী

» বাসচাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত

» ‌‌‘বিনা কারণে কারাগার এখন বিএনপি নেতাকর্মীদের স্থায়ী ঠিকানা’

» রাজধানীর শিশু হাসপাতালের আগুন নিয়ন্ত্রণে

» বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা রাজনৈতিক নয়: প্রধানমন্ত্রী

» রাজধানীর শিশু হাসপাতালের ভবনে আগুন

» শনিবার ২ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়

» মাদক বিক্রি ও সেবন করার অপরাধে ১০ জন গ্রেফতার

» ‘জীবনে অনেক ভুল করেছি’—হঠাৎ কী হলো পরিণীতির?

» ‘মুস্তাফিজকে কেন পুরো আইপিএল খেলতে দিচ্ছে না বাংলাদেশ’

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ব্যাংকের আমানত কমে অর্ধেক

করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলেও উল্টো পথে দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি হার। আমানতকে বলা হয়- ব্লাড ফ্লো অব দ্যা ব্যাংক। সেই আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে আমানত কমেছে ৫১ শতাংশ। এদিকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের সেই দায়িত্ব
পড়েছে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের ওপর। ব্যাংক শুধু যে আমানত সংগ্রহের জন্যই কর্মীদের চাপ বা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়, তা নয়। ঋণ দেয়া, কার্ড বিক্রি বা অন্যান্য সেবার বিক্রির জন্যও লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। ব্যাংকের বেঁধে দেয়া লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে তার বছর শেষের মূল্যায়নে প্রভাব ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চাকরির ওপর।

ফলে চাপে দিশাহারা ব্যাংকের কর্মীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছিল ৮৬ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। ওই সময় আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৮ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু ২০২১ সালের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকায়। ওই হিসাবে এ সময়ের মধ্যে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ কমেছে ৫১ শতাংশ। ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলোয় মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের একই সময়ে মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪১ শতাংশ।
সূত্র জানায়, ২০২০ সাল করোনার প্রাদুর্ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হলেও ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে এক বছরের মধ্যেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলেও থমকে দাঁড়িয়েছে আমানতের প্রবৃদ্ধি হার।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ২০২০ সালে ব্যাংক খাতে আমানতের গতি আশাব্যঞ্জক হয়েছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে শুরু করেছে তখন আমানতের প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া প্রশ্নবোধক। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের আড়ালে দেশ থেকে টাকা পাচার বাড়ছে। আর মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করছেন বলে সন্দেহ তাদের। সমপ্রতি দেশে খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম ৯২ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অথচ ব্যাংক খাতে প্রতি ডলার বিনিময় হচ্ছে ৮৬ টাকায়। ব্যাংক খাতের সঙ্গে খুচরা বাজারে ডলারের দামের বড় ধরনের তারতম্যের পেছনে দেশ থেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে নিয়ে আসার কারণে আমানতের সুদহারও কমে গেছে। বর্তমানে আমানত ও ঋণের হার ৬-৯। কোনো কোনো ব্যাংকে আরও কম। ফলে ঋণের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ থাকলেও বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখতে সাধারণ গ্রাহকরা আগ্রহী হন না।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালে বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ব্যাংকে জমা ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে মনোযোগী হয়েছে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমাসহ বেশ কয়েকটি কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। তবে কোন কারণে এত বেশি কমেছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের নভেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মেয়াদি ও তলবি আমানতের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা ছিল মেয়াদি আমানত। আর তলবি আমানত ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুলাই-নভেম্বর মেয়াদে ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৯ শতাংশেরও বেশি। আর ২০২১ সালের একই সময়ে মেয়াদি আমানতের এ প্রবৃদ্ধি ৪১.১৩ শতাংশ কমেছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ১১৮ কোটি টাকা।
জানা গেছে, আমানতের বড় উল্লম্ফন হওয়ায় গত বছরের মাঝামাঝিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অলস তারল্যের চাপ সামলাতে ওই সময় মেয়াদি আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নামিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। ওই সময় কোনো কোনো ব্যাংক তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার ৩ শতাংশে নামিয়ে আনে। এ পরিস্থিতিতে আমানতের সুদহারে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মেয়াদি আমানতের সুদহার দেশের মূল্যস্ফীতির নিচে হবে না বলে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনটি জারি হওয়ার পর ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার বাড়াতে বাধ্য হয়। সুদহার বাড়ানোর পরও ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি থমকে গিয়েছে।
ওদিকে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আমানত সংগ্রহের সেই দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের ওপর।

 

ব্যাংকের একজন কর্মী জানান, আমাদের ব্যাংক এই বছর ১৮০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করার লক্ষ্য দিয়েছে। আমাদের ব্রাঞ্চে কয়েক কোটি টাকার টার্গেট পড়েছে। আমার ভাগে পড়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার আমানত সংগ্রহ করার। আর এত ব্যাংক- মানুষ আর ব্যাংকে আমানত রাখতে চায় না। ব্যাংকের কাজ করি আর সারাক্ষণ চিন্তা করি, কোথায় কার কাছ থেকে এত টাকা ব্যাংকে আনবো। তিনি বলেন, প্রথম দিকে আত্মীয়স্বজনদের ধরে ব্যাংকে আমানত সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখন আর ঘনিষ্ঠদের কেউ নেই যে, নতুন করে টাকা জমা রাখবে। কারণ যারা আগে বেশি সুদের আশায় ব্যাংকে টাকা রাখতেন, তারাও সেই টাকা তুলে অন্যত্র বিনিয়োগ করেছেন। কেননা আমানতের সুদ হার খুবই কম। কিন্তু ব্যাংকের বেঁধে দেয়া লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে তার বছর শেষের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলবে, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে চাকরির ওপরেও।

 

এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ব্যাংকের ব্যবসাই হলো আমানত সংগ্রহ করার পর সেটাকে ঋণ হিসেবে বিতরণ করে মুনাফা করা। এ জন্য ব্যাংককে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। আর সেই লক্ষ্য পূরণের দায়িত্ব কর্মীদের ওপর পড়ে।
এদিকে সরকারি ব্যাংকগুলোয় আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হলে, সেটা পূরণ না হলেও কর্মীদের বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধার ওপরে কোনো প্রভাব পড়ে না। অথচ বেসরকারি ব্যাংকের বেলায় এই চিত্র একেবারে উল্টো। সেখানে কর্মীদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা হয় ‘কেপিআই’ বা ‘কি পারফরমেন্স ইনডেক্স’ নামের একটি পদ্ধতিতে।

 

ব্যাংকের কর্মীরা জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে কর্মী লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমানত সংগ্রহ করতে পেরেছেন কিনা, কতোটা ঋণ বিতরণ করতে পেরেছেন, বাড়তি কোনো অবদান রেখেছেন কিনা ইত্যাদি বিষয় বিচার করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে বছর শেষে তার প্রমোশন, বোনাস, বেতন বৃদ্ধি, পোস্টিং ইত্যাদি নির্ভর করে। কেউ যদি টার্গেট পূরণ করতে না পারে, বছর শেষে হয়তো তার ইনক্রিমেন্ট হবে না বা বোনাস কম পাবেন। অনেক সময় দূরে বা গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন শাখা বা বিভাগে বদলি করে দেয়া হয়।

 

কর্মীদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া না দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা নেই। প্রতিটা ব্যাংক তাদের নিজস্ব নীতি বিবেচনায় এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অতীতে কোনো পর্যবেক্ষণও দেয়নি। সমপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনায় বলেছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা ও কাজের অদক্ষতা প্রদর্শন সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোকে নিচের দিকের সব কর্মী, সাপোর্ট স্টাফ, অফিসার, ক্যাশ অফিসার এদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও প্রমোশন চালিয়ে যেতে হবে। সূএ:মানবজমিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com