ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত

তসলিমা নাসরিন:  মাঝে মাঝে ভুলে যাই আমি ডাক্তার। ডাক্তারি চাকরি করি না, চেম্বারে বসে রোগী দেখি না। তাতে কী? ডাক্তার তো! দিন রাত লেখাপড়া করে ডাক্তারি পাস করেছি। দিন রাত রোগীর চিকিৎসা করে করে ইন্টার্নিশিপ করেছি। তারপর তো আট বছর চাকরি। গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প করে ভেসেকটমি টিউবেকটমি করতাম। মিটফোর্ড আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনি বিভাগ আর এনেস্থেসিয়া বিভাগে চাকরি করতাম। দিন রাত রোগীর বাচ্চা হওয়ানো, ফরসেপ ডেলিভারি, ব্রিচ ডেলিভারি, সিজারিয়ান করায় ব্যস্ত থেকেছি। তারপর বিভাগ পাল্টে রোগীকে অপারেশন টেবিলে তুলে অজ্ঞান করতাম, অপারেশনের পর জ্ঞান ফেরাতাম। আমি নামের আগে ডাক্তার শব্দটি ব্যবহার করি না। ইউরোপের নামি চারটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট পেয়েছি। তারপরও নামের আগে ডক্টর ব্যবহার করি না। নামের আগে পরে ভারি ভারি জিনিস থাকলে নামের ওপর চাপ পড়ে।

 

২. অদ্ভুত আমি। কোনও কিছু নিয়ে পাগল হই, দুদিন পর ভুলে যাই। ফুসফুসে কীসব ধরা পড়ছে, দৌড়োদৌড়ি ডাক্তারের কাছে, একজন নয়, দু’তিনজন স্পেশালিস্টের সংগে মিটিং করা হয়ে গেল। এরপর কী জানি কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, ফুসফুসের ব্যাপারে যে কিছু একটা করতে হবে ভুলেই গেলাম। লিভার কিডনি নিয়েও একই ঘটনা। লিভারে ফ্যাট জমতে জমতে সর্বনাশ হচ্ছে। এ দেশি স্পেশালিস্ট ও দেশি স্পেশালিস্ট করছি। চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ডাক্তার উপদেশ দিচ্ছেন। খুব মন দিয়ে শুনছি। তারপর মনে নেই ঘুরতে চলে গেলাম, নাকি কিছু লিখতে বা পড়তে শুরু করলাম। লিভার মাথা থেকে চলে গেল। দু’তিন বছর আর লিভারের কথা মনেও পড়লো না। সেদিন কিডনি নিয়েও টেনশানে মরে যাই মরে যাই অবস্থা। সাতদিনে সাতটা ডাক্তার দেখিয়ে ফেললাম। ডাক্তাররা প্রচুর টেস্ট দিয়েছেন করতে। আজ করবো কাল করবো করতে করতে একসময় ভুলেই গেলাম। এ বছর পার হবে মনে হচ্ছে। দুম করে কবে যে একদিন মরে যাবো। দুদিনের জীবন, রোগ শোকের কথা ভুলে থাকাই হয়তো ভালো। উপসর্গ না থাকলে এই সুবিধে। দিব্যি বছরের পর বছর অসুখ বিসুখের কথা না ভেবেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।

 

৩. একটা সময় আমি খুব বিখ্যাত ছিলাম। দেশে বিদেশে সর্বত্র। তারপর ধীরে ধীরে কখন যে অখ্যাত আর কুখ্যাত হয়ে গেলাম, টের পাইনি। যদিও আমার নীতি আর আদর্শের একচুলও বদল হয়নি। যে আমি, সেই আমিই আছি। সরল, সহজ, সৎ, সংবেদনশীল। তবে বিখ্যাত থাকার সময় আমি যতটুকু ভালো ছিলাম, তারচেয়ে শতগুণ ভালো আমি অখ্যাত আর কুখ্যাত যখন, তখন। দিন দিন আমার ভালোত্ব বাড়ছে, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, দয়াশীলতা বাড়ছে, আর আমি কুখ্যাত হচ্ছি। অপরিচিত, অল্প পরিচিত সকলের মধ্যে আমাকে নিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প চলে। গল্পগুলোর দুটো একটা কানে এলে আমি আকাশ থেকে পড়ি।

 

এখন আর অখ্যাত, বিখ্যাত, কুখ্যাত কিনা আমি, লোকে আমার জন্য উন্মাদ কিনা, আমাকে ভুলে গেলো কি না, আমার বই পড়া বন্ধ করে দিয়েছে কিনা, আমার বদনাম করে বেড়ায় কিনা, আমাকে খিস্তি করে কিনা, এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ নেই। এক জীবনে যা পেয়েছি, তা যথেষ্টরও বেশি। এখনও পথেঘাটে অচেনা অজ্ঞাত মানুষেরা কাছে এসে ‘আপনার লেখা খুব ভালোবাসি’ বলে, এই ছোট্ট ‘পাওয়া’র কাছে আমার ‘না-পাওয়ার পাহাড়’ অতি ক্ষুদ্র।

 

৪. বৈশাখের প্রথম দিনে আমরা বলছি বটে ‘শুভ নববর্ষ’, কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডার মেনে কি আমরা আদৌ সারা বছর চলি? চলি না। মনে আছে যখন ডাক্তারি পড়তাম এবং ডাক্তারি করতাম, তখন রোগীদের সঙ্গে রোগ নিয়ে কথা বললে ওরা বাংলা মাসের হিসাব দিত, একটি উদাহরণ দিচ্ছি : ‘জোষ্ঠি মাসে অল্প যন্ত্রণা ছিল পেটে, আষাঢ় মাসে পেটের ডানদিকে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হইলো, শাওন মাসে কবিরাজ দেখাইলাম, কবিরাজি ওষুধ খাইলাম, ভাদ্র মাসে যন্ত্রণা বাড়লো, আয়ুর্বেদি ওষুধ খাইলাম, আশ্বিন মাসে হোমিওপ্যাথি খাইলাম, কার্তিক মাসে পেটের বাম দিকেও যন্ত্রণা শুরু হইলো, ইউনানি ডাক্তার দেখাইলাম, অঘ্রাণ মাসে বমি শুরু হইলো, পৌষ মাসে হাত পায়ে কোনও শক্তি পাই নাই, মাঘ মাসে যন্ত্রণা পেট থেইকা বুকে গেল, ফাগুন মাসে বিছানা থেইকা উঠতে পারি না, চৈত্র মাসে খাওয়া বন্ধ হইয়া গেল, বৈশাখ মাসে এই আইলাম সরকারি হাসপাতালে।’ ডাক্তারদের তখন বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার মিলিয়ে দেখে বুঝতে হতো রোগীর রোগের ইতিহাস। শুধু ওই সময়টাতেই আমার বা আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারের দরকার পড়তো, তাছাড়া পড়তো না।

 

আমি জানি না এখনও গ্রামের মানুষ বাংলা মাসের হিসাবে জীবনযাপন করে কিনা। তবে আমরা শিক্ষিত শহুরেরা ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালন করি, বাংলা খাবার খাই, বাংলা গান গাই, কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জিকে এড়িয়ে চলি। এখন আর আগের মতো দোকানপাটে হালখাতাও হয় না। দোকানিদের কাছেও হালখাতা বড় সেকেলে। কৃষকদেরও মনে হয় না বাংলা মাসের হিসাব রাখতে হয়। তারাও বেশ আধুনিক এখন।

 

গ্রাম বদলে যাচ্ছে। গ্রাম বদলে গেলে ফসল বোনা ফসল কাটা নবান্নের উৎসব কিছুতেই আর বাংলা বর্ষপঞ্জির দরকার হবে না। বাংলা মাসগুলো আমাদের স্মৃতিতে, নয়তো বাংলার ইতিহাসের পুস্তিকাতে ঠাঁই পাবে।

 

আর কত বছর নববর্ষের উৎসব হবে, মেলা হবে, গান কবিতা হবে, মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, তা কেউ সঠিক বলতে পারবে না। তবু ধর্মীয় উৎসব ছাড়া বাঙালির তো তেমন কোনও উৎসব নেই, অন্তত নিছক উৎসবের জন্য হলেও নববর্ষের উৎসব আরও হাজার বছর ধরে হোক। তা না হলে বাঙালের কাঙাল হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

 

৫. বাংলাদেশের দুটো জিনিস নিয়ে গর্ব করতেই হয়। এক, একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন। দুই, পয়লা বৈশাখ উদযাপন। পয়লা বৈশাখের সকাল থেকেই যে নাচ, গান, মেলা আর মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়, তার কোনও তুলনা হয় না। ধর্ম ব্যবসায়ীরা এসবের খুব বিরুদ্ধে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া যাবে না, ওটা নাকি হিন্দুয়ানি কালচার। কোনও অনুষ্ঠানে প্রদীপ জ্বালানো চলবে না, ওটাও নাকি হিন্দুয়ানি কালচার। পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা চলবে না, ওটাও হিন্দুয়ানি কালচার। হিন্দুয়ানি কালচারকে ভীষণ ভয় ওদের। ওরা সুদূর আরব দেশের বহুঈশ্বরবাদী পেগানদের কালচারটাকে পছন্দ করে, ওদের ধর্মের প্রবর্তকের কালচার তো সেটিই ছিল। কেন বাপু, চলতে ফিরতে, উঠতে বসতে, খাওয়ায় দাওয়ায়, পোশাকে আশাকে, কথায় বার্তায় যা কিছুই তোমার, সবই তো হিন্দুয়ানি কালচার, কারণ তোমার বাপের বাপের বাপের বাপরা, বা তোমার মায়ের মায়ের মায়ের মা’রা তো হিন্দু ছিল। ভিনদেশের ধর্ম পালন করো, ভালো কথা। সংস্কৃতিটা তোমার নিজস্ব। আরবদের সংস্কৃতি আরবীয়। তোমার সংস্কৃতি ভারতীয়। হিন্দুর দেশে বহিরাগত মুসলমানদের ধর্ম প্রচারের কারণে তোমার পূর্বপুরুষ মুসলমানের ধর্ম গ্রহণ করেছে, কিন্তু কালচারটা তো তোমার মাটির, হাজার বছরের পুরনো। ভাষাটাও তোমার পূর্বপুরুষের। মুরব্বিদের পা ছুঁয়ে যে কদমবুসি করো, সেটা তোমার পূর্বপুরুষের প্রণাম থেকে আসা। মনে রাখতে হবে, নিজের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা মানে নিজেকে ঘৃণা করা। নিজের ইতিহাসকে, নিজের জন্মকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে অস্বীকার করা।

 

মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে আমাদের চোখের সামনে, আশির দশকে। কাঠের শোলার কাগজের হাতি ঘোড়া বাঘ বক পাখি পেঁচা বানিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো চমৎকার একটি দৃশ্য বটে। নাচ, গান, হাতি ঘোড়া, ঢাক ঢোল, পিঠে পুলি, ইলিশ টিলিশ ছাড়া আমাদের কালচারে আর আছে কী! সতীদাহ? মেয়েদের পাথর ছুড়ে মারা? ওসব তো নারী নির্যাতন। কীর্তন, মিলাদ? ও তো ধর্ম। ধর্মকে আমি কালচার বলি না। ধর্মকে আমি ‘অলৌকিকে বিশ্বাস’ বলি। কালচারের সঙ্গে লৌকিকতার সম্পর্কই সত্যিকারের সম্পর্ক।

 

৬. নওগাঁর মহাদেবপুরের এক স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা আমোদিনী পালের সঙ্গে যা হয়েছে তা যে কোনও ধর্মের মহিলার সঙ্গেই হতে পারতো। আমোদিনী পালের প্রধান শিক্ষিকা হওয়ার কথা, তাঁকে ইস্কুলের কিছু শিক্ষক ষড়যন্ত্র করে প্রধান শিক্ষিকা হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করছেন। হিজাব পরেছে বলে ছাত্রীদের মেরেছেন তিনি, এই মিথ্যে অভিযোগ ষড়যন্ত্রকারীরা করেছেন আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে, যেন ক্ষিপ্ত জনগণ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, যেন তাঁর পদোন্নতি আটকে যায়। বাংলাদেশের মতো দেশে এ কোনও অবাক করা ব্যাপার নয়। সাম্প্রদায়িকতা থিকথিক করছে দেশে। তবে ইস্কুলের এই ষড়যন্ত্র আমোদিনী পাল হিন্দু বলে নয়, আমোদিনী পাল প্রধান শিক্ষিকা হবেন বলে। তিনি প্রধান শিক্ষিকা হলে অসৎ এবং দুর্নীতিবাজ কিছু শিক্ষক ফেঁসে যাবেন, সে কারণে। কোনও মুসলমান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে যদি হিজাবী ছাত্রীদের পেটানোর কথা রটে যেতো, সেই মুসলমান শিক্ষিকার বিরুদ্ধেও জনগণ ক্ষেপে উঠতো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাঁর ছাত্রীদের বোরখা না পরে ক্লাসে আসতে বলেছিলেন, কারণ বোরখা পরলে তাঁর ছাত্রীদের মুখ তিনি দেখতে পান না, কে ক্লাস করছে, কে করছে না, তারও হিসাব রাখতে পারেন না। সেই শিক্ষককে গুলি করে মেরেছিল সন্ত্রাসীরা। সেই শিক্ষক হিন্দু ছিলেন না। আর, এই আমাকে যে নির্বিচারে জঘন্যতম অত্যাচার করছে দেশের সরকার আর মুসলিম মৌলবাদী গোষ্ঠী, আমার দেশে যে তিন দশক ধরে আমাকে পা রাখতে দিচ্ছে না, আমি তো হিন্দু নই!

 

মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় রাগ ইসলামের সমালোচকদের ওপর, সেই সমালোচকরা যে ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকেই আসুক, তাদের ছিঁড়ে খেতে চায় তারা। সাধারণ হিন্দুরা অসহায় বলে তাদের ওপর অত্যাচার হয়। যে হিন্দুরা বিখ্যাত এবং ধনী এবং ক্ষমতাবান, তাদের অত্যাচার করার সাহস মূর্খদের নেই, অথবা থাকলেও কম। হিন্দু নাস্তিকের ওপর তাদের কোনও ক্ষোভ নেই, যতক্ষণ না সেই নাস্তিক ইসলামের সমালোচনা করছে।

 

৬. কেউ কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারবে না-এই আইনটা কেন হলো? মুসা নবী মিশরের বহুঈশ্বরবাদীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন, ঈসা নবী ইহুদিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন। শেষ নবী মক্কার বহুঈশ্বরবাদীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন। পুরনো ধর্মে বা পুরনো ধর্মীয় মতাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত না করে নতুন ধর্ম সৃষ্টি করা যায় না। পুরনো মতবাদকে আঘাত না করে নতুন মতবাদ তৈরি করা যায় না। যুগে যুগে এভাবেই ভাঙ্গাগড়া চলছে। গায়ের জোরে বা চাপাতির জোরে বা ধড়িবাজ শাসকের জোরে কোনও মতবাদকে চিরকালের জন্য টিকিয়ে রাখা যায় না। যায়নি কোনওদিন।

 

৭. শ্লীলতাহানি তো পুরুষেরও হতে পারে, মেয়েদের হলে চারদিকে কান্নাকাটির রোল পড়ে কেন? এর মানে কি এই যে, পুরুষের শ্লীলতাটা বজায় না রাখলেও চলে, কিন্তু মেয়েদেরটা মাস্ট?

 

যারা মনে করে মেয়েদের শ্লীলতা মেয়েদের জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান বিষয়, সুতরাং যে করেই হোক এই শ্লীলতাটা তাদের রক্ষা করতে হবে, তারাই মেয়েদের হিজাব পরায়, বোরখা পরায়, মেয়েদের ঘরবন্দি করে। তারাই রাস্তাঘাটে পুরুষেরা মেয়েদের কাপড় চোপড় খুলে নিলে রেগে আগুন হয়।

 

এই সমাজ একটা মেয়েকে তৈরি করে পুরুষের খাদ্য হিসেবে এবং একটা পুরুষকে তৈরি করে মেয়েদের খাদক হিসেবে। এই তৈরি করায় কারও আপত্তি নেই, কিন্তু পুরুষেরা জনসমক্ষে মেয়েদের খেতে গেলেই আপত্তি। অবশ্য একটু আড়ালে, একটু নাটক করে, ঢাকঢোল বাজিয়ে, কায়দা করে খেলে আপত্তি নেই, এই ভন্ডামিটা হয়তে আরো কয়েক শ বছর চলবে।

 

৮. মেয়েকে ধর্ষণ করার পর খুন করা হয়েছে। মানুষ ধর্ষককে শাস্তি দাও, ফাঁসি দাও বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে, এটিই মানুষ মনে রাখে, মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে, সে কথা ভুলে যায়। একটি ছেলেকে ধর্ষণ করার পর খুন করা হলে কিন্তু ছেলেটিকে যে খুন করা হয়েছে সেটি মানুষ মনে রাখতো, ধর্ষণের কথা হয়তো ভুলেও যেত। একটি ছেলের যৌনাঙ্গের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। মেয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটো। ধর্ষণ মেয়েদের বেলায় বেশি গুরুত্ব পায় কেন? মেয়েদের বেলায় কেন খুনের চেয়ে ধর্ষণকেই বড় অপরাধ বলে গণ্য করা হয়? কারণ ধর্ষণ যারা করে, আর যারা খুনের প্রতিবাদ না করে শুধু ধর্ষণের প্রতিবাদ করে, খুনির শাস্তি না চেয়ে শুধু ধর্ষকের শাস্তি চায়, তাদের কাছে একটি মেয়ে নিতান্তই একটি ‘যৌনাঙ্গ’ ছাড়া আর কিছু নয়। দু’পক্ষের কাছেই যৌনাঙ্গকে ক্ষতবিক্ষত করা মানে মেয়েটাকে ক্ষতবিক্ষত করা-মেয়েটাকে মেরে ফেলা।

ধর্ষণের প্রতিবাদ করো, দয়া করে খুনের কথাও উল্লেখ ক’রো। খুনের প্রতিবাদও ক’রো। মেয়েদের জীবনেরও দাম আছে। মেয়েদের যৌনাঙ্গের চেয়েও মেয়েদের জীবন মূল্যবান।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।  সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» জয়পুরহাটে আগামী ৪-৭ জুন জাতীয় ভিটামিন ‌‌‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন

» দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান মির্জা ফখরুলের

» অপেক্ষা করুন, আসছে তরুণ প্রজন্মের ড্রিম প্রোজেক্ট: বিএনপিকে ওবায়দুল কাদের

» অন্যায়ের বিরুদ্ধে নজরুলের ভূমিকা বিশ্বকে আজীবন পথ দেখাবে

» চক্রের খপ্পড়ে পিন কোড যোগ-বিয়োগে গ্রাহকের অর্ধকোটি টাকা হাওয়া

» যে খাবার ও উপার্জন সর্বোত্তম

» সর্ষে ইলিশ খিচুড়ি তৈরির রেসিপি

» নাচতে নাচতে মারা যায় শত শত মানুষ

» প্লাস্টিকের বালতির দাম ৪০ হাজার টাকা!

» রামুতে পিকআপ ভ্যানের তেলের ট্যাংকিতে মিললো ৩৯ হাজার ইয়াবা

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত

তসলিমা নাসরিন:  মাঝে মাঝে ভুলে যাই আমি ডাক্তার। ডাক্তারি চাকরি করি না, চেম্বারে বসে রোগী দেখি না। তাতে কী? ডাক্তার তো! দিন রাত লেখাপড়া করে ডাক্তারি পাস করেছি। দিন রাত রোগীর চিকিৎসা করে করে ইন্টার্নিশিপ করেছি। তারপর তো আট বছর চাকরি। গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প করে ভেসেকটমি টিউবেকটমি করতাম। মিটফোর্ড আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনি বিভাগ আর এনেস্থেসিয়া বিভাগে চাকরি করতাম। দিন রাত রোগীর বাচ্চা হওয়ানো, ফরসেপ ডেলিভারি, ব্রিচ ডেলিভারি, সিজারিয়ান করায় ব্যস্ত থেকেছি। তারপর বিভাগ পাল্টে রোগীকে অপারেশন টেবিলে তুলে অজ্ঞান করতাম, অপারেশনের পর জ্ঞান ফেরাতাম। আমি নামের আগে ডাক্তার শব্দটি ব্যবহার করি না। ইউরোপের নামি চারটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট পেয়েছি। তারপরও নামের আগে ডক্টর ব্যবহার করি না। নামের আগে পরে ভারি ভারি জিনিস থাকলে নামের ওপর চাপ পড়ে।

 

২. অদ্ভুত আমি। কোনও কিছু নিয়ে পাগল হই, দুদিন পর ভুলে যাই। ফুসফুসে কীসব ধরা পড়ছে, দৌড়োদৌড়ি ডাক্তারের কাছে, একজন নয়, দু’তিনজন স্পেশালিস্টের সংগে মিটিং করা হয়ে গেল। এরপর কী জানি কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, ফুসফুসের ব্যাপারে যে কিছু একটা করতে হবে ভুলেই গেলাম। লিভার কিডনি নিয়েও একই ঘটনা। লিভারে ফ্যাট জমতে জমতে সর্বনাশ হচ্ছে। এ দেশি স্পেশালিস্ট ও দেশি স্পেশালিস্ট করছি। চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ডাক্তার উপদেশ দিচ্ছেন। খুব মন দিয়ে শুনছি। তারপর মনে নেই ঘুরতে চলে গেলাম, নাকি কিছু লিখতে বা পড়তে শুরু করলাম। লিভার মাথা থেকে চলে গেল। দু’তিন বছর আর লিভারের কথা মনেও পড়লো না। সেদিন কিডনি নিয়েও টেনশানে মরে যাই মরে যাই অবস্থা। সাতদিনে সাতটা ডাক্তার দেখিয়ে ফেললাম। ডাক্তাররা প্রচুর টেস্ট দিয়েছেন করতে। আজ করবো কাল করবো করতে করতে একসময় ভুলেই গেলাম। এ বছর পার হবে মনে হচ্ছে। দুম করে কবে যে একদিন মরে যাবো। দুদিনের জীবন, রোগ শোকের কথা ভুলে থাকাই হয়তো ভালো। উপসর্গ না থাকলে এই সুবিধে। দিব্যি বছরের পর বছর অসুখ বিসুখের কথা না ভেবেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।

 

৩. একটা সময় আমি খুব বিখ্যাত ছিলাম। দেশে বিদেশে সর্বত্র। তারপর ধীরে ধীরে কখন যে অখ্যাত আর কুখ্যাত হয়ে গেলাম, টের পাইনি। যদিও আমার নীতি আর আদর্শের একচুলও বদল হয়নি। যে আমি, সেই আমিই আছি। সরল, সহজ, সৎ, সংবেদনশীল। তবে বিখ্যাত থাকার সময় আমি যতটুকু ভালো ছিলাম, তারচেয়ে শতগুণ ভালো আমি অখ্যাত আর কুখ্যাত যখন, তখন। দিন দিন আমার ভালোত্ব বাড়ছে, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, দয়াশীলতা বাড়ছে, আর আমি কুখ্যাত হচ্ছি। অপরিচিত, অল্প পরিচিত সকলের মধ্যে আমাকে নিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প চলে। গল্পগুলোর দুটো একটা কানে এলে আমি আকাশ থেকে পড়ি।

 

এখন আর অখ্যাত, বিখ্যাত, কুখ্যাত কিনা আমি, লোকে আমার জন্য উন্মাদ কিনা, আমাকে ভুলে গেলো কি না, আমার বই পড়া বন্ধ করে দিয়েছে কিনা, আমার বদনাম করে বেড়ায় কিনা, আমাকে খিস্তি করে কিনা, এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ নেই। এক জীবনে যা পেয়েছি, তা যথেষ্টরও বেশি। এখনও পথেঘাটে অচেনা অজ্ঞাত মানুষেরা কাছে এসে ‘আপনার লেখা খুব ভালোবাসি’ বলে, এই ছোট্ট ‘পাওয়া’র কাছে আমার ‘না-পাওয়ার পাহাড়’ অতি ক্ষুদ্র।

 

৪. বৈশাখের প্রথম দিনে আমরা বলছি বটে ‘শুভ নববর্ষ’, কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডার মেনে কি আমরা আদৌ সারা বছর চলি? চলি না। মনে আছে যখন ডাক্তারি পড়তাম এবং ডাক্তারি করতাম, তখন রোগীদের সঙ্গে রোগ নিয়ে কথা বললে ওরা বাংলা মাসের হিসাব দিত, একটি উদাহরণ দিচ্ছি : ‘জোষ্ঠি মাসে অল্প যন্ত্রণা ছিল পেটে, আষাঢ় মাসে পেটের ডানদিকে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হইলো, শাওন মাসে কবিরাজ দেখাইলাম, কবিরাজি ওষুধ খাইলাম, ভাদ্র মাসে যন্ত্রণা বাড়লো, আয়ুর্বেদি ওষুধ খাইলাম, আশ্বিন মাসে হোমিওপ্যাথি খাইলাম, কার্তিক মাসে পেটের বাম দিকেও যন্ত্রণা শুরু হইলো, ইউনানি ডাক্তার দেখাইলাম, অঘ্রাণ মাসে বমি শুরু হইলো, পৌষ মাসে হাত পায়ে কোনও শক্তি পাই নাই, মাঘ মাসে যন্ত্রণা পেট থেইকা বুকে গেল, ফাগুন মাসে বিছানা থেইকা উঠতে পারি না, চৈত্র মাসে খাওয়া বন্ধ হইয়া গেল, বৈশাখ মাসে এই আইলাম সরকারি হাসপাতালে।’ ডাক্তারদের তখন বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার মিলিয়ে দেখে বুঝতে হতো রোগীর রোগের ইতিহাস। শুধু ওই সময়টাতেই আমার বা আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারের দরকার পড়তো, তাছাড়া পড়তো না।

 

আমি জানি না এখনও গ্রামের মানুষ বাংলা মাসের হিসাবে জীবনযাপন করে কিনা। তবে আমরা শিক্ষিত শহুরেরা ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালন করি, বাংলা খাবার খাই, বাংলা গান গাই, কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জিকে এড়িয়ে চলি। এখন আর আগের মতো দোকানপাটে হালখাতাও হয় না। দোকানিদের কাছেও হালখাতা বড় সেকেলে। কৃষকদেরও মনে হয় না বাংলা মাসের হিসাব রাখতে হয়। তারাও বেশ আধুনিক এখন।

 

গ্রাম বদলে যাচ্ছে। গ্রাম বদলে গেলে ফসল বোনা ফসল কাটা নবান্নের উৎসব কিছুতেই আর বাংলা বর্ষপঞ্জির দরকার হবে না। বাংলা মাসগুলো আমাদের স্মৃতিতে, নয়তো বাংলার ইতিহাসের পুস্তিকাতে ঠাঁই পাবে।

 

আর কত বছর নববর্ষের উৎসব হবে, মেলা হবে, গান কবিতা হবে, মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, তা কেউ সঠিক বলতে পারবে না। তবু ধর্মীয় উৎসব ছাড়া বাঙালির তো তেমন কোনও উৎসব নেই, অন্তত নিছক উৎসবের জন্য হলেও নববর্ষের উৎসব আরও হাজার বছর ধরে হোক। তা না হলে বাঙালের কাঙাল হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

 

৫. বাংলাদেশের দুটো জিনিস নিয়ে গর্ব করতেই হয়। এক, একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন। দুই, পয়লা বৈশাখ উদযাপন। পয়লা বৈশাখের সকাল থেকেই যে নাচ, গান, মেলা আর মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়, তার কোনও তুলনা হয় না। ধর্ম ব্যবসায়ীরা এসবের খুব বিরুদ্ধে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া যাবে না, ওটা নাকি হিন্দুয়ানি কালচার। কোনও অনুষ্ঠানে প্রদীপ জ্বালানো চলবে না, ওটাও নাকি হিন্দুয়ানি কালচার। পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা চলবে না, ওটাও হিন্দুয়ানি কালচার। হিন্দুয়ানি কালচারকে ভীষণ ভয় ওদের। ওরা সুদূর আরব দেশের বহুঈশ্বরবাদী পেগানদের কালচারটাকে পছন্দ করে, ওদের ধর্মের প্রবর্তকের কালচার তো সেটিই ছিল। কেন বাপু, চলতে ফিরতে, উঠতে বসতে, খাওয়ায় দাওয়ায়, পোশাকে আশাকে, কথায় বার্তায় যা কিছুই তোমার, সবই তো হিন্দুয়ানি কালচার, কারণ তোমার বাপের বাপের বাপের বাপরা, বা তোমার মায়ের মায়ের মায়ের মা’রা তো হিন্দু ছিল। ভিনদেশের ধর্ম পালন করো, ভালো কথা। সংস্কৃতিটা তোমার নিজস্ব। আরবদের সংস্কৃতি আরবীয়। তোমার সংস্কৃতি ভারতীয়। হিন্দুর দেশে বহিরাগত মুসলমানদের ধর্ম প্রচারের কারণে তোমার পূর্বপুরুষ মুসলমানের ধর্ম গ্রহণ করেছে, কিন্তু কালচারটা তো তোমার মাটির, হাজার বছরের পুরনো। ভাষাটাও তোমার পূর্বপুরুষের। মুরব্বিদের পা ছুঁয়ে যে কদমবুসি করো, সেটা তোমার পূর্বপুরুষের প্রণাম থেকে আসা। মনে রাখতে হবে, নিজের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা মানে নিজেকে ঘৃণা করা। নিজের ইতিহাসকে, নিজের জন্মকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে অস্বীকার করা।

 

মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে আমাদের চোখের সামনে, আশির দশকে। কাঠের শোলার কাগজের হাতি ঘোড়া বাঘ বক পাখি পেঁচা বানিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো চমৎকার একটি দৃশ্য বটে। নাচ, গান, হাতি ঘোড়া, ঢাক ঢোল, পিঠে পুলি, ইলিশ টিলিশ ছাড়া আমাদের কালচারে আর আছে কী! সতীদাহ? মেয়েদের পাথর ছুড়ে মারা? ওসব তো নারী নির্যাতন। কীর্তন, মিলাদ? ও তো ধর্ম। ধর্মকে আমি কালচার বলি না। ধর্মকে আমি ‘অলৌকিকে বিশ্বাস’ বলি। কালচারের সঙ্গে লৌকিকতার সম্পর্কই সত্যিকারের সম্পর্ক।

 

৬. নওগাঁর মহাদেবপুরের এক স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা আমোদিনী পালের সঙ্গে যা হয়েছে তা যে কোনও ধর্মের মহিলার সঙ্গেই হতে পারতো। আমোদিনী পালের প্রধান শিক্ষিকা হওয়ার কথা, তাঁকে ইস্কুলের কিছু শিক্ষক ষড়যন্ত্র করে প্রধান শিক্ষিকা হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করছেন। হিজাব পরেছে বলে ছাত্রীদের মেরেছেন তিনি, এই মিথ্যে অভিযোগ ষড়যন্ত্রকারীরা করেছেন আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে, যেন ক্ষিপ্ত জনগণ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, যেন তাঁর পদোন্নতি আটকে যায়। বাংলাদেশের মতো দেশে এ কোনও অবাক করা ব্যাপার নয়। সাম্প্রদায়িকতা থিকথিক করছে দেশে। তবে ইস্কুলের এই ষড়যন্ত্র আমোদিনী পাল হিন্দু বলে নয়, আমোদিনী পাল প্রধান শিক্ষিকা হবেন বলে। তিনি প্রধান শিক্ষিকা হলে অসৎ এবং দুর্নীতিবাজ কিছু শিক্ষক ফেঁসে যাবেন, সে কারণে। কোনও মুসলমান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে যদি হিজাবী ছাত্রীদের পেটানোর কথা রটে যেতো, সেই মুসলমান শিক্ষিকার বিরুদ্ধেও জনগণ ক্ষেপে উঠতো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাঁর ছাত্রীদের বোরখা না পরে ক্লাসে আসতে বলেছিলেন, কারণ বোরখা পরলে তাঁর ছাত্রীদের মুখ তিনি দেখতে পান না, কে ক্লাস করছে, কে করছে না, তারও হিসাব রাখতে পারেন না। সেই শিক্ষককে গুলি করে মেরেছিল সন্ত্রাসীরা। সেই শিক্ষক হিন্দু ছিলেন না। আর, এই আমাকে যে নির্বিচারে জঘন্যতম অত্যাচার করছে দেশের সরকার আর মুসলিম মৌলবাদী গোষ্ঠী, আমার দেশে যে তিন দশক ধরে আমাকে পা রাখতে দিচ্ছে না, আমি তো হিন্দু নই!

 

মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় রাগ ইসলামের সমালোচকদের ওপর, সেই সমালোচকরা যে ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকেই আসুক, তাদের ছিঁড়ে খেতে চায় তারা। সাধারণ হিন্দুরা অসহায় বলে তাদের ওপর অত্যাচার হয়। যে হিন্দুরা বিখ্যাত এবং ধনী এবং ক্ষমতাবান, তাদের অত্যাচার করার সাহস মূর্খদের নেই, অথবা থাকলেও কম। হিন্দু নাস্তিকের ওপর তাদের কোনও ক্ষোভ নেই, যতক্ষণ না সেই নাস্তিক ইসলামের সমালোচনা করছে।

 

৬. কেউ কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারবে না-এই আইনটা কেন হলো? মুসা নবী মিশরের বহুঈশ্বরবাদীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন, ঈসা নবী ইহুদিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন। শেষ নবী মক্কার বহুঈশ্বরবাদীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন। পুরনো ধর্মে বা পুরনো ধর্মীয় মতাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত না করে নতুন ধর্ম সৃষ্টি করা যায় না। পুরনো মতবাদকে আঘাত না করে নতুন মতবাদ তৈরি করা যায় না। যুগে যুগে এভাবেই ভাঙ্গাগড়া চলছে। গায়ের জোরে বা চাপাতির জোরে বা ধড়িবাজ শাসকের জোরে কোনও মতবাদকে চিরকালের জন্য টিকিয়ে রাখা যায় না। যায়নি কোনওদিন।

 

৭. শ্লীলতাহানি তো পুরুষেরও হতে পারে, মেয়েদের হলে চারদিকে কান্নাকাটির রোল পড়ে কেন? এর মানে কি এই যে, পুরুষের শ্লীলতাটা বজায় না রাখলেও চলে, কিন্তু মেয়েদেরটা মাস্ট?

 

যারা মনে করে মেয়েদের শ্লীলতা মেয়েদের জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান বিষয়, সুতরাং যে করেই হোক এই শ্লীলতাটা তাদের রক্ষা করতে হবে, তারাই মেয়েদের হিজাব পরায়, বোরখা পরায়, মেয়েদের ঘরবন্দি করে। তারাই রাস্তাঘাটে পুরুষেরা মেয়েদের কাপড় চোপড় খুলে নিলে রেগে আগুন হয়।

 

এই সমাজ একটা মেয়েকে তৈরি করে পুরুষের খাদ্য হিসেবে এবং একটা পুরুষকে তৈরি করে মেয়েদের খাদক হিসেবে। এই তৈরি করায় কারও আপত্তি নেই, কিন্তু পুরুষেরা জনসমক্ষে মেয়েদের খেতে গেলেই আপত্তি। অবশ্য একটু আড়ালে, একটু নাটক করে, ঢাকঢোল বাজিয়ে, কায়দা করে খেলে আপত্তি নেই, এই ভন্ডামিটা হয়তে আরো কয়েক শ বছর চলবে।

 

৮. মেয়েকে ধর্ষণ করার পর খুন করা হয়েছে। মানুষ ধর্ষককে শাস্তি দাও, ফাঁসি দাও বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে, এটিই মানুষ মনে রাখে, মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে, সে কথা ভুলে যায়। একটি ছেলেকে ধর্ষণ করার পর খুন করা হলে কিন্তু ছেলেটিকে যে খুন করা হয়েছে সেটি মানুষ মনে রাখতো, ধর্ষণের কথা হয়তো ভুলেও যেত। একটি ছেলের যৌনাঙ্গের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। মেয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটো। ধর্ষণ মেয়েদের বেলায় বেশি গুরুত্ব পায় কেন? মেয়েদের বেলায় কেন খুনের চেয়ে ধর্ষণকেই বড় অপরাধ বলে গণ্য করা হয়? কারণ ধর্ষণ যারা করে, আর যারা খুনের প্রতিবাদ না করে শুধু ধর্ষণের প্রতিবাদ করে, খুনির শাস্তি না চেয়ে শুধু ধর্ষকের শাস্তি চায়, তাদের কাছে একটি মেয়ে নিতান্তই একটি ‘যৌনাঙ্গ’ ছাড়া আর কিছু নয়। দু’পক্ষের কাছেই যৌনাঙ্গকে ক্ষতবিক্ষত করা মানে মেয়েটাকে ক্ষতবিক্ষত করা-মেয়েটাকে মেরে ফেলা।

ধর্ষণের প্রতিবাদ করো, দয়া করে খুনের কথাও উল্লেখ ক’রো। খুনের প্রতিবাদও ক’রো। মেয়েদের জীবনেরও দাম আছে। মেয়েদের যৌনাঙ্গের চেয়েও মেয়েদের জীবন মূল্যবান।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।  সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com