অসহিষ্ণুতা

তসলিমা নাসরিন:  ১. হিন্দু ইহুদি খ্রিস্টান বৌদ্ধ মুসলিম মৌলবাদীর মধ্যে তেমন কোনও ফারাক নেই। তারা মূলত অসহিষ্ণু। লতা মঙ্গেশকরের মরদেহর পাশে দাঁড়িয়ে মুসলমান আল্লাহর কাছে, হিন্দু ভগবানের কাছে, খ্রিস্টান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন। বলিউডের জনপ্রিয় হিরো শাহরুখ খান দুই হাত তুলে মোনাজাত করে লতাজির গায়ে ফুঁ দিয়েছেন, এটি দেখে কিছু উগ্র হিন্দু মনে করেছে লতাজির মুখে থুতু ছিটিয়েছেন শাহরুখ খান। এ নিয়ে তুমুল হৈ চৈ শুরু হলো সোশ্যাল মিডিয়ায়। আমি লক্ষ্য করেছি ভারতের অনেক মুসলিম হিন্দুর ধর্মীয় রীতিনীতি অনেকটা জানলেও সব হিন্দুই মুসলিমদের সব রীতিনীতি জানে না। বাংলাদেশেও দেখেছি, হিন্দু যতটা জানে মুসলমান সম্পর্কে, মুসলমান ততটা হিন্দু সম্পর্কে জানে না।

 

অজ্ঞানতাই মানুষকে অনেক সময় অসহিষ্ণু করে। শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে ওই অপবাদ ছড়িয়ে কার কী লাভ হয়েছে জানি না। তবে শাহরুখের পক্ষে সব ধর্মের, সব সংস্কৃতির মানুষ যেভাবে দাঁড়িয়েছে, তাতে মনে হয়েছে, উগ্র হিন্দুদের অন্য কারও দরকার নেই, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক উদার হিন্দুই প্রতিহত করে এবং করবে।

 

২. ওদিকে কর্ণাটক রাজ্যে বোরখা নিয়ে অহেতুক হুলস্থুল শুরু হয়ে গেছে। কলেজে বোরখা পরে আসতে পারবে না কোনও ছাত্রী, ঘোষণাও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের বোরখার বিরুদ্ধে একদল ছাত্র গেরুয়া উত্তরীয় পরে বিদ্রোহ করতে নেমে গেল। দাঙ্গার মতো অবস্থা হচ্ছে আঁচ করে মুখ্যমন্ত্রী ইস্কুল কলেজ কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু ইস্কুল কলেজ তো সারা বছর বন্ধ রাখা যাবে না। একদিন না একদিন খুলতে তো হবেই। তখন কি দাঙ্গা বাধবে না? বাধতেও পারে। আসলে মনমানসিকতার বদল না হলে দাঙ্গা আজ না হোক, কাল বাধবে। দু’পক্ষের মন থেকেই ঘৃণা এবং ভয় দূর করতে হবে। ভারত ভাগের পঁচাত্তর বছর পর আজও হিন্দু মুসলমানের দূরত্ব ঘোচেনি। পাকিস্তান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র, ভারত কিন্তু পাকিস্তানের মতো হতে চায়নি। হতে চাইলে পঁচাত্তর বছর আগেই এটি একটি হিন্দু রাষ্ট্র হতে পারতো। ধর্মকে নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দেওয়া হয়েছে ভারতের সংবিধানে। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ধারণ করেছে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের এই ভূখণ্ড। নানা ধর্মের, নানা জাতের, নানা ভাষার, নানা বর্ণের, নানা সংস্কৃতির মানুষকে রাষ্ট্রের আইন দিয়েছে সমান অধিকার।

 

ধর্মনিরপেক্ষ দেশের ইস্কুল কলেজে ধর্মনিরপেক্ষ ড্রেস কোড দেওয়া যেতেই পারে। সব ছাত্র ছাত্রীকে ধর্মীয় চিহ্ন বর্জন করে ইস্কুল কলেজে আসার নির্দেশ দেওয়া যেতেই পারে। ধর্ম পালন নিজের ঘরবাড়িতে চলে, ওকে বিদ্যালয়ে বয়ে আনার দরকার নেই, এ কথা বলতেই পারে ইস্কুল কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ইস্কুল কলেজে হিজাব পরার অধিকার নিয়ে মামলা হওয়ার পর কর্ণাটকের হাই কোর্ট রায় দিয়েছে হিজাব পরা মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।

 

বারো বছর আগে বোরখা নিয়ে আমার একটি কলাম স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু জঙ্গি মুসলমান পত্রিকা অফিস ভেঙে চুরে পুড়িয়ে দিয়েছিল। রাস্তার ধারের দোকানপাটেও আগুন দিয়েছিল। প্রতিরোধের জন্য রাস্তায় নেমেছিল হিন্দুরাও। পুলিশের গুলিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। সামান্য বোরখা এখনও এই রাজ্যকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে। লেগে যেতে পারে ভয়াবহ দাঙ্গা।

 

বোরখা পরায় বাধা যখন আসে, তখন বোরখা পরার অধিকারের পক্ষে দাঁড়াই আমি। আবার বোরখা যখন জোর করে মেয়েদের শরীরে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন এটি খুলে ফেলার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াই। ব্যক্তিগতভাবে আমি হিজাব আর বোরখা পরার বিপক্ষে। আমি মনে করি এই পোশাক মেয়েদের পরানোর পেছনে আছে পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র। বোরখা হিজাব নিকাব আসলে নারীকে অবদমনের এবং অসম্মানের প্রতীক। আমি আশা করি, মেয়েরা একদিন অনুধাবন করবে বোরখা হলো অন্ধকার যুগের চেস্টিটি বেল্ট বা সতীত্ব বন্ধনীর মতো, যে বন্ধনী যৌনাঙ্গকে খাঁচায় বন্দি করে রাখত। সেই সতীত্ব বন্ধনী যদি অসম্মানের প্রতীক হতে পারে, বোরখা নয় কেন?

 

ইরানের মেয়েদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের হিজাব উড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়। আজ কর্ণাটকের যে মেয়েরা আঁকড়ে ধরে আছে হিজাব একে নিজের আইডেনটিটি মনে করে, তারা নিজেদের জন্য আরও ভালো আইডেনটিটি খুঁজে পাক, আরও অর্থবহ, আরও সম্মানীয় আইডেনটিটি। হিজাব বা বোরখা বা কোনও ধর্মীয় পোশাক আশাক তাদের পরিচয়পত্র না হোক।

 

৩. দাঙ্গা লাগে না, দাঙ্গা লাগানো হয়।

বড় কোনও নির্বাচনের আগে আগেই শুনেছি দাঙ্গা লাগানো হয়। দাঙ্গা মানেই হিন্দু-মুসলমান। কিছুটা হিন্দু-মুসলমান হলে নাকি কিছুটা ভোট মেলে। ধরা যাক, এক পারসেন্ট। দুর্দিনে ওটিই বা কম কী! লোকে বলে।

 

একদিক দিয়ে ভালো, দাঙ্গা লাগে না। দাঙ্গা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেগে যেত, তাহলে ভয় ছিল। তাহলে ভাবা যেত, হিন্দু মুসলমান জন্মের শত্রু, এদের আর এক সমাজে বসবাস সম্ভব নয়। আমার তো মনে হয় পার্টিশানের দাঙ্গাও লাগেনি, লাগানো হয়েছিল।

 

৪. কিছু উগ্র হিন্দু চিৎকার করে বলে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করা হবে, অহিন্দু যারা আছে, তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হবে, যদি মরতে না চায় ওরা, তবে ওদের সবাইকে হিন্দু হতে হবে, নয়তো ভারত থেকে তাদের চলে যেতে হবে। মসজিদগুলোকে সব মন্দির করে ফেলা হবে।

 

আমি ঠিক জানি না, এরকম যারা ভাবছে, তাদের সংখ্যা অনেক কিনা। ভারতকে সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে জানি, তাই ভালোবাসি, আস্থা রাখি। ভারত কি বদলে যাচ্ছে? বদলে যাবে? হিন্দু ধর্মের উদারতার কথা জানি, কেউ এই ধর্মকে মানতে পারে, না মানতেও পারে, মানার জন্য ইসলাম ধর্মের মতো জোর জবরদস্তি নেই। না মানলে দুররা মারা, জেলে ভরা, ফাঁসি দেওয়া, শূলে চড়ানো, কুপিয়ে মেরে ফেলা- এসব নেই। প্রচুর কুসংস্কার আছে। কিন্তু অনেক কুসংস্কার সময়ের সঙ্গে চলেও গেছে। শুধু হিন্দু থাকবে ভারতে, আর কেউ থাকতে পারবে না, হিন্দু বা হিন্দুত্ব নিয়ে কোনও কথা বললে গুলি করে মেরে দেব- এই কথাগুলো আমার কাছে নতুন। সেই আশির দশক থেকে নারীর সমানাধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সব ধর্ম আর সব ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা করছি। হিন্দু ধর্ম আর হিন্দু সমাজের নারীবিরোধী কুসংস্কারের সমালোচনা ভারতের পত্র-পত্রিকাতেও ছাপানো হয়েছে। মানুষ আমার লেখার প্রশংসা করেছে। কিন্তু আজ “করভা চৌত” কি পুরুষেরা করে স্ত্রীর মঙ্গলের জন্য? এই প্রশ্নটি করার সঙ্গে সঙ্গে শত শত হিন্দু পঙ্গপালের মতো ঘিরে ধরে আমাকে, গালিগালিতে ভাসিয়ে ফেলে, ভারত থেকে যেন দূর হয়ে যাই হুমকি দেয়। এ এক নতুন ভারত। কল্পনার অতীত এক ভারত। অনেকের আচরণ, সত্যি বলতে কী, মুসলমান মৌলবাদীদের মতো। চরম অসহিষ্ণু।

 

আমি হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের কথা ভাবি। ওই ভারতে কি সব উদারপন্থী এবং কট্টরপন্থী হিন্দু সুখে শান্তিতে বাস করতে পারবেন? ছোট জাত আর বড় জাতে কোনও অসন্তোষ থাকবে না, নারী পুরুষে কোনো বৈষম্য? শুধু হিন্দুদের জন্য রাষ্ট্র! হতেই পারে। ইহুদিরা যেমন শুধু ইহুদিদের জন্য একটি দেশ বানিয়ে নিয়েছে, তেমন শুধু হিন্দুদের জন্য হতেই পারে একটি দেশ।

 

হিন্দু রাষ্ট্র থেকে আমাকেও বিদেয় নিতে হবে। কারণ আমি তো হিন্দু হতে যাবো না। আমি নাস্তিক, মানববাদ আমার ধর্ম। এটি নিয়েই আমি থাকবো। গৌরি লঙ্কেশ বোধ হয় মানববাদী ছিলেন, তিনিও তো হিন্দু রাষ্ট্রের জন্য যোগ্য ছিলেন না, আমিও যোগ্য নই।

 

তবে সবার মঙ্গল চাই আমি। ইহুদি রাষ্ট্রে ইহুদিরা ভালো থাকুক। ভারত কখনও হিন্দু রাষ্ট্র হয়তো হবে না, তারপরও যদি কোনও দুর্যোগে দুঃসময়ে হয়েই যায় এটি হিন্দু রাষ্ট্র, হিন্দুরা ভালো থাকুক। মুসলমানের দেশে মুসলমানেরা ভালো থাকুক। বৌদ্ধ খ্রিস্টানের দেশে বৌদ্ধ খ্রিস্টানরা। সেক্যুলারদের দেশে ভালো থাকুক সেক্যুলাররা। আমি যেখানেই থাকি, থাকবো ব্রহ্মাণ্ডকে আমার পৃথিবী ভেবে, এই গ্যালাক্সিকে আমার দেশ ভেবে, সৌরজগৎকে গ্রাম ভেবে, আর পৃথিবীকে আমার ঘর ভেবে। ধর্মে নয়, বিজ্ঞানে বিশ্বাস করা, কুসংস্কারে নয়, বিবর্তনে বিশ্বাস করা, মানুষকে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধ ইহুদি না ভেবে মানুষ বলে মনে করা, ধর্মীয় বা অধর্মীয় কোনও জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস না করা মানুষটি যেখানেই বাঁচি, বা যতদিনই বাঁচি, নিজের সততা আর সম্মানকে কখনও মরতে দেব না।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।  সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বিশ্বজয়ী প্রযুক্তিবিদ তৈরি হবে দেশে: পলক

» বাংলাদেশ সফরে আসছেন বেলজিয়ামের রানি মাথিল্ডে

» জ্ঞান ফল

» ২৯ দিনে মেট্রোরেলের আয় জানা গেল

» আজকের বাংলাদেশ বদলে গেছে: প্রধানমন্ত্রী

» চট্টগ্রামে মেট্রোরেলের মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন ও সম্ভাব্যতা যাচাই কাজের উদ্বোধন

» চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপ নির্বাচন: মোতায়েন থাকবে ১৩ প্লাটুন বিজিবি

» টসে জিতে ব্যাটিংয়ে বরিশাল

» অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের সময় নারী-শিশুসহ আটক ৯

» প্রধানমন্ত্রীর কাছে শপথ নিলেন রসিক মেয়র মোস্তফা

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

অসহিষ্ণুতা

তসলিমা নাসরিন:  ১. হিন্দু ইহুদি খ্রিস্টান বৌদ্ধ মুসলিম মৌলবাদীর মধ্যে তেমন কোনও ফারাক নেই। তারা মূলত অসহিষ্ণু। লতা মঙ্গেশকরের মরদেহর পাশে দাঁড়িয়ে মুসলমান আল্লাহর কাছে, হিন্দু ভগবানের কাছে, খ্রিস্টান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন। বলিউডের জনপ্রিয় হিরো শাহরুখ খান দুই হাত তুলে মোনাজাত করে লতাজির গায়ে ফুঁ দিয়েছেন, এটি দেখে কিছু উগ্র হিন্দু মনে করেছে লতাজির মুখে থুতু ছিটিয়েছেন শাহরুখ খান। এ নিয়ে তুমুল হৈ চৈ শুরু হলো সোশ্যাল মিডিয়ায়। আমি লক্ষ্য করেছি ভারতের অনেক মুসলিম হিন্দুর ধর্মীয় রীতিনীতি অনেকটা জানলেও সব হিন্দুই মুসলিমদের সব রীতিনীতি জানে না। বাংলাদেশেও দেখেছি, হিন্দু যতটা জানে মুসলমান সম্পর্কে, মুসলমান ততটা হিন্দু সম্পর্কে জানে না।

 

অজ্ঞানতাই মানুষকে অনেক সময় অসহিষ্ণু করে। শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে ওই অপবাদ ছড়িয়ে কার কী লাভ হয়েছে জানি না। তবে শাহরুখের পক্ষে সব ধর্মের, সব সংস্কৃতির মানুষ যেভাবে দাঁড়িয়েছে, তাতে মনে হয়েছে, উগ্র হিন্দুদের অন্য কারও দরকার নেই, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক উদার হিন্দুই প্রতিহত করে এবং করবে।

 

২. ওদিকে কর্ণাটক রাজ্যে বোরখা নিয়ে অহেতুক হুলস্থুল শুরু হয়ে গেছে। কলেজে বোরখা পরে আসতে পারবে না কোনও ছাত্রী, ঘোষণাও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের বোরখার বিরুদ্ধে একদল ছাত্র গেরুয়া উত্তরীয় পরে বিদ্রোহ করতে নেমে গেল। দাঙ্গার মতো অবস্থা হচ্ছে আঁচ করে মুখ্যমন্ত্রী ইস্কুল কলেজ কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু ইস্কুল কলেজ তো সারা বছর বন্ধ রাখা যাবে না। একদিন না একদিন খুলতে তো হবেই। তখন কি দাঙ্গা বাধবে না? বাধতেও পারে। আসলে মনমানসিকতার বদল না হলে দাঙ্গা আজ না হোক, কাল বাধবে। দু’পক্ষের মন থেকেই ঘৃণা এবং ভয় দূর করতে হবে। ভারত ভাগের পঁচাত্তর বছর পর আজও হিন্দু মুসলমানের দূরত্ব ঘোচেনি। পাকিস্তান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র, ভারত কিন্তু পাকিস্তানের মতো হতে চায়নি। হতে চাইলে পঁচাত্তর বছর আগেই এটি একটি হিন্দু রাষ্ট্র হতে পারতো। ধর্মকে নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দেওয়া হয়েছে ভারতের সংবিধানে। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ধারণ করেছে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের এই ভূখণ্ড। নানা ধর্মের, নানা জাতের, নানা ভাষার, নানা বর্ণের, নানা সংস্কৃতির মানুষকে রাষ্ট্রের আইন দিয়েছে সমান অধিকার।

 

ধর্মনিরপেক্ষ দেশের ইস্কুল কলেজে ধর্মনিরপেক্ষ ড্রেস কোড দেওয়া যেতেই পারে। সব ছাত্র ছাত্রীকে ধর্মীয় চিহ্ন বর্জন করে ইস্কুল কলেজে আসার নির্দেশ দেওয়া যেতেই পারে। ধর্ম পালন নিজের ঘরবাড়িতে চলে, ওকে বিদ্যালয়ে বয়ে আনার দরকার নেই, এ কথা বলতেই পারে ইস্কুল কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ইস্কুল কলেজে হিজাব পরার অধিকার নিয়ে মামলা হওয়ার পর কর্ণাটকের হাই কোর্ট রায় দিয়েছে হিজাব পরা মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।

 

বারো বছর আগে বোরখা নিয়ে আমার একটি কলাম স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু জঙ্গি মুসলমান পত্রিকা অফিস ভেঙে চুরে পুড়িয়ে দিয়েছিল। রাস্তার ধারের দোকানপাটেও আগুন দিয়েছিল। প্রতিরোধের জন্য রাস্তায় নেমেছিল হিন্দুরাও। পুলিশের গুলিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। সামান্য বোরখা এখনও এই রাজ্যকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে। লেগে যেতে পারে ভয়াবহ দাঙ্গা।

 

বোরখা পরায় বাধা যখন আসে, তখন বোরখা পরার অধিকারের পক্ষে দাঁড়াই আমি। আবার বোরখা যখন জোর করে মেয়েদের শরীরে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন এটি খুলে ফেলার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াই। ব্যক্তিগতভাবে আমি হিজাব আর বোরখা পরার বিপক্ষে। আমি মনে করি এই পোশাক মেয়েদের পরানোর পেছনে আছে পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র। বোরখা হিজাব নিকাব আসলে নারীকে অবদমনের এবং অসম্মানের প্রতীক। আমি আশা করি, মেয়েরা একদিন অনুধাবন করবে বোরখা হলো অন্ধকার যুগের চেস্টিটি বেল্ট বা সতীত্ব বন্ধনীর মতো, যে বন্ধনী যৌনাঙ্গকে খাঁচায় বন্দি করে রাখত। সেই সতীত্ব বন্ধনী যদি অসম্মানের প্রতীক হতে পারে, বোরখা নয় কেন?

 

ইরানের মেয়েদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের হিজাব উড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়। আজ কর্ণাটকের যে মেয়েরা আঁকড়ে ধরে আছে হিজাব একে নিজের আইডেনটিটি মনে করে, তারা নিজেদের জন্য আরও ভালো আইডেনটিটি খুঁজে পাক, আরও অর্থবহ, আরও সম্মানীয় আইডেনটিটি। হিজাব বা বোরখা বা কোনও ধর্মীয় পোশাক আশাক তাদের পরিচয়পত্র না হোক।

 

৩. দাঙ্গা লাগে না, দাঙ্গা লাগানো হয়।

বড় কোনও নির্বাচনের আগে আগেই শুনেছি দাঙ্গা লাগানো হয়। দাঙ্গা মানেই হিন্দু-মুসলমান। কিছুটা হিন্দু-মুসলমান হলে নাকি কিছুটা ভোট মেলে। ধরা যাক, এক পারসেন্ট। দুর্দিনে ওটিই বা কম কী! লোকে বলে।

 

একদিক দিয়ে ভালো, দাঙ্গা লাগে না। দাঙ্গা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেগে যেত, তাহলে ভয় ছিল। তাহলে ভাবা যেত, হিন্দু মুসলমান জন্মের শত্রু, এদের আর এক সমাজে বসবাস সম্ভব নয়। আমার তো মনে হয় পার্টিশানের দাঙ্গাও লাগেনি, লাগানো হয়েছিল।

 

৪. কিছু উগ্র হিন্দু চিৎকার করে বলে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করা হবে, অহিন্দু যারা আছে, তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হবে, যদি মরতে না চায় ওরা, তবে ওদের সবাইকে হিন্দু হতে হবে, নয়তো ভারত থেকে তাদের চলে যেতে হবে। মসজিদগুলোকে সব মন্দির করে ফেলা হবে।

 

আমি ঠিক জানি না, এরকম যারা ভাবছে, তাদের সংখ্যা অনেক কিনা। ভারতকে সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে জানি, তাই ভালোবাসি, আস্থা রাখি। ভারত কি বদলে যাচ্ছে? বদলে যাবে? হিন্দু ধর্মের উদারতার কথা জানি, কেউ এই ধর্মকে মানতে পারে, না মানতেও পারে, মানার জন্য ইসলাম ধর্মের মতো জোর জবরদস্তি নেই। না মানলে দুররা মারা, জেলে ভরা, ফাঁসি দেওয়া, শূলে চড়ানো, কুপিয়ে মেরে ফেলা- এসব নেই। প্রচুর কুসংস্কার আছে। কিন্তু অনেক কুসংস্কার সময়ের সঙ্গে চলেও গেছে। শুধু হিন্দু থাকবে ভারতে, আর কেউ থাকতে পারবে না, হিন্দু বা হিন্দুত্ব নিয়ে কোনও কথা বললে গুলি করে মেরে দেব- এই কথাগুলো আমার কাছে নতুন। সেই আশির দশক থেকে নারীর সমানাধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সব ধর্ম আর সব ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা করছি। হিন্দু ধর্ম আর হিন্দু সমাজের নারীবিরোধী কুসংস্কারের সমালোচনা ভারতের পত্র-পত্রিকাতেও ছাপানো হয়েছে। মানুষ আমার লেখার প্রশংসা করেছে। কিন্তু আজ “করভা চৌত” কি পুরুষেরা করে স্ত্রীর মঙ্গলের জন্য? এই প্রশ্নটি করার সঙ্গে সঙ্গে শত শত হিন্দু পঙ্গপালের মতো ঘিরে ধরে আমাকে, গালিগালিতে ভাসিয়ে ফেলে, ভারত থেকে যেন দূর হয়ে যাই হুমকি দেয়। এ এক নতুন ভারত। কল্পনার অতীত এক ভারত। অনেকের আচরণ, সত্যি বলতে কী, মুসলমান মৌলবাদীদের মতো। চরম অসহিষ্ণু।

 

আমি হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের কথা ভাবি। ওই ভারতে কি সব উদারপন্থী এবং কট্টরপন্থী হিন্দু সুখে শান্তিতে বাস করতে পারবেন? ছোট জাত আর বড় জাতে কোনও অসন্তোষ থাকবে না, নারী পুরুষে কোনো বৈষম্য? শুধু হিন্দুদের জন্য রাষ্ট্র! হতেই পারে। ইহুদিরা যেমন শুধু ইহুদিদের জন্য একটি দেশ বানিয়ে নিয়েছে, তেমন শুধু হিন্দুদের জন্য হতেই পারে একটি দেশ।

 

হিন্দু রাষ্ট্র থেকে আমাকেও বিদেয় নিতে হবে। কারণ আমি তো হিন্দু হতে যাবো না। আমি নাস্তিক, মানববাদ আমার ধর্ম। এটি নিয়েই আমি থাকবো। গৌরি লঙ্কেশ বোধ হয় মানববাদী ছিলেন, তিনিও তো হিন্দু রাষ্ট্রের জন্য যোগ্য ছিলেন না, আমিও যোগ্য নই।

 

তবে সবার মঙ্গল চাই আমি। ইহুদি রাষ্ট্রে ইহুদিরা ভালো থাকুক। ভারত কখনও হিন্দু রাষ্ট্র হয়তো হবে না, তারপরও যদি কোনও দুর্যোগে দুঃসময়ে হয়েই যায় এটি হিন্দু রাষ্ট্র, হিন্দুরা ভালো থাকুক। মুসলমানের দেশে মুসলমানেরা ভালো থাকুক। বৌদ্ধ খ্রিস্টানের দেশে বৌদ্ধ খ্রিস্টানরা। সেক্যুলারদের দেশে ভালো থাকুক সেক্যুলাররা। আমি যেখানেই থাকি, থাকবো ব্রহ্মাণ্ডকে আমার পৃথিবী ভেবে, এই গ্যালাক্সিকে আমার দেশ ভেবে, সৌরজগৎকে গ্রাম ভেবে, আর পৃথিবীকে আমার ঘর ভেবে। ধর্মে নয়, বিজ্ঞানে বিশ্বাস করা, কুসংস্কারে নয়, বিবর্তনে বিশ্বাস করা, মানুষকে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধ ইহুদি না ভেবে মানুষ বলে মনে করা, ধর্মীয় বা অধর্মীয় কোনও জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস না করা মানুষটি যেখানেই বাঁচি, বা যতদিনই বাঁচি, নিজের সততা আর সম্মানকে কখনও মরতে দেব না।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।  সূএ:বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।(দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com