দিনমজুর থেকে কেএফসির মালিক

একের পর এক ব্যর্থতায় মানুষ যখন হতাশায় ভুগতে শুরু করেন তখন তাদের সামনে সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষটি হচ্ছেন কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স।  বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর সাফল্যের শীর্ষে উঠেছিলেন তিনি…

নাম কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স। বিশ্বের প্রথম বড় ফ্রাইড চিকেন ‘কেএফসি’র মালিক তিনি। জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি ব্যর্থতা আর গ্লানির মাঝে কাটালেও নিজের অদম্য ইচ্ছা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে ৬০ বছর বয়সে সফলতা লাভ করেন। বর্তমানে ফাস্টফুডের জগতে ম্যাকডোনাল্ডসের পর নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত নামটি হলো কেএফসি বা কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন। বিশ্বের ১২৫টি দেশে ২০ হাজারের বেশি কেএফসির অনুমোদিত আউটলেট রয়েছে। আর এই বিস্তৃত ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টের খাবারের মেন্যুতে সবার ওপরে যে নামটি রয়েছে তা হচ্ছে অরিজিনাল রেসিপি চিকেন। ১১ রকমের মসলার মিশ্রণে তৈরি করা এই চিকেন ফ্রাইয়ের মন ভোলানো স্বাদ ছোট-বড় সবাইকে আকৃষ্ট করে। কেএফসির রেসিপি চিকেনও কেএফসির আউটলেটগুলোতে একটি সর্বজনীন অর্ডার। ১৯৪০ সালে কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড প্রথম ১১ রকমের মসলার মিশ্রণে অরিজিনাল রেসিপি চিকেন নামে এই চিকেন ফ্রাই বিক্রি শুরু করেন। তারপর থেকে এই ভাজা মুরগির স্বাদ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যেতে লাগল অবিকৃতভাবে। ২০০৬ সালে বিশ্বজুড়ে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি চিকেন ফ্রাই বিক্রি করার মাইলফলক ছাড়িয়ে যায় কেএফসি! অথচ এই ফ্রাইড চিকেনের জনকের জীবন মসৃণ ছিল না। বারবার ব্যর্থতা গ্রাস করে স্যান্ডার্সের জীবনে। অবশেষে ৬৬ বছর বয়সে তিনি এসে সফলতা পান। পুরো নাম কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। জš§ ১৮৯০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের হেনরিভ্যালিতে। বাবা উইলবার ডেভিড এবং মা মার্গারেট অ্যানে স্যান্ডার্স। তিন সন্তানের মধ্যে স্যান্ডার্স সবার বড়। বাবা ছিলেন একজন কৃষক। ৮০ একর জমির একটি ফার্মে তিনি কৃষিকাজ করতেন। আর তাতেই সংসারটি কোনো রকমে চলে যেত স্যান্ডার্সদের। কিন্তু হঠাৎ দুর্ঘটনায় স্যান্ডার্সের জীবনের ছন্দপতন ঘটে। ১৮৯৩ সালে ফার্মে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় বাবা উইলবার ডেভিডের পা ভেঙে যায়। দুর্ঘটনার দুই বছর পর যখন স্যান্ডার্সের বয়স মাত্র পাঁচ বছর তখন বাবা উইলবার ডেভিড মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর মা মার্গারেট অ্যানে ১৯০২ সালে আবার বিয়ে করেন। সৎ বাবার পরিবার ভালো লাগত না স্যান্ডার্সের। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর স্যান্ডার্স ও তাদের পরিবার ইন্ডিয়ানার গ্রিনউডে চলে আসেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে অর্থাভাবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন। স্কুল থেকে ঝরে পড়েন তারও আগে। শুরু করেন খামারে কৃষকের কাজ। কিন্তু কিশোর বয়সে স্যান্ডার্সের কৃষি কাজ ভালো লাগত না। এরপর ইন্ডিয়ানা পুলিশের ঘোড়ার গাড়ি রং করার চাকরি নেন। এটাও ছেড়ে দিয়ে ১৪ বছর বয়সে আবারও খামারে খেতমজুরের কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯০৬ সালে ইন্ডিয়ানার নিউ আলবানিতে গাড়ির কন্ডাক্টরের চাকরি করেন। মাত্র বছরখানেক করেছিলেন সেই চাকরি। এরপর কামারশালায় লোহা পেটানোর কাজ নেন। কিন্তু এখানেও মন টেকে না স্যান্ডার্সের। এবার কয়লাচালিত ট্রেনের ছাইয়ের টাংকি পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে কাজ পান স্টেশনের ফায়ারম্যানের। এক সময় নর্থফোক ও ওয়েস্টার্ন রেলস্টেশনে দিনমজুরের কাজও করেন। কর্নেল স্যান্ডার্স এক জায়গায় বেশি দিন কাজ করতে পারতেন না। দুই বছর পর আবার তিনি ফিরে যান ইলিনয় সেন্ট্রাল রেল রোডে। শুরু করেন ফায়ারম্যানের কাজ। ১৭ বছরের মাথায় মোট চারবার চাকরি হারিয়েছিলেন স্যান্ডার্স। এরপর এক্সটেনশন ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে লিটল রক নামের প্রতিষ্ঠানে বছর তিনেক প্রশিক্ষণ শেষে অর্থ উপার্জন শুরু করেন। এখানেও তাঁর বাধার শেষ ছিল না। মাথা গরম প্রকৃতির স্যান্ডার্স ক্লায়েন্টের সঙ্গে আদালতপাড়ায় ঝগড়া করেই আইন পেশার সমাপ্তি ঘটান। অর্থাভাবে কিছু দিন পর নিজে আইন পেশাকে বিদায় জানান। সেখান থেকে ফিরে পেনসিলভেনিয়া। চাকরি নেন রেলস্টেশনে। এখানেও খুব বেশি দিন না থেকে ১৯১৬ সালের দিকে পরিবার নিয়ে জেফারসনভাইলে চলে আসেন এবং বীমা কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন। স্যান্ডার্স কোথাও স্থায়ী হতে পারতেন না। কারণ, তিনি ছিলেন রাগী প্রকৃতির। তাই বীমার চাকরি হারিয়ে সেলসম্যানের কাজ করেন। করেছেন স্টোর ক্লার্কের কাজও। ১৯০৮ সালে ১৮ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন এবং ১৯ বছর বয়সেই বাবা হন। কিন্তু ২০ বছর বয়সে স্ত্রী তাঁকে ফেলে রেখে কন্যাসন্তানটিকে সঙ্গে নিয়ে চলে যান। ১৯২০ সালে তিনি নৌকার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। স্যান্ডার্স এখানে ডিঙি নৌকা তৈরি করে তা বিক্রি করতেন। এক সময় কোম্পানির ভবিষ্যৎ আরও বড় পরিসরে করার জন্য কোম্পানির নামে শেয়ারও চালু করেন। যার বেশির ভাগ মালিক ছিলেন স্যান্ডার্স নিজেই এবং পরে তিনি কোম্পানির সচিব নির্বাচিত হন। এটিই ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম সফলতা। ১৯৪০ সালে ১৪০ আসনের রেস্টুরেন্ট খুলে স্পেশাল ফ্রাইড চিকেন বিক্রি শুরু করেন। নতুন স্বাদের এই চিকেন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ১৯৫২ সালে স্যান্ডার্স ‘চিকেন ফ্রাই’ ধারণাটিকে আয়ের উৎসে পরিণত করার পর থেকে ‘ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন’ বিশ্বের প্রথম বড় ফ্রাইড চিকেন কোম্পানি হয়ে ওঠে। প্রাচীন রেস্তোরাঁটিই আজকের ‘কেএফসি’। যার রয়েছে ৬০০টি শাখা। ১৯৭০ সালে স্যান্ডার্স আমেরিকান কোম্পানির কাছে রেস্তোরাঁটি ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্যান্ডার্স ছুটে বেড়িয়েছেন মাইলের পর মাইল তাঁর হাতে গড়া রেসিপির কদর আর মান দেখার জন্য। কখনো গুণাগুণের ব্যাপারে সমঝোতা করেননি। সব সময় চেয়েছেন নিজের তৈরি রেসিপি নিয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকতে। তাঁর চাওয়া যে সফলভাবে পাওয়াতে পরিণত হয়েছে তা তো সময়ই প্রমাণ। তাই মন থেকে কিছু চেয়ে সঠিকভাবে লেগে থাকলে সফলতা আসবেই।  যে কোনো বয়সে নতুন উদ্দীপনায় নতুন কৌশলে নিজেকে জাহির করাই ছিল স্যান্ডার্সের আদর্শ।

কখনো দিনমজুরফায়ারম্যানগাড়ির টায়ার বিক্রেতা

‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’, ছেলেবেলা থেকেই কবিতাটি পড়ে এসেছি কেবল, কখনো এর বাস্তবতার নিরিখে দেখা হয়নি। কিন্তু আজো যখন কিছু মানুষের সফল হওয়ার গল্প শুনি, তখনই মনে হয় ভুল তো নয়! চাইলেই তো সব পাওয়া যায়। শুধু চাওয়ার পেছনে একাগ্রতা আর সত্যি করে পাওয়ার আকাক্সক্ষা চাই। আর তেমনি একজনের গল্প বলতে যাচ্ছি আজ, যা আমাদের জীবন সম্পর্কে ধারণাই হয়তো বদলে দেবে। ১৯২২ সালে ইন্ডিয়ানার কলম্বাসে চেম্বার অব কমার্স নামের একটি কোম্পানিতে সচিবের চাকরি নেন স্যান্ডার্স। সেই চাকরিটিও ভালো না লাগায় এক সময় তা ছেড়ে দেন। শুধু তাই নয়, তাঁর ডিঙি নৌকার কোম্পানিটিও ৩২ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেন। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৩ লাখ ৯ হাজার ডলার। সেই অর্থ দিয়ে হাইড্রোকার্বন গ্যাসের বাতি উৎপাদনকারী কোম্পানি চালু করেন। তাঁর বৈদ্যুতিক বাতির কোম্পানিটিও বেশি দিন টেকেনি। স্যান্ডার্স বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হন।

নানা ব্যর্থতার বেড়াজাল পেরিয়ে স্যান্ডার্স ক্যান্টাকির উইনচেস্টারে চলে আসেন। সেখানে তিনি ম্যাচিলিন নামের একটি টায়ার কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি নেন। ১৯২৪ সালে কোম্পানিটি বন্ধ হলে নিকোলাসভ্যালির এক স্টেশনে চাকরি নেন এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো ১৯৩০ সালে স্টেশনটিও বন্ধ হয়ে যায়। একই বছরে ক্যান্টাকির নর্থ ক্যারোলিনা এলাকায় শিল অয়েল কোম্পানি তাঁকে স্টেশনের কর্মীদের জন্য খাবার সার্ভিসের প্রস্তাব করে থাকে। সেখানে তাঁকে কোনো জায়গা ভাড়া দিতে হতো না। বিনিময়ে বিক্রি করা খাবারের লভ্যাংশের সামান্য অংশ দিলেই যথেষ্ট। সেখানে ফ্রাইড চিকেনসহ বিভিন্ন ফাস্টফুড সার্ভিস দিতেন স্যান্ডার্স। স্যান্ডার্সের খাবারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ক্যান্টাকির অলিগলিতে। ১৯৩৯ সালে নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশেভ্যালিতে মোটেল নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখানেও বাধা পান। তবুও স্যান্ডার্স পিছপা হননি। কখনো দিনমজুর, ট্রেনের ফায়ারম্যান, কখনো বা বীমা কোম্পানির সেলসম্যান, গাড়ির টায়ার বিক্রেতা, ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী এবং সর্বশেষ একজন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। ১৯৩০ সালের দিকে স্যান্ডার্স ক্যান্টাকিতে একটি পেট্রোল স্টেশনের পাশে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য বিক্রয় করতে লাগলেন। নিজেই রান্না করে বিভিন্ন সাউথ আমেরিকান খাবার পরিবেশন করতেন। ধীরে ধীরে খাবারের খ্যাতি আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে শেফ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন কর্নেল স্যান্ডার্স।  মানুষ তাঁর তৈরি খাবারের জন্য আসতে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকে। চূড়ান্ত সফলতা এসে ধরা দেয় স্যান্ডার্সের হাতে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে বিশ্বের ব্যর্থ মানুষদের পথদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন স্যান্ডার্স। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কেএফসির হাজার হাজার ফ্র্যাঞ্চাইজি।  সবখানেই কেএফসি তার মান ও স্বাদ একইভাবে ধরে রেখেছে বছরের পর বছর।

 

গ্যাস স্টেশন থেকে শুরু

১৯৩০ সালে স্যান্ডার্স ক্যান্টাকিতে গ্যাস স্টেশনের ভিতরে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। জরাজীর্ণ রুমে সামান্য টেবিলই ছিল সম্বল। স্টেশনের ট্রাক ড্রাইভারদের জন্য স্যান্ডার্স দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। ফ্রাইড চিকেনই একমাত্র খাবারের আইটেম ছিল, যা তৈরি করতে অনেক সময় লাগত। এর বাইরেও তাঁর তৈরি হ্যাম ও স্টিক ডিনার ছিল বেশ জনপ্রিয়। স্যান্ডার্স রেস্তোরাঁ খুলে চিকেন ফ্রাই ও আয়রন স্কিলেট বিক্রি করতেন। সময়ের তালে তালে ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই রেস্তোরাঁটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৩৫ সালে আবারও ব্যবসা শুরু করেন। স্টেশনের ড্রাইভারদের ছাড়াও স্যান্ডার্স বাইরে অর্ডারে চিকেন ফ্রাইড সরবরাহ করতেন। এবারও ভাগ্য পাশে ছিল না। ১৯৩৯ সালে স্যান্ডার্স নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশেভ্যালিতে মোটেল খোলেন। মোটেল ব্যবসায়ে আগুন লেগে তা বন্ধ হয়ে যায়। আবারও গ্যাস স্টেশনে ট্রাক ড্রাইভারদের খাবারের ব্যবসা শুরু করেন স্যান্ডার্স। এবার ১৪০ আসনের রেস্তোরাঁ নেন এবং ১৯৪০ সালের জুলাইয়ে তাঁর রেস্টুরেন্টে স্পেশাল ফ্রাইড চিকেন বিক্রি শুরু করেন। নতুন স্বাদের চিকেন ফ্রাই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ‘ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন’ বিশ্বের প্রথম বড় পরিসরের ফ্রাইড চিকেন কোম্পানি। প্রাচীন এ রেস্তোরাঁটিই আজকের জনপ্রিয় ‘কেএফসি’। ১৯৫৫ সাল থেকে মাত্র ১০ বছরে এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে যায় সমগ্র বিশ্বে। এখন  কেএফসির ৬০০টির বেশি শাখা কিন্তু শুরুটা হয়েছিল সামান্য একটি গ্যাস স্টেশন থেকেই।

যে কারণে কর্নেল ডাকা হয়

ক্যান্টাকির বাসিন্দা না হলে এমন ভুল করাটাই স্বাভাবিক। যেমন অনেকেই মনে করেন কর্নেল স্যান্ডার্স নিশ্চয়ই কোনো এক সময় মিলিটারি দলের কর্তা ছিলেন। আসল ঘটনাটি হলো- ক্যান্টাকির সাধারণ মানুষ তো বটেই, বড় বড় আমলা স্যান্ডার্সকে সম্মান দিয়ে কর্নেল বলে সম্বোধন করতেন। আর স্যান্ডার্স নিজেকে গড়ে তোলার জন্য এই নামটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু এ নামটির পেছনেও রয়েছে একটি ইতিহাস। স্যান্ডার্স জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে সফল হন। ‘কর্নেল’ উপাধি পান ১৯৩৫ সালে, যখন গ্যাস স্টেশনের ভিতরের জরাজীর্ণ রুমে ‘স্যান্ডার্স ক্যাফে’ খুলে খাবারের ব্যবসা করেন। কিন্তু ১৯৪৯ সালে স্যান্ডার্স সনদপত্র আকারে কর্নেল খেতাব গ্রহণ করেন। এই বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন ক্যান্টাকির তৎকালীন গভর্নর। ১৯৫০ সালে স্যান্ডার্স নিজেকে সবার সামনে সভ্য এবং ক্যান্টাকির কর্নেল হিসেবে উপস্থাপন করা শুরু করলেন। সাদা দাড়ি, স্ট্রিং টাই এবং সাদা ওয়েস্ট কোটে নিজেকে অনন্য মানুষ হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করতেন স্যান্ডার্স। আর ব্যবসার সফলতা এবং সারা বিশ্বে এর ব্যাপ্তির কারণে কর্নেল নামটি সবার মুখে মুখে, যা স্যান্ডার্সকে শেষ বয়সে করেছে সম্মানিত। মুরগির স্বাদ বদলে দেওয়া স্যান্ডার্স ১৯৫০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিজের রেসিপি বিক্রির মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেন। তাঁর ব্যবসা ও নতুন স্বাদের খাবারে বিমোহিত হয়ে ক্যান্টাকির সাধারণ মানুষ তাঁকে কর্নেল বলে সম্বোধন করতেন।

বারবার জড়িয়েছেন ঝামেলায়

মাথা গরম বলে স্যান্ডার্সের ওপর বিরক্ত ছিলেন অনেকেই। এমনকি নিজের স্ত্রীও ত্যাগ করেছিলেন তাঁকে। কিন্তু জীবনের শুরু থেকে হোঁচট খেয়ে খেয়ে বাস্তবতা শেখা স্যান্ডার্স নানা বাধা-বিপত্তি সামলে এগিয়ে চলেন গন্তব্যের দিকে। রগচটা ও মাথা গরম প্রকৃতির কারণে বারবার চাকরিও ছাড়তে হয় তাঁকে। তাই হয়তো কখনই ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ পাননি বা বারবার ঝামেলাই এসে জুটত তাঁর কাছে। এর প্রমাণ মেলে তাঁর শেল তেল গ্যাস স্টেশন ‘হেলস হাফ একর’ ঘরটিতে ঘুরপাক খাওয়া ঘটনা।

স্যান্ডার্স নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিলেন উদ্বিগ্ন। নিজ ব্যবসাকে কীভাবে বড় পরিসরে আনা যায় তা নিয়ে হরহামেশাই চিন্তা করতেন। বিশালাকার ফাস্টফুডের ব্যাপক প্রচারণার চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তাঁর দিকে ছুড়ে দেওয়া হলো একটি আক্রমণাত্মক মার্কেটিং কৌশল। এই কৌশল পরিচালনা করেন শেল অয়েল গ্যাস স্টেশনের কাছাকাছি একটি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল গ্যাস স্টেশনের পরিচালক ম্যাট স্টুয়ার্ট। স্যান্ডার্সকে সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ‘স্টুয়ার্ট স্যান্ডার্সের ব্যবসার প্রচারণা ব্যর্থ করতে জালিয়াতির পথ বেছে নেন। বিষয়টি স্যান্ডার্স অবগত হওয়ার পর স্টুয়ার্টের ওপর চড়াও হন। জোশ অজারস্কির লেখা ‘কর্নেল স্যান্ডার্স অ্যান্ড দ্য আমেরিকান ড্রিম’ বই থেকে পাওয়া যায় একটি হত্যার ঘটনা। স্যান্ডার্সের সুনাম স্টুয়ার্ট নষ্ট করতে না পেরে শেল গ্যাস স্টেশনের ম্যানেজার রবার্ট গিবসনকে গুলি করে হত্যা করেন। পুলিশ ঘটনার সত্যতা পেয়ে স্টুয়ার্টকে আটক করে এবং এজন্য তাঁকে ১৮ বছর জেলে থাকতে হয়। কিন্তু স্টুয়ার্ট আটক হওয়ার পরও স্যান্ডার্সকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।’

বিশ্বের প্রথম কেএফসি

১৯৫২ সালে ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেনের শুরু করেছিলেন শুধু ফ্রাইড চিকেন দিয়ে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত করেন ফাস্টফুড খাবারের আইটেম। তখন কেএফসির প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি হয়েছিলেন স্যান্ডার্সের বন্ধু পিট হারমান। পিট হারমান উতাহে বিশাল রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করতেন। বন্ধু পিট স্যান্ডার্সের কেএফসির স্বাদের ভূয়সী প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে সল্টলেক সিটিতে নতুন শাখা চালু করেন। পিট হারমানই হলেন কেএফসির প্রথম ফ্যাঞ্চাইজ আর উতাহেই কেএফসির প্রথম চেইন শপ চালু হয়েছিল। জোশ ওজারস্কির মতে, ‘স্যান্ডার্স স্টেশনের পাশে রেস্তোরাঁয় দারুণ ব্যবসা করেন। এক সময় ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য নতুন ব্রাঞ্চ খোলার জন্য বন্ধু পিটকে সঙ্গে নেন। পিট মোনিকাকে সঙ্গে নিয়ে ক্যান্টাকি আসেন। তখন কেএফসির খাবার পরিবেশনের বালতি আকারের বাক্সটি দেখতে অন্যরকম লাগত। স্যান্ডার্সের কেএফসির সঙ্গে পিট হারমান মাসে ১০৫ ডলারের বিনিময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি স্বাক্ষর করেন।সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share Button

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» নিয়ামতপুরে মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত

» নকল পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকার আহ্বান মডার্ণ হারবাল গ্রুপের

» খুলনায় পুলিশি বেস্টনীর মধ্যেই বিএনপির মহাসমাবেশ

» এবার মধুচক্রে ফাঁসলেন ব্যাংক কর্মকর্তা, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪

» মুশতাকের মৃত্যু ষড়যন্ত্রের অংশ কি না খতিয়ে দেখা উচিত: হানিফ

» রায়েরবাগ এলাকায় মোটরসাইকেল তল্লাশি করে২২ কেজি গাঁজাসহ বাইক চালক গ্রেপ্তার

» কে বা কারা মোবাইল বিল দিচ্ছেন সাংসদ নূর মোহাম্মদের

» একযুগ আগের আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়: প্রধানমন্ত্রী

» সস্ত্রীক টিকা নিলেন তোফায়েল আহমেদ

» করোনায় ৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৪০৭

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

দিনমজুর থেকে কেএফসির মালিক

একের পর এক ব্যর্থতায় মানুষ যখন হতাশায় ভুগতে শুরু করেন তখন তাদের সামনে সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষটি হচ্ছেন কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স।  বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর সাফল্যের শীর্ষে উঠেছিলেন তিনি…

নাম কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স। বিশ্বের প্রথম বড় ফ্রাইড চিকেন ‘কেএফসি’র মালিক তিনি। জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি ব্যর্থতা আর গ্লানির মাঝে কাটালেও নিজের অদম্য ইচ্ছা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে ৬০ বছর বয়সে সফলতা লাভ করেন। বর্তমানে ফাস্টফুডের জগতে ম্যাকডোনাল্ডসের পর নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত নামটি হলো কেএফসি বা কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন। বিশ্বের ১২৫টি দেশে ২০ হাজারের বেশি কেএফসির অনুমোদিত আউটলেট রয়েছে। আর এই বিস্তৃত ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টের খাবারের মেন্যুতে সবার ওপরে যে নামটি রয়েছে তা হচ্ছে অরিজিনাল রেসিপি চিকেন। ১১ রকমের মসলার মিশ্রণে তৈরি করা এই চিকেন ফ্রাইয়ের মন ভোলানো স্বাদ ছোট-বড় সবাইকে আকৃষ্ট করে। কেএফসির রেসিপি চিকেনও কেএফসির আউটলেটগুলোতে একটি সর্বজনীন অর্ডার। ১৯৪০ সালে কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড প্রথম ১১ রকমের মসলার মিশ্রণে অরিজিনাল রেসিপি চিকেন নামে এই চিকেন ফ্রাই বিক্রি শুরু করেন। তারপর থেকে এই ভাজা মুরগির স্বাদ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যেতে লাগল অবিকৃতভাবে। ২০০৬ সালে বিশ্বজুড়ে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি চিকেন ফ্রাই বিক্রি করার মাইলফলক ছাড়িয়ে যায় কেএফসি! অথচ এই ফ্রাইড চিকেনের জনকের জীবন মসৃণ ছিল না। বারবার ব্যর্থতা গ্রাস করে স্যান্ডার্সের জীবনে। অবশেষে ৬৬ বছর বয়সে তিনি এসে সফলতা পান। পুরো নাম কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। জš§ ১৮৯০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের হেনরিভ্যালিতে। বাবা উইলবার ডেভিড এবং মা মার্গারেট অ্যানে স্যান্ডার্স। তিন সন্তানের মধ্যে স্যান্ডার্স সবার বড়। বাবা ছিলেন একজন কৃষক। ৮০ একর জমির একটি ফার্মে তিনি কৃষিকাজ করতেন। আর তাতেই সংসারটি কোনো রকমে চলে যেত স্যান্ডার্সদের। কিন্তু হঠাৎ দুর্ঘটনায় স্যান্ডার্সের জীবনের ছন্দপতন ঘটে। ১৮৯৩ সালে ফার্মে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় বাবা উইলবার ডেভিডের পা ভেঙে যায়। দুর্ঘটনার দুই বছর পর যখন স্যান্ডার্সের বয়স মাত্র পাঁচ বছর তখন বাবা উইলবার ডেভিড মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর মা মার্গারেট অ্যানে ১৯০২ সালে আবার বিয়ে করেন। সৎ বাবার পরিবার ভালো লাগত না স্যান্ডার্সের। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর স্যান্ডার্স ও তাদের পরিবার ইন্ডিয়ানার গ্রিনউডে চলে আসেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে অর্থাভাবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন। স্কুল থেকে ঝরে পড়েন তারও আগে। শুরু করেন খামারে কৃষকের কাজ। কিন্তু কিশোর বয়সে স্যান্ডার্সের কৃষি কাজ ভালো লাগত না। এরপর ইন্ডিয়ানা পুলিশের ঘোড়ার গাড়ি রং করার চাকরি নেন। এটাও ছেড়ে দিয়ে ১৪ বছর বয়সে আবারও খামারে খেতমজুরের কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯০৬ সালে ইন্ডিয়ানার নিউ আলবানিতে গাড়ির কন্ডাক্টরের চাকরি করেন। মাত্র বছরখানেক করেছিলেন সেই চাকরি। এরপর কামারশালায় লোহা পেটানোর কাজ নেন। কিন্তু এখানেও মন টেকে না স্যান্ডার্সের। এবার কয়লাচালিত ট্রেনের ছাইয়ের টাংকি পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে কাজ পান স্টেশনের ফায়ারম্যানের। এক সময় নর্থফোক ও ওয়েস্টার্ন রেলস্টেশনে দিনমজুরের কাজও করেন। কর্নেল স্যান্ডার্স এক জায়গায় বেশি দিন কাজ করতে পারতেন না। দুই বছর পর আবার তিনি ফিরে যান ইলিনয় সেন্ট্রাল রেল রোডে। শুরু করেন ফায়ারম্যানের কাজ। ১৭ বছরের মাথায় মোট চারবার চাকরি হারিয়েছিলেন স্যান্ডার্স। এরপর এক্সটেনশন ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে লিটল রক নামের প্রতিষ্ঠানে বছর তিনেক প্রশিক্ষণ শেষে অর্থ উপার্জন শুরু করেন। এখানেও তাঁর বাধার শেষ ছিল না। মাথা গরম প্রকৃতির স্যান্ডার্স ক্লায়েন্টের সঙ্গে আদালতপাড়ায় ঝগড়া করেই আইন পেশার সমাপ্তি ঘটান। অর্থাভাবে কিছু দিন পর নিজে আইন পেশাকে বিদায় জানান। সেখান থেকে ফিরে পেনসিলভেনিয়া। চাকরি নেন রেলস্টেশনে। এখানেও খুব বেশি দিন না থেকে ১৯১৬ সালের দিকে পরিবার নিয়ে জেফারসনভাইলে চলে আসেন এবং বীমা কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন। স্যান্ডার্স কোথাও স্থায়ী হতে পারতেন না। কারণ, তিনি ছিলেন রাগী প্রকৃতির। তাই বীমার চাকরি হারিয়ে সেলসম্যানের কাজ করেন। করেছেন স্টোর ক্লার্কের কাজও। ১৯০৮ সালে ১৮ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন এবং ১৯ বছর বয়সেই বাবা হন। কিন্তু ২০ বছর বয়সে স্ত্রী তাঁকে ফেলে রেখে কন্যাসন্তানটিকে সঙ্গে নিয়ে চলে যান। ১৯২০ সালে তিনি নৌকার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। স্যান্ডার্স এখানে ডিঙি নৌকা তৈরি করে তা বিক্রি করতেন। এক সময় কোম্পানির ভবিষ্যৎ আরও বড় পরিসরে করার জন্য কোম্পানির নামে শেয়ারও চালু করেন। যার বেশির ভাগ মালিক ছিলেন স্যান্ডার্স নিজেই এবং পরে তিনি কোম্পানির সচিব নির্বাচিত হন। এটিই ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম সফলতা। ১৯৪০ সালে ১৪০ আসনের রেস্টুরেন্ট খুলে স্পেশাল ফ্রাইড চিকেন বিক্রি শুরু করেন। নতুন স্বাদের এই চিকেন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ১৯৫২ সালে স্যান্ডার্স ‘চিকেন ফ্রাই’ ধারণাটিকে আয়ের উৎসে পরিণত করার পর থেকে ‘ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন’ বিশ্বের প্রথম বড় ফ্রাইড চিকেন কোম্পানি হয়ে ওঠে। প্রাচীন রেস্তোরাঁটিই আজকের ‘কেএফসি’। যার রয়েছে ৬০০টি শাখা। ১৯৭০ সালে স্যান্ডার্স আমেরিকান কোম্পানির কাছে রেস্তোরাঁটি ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্যান্ডার্স ছুটে বেড়িয়েছেন মাইলের পর মাইল তাঁর হাতে গড়া রেসিপির কদর আর মান দেখার জন্য। কখনো গুণাগুণের ব্যাপারে সমঝোতা করেননি। সব সময় চেয়েছেন নিজের তৈরি রেসিপি নিয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকতে। তাঁর চাওয়া যে সফলভাবে পাওয়াতে পরিণত হয়েছে তা তো সময়ই প্রমাণ। তাই মন থেকে কিছু চেয়ে সঠিকভাবে লেগে থাকলে সফলতা আসবেই।  যে কোনো বয়সে নতুন উদ্দীপনায় নতুন কৌশলে নিজেকে জাহির করাই ছিল স্যান্ডার্সের আদর্শ।

কখনো দিনমজুরফায়ারম্যানগাড়ির টায়ার বিক্রেতা

‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’, ছেলেবেলা থেকেই কবিতাটি পড়ে এসেছি কেবল, কখনো এর বাস্তবতার নিরিখে দেখা হয়নি। কিন্তু আজো যখন কিছু মানুষের সফল হওয়ার গল্প শুনি, তখনই মনে হয় ভুল তো নয়! চাইলেই তো সব পাওয়া যায়। শুধু চাওয়ার পেছনে একাগ্রতা আর সত্যি করে পাওয়ার আকাক্সক্ষা চাই। আর তেমনি একজনের গল্প বলতে যাচ্ছি আজ, যা আমাদের জীবন সম্পর্কে ধারণাই হয়তো বদলে দেবে। ১৯২২ সালে ইন্ডিয়ানার কলম্বাসে চেম্বার অব কমার্স নামের একটি কোম্পানিতে সচিবের চাকরি নেন স্যান্ডার্স। সেই চাকরিটিও ভালো না লাগায় এক সময় তা ছেড়ে দেন। শুধু তাই নয়, তাঁর ডিঙি নৌকার কোম্পানিটিও ৩২ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেন। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৩ লাখ ৯ হাজার ডলার। সেই অর্থ দিয়ে হাইড্রোকার্বন গ্যাসের বাতি উৎপাদনকারী কোম্পানি চালু করেন। তাঁর বৈদ্যুতিক বাতির কোম্পানিটিও বেশি দিন টেকেনি। স্যান্ডার্স বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হন।

নানা ব্যর্থতার বেড়াজাল পেরিয়ে স্যান্ডার্স ক্যান্টাকির উইনচেস্টারে চলে আসেন। সেখানে তিনি ম্যাচিলিন নামের একটি টায়ার কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি নেন। ১৯২৪ সালে কোম্পানিটি বন্ধ হলে নিকোলাসভ্যালির এক স্টেশনে চাকরি নেন এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো ১৯৩০ সালে স্টেশনটিও বন্ধ হয়ে যায়। একই বছরে ক্যান্টাকির নর্থ ক্যারোলিনা এলাকায় শিল অয়েল কোম্পানি তাঁকে স্টেশনের কর্মীদের জন্য খাবার সার্ভিসের প্রস্তাব করে থাকে। সেখানে তাঁকে কোনো জায়গা ভাড়া দিতে হতো না। বিনিময়ে বিক্রি করা খাবারের লভ্যাংশের সামান্য অংশ দিলেই যথেষ্ট। সেখানে ফ্রাইড চিকেনসহ বিভিন্ন ফাস্টফুড সার্ভিস দিতেন স্যান্ডার্স। স্যান্ডার্সের খাবারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ক্যান্টাকির অলিগলিতে। ১৯৩৯ সালে নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশেভ্যালিতে মোটেল নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখানেও বাধা পান। তবুও স্যান্ডার্স পিছপা হননি। কখনো দিনমজুর, ট্রেনের ফায়ারম্যান, কখনো বা বীমা কোম্পানির সেলসম্যান, গাড়ির টায়ার বিক্রেতা, ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী এবং সর্বশেষ একজন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। ১৯৩০ সালের দিকে স্যান্ডার্স ক্যান্টাকিতে একটি পেট্রোল স্টেশনের পাশে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য বিক্রয় করতে লাগলেন। নিজেই রান্না করে বিভিন্ন সাউথ আমেরিকান খাবার পরিবেশন করতেন। ধীরে ধীরে খাবারের খ্যাতি আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে শেফ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন কর্নেল স্যান্ডার্স।  মানুষ তাঁর তৈরি খাবারের জন্য আসতে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকে। চূড়ান্ত সফলতা এসে ধরা দেয় স্যান্ডার্সের হাতে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে বিশ্বের ব্যর্থ মানুষদের পথদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন স্যান্ডার্স। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কেএফসির হাজার হাজার ফ্র্যাঞ্চাইজি।  সবখানেই কেএফসি তার মান ও স্বাদ একইভাবে ধরে রেখেছে বছরের পর বছর।

 

গ্যাস স্টেশন থেকে শুরু

১৯৩০ সালে স্যান্ডার্স ক্যান্টাকিতে গ্যাস স্টেশনের ভিতরে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। জরাজীর্ণ রুমে সামান্য টেবিলই ছিল সম্বল। স্টেশনের ট্রাক ড্রাইভারদের জন্য স্যান্ডার্স দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। ফ্রাইড চিকেনই একমাত্র খাবারের আইটেম ছিল, যা তৈরি করতে অনেক সময় লাগত। এর বাইরেও তাঁর তৈরি হ্যাম ও স্টিক ডিনার ছিল বেশ জনপ্রিয়। স্যান্ডার্স রেস্তোরাঁ খুলে চিকেন ফ্রাই ও আয়রন স্কিলেট বিক্রি করতেন। সময়ের তালে তালে ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই রেস্তোরাঁটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৩৫ সালে আবারও ব্যবসা শুরু করেন। স্টেশনের ড্রাইভারদের ছাড়াও স্যান্ডার্স বাইরে অর্ডারে চিকেন ফ্রাইড সরবরাহ করতেন। এবারও ভাগ্য পাশে ছিল না। ১৯৩৯ সালে স্যান্ডার্স নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশেভ্যালিতে মোটেল খোলেন। মোটেল ব্যবসায়ে আগুন লেগে তা বন্ধ হয়ে যায়। আবারও গ্যাস স্টেশনে ট্রাক ড্রাইভারদের খাবারের ব্যবসা শুরু করেন স্যান্ডার্স। এবার ১৪০ আসনের রেস্তোরাঁ নেন এবং ১৯৪০ সালের জুলাইয়ে তাঁর রেস্টুরেন্টে স্পেশাল ফ্রাইড চিকেন বিক্রি শুরু করেন। নতুন স্বাদের চিকেন ফ্রাই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ‘ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন’ বিশ্বের প্রথম বড় পরিসরের ফ্রাইড চিকেন কোম্পানি। প্রাচীন এ রেস্তোরাঁটিই আজকের জনপ্রিয় ‘কেএফসি’। ১৯৫৫ সাল থেকে মাত্র ১০ বছরে এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে যায় সমগ্র বিশ্বে। এখন  কেএফসির ৬০০টির বেশি শাখা কিন্তু শুরুটা হয়েছিল সামান্য একটি গ্যাস স্টেশন থেকেই।

যে কারণে কর্নেল ডাকা হয়

ক্যান্টাকির বাসিন্দা না হলে এমন ভুল করাটাই স্বাভাবিক। যেমন অনেকেই মনে করেন কর্নেল স্যান্ডার্স নিশ্চয়ই কোনো এক সময় মিলিটারি দলের কর্তা ছিলেন। আসল ঘটনাটি হলো- ক্যান্টাকির সাধারণ মানুষ তো বটেই, বড় বড় আমলা স্যান্ডার্সকে সম্মান দিয়ে কর্নেল বলে সম্বোধন করতেন। আর স্যান্ডার্স নিজেকে গড়ে তোলার জন্য এই নামটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু এ নামটির পেছনেও রয়েছে একটি ইতিহাস। স্যান্ডার্স জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে সফল হন। ‘কর্নেল’ উপাধি পান ১৯৩৫ সালে, যখন গ্যাস স্টেশনের ভিতরের জরাজীর্ণ রুমে ‘স্যান্ডার্স ক্যাফে’ খুলে খাবারের ব্যবসা করেন। কিন্তু ১৯৪৯ সালে স্যান্ডার্স সনদপত্র আকারে কর্নেল খেতাব গ্রহণ করেন। এই বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন ক্যান্টাকির তৎকালীন গভর্নর। ১৯৫০ সালে স্যান্ডার্স নিজেকে সবার সামনে সভ্য এবং ক্যান্টাকির কর্নেল হিসেবে উপস্থাপন করা শুরু করলেন। সাদা দাড়ি, স্ট্রিং টাই এবং সাদা ওয়েস্ট কোটে নিজেকে অনন্য মানুষ হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করতেন স্যান্ডার্স। আর ব্যবসার সফলতা এবং সারা বিশ্বে এর ব্যাপ্তির কারণে কর্নেল নামটি সবার মুখে মুখে, যা স্যান্ডার্সকে শেষ বয়সে করেছে সম্মানিত। মুরগির স্বাদ বদলে দেওয়া স্যান্ডার্স ১৯৫০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিজের রেসিপি বিক্রির মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেন। তাঁর ব্যবসা ও নতুন স্বাদের খাবারে বিমোহিত হয়ে ক্যান্টাকির সাধারণ মানুষ তাঁকে কর্নেল বলে সম্বোধন করতেন।

বারবার জড়িয়েছেন ঝামেলায়

মাথা গরম বলে স্যান্ডার্সের ওপর বিরক্ত ছিলেন অনেকেই। এমনকি নিজের স্ত্রীও ত্যাগ করেছিলেন তাঁকে। কিন্তু জীবনের শুরু থেকে হোঁচট খেয়ে খেয়ে বাস্তবতা শেখা স্যান্ডার্স নানা বাধা-বিপত্তি সামলে এগিয়ে চলেন গন্তব্যের দিকে। রগচটা ও মাথা গরম প্রকৃতির কারণে বারবার চাকরিও ছাড়তে হয় তাঁকে। তাই হয়তো কখনই ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ পাননি বা বারবার ঝামেলাই এসে জুটত তাঁর কাছে। এর প্রমাণ মেলে তাঁর শেল তেল গ্যাস স্টেশন ‘হেলস হাফ একর’ ঘরটিতে ঘুরপাক খাওয়া ঘটনা।

স্যান্ডার্স নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিলেন উদ্বিগ্ন। নিজ ব্যবসাকে কীভাবে বড় পরিসরে আনা যায় তা নিয়ে হরহামেশাই চিন্তা করতেন। বিশালাকার ফাস্টফুডের ব্যাপক প্রচারণার চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তাঁর দিকে ছুড়ে দেওয়া হলো একটি আক্রমণাত্মক মার্কেটিং কৌশল। এই কৌশল পরিচালনা করেন শেল অয়েল গ্যাস স্টেশনের কাছাকাছি একটি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল গ্যাস স্টেশনের পরিচালক ম্যাট স্টুয়ার্ট। স্যান্ডার্সকে সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ‘স্টুয়ার্ট স্যান্ডার্সের ব্যবসার প্রচারণা ব্যর্থ করতে জালিয়াতির পথ বেছে নেন। বিষয়টি স্যান্ডার্স অবগত হওয়ার পর স্টুয়ার্টের ওপর চড়াও হন। জোশ অজারস্কির লেখা ‘কর্নেল স্যান্ডার্স অ্যান্ড দ্য আমেরিকান ড্রিম’ বই থেকে পাওয়া যায় একটি হত্যার ঘটনা। স্যান্ডার্সের সুনাম স্টুয়ার্ট নষ্ট করতে না পেরে শেল গ্যাস স্টেশনের ম্যানেজার রবার্ট গিবসনকে গুলি করে হত্যা করেন। পুলিশ ঘটনার সত্যতা পেয়ে স্টুয়ার্টকে আটক করে এবং এজন্য তাঁকে ১৮ বছর জেলে থাকতে হয়। কিন্তু স্টুয়ার্ট আটক হওয়ার পরও স্যান্ডার্সকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।’

বিশ্বের প্রথম কেএফসি

১৯৫২ সালে ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেনের শুরু করেছিলেন শুধু ফ্রাইড চিকেন দিয়ে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত করেন ফাস্টফুড খাবারের আইটেম। তখন কেএফসির প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি হয়েছিলেন স্যান্ডার্সের বন্ধু পিট হারমান। পিট হারমান উতাহে বিশাল রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করতেন। বন্ধু পিট স্যান্ডার্সের কেএফসির স্বাদের ভূয়সী প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে সল্টলেক সিটিতে নতুন শাখা চালু করেন। পিট হারমানই হলেন কেএফসির প্রথম ফ্যাঞ্চাইজ আর উতাহেই কেএফসির প্রথম চেইন শপ চালু হয়েছিল। জোশ ওজারস্কির মতে, ‘স্যান্ডার্স স্টেশনের পাশে রেস্তোরাঁয় দারুণ ব্যবসা করেন। এক সময় ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য নতুন ব্রাঞ্চ খোলার জন্য বন্ধু পিটকে সঙ্গে নেন। পিট মোনিকাকে সঙ্গে নিয়ে ক্যান্টাকি আসেন। তখন কেএফসির খাবার পরিবেশনের বালতি আকারের বাক্সটি দেখতে অন্যরকম লাগত। স্যান্ডার্সের কেএফসির সঙ্গে পিট হারমান মাসে ১০৫ ডলারের বিনিময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তি স্বাক্ষর করেন।সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share Button

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com