হুন্ডিতে অর্থনীতির সর্বনাশ

দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। গত বছরের শুরুতেই তিনি মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ সুবিধা নিয়েছেন। এ সুবিধা পেতে মালয়েশিয়ার ব্যাংকে প্রায় সোয়া কোটি টাকা মূল্যমানের রিঙ্গিত জমা রেখেছেন। এ ছাড়া নিয়ে গেছেন সারা জীবনের অর্জিত সব অর্থসম্পদ। আর এই পুরো টাকাটাই তিনি বের করে নিয়ে গেছেন হুন্ডির মাধ্যমে। কামরুল ইসলামের মতো শুধু মালয়েশিয়াতেই টাকা পাচারের মাধ্যমে এভাবে আড়াই হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেকেন্ড হোম সুবিধা নিয়েছেন। আর প্রতিদিনই এভাবে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে টাকা। টাকা পাচার এড়াতে সরকারের কোনো পদক্ষেপই আর কাজে আসছে না। তবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে কারসাজিতে অর্থ পাচারের অঙ্কটা আশঙ্কাজনক। আর পাচার করা অর্থের বেশির ভাগই কানাডা, মালয়েশিয়া, ব্যাংকক, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাই চলে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় পাচারকারীরা টাকা পাচারে ওইসব দেশকে বেছে নিচ্ছে। সেখানে আবাসিক ভবন, জমি কেনা, হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসায় এসব টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে ইংলিশ চ্যানেলের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতেও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাচারের টাকা যাচ্ছে বিদেশের নামিদামি ক্যাসিনোতেও। একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অসাধু ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হুন্ডি কারবারে জড়িত। সরকারি মুদ্রানীতি অনুসরণ না করে এভাবে অর্থ স্থানান্তরের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরকারি প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে সরকারও বঞ্চিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যে কোনো উপায়ে হোক অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচার বন্ধ করতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়ানো দুরূহ হবে। এজন্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে আরও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বাণিজ্য কারসাজি : বাণিজ্য কারসাজি করে টাকা পাচারের তালিকায় বিশ্বের ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্য কারসাজিতে বাংলাদেশ থেকে টাকা বেরিয়ে গেছে দুইভাবে। একটি উপায় হচ্ছে, পণ্য আমদানির সময় কাগজপত্রে বেশি দাম উল্লেখ করে টাকা পাচার; আরেকটি হচ্ছে, পণ্য রপ্তানি করার সময় কাগজপত্রে দাম কম দেখানো। রপ্তানির সময় কম দাম দেখানোর ফলে বিদেশি ক্রেতারা যে অর্থ পরিশোধ করছেন, তার একটি অংশ বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আসছে শুধু সেই পরিমাণ অর্থ, যে পরিমাণ অর্থের কথা দেখানো হচ্ছে অর্থাৎ কাগজপত্রে যে দাম উল্লেখ করা হয়েছে সেটা। অনেক সময় পণ্য আমদানি-রপ্তানির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে খালি কনটেইনার আসা-যাওয়া করেছে, এমন উদাহরণও রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইনটেগ্রিটি (জিএফআই) বলছে, ২০১৫ সালে বাণিজ্যে কারসাজির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সময় এ কারসাজি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রধান মাধ্যম হুন্ডি : অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম এখন হুন্ডি। মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিদেশে অর্থ পাচার করে বাড়ি বানাচ্ছেন, জমি কিনছেন, কারখানা গড়ছেন। ব্যবসায়ীরা দেদার অর্থ পাচার করছেন আমদানি-রপ্তানির আড়ালে; আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে আর রপ্তানি পণ্যের দাম কম দেখিয়ে। এজেন্টের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আত্মীয়স্বজনের ঠিকানায় হুন্ডির টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। জিএফআই জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে হুন্ডিচক্র এতটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছে যে, ব্যাংকিং বা অন্য যে কোনো মাধ্যমের চেয়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং কোনোরকম হয়রানি ছাড়াই তারা গ্রাহকের ঠিকানায় টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে হুন্ডি টাকা পাচারের একটি ভয়ঙ্কর মাধ্যম। কেননা আমদানি বা রপ্তানির মাধ্যমে টাকা পাচার করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্ট বা কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হয়। এর ফলে অপরাধীর পরিচয় একসময় পাওয়া যায়। কিন্তু হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না। এ প্রক্রিয়ায় টাকা পাচার করা হলে পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন। এ ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরে খরচ কম। এ কারণেই পাচারকারীরা হুন্ডিকেই পছন্দ করে বেশি। শুধু বাংলাদেশ থেকে টাকা যায় না, টাকা আসেও হুন্ডির মাধ্যমে। বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা থাকায় প্রবাসী শ্রমিকরাও হুন্ডির আশ্রয় নিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে এবং বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে।

কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি : বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও থাইল্যান্ডে। এর বাইরে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নিয়ে অনেক দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। সরকারের একাধিক সংস্থা এ নিয়ে তদন্তও করেছে। হুন্ডি সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। তারা মনে করে, হুন্ডির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পাচারের সিন্ডিকেট বন্ধ করা গেলে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। সূত্রমতে হুন্ডি ও অর্থ পাচারের মতো অবৈধ কর্মকান্ডে র সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। বিভিন্ন জেলার ৬৩২ জনের নামের তালিকাসংবলিত বিশেষ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায় গোয়েন্দা সংস্থাটি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এটি আমলে নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে হুন্ডি ব্যবসা প্রতিরোধে পাঁচ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান পরিচালনা। স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সক্রিয়তা আরও বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়ার কথাও রয়েছে সুপারিশে। সেসব সুপারিশ আর আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» যুক্তরাজ্যে কন্টেইনার থেকে ৩৯ লাশ উদ্ধার

» গ্রামীণ জনগণ প্রকৃত উপজেলার সুফল থেকে বঞ্চিত: জি এম কাদের

» রাজধানীতে টানা দুই ঘণ্টা বৃষ্টি

» শিক্ষকরা ছত্রভঙ্গ, আহত ১০

» পদ হারিয়ে কাওসার বললেন, রাজনীতি করলে ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে

» জরিপভিত্তিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নই: তথ্যমন্ত্রী

» শায়েস্তাগঞ্জে কালোবাজারীর দখলে ট্রেনের টিকেট

» কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকা!

» গাছ কেটে ভাইরাল হওয়া সেই নারী আটক

» একজন নেতার জন্য ১৪ দল ভাঙতে পারে না: ওবায়দুল কাদের

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

হুন্ডিতে অর্থনীতির সর্বনাশ

দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। গত বছরের শুরুতেই তিনি মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ সুবিধা নিয়েছেন। এ সুবিধা পেতে মালয়েশিয়ার ব্যাংকে প্রায় সোয়া কোটি টাকা মূল্যমানের রিঙ্গিত জমা রেখেছেন। এ ছাড়া নিয়ে গেছেন সারা জীবনের অর্জিত সব অর্থসম্পদ। আর এই পুরো টাকাটাই তিনি বের করে নিয়ে গেছেন হুন্ডির মাধ্যমে। কামরুল ইসলামের মতো শুধু মালয়েশিয়াতেই টাকা পাচারের মাধ্যমে এভাবে আড়াই হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেকেন্ড হোম সুবিধা নিয়েছেন। আর প্রতিদিনই এভাবে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে টাকা। টাকা পাচার এড়াতে সরকারের কোনো পদক্ষেপই আর কাজে আসছে না। তবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে কারসাজিতে অর্থ পাচারের অঙ্কটা আশঙ্কাজনক। আর পাচার করা অর্থের বেশির ভাগই কানাডা, মালয়েশিয়া, ব্যাংকক, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাই চলে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় পাচারকারীরা টাকা পাচারে ওইসব দেশকে বেছে নিচ্ছে। সেখানে আবাসিক ভবন, জমি কেনা, হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসায় এসব টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে ইংলিশ চ্যানেলের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতেও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাচারের টাকা যাচ্ছে বিদেশের নামিদামি ক্যাসিনোতেও। একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অসাধু ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হুন্ডি কারবারে জড়িত। সরকারি মুদ্রানীতি অনুসরণ না করে এভাবে অর্থ স্থানান্তরের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরকারি প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে সরকারও বঞ্চিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যে কোনো উপায়ে হোক অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচার বন্ধ করতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়ানো দুরূহ হবে। এজন্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে আরও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বাণিজ্য কারসাজি : বাণিজ্য কারসাজি করে টাকা পাচারের তালিকায় বিশ্বের ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্য কারসাজিতে বাংলাদেশ থেকে টাকা বেরিয়ে গেছে দুইভাবে। একটি উপায় হচ্ছে, পণ্য আমদানির সময় কাগজপত্রে বেশি দাম উল্লেখ করে টাকা পাচার; আরেকটি হচ্ছে, পণ্য রপ্তানি করার সময় কাগজপত্রে দাম কম দেখানো। রপ্তানির সময় কম দাম দেখানোর ফলে বিদেশি ক্রেতারা যে অর্থ পরিশোধ করছেন, তার একটি অংশ বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আসছে শুধু সেই পরিমাণ অর্থ, যে পরিমাণ অর্থের কথা দেখানো হচ্ছে অর্থাৎ কাগজপত্রে যে দাম উল্লেখ করা হয়েছে সেটা। অনেক সময় পণ্য আমদানি-রপ্তানির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে খালি কনটেইনার আসা-যাওয়া করেছে, এমন উদাহরণও রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইনটেগ্রিটি (জিএফআই) বলছে, ২০১৫ সালে বাণিজ্যে কারসাজির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সময় এ কারসাজি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রধান মাধ্যম হুন্ডি : অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম এখন হুন্ডি। মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিদেশে অর্থ পাচার করে বাড়ি বানাচ্ছেন, জমি কিনছেন, কারখানা গড়ছেন। ব্যবসায়ীরা দেদার অর্থ পাচার করছেন আমদানি-রপ্তানির আড়ালে; আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে আর রপ্তানি পণ্যের দাম কম দেখিয়ে। এজেন্টের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আত্মীয়স্বজনের ঠিকানায় হুন্ডির টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। জিএফআই জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে হুন্ডিচক্র এতটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছে যে, ব্যাংকিং বা অন্য যে কোনো মাধ্যমের চেয়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং কোনোরকম হয়রানি ছাড়াই তারা গ্রাহকের ঠিকানায় টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে হুন্ডি টাকা পাচারের একটি ভয়ঙ্কর মাধ্যম। কেননা আমদানি বা রপ্তানির মাধ্যমে টাকা পাচার করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্ট বা কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হয়। এর ফলে অপরাধীর পরিচয় একসময় পাওয়া যায়। কিন্তু হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না। এ প্রক্রিয়ায় টাকা পাচার করা হলে পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন। এ ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরে খরচ কম। এ কারণেই পাচারকারীরা হুন্ডিকেই পছন্দ করে বেশি। শুধু বাংলাদেশ থেকে টাকা যায় না, টাকা আসেও হুন্ডির মাধ্যমে। বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা থাকায় প্রবাসী শ্রমিকরাও হুন্ডির আশ্রয় নিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে এবং বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে।

কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি : বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও থাইল্যান্ডে। এর বাইরে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নিয়ে অনেক দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। সরকারের একাধিক সংস্থা এ নিয়ে তদন্তও করেছে। হুন্ডি সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। তারা মনে করে, হুন্ডির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পাচারের সিন্ডিকেট বন্ধ করা গেলে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। সূত্রমতে হুন্ডি ও অর্থ পাচারের মতো অবৈধ কর্মকান্ডে র সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। বিভিন্ন জেলার ৬৩২ জনের নামের তালিকাসংবলিত বিশেষ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায় গোয়েন্দা সংস্থাটি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এটি আমলে নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে হুন্ডি ব্যবসা প্রতিরোধে পাঁচ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান পরিচালনা। স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সক্রিয়তা আরও বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়ার কথাও রয়েছে সুপারিশে। সেসব সুপারিশ আর আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com