রিমান্ড রিমান্ড খেলা

নঈম নিজাম:

নাম কী?

জজ মিয়া।

ভালো নাম?

জালাল আহমেদ।

আগে পিছে কিছু আছে, না শুধুই জালাল আহমেদ?

স্যার, জজ মিয়া বলতে পারেন। জজ মিয়া নামেই বাবা ডাকতেন। পরে এলাকার মানুষও জজ মিয়া নামে ডাকে।

তোমার এত কথা বলার দরকার নেই। কী নামে ডাকতে হবে আমরা জানি। সময়মতো টের পাইবা। আমার নাম মুন্সী আতিক। এ নাম শুনলে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে। পাশে বসা স্যারের নাম রুহুল আমীন। তিনি এসপি রুহুল আমীন। আর তোরে ধরে এনেছেন যিনি তিনি এসপি রশিদ। শালা, আগামী কিছুদিনের মধ্যে টের পাবি দুনিয়াদারি। ক্রসফায়ার রেডি। জজ মিয়া নীরব। নিরীহ এই গরিব শ্রমজীবী জানে না তাকে কেন আটক করে আনা হয়েছে। তাই নীরবতাই তার কাছে এখন নিরাপদ। কথা বললেই মারধর শুরু হয়। এই কয় দিনে জজ মিয়া অনেক কিছু বুঝতে পেরেছে। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দিন জজ মিয়া ছিলেন নোয়াখালীর সেনবাগের বীরকোট গ্রামের বাড়িতে। সন্ধ্যায় স্থানীয় বাবুলের দোকানে চা খেতে খেতে জজ মিয়া শোনেন ঢাকায় বিরোধীদলীয় নেতাকে হত্যা করতে বোমা হামলা হয়েছে। এ হামলা নিয়ে গ্রামের মানুষ অনেক আলোচনা করে। জজ মিয়া আলোচনা শোনে। নিজেও অংশ নেয়। পরে চলে যায় বাড়িতে। কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে আসে। কাজকর্ম শুরু করে। মাঝে মাঝে বাড়িতেও যায়। এ ঘটনার ছয় মাস পর একদিন জজ মিয়া গ্রামে অবস্থানকালে গ্রাম চৌকিদার আসে তার কাছে। তারপর জানায়, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দারোগা আসছে গ্রামে। দারোগা এসে থানায় নিয়ে গেলেন জজ মিয়াকে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন সিআইডির কর্মকর্তা আবদুর রশিদ। জজ মিয়া কিছুই বুঝতে পারে না। একপর্যায়ে সিআইডি টিম লকআপে প্রবেশ করে। তারপর থানার লকআপের ভিতর তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এতে ভেঙে যায় তার পাঁজরের হাড়। তারপর আনা হয় ঢাকায়। সিআইডি অফিসে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। আর সেইসঙ্গে মারধর। রিমান্ডে জজ মিয়ার সঙ্গে কথোপকথনেও ছিল অনেক নাটকীয়তা।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় সিআইডি কর্মকর্তারা প্রশ্ন করেন, এই হামলার নেতৃত্ব কে দিয়েছে?

-স্যার, আমি কিছু জানি না।

জানিস না মানে? ভুলে গেলি গত কয়েক রাতের কথা।

-স্যার, শিখিয়ে দেন, একটু ধরাইয়া দিলে জানব।

সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন, মুকুলদের সঙ্গে কত দিন ধরে কাজ করিস? ওরা কি তোর সাগরেদ? কীভাবে ভারত গেল ওরা?

-স্যার, আমি ফল বেচতাম। ওরাও ফল বেচত। সেভাবে সম্পর্ক। তা ছাড়া আরও দুই-একটা এমন ব্যবসা করেছি একসঙ্গে।

হারামজাদা! ওরা ফল বেচবে কেন? ওরা শীর্ষ সন্ত্রাসী।

-কী বলব স্যার, ধরায়ে দেন। তাহলে সেভাবেই বলব।

ওরা সবাই তোর গ্রুপে ছিল। সবাই সন্ত্রাসী গ্রুপ। তুই এই গ্রুপের মেইন সমন্বয়কারী। সবাই মিলেই একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করেছিস শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে।

-জি স্যার, আমরা সবাই শীর্ষ সন্ত্রাসী। আমরা বোমা মারি। আমার পরিবারের অন্যরাও এই কাজ করে খায়। আমরা সবাই এই কাজ করি।

গুড, ভালো। তোকে দিয়ে হবে। বোমা না, বলবি গ্রেনেড।

-জি স্যার, গেরেনেট। এইডা কী? দেশগ্রামে সবাই কইছে বোমা।

নোয়াখাইল্যা তুই, তোর গেরেনেট বললেই চলবে।

তার পরও আস্থা রাখতে পারেননি কর্মকর্তারা। এ কারণে আরও এক মাস জজ মিয়াকে সিআইডি আটক করে রাখে। প্রতি রাতে তাকে পেটানো হতো। শুধু বুকের পাঁজর নয়, তার ডান হাতও ভেঙে যায়। সারা শরীরে এখনো জখমের চিহ্ন রয়েছে। এখনো পূর্ণিমা, অমাবস্যায় ব্যথায় চিৎকার করে জালাল আহমেদ। একদিন সিআইডি কর্মকর্তারা জজ মিয়াকে বলেন, তুই নিজে বাঁচ। পরিবারকে বাঁচা। আমাদেরও বাঁচা। আর কথা না শুনলে ক্রসফায়ার। কোনো রক্ষা নেই। আমাদের প্রস্তাবে রাজি? জজ মিয়া বলল, উত্তম প্রস্তাব। এরপর কি মাইরধইর করবেন? আদালতে যা বলব তা বললে নো মার ধর।  সিআইডির প্রস্তাব অনুযায়ী জজ মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তি দিল। স্বীকারোক্তির পর আদালতে বিচারকের কক্ষেই বিরানি এনে খাওয়ান সিআইডির কর্মকর্তারা।

অখ্যাত জালাল আহমেদ ওরফে জজ মিয়া অপরাধজগতে আলোচনায় চলে আসে। অনেক নাটক জমিয়েছিল সিআইডি। আসল খুনিরা চলে যায় আড়ালে। মিডিয়া জজ মিয়া নাটকের রগরগে কাহিনি প্রকাশ করে। রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নাটকের পাত্র হয়ে সামনে চলে আসে। জজ মিয়া আদালতে বলে রবিন, শফিক, বকুল, হাশেম, লিংকন, আনু, মুকুল, সুব্রত বাইন, জাহিদ, জয় ও মোল্লা মাসুদের নাম। জজ মিয়া জানতও না কাদের নাম বলেছে আদালতে। তারা কী করে তাও তার জানা ছিল না। এই জবানবন্দির পর সবার চাঁদার রেট বেড়ে যায়। কলকাতা থেকে ঢাকায় সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদের নামে ফোন আসতে থাকে ব্যবসায়ীদের কাছে। নিজের লোকদের জামিনের জন্য টাকা প্রয়োজন। এ টাকা না দিলে খবর আছে! এসব ফোনের অধিকাংশই ছিল প্রতারক চক্রের কাজ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সেসব নিয়ে মাথা -ব্যথা ছিল না। তারা নির্দেশ পেয়েছিল মূল ঘটনা আড়ালের। সে কাজটি করতে গিয়েই তারা অনেক কাহিনি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে জজ মিয়ার ঠাঁই হয় জেলখানায়। তবে সিআইডি জজ মিয়ার বাড়িতে পয়সা দিত। রুহুল আমীন, মুন্সী আতিকরা বেশি খারাপ ছিলেন না। তারা নাট্যকার হিসেবে দুর্বল ছিলেন। সন্দেহ শুরু হয় জজ মিয়া স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর সিআইডির কর্তকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে বিরানি খাওয়ার খবর প্রকাশ হয়ে পড়ায়। আর সেই খবর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একই পত্রিকায় একইভাবে প্রকাশিত হয়েছিল জজ মিয়ার পরিবারকে মাসে মাসে সিআইডির অর্থ প্রদানের খবরও। ওয়ান ইলেভেন সরকার আসল রহস্য বের করে দেয়। সামনে চলে আসে মাওলনা তাজউদ্দিন ও মুফতি হান্নানদের নাম। একই সঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও আরেকটির শীর্ষ কর্মকর্তার সরাসরি জড়িত থাকার খবর বেরিয়ে আসে। সারা দেশে তোলপাড় হয়ে যায়। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের আটকের জন্য সরকার এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। জজ মিয়াকে আটক করে সেই পুরস্কারের টাকা কে পেয়েছিল? শুনেছি পুলিশের লোকজনই ভাগ করে নিয়েছিল। আর পাঁচ বছর জেলে কাটায় জজ মিয়া। এই সময়ে পুলিশ দয়া করে তার মাকে প্রতি মাসে কিছু অর্থ দিত। সারা জীবন শুনেছি সাক্ষীকে আর্থিক সাহায্যের কথা। এই প্রথম শুনলাম আসামিকে অর্থ দেওয়ার কথা।

এ মামলায় শৈবাল সাহা নামে এক যুবককে জজ মিয়ার আগে আটক করা হয়। এই যুবক ভারতে পড়াশোনা করতেন। প্রথমে তাকে দিয়ে গল্প তৈরির চেষ্টা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাকে শেখানো হতো, বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা একুশে আগস্টে জড়িত। আর যুবকটি গোয়েন্দা এজেন্ট। কিন্তু সেই গল্প বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।

নিরীহ ছাত্র শৈবাল সাহাকে প্রশ্নকারী বলেছেন,

নাম কী?

শৈবাল সাহা।

তুমি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার হেড অফিসে কাজ কর?

-না স্যার, আমি ছাত্র। পড়াশোনা করি।

চলতে থাকে অত্যাচার-নির্যাতন।

তুমি কী কর?

স্যার, আপনারা যা যা বলে দেবেন তাই করি। শুধু একটু ধরায়ে দেবেন তাই বলব আদালতে।

ঠিক আছে। মনে থাকে যেন।

মনে থাকবে স্যার।

একুশে আগস্ট নিয়ে নাটকের শেষ ছিল না। চট্টগ্রামে ট্রাকে ট্রাকে অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে অনেক গল্প প্রচার করা হয়। হায়রে রিমান্ড!

 

দুই

এবার রিমান্ড নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাসের কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই। ক্রিমিনাল আয়না মজিদ সন্দেহে আটক হলেন হুমায়ূন আহমেদের নায়ক হিমু। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। পাঠকদের জন্য এই জিজ্ঞাসাবাদটুকু তুলে ধরছি-

‘নাম কী?

হিমু।

ভালো নাম?

হিমালয়।

হিমালয়ের আগে পিছে কিছু আছে? নাকি শুধুই হিমালয়?

স্যার, হিমালয় এমনই এক বস্তু যার আগে পিছে কিছু থাকে না।

প্রশ্নকর্তা চশমার ওপরের ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। চশমা পরা হয় চশমার ভিতর দিয়ে দেখার জন্য। যারা এ কাজটা চশমার ফাঁক দিয়ে দেখতে চান তাদের বিষয়ে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন আছে। আমি খানিকটা সাবধান হয়ে গেলাম। সাবধান হওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ড শব্দটা এত দিন পত্রপত্রিকায় পড়েছি। অমুক নেতা রিমান্ডে মুখ খুলেছেন। অমুক শিল্পপতি গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন ইত্যাদি। রিমান্ডে হালুয়া টাইট করে দেওয়া হয় এবং ব্রেন হালুয়া করে দেওয়া হয়। বিশেষ সেই অবস্থার শেষ পর্যায়ে আসামি যেসব অপরাধ সে করেনি তাও স্বীকার করে। উদাহরণ-

তুই মহাত্মা গান্ধীকে খুন করেছিস?

জি স্যার, করেছি।

উনাকে কীভাবে খুন করলি?

কীভাবে করেছি এখন মনে নেই। একটু যদি ধরায়ে দেন তাহলে বলতে পারব। তবে খুন যে করেছি ইহা সত্য।

গলা টিপে মেরেছিস?

এই তো মনে পড়েছে। জি স্যার, গলা টিপে মেরেছি।

উনার যে ছাগল ছিল সেটা কী করেছিস?

ছাগলের কথা মনে নেই স্যার, একটু ধরায়ে দেন। ধরায়ে দিলেই বলতে পারব।

ছাগলটা কেটেকুটে খেয়ে ফেলেছিস কিনা, বল।

অবশ্যই খেয়েছি স্যার। কচি ছাগলের মাংস অত্যন্ত উপাদেয়। এই বিষয়ে একটা ছড়াও আছে স্যার। বলব?

কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ

দধির অগ্র ঘোলের শেষ।

পাঁঠার জায়গায় হবে ছাগল। আমাকে যিনি প্রশ্ন করছেন তার চেহারা অমায়িক। প্রাইভেট কলেজের বাংলা স্যার-টাইপ চেহারা। তবে কাপড়চোপড় দামি। হাফশার্ট পরেছেন বলে হাতের ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। ঘড়িটা যথেষ্টই দামি, একশ-দেড়শ টাকার হংকং ঘড়ি না। ঘড়ি সবাই বাঁ হাতে পরে, উনি পরেছেন ডান হাতে- এই বিষয়টা বোঝা যাচ্ছে না। আমার জায়গায় মিসির আলি সাহেব থাকলে চট করে কারণ বের করে ফেলতেন। প্রশ্নকর্তা গায়ে সেন্ট মেখেছেন। মাঝে মাঝে সেন্টের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।’

 

তিন.

ওয়ান ইলেভেনের সময়কার রিমান্ড নিয়ে অনেক গল্প আছে। অনেক প্রভাবশালী প্রশ্নের আগেই অনেক কিছু বলেছেন তাদের নেতানেত্রীদের নামে। সেই রিমান্ডের কাহিনি ইউটিউবে এখনো আছে। অনেকেই ঘুষের খবরগুলো জিজ্ঞাসাবাদের আগেই বলেছেন। তখনকার পত্রিকাও সেসব খবর প্রকাশ করেছে। একজন রাজনীতিবিদ রিমান্ডের পরদিন পানির পিপাসায় ছটফট করছেন। এমন সময় সিপাহি গোছের একজনকে দেখে বললেন, স্যার পানি খাব। একটু পানি দিন স্যার। পাশে থাকা আরেকজন বললেন, আপনি কাকে স্যার ডাকছেন! তিনি তো অফিসার নন। অফিসাররা আসেন রাতে। জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে যান। দিনে কাজ করেন সিপাহিরা। সিপাহিদের স্যার ডাকছেন কেন? অফিসাররা তো জিজ্ঞাসাবাদের সময় এমনিতেই স্যার ডাকেন। আবার তারাও স্যার ডাকেন। স্যার ডেকেই টর্চার করেন। তারা যা করেন তাকে বলা হয় প্রটোকল। জবাবে সেই ভদ্রলোক বললেন, স্যার না, বাপ ডাকো এখন। এখন যে অবস্থায় আছি সিপাহি হোক যেই হোক সবাই আমার স্যার। আর স্যার ডেকে দিন পার করতে পারলে বাঁচি।

 

চার.

আমি বরগুনার রিমান্ড নিয়ে কিছু বলতে চাই না। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলতে চাই না। সাক্ষীকে আসামি করার জন্য প্রথমে ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ, তারপর রিমান্ড, আইনজীবীকে আদালতে দাঁড়াতে না দেওয়া, ঢাকার ক্রাইম রিপোর্টারদের কাছে অতীতের স্টাইলে ধরনা দিয়ে গল্প লেখার অনুরোধ জানানো হিন্দি সিনেমাকেও হার মানায়। আমাদের পুলিশ গল্প বানাতে পছন্দ করে। গল্প তৈরির সময় তারা অনেক কিছু কল্পনা করে। হিন্দি সিনেমাকেও হার মানাতে চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার স্ক্রিপ্টও হয় না। দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর সঙ্গে বৈঠক করলে তারা আরও ভালো কিছু পেতেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের রিমান্ড আর জজ মিয়ার রিমান্ড প্রায় একই রকম। উপন্যাস পড়ে তারা সেই রিমান্ডের কাহিনি তৈরি করেছেন কিনা জানি না। তবে মানুষের কাছে কাল্পনিক বিষয় বেশিদিন বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।  কোনো কিছু বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে বাস্তবতায় থাকতে হবে। সমস্যা হলো, ক্ষমতায় থাকার সময় কেউই বাস্তবতায় থাকতে চান না। এসপি রুহুল আমীন, মুন্সী আতিক, রশিদও ছিলেন না। সেই সময়কার শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও বাস্তবতায় ছিলেন না। সেই না থাকার খেসারত এখন তাদের দিতে হচ্ছে। প্রভাবশালীদের বাঁচানোর জন্য তারা একটি গল্প তৈরি করেছিলেন। সেই গল্প বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেই একাধিক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়ে যায়। আর ওয়ান ইলেভেনের সময় বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। এখনো অনেক কিছু ঘটছে আমাদের চারপাশে যার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এই গল্পকারদের মনে রাখা দরকার, এই দিন দিন না, আরও দিন আছে/এই দিন নিয়ে যাবে সেই দিনেরই কাছে। বাংলাদেশের মানুষকে বোকা মনে করার কারণ নেই। মহলবিশেষের স্বার্থ রক্ষা করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হতে পারে না। আপনার আজকের ভুল আগামী দিনে আপনার জন্যই সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কবি নজরুল বলেছেন, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’ আপনারও এই দিন আগামীতে সমান নাও যেতে পারে। শুভাকাক্সক্ষীর মতো পরামর্শ দিচ্ছি- এই যুগে গল্প তৈরি করে প্রচার করবেন না।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই তাই শেখ হাসিনার কাছে বিচার দিলেন সুমন

» সাহস থাকলে প্রমাণ নিয়ে সামনে বসুন: ইলিয়াস কাঞ্চন

» দূষিত রক্ত মুক্ত করে আওয়ামী লীগে বিশুদ্ধ রক্ত সঞ্চালন করা হবে: ওবায়দুল কাদের

» রাজধানীর বনানী থেকে মাটিচাপা অবস্থায় চীনা নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার

» স্ত্রী-শ্যালিকাকে এক সঙ্গে বিয়ে করলেন যুবক!

» ঝিনাইদহে ফেনসিডিলসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক

» খালেদা জিয়া কারাগারে ভালোভাবেই আছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

» পদ্মার ইলিশ কিনলেই এক কেজি পেঁয়াজ ফ্রি

» দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ : মির্জা ফখরুল

» পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

বিশেষ প্রতিনিধি:মাকসুদা লিসা

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

রিমান্ড রিমান্ড খেলা

নঈম নিজাম:

নাম কী?

জজ মিয়া।

ভালো নাম?

জালাল আহমেদ।

আগে পিছে কিছু আছে, না শুধুই জালাল আহমেদ?

স্যার, জজ মিয়া বলতে পারেন। জজ মিয়া নামেই বাবা ডাকতেন। পরে এলাকার মানুষও জজ মিয়া নামে ডাকে।

তোমার এত কথা বলার দরকার নেই। কী নামে ডাকতে হবে আমরা জানি। সময়মতো টের পাইবা। আমার নাম মুন্সী আতিক। এ নাম শুনলে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে। পাশে বসা স্যারের নাম রুহুল আমীন। তিনি এসপি রুহুল আমীন। আর তোরে ধরে এনেছেন যিনি তিনি এসপি রশিদ। শালা, আগামী কিছুদিনের মধ্যে টের পাবি দুনিয়াদারি। ক্রসফায়ার রেডি। জজ মিয়া নীরব। নিরীহ এই গরিব শ্রমজীবী জানে না তাকে কেন আটক করে আনা হয়েছে। তাই নীরবতাই তার কাছে এখন নিরাপদ। কথা বললেই মারধর শুরু হয়। এই কয় দিনে জজ মিয়া অনেক কিছু বুঝতে পেরেছে। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দিন জজ মিয়া ছিলেন নোয়াখালীর সেনবাগের বীরকোট গ্রামের বাড়িতে। সন্ধ্যায় স্থানীয় বাবুলের দোকানে চা খেতে খেতে জজ মিয়া শোনেন ঢাকায় বিরোধীদলীয় নেতাকে হত্যা করতে বোমা হামলা হয়েছে। এ হামলা নিয়ে গ্রামের মানুষ অনেক আলোচনা করে। জজ মিয়া আলোচনা শোনে। নিজেও অংশ নেয়। পরে চলে যায় বাড়িতে। কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে আসে। কাজকর্ম শুরু করে। মাঝে মাঝে বাড়িতেও যায়। এ ঘটনার ছয় মাস পর একদিন জজ মিয়া গ্রামে অবস্থানকালে গ্রাম চৌকিদার আসে তার কাছে। তারপর জানায়, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দারোগা আসছে গ্রামে। দারোগা এসে থানায় নিয়ে গেলেন জজ মিয়াকে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন সিআইডির কর্মকর্তা আবদুর রশিদ। জজ মিয়া কিছুই বুঝতে পারে না। একপর্যায়ে সিআইডি টিম লকআপে প্রবেশ করে। তারপর থানার লকআপের ভিতর তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এতে ভেঙে যায় তার পাঁজরের হাড়। তারপর আনা হয় ঢাকায়। সিআইডি অফিসে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। আর সেইসঙ্গে মারধর। রিমান্ডে জজ মিয়ার সঙ্গে কথোপকথনেও ছিল অনেক নাটকীয়তা।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় সিআইডি কর্মকর্তারা প্রশ্ন করেন, এই হামলার নেতৃত্ব কে দিয়েছে?

-স্যার, আমি কিছু জানি না।

জানিস না মানে? ভুলে গেলি গত কয়েক রাতের কথা।

-স্যার, শিখিয়ে দেন, একটু ধরাইয়া দিলে জানব।

সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন, মুকুলদের সঙ্গে কত দিন ধরে কাজ করিস? ওরা কি তোর সাগরেদ? কীভাবে ভারত গেল ওরা?

-স্যার, আমি ফল বেচতাম। ওরাও ফল বেচত। সেভাবে সম্পর্ক। তা ছাড়া আরও দুই-একটা এমন ব্যবসা করেছি একসঙ্গে।

হারামজাদা! ওরা ফল বেচবে কেন? ওরা শীর্ষ সন্ত্রাসী।

-কী বলব স্যার, ধরায়ে দেন। তাহলে সেভাবেই বলব।

ওরা সবাই তোর গ্রুপে ছিল। সবাই সন্ত্রাসী গ্রুপ। তুই এই গ্রুপের মেইন সমন্বয়কারী। সবাই মিলেই একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করেছিস শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে।

-জি স্যার, আমরা সবাই শীর্ষ সন্ত্রাসী। আমরা বোমা মারি। আমার পরিবারের অন্যরাও এই কাজ করে খায়। আমরা সবাই এই কাজ করি।

গুড, ভালো। তোকে দিয়ে হবে। বোমা না, বলবি গ্রেনেড।

-জি স্যার, গেরেনেট। এইডা কী? দেশগ্রামে সবাই কইছে বোমা।

নোয়াখাইল্যা তুই, তোর গেরেনেট বললেই চলবে।

তার পরও আস্থা রাখতে পারেননি কর্মকর্তারা। এ কারণে আরও এক মাস জজ মিয়াকে সিআইডি আটক করে রাখে। প্রতি রাতে তাকে পেটানো হতো। শুধু বুকের পাঁজর নয়, তার ডান হাতও ভেঙে যায়। সারা শরীরে এখনো জখমের চিহ্ন রয়েছে। এখনো পূর্ণিমা, অমাবস্যায় ব্যথায় চিৎকার করে জালাল আহমেদ। একদিন সিআইডি কর্মকর্তারা জজ মিয়াকে বলেন, তুই নিজে বাঁচ। পরিবারকে বাঁচা। আমাদেরও বাঁচা। আর কথা না শুনলে ক্রসফায়ার। কোনো রক্ষা নেই। আমাদের প্রস্তাবে রাজি? জজ মিয়া বলল, উত্তম প্রস্তাব। এরপর কি মাইরধইর করবেন? আদালতে যা বলব তা বললে নো মার ধর।  সিআইডির প্রস্তাব অনুযায়ী জজ মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তি দিল। স্বীকারোক্তির পর আদালতে বিচারকের কক্ষেই বিরানি এনে খাওয়ান সিআইডির কর্মকর্তারা।

অখ্যাত জালাল আহমেদ ওরফে জজ মিয়া অপরাধজগতে আলোচনায় চলে আসে। অনেক নাটক জমিয়েছিল সিআইডি। আসল খুনিরা চলে যায় আড়ালে। মিডিয়া জজ মিয়া নাটকের রগরগে কাহিনি প্রকাশ করে। রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নাটকের পাত্র হয়ে সামনে চলে আসে। জজ মিয়া আদালতে বলে রবিন, শফিক, বকুল, হাশেম, লিংকন, আনু, মুকুল, সুব্রত বাইন, জাহিদ, জয় ও মোল্লা মাসুদের নাম। জজ মিয়া জানতও না কাদের নাম বলেছে আদালতে। তারা কী করে তাও তার জানা ছিল না। এই জবানবন্দির পর সবার চাঁদার রেট বেড়ে যায়। কলকাতা থেকে ঢাকায় সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদের নামে ফোন আসতে থাকে ব্যবসায়ীদের কাছে। নিজের লোকদের জামিনের জন্য টাকা প্রয়োজন। এ টাকা না দিলে খবর আছে! এসব ফোনের অধিকাংশই ছিল প্রতারক চক্রের কাজ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সেসব নিয়ে মাথা -ব্যথা ছিল না। তারা নির্দেশ পেয়েছিল মূল ঘটনা আড়ালের। সে কাজটি করতে গিয়েই তারা অনেক কাহিনি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে জজ মিয়ার ঠাঁই হয় জেলখানায়। তবে সিআইডি জজ মিয়ার বাড়িতে পয়সা দিত। রুহুল আমীন, মুন্সী আতিকরা বেশি খারাপ ছিলেন না। তারা নাট্যকার হিসেবে দুর্বল ছিলেন। সন্দেহ শুরু হয় জজ মিয়া স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর সিআইডির কর্তকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে বিরানি খাওয়ার খবর প্রকাশ হয়ে পড়ায়। আর সেই খবর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একই পত্রিকায় একইভাবে প্রকাশিত হয়েছিল জজ মিয়ার পরিবারকে মাসে মাসে সিআইডির অর্থ প্রদানের খবরও। ওয়ান ইলেভেন সরকার আসল রহস্য বের করে দেয়। সামনে চলে আসে মাওলনা তাজউদ্দিন ও মুফতি হান্নানদের নাম। একই সঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও আরেকটির শীর্ষ কর্মকর্তার সরাসরি জড়িত থাকার খবর বেরিয়ে আসে। সারা দেশে তোলপাড় হয়ে যায়। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের আটকের জন্য সরকার এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। জজ মিয়াকে আটক করে সেই পুরস্কারের টাকা কে পেয়েছিল? শুনেছি পুলিশের লোকজনই ভাগ করে নিয়েছিল। আর পাঁচ বছর জেলে কাটায় জজ মিয়া। এই সময়ে পুলিশ দয়া করে তার মাকে প্রতি মাসে কিছু অর্থ দিত। সারা জীবন শুনেছি সাক্ষীকে আর্থিক সাহায্যের কথা। এই প্রথম শুনলাম আসামিকে অর্থ দেওয়ার কথা।

এ মামলায় শৈবাল সাহা নামে এক যুবককে জজ মিয়ার আগে আটক করা হয়। এই যুবক ভারতে পড়াশোনা করতেন। প্রথমে তাকে দিয়ে গল্প তৈরির চেষ্টা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাকে শেখানো হতো, বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা একুশে আগস্টে জড়িত। আর যুবকটি গোয়েন্দা এজেন্ট। কিন্তু সেই গল্প বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।

নিরীহ ছাত্র শৈবাল সাহাকে প্রশ্নকারী বলেছেন,

নাম কী?

শৈবাল সাহা।

তুমি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার হেড অফিসে কাজ কর?

-না স্যার, আমি ছাত্র। পড়াশোনা করি।

চলতে থাকে অত্যাচার-নির্যাতন।

তুমি কী কর?

স্যার, আপনারা যা যা বলে দেবেন তাই করি। শুধু একটু ধরায়ে দেবেন তাই বলব আদালতে।

ঠিক আছে। মনে থাকে যেন।

মনে থাকবে স্যার।

একুশে আগস্ট নিয়ে নাটকের শেষ ছিল না। চট্টগ্রামে ট্রাকে ট্রাকে অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে অনেক গল্প প্রচার করা হয়। হায়রে রিমান্ড!

 

দুই

এবার রিমান্ড নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাসের কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই। ক্রিমিনাল আয়না মজিদ সন্দেহে আটক হলেন হুমায়ূন আহমেদের নায়ক হিমু। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। পাঠকদের জন্য এই জিজ্ঞাসাবাদটুকু তুলে ধরছি-

‘নাম কী?

হিমু।

ভালো নাম?

হিমালয়।

হিমালয়ের আগে পিছে কিছু আছে? নাকি শুধুই হিমালয়?

স্যার, হিমালয় এমনই এক বস্তু যার আগে পিছে কিছু থাকে না।

প্রশ্নকর্তা চশমার ওপরের ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। চশমা পরা হয় চশমার ভিতর দিয়ে দেখার জন্য। যারা এ কাজটা চশমার ফাঁক দিয়ে দেখতে চান তাদের বিষয়ে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন আছে। আমি খানিকটা সাবধান হয়ে গেলাম। সাবধান হওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ড শব্দটা এত দিন পত্রপত্রিকায় পড়েছি। অমুক নেতা রিমান্ডে মুখ খুলেছেন। অমুক শিল্পপতি গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন ইত্যাদি। রিমান্ডে হালুয়া টাইট করে দেওয়া হয় এবং ব্রেন হালুয়া করে দেওয়া হয়। বিশেষ সেই অবস্থার শেষ পর্যায়ে আসামি যেসব অপরাধ সে করেনি তাও স্বীকার করে। উদাহরণ-

তুই মহাত্মা গান্ধীকে খুন করেছিস?

জি স্যার, করেছি।

উনাকে কীভাবে খুন করলি?

কীভাবে করেছি এখন মনে নেই। একটু যদি ধরায়ে দেন তাহলে বলতে পারব। তবে খুন যে করেছি ইহা সত্য।

গলা টিপে মেরেছিস?

এই তো মনে পড়েছে। জি স্যার, গলা টিপে মেরেছি।

উনার যে ছাগল ছিল সেটা কী করেছিস?

ছাগলের কথা মনে নেই স্যার, একটু ধরায়ে দেন। ধরায়ে দিলেই বলতে পারব।

ছাগলটা কেটেকুটে খেয়ে ফেলেছিস কিনা, বল।

অবশ্যই খেয়েছি স্যার। কচি ছাগলের মাংস অত্যন্ত উপাদেয়। এই বিষয়ে একটা ছড়াও আছে স্যার। বলব?

কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ

দধির অগ্র ঘোলের শেষ।

পাঁঠার জায়গায় হবে ছাগল। আমাকে যিনি প্রশ্ন করছেন তার চেহারা অমায়িক। প্রাইভেট কলেজের বাংলা স্যার-টাইপ চেহারা। তবে কাপড়চোপড় দামি। হাফশার্ট পরেছেন বলে হাতের ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। ঘড়িটা যথেষ্টই দামি, একশ-দেড়শ টাকার হংকং ঘড়ি না। ঘড়ি সবাই বাঁ হাতে পরে, উনি পরেছেন ডান হাতে- এই বিষয়টা বোঝা যাচ্ছে না। আমার জায়গায় মিসির আলি সাহেব থাকলে চট করে কারণ বের করে ফেলতেন। প্রশ্নকর্তা গায়ে সেন্ট মেখেছেন। মাঝে মাঝে সেন্টের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।’

 

তিন.

ওয়ান ইলেভেনের সময়কার রিমান্ড নিয়ে অনেক গল্প আছে। অনেক প্রভাবশালী প্রশ্নের আগেই অনেক কিছু বলেছেন তাদের নেতানেত্রীদের নামে। সেই রিমান্ডের কাহিনি ইউটিউবে এখনো আছে। অনেকেই ঘুষের খবরগুলো জিজ্ঞাসাবাদের আগেই বলেছেন। তখনকার পত্রিকাও সেসব খবর প্রকাশ করেছে। একজন রাজনীতিবিদ রিমান্ডের পরদিন পানির পিপাসায় ছটফট করছেন। এমন সময় সিপাহি গোছের একজনকে দেখে বললেন, স্যার পানি খাব। একটু পানি দিন স্যার। পাশে থাকা আরেকজন বললেন, আপনি কাকে স্যার ডাকছেন! তিনি তো অফিসার নন। অফিসাররা আসেন রাতে। জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে যান। দিনে কাজ করেন সিপাহিরা। সিপাহিদের স্যার ডাকছেন কেন? অফিসাররা তো জিজ্ঞাসাবাদের সময় এমনিতেই স্যার ডাকেন। আবার তারাও স্যার ডাকেন। স্যার ডেকেই টর্চার করেন। তারা যা করেন তাকে বলা হয় প্রটোকল। জবাবে সেই ভদ্রলোক বললেন, স্যার না, বাপ ডাকো এখন। এখন যে অবস্থায় আছি সিপাহি হোক যেই হোক সবাই আমার স্যার। আর স্যার ডেকে দিন পার করতে পারলে বাঁচি।

 

চার.

আমি বরগুনার রিমান্ড নিয়ে কিছু বলতে চাই না। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলতে চাই না। সাক্ষীকে আসামি করার জন্য প্রথমে ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ, তারপর রিমান্ড, আইনজীবীকে আদালতে দাঁড়াতে না দেওয়া, ঢাকার ক্রাইম রিপোর্টারদের কাছে অতীতের স্টাইলে ধরনা দিয়ে গল্প লেখার অনুরোধ জানানো হিন্দি সিনেমাকেও হার মানায়। আমাদের পুলিশ গল্প বানাতে পছন্দ করে। গল্প তৈরির সময় তারা অনেক কিছু কল্পনা করে। হিন্দি সিনেমাকেও হার মানাতে চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার স্ক্রিপ্টও হয় না। দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর সঙ্গে বৈঠক করলে তারা আরও ভালো কিছু পেতেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের রিমান্ড আর জজ মিয়ার রিমান্ড প্রায় একই রকম। উপন্যাস পড়ে তারা সেই রিমান্ডের কাহিনি তৈরি করেছেন কিনা জানি না। তবে মানুষের কাছে কাল্পনিক বিষয় বেশিদিন বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।  কোনো কিছু বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে বাস্তবতায় থাকতে হবে। সমস্যা হলো, ক্ষমতায় থাকার সময় কেউই বাস্তবতায় থাকতে চান না। এসপি রুহুল আমীন, মুন্সী আতিক, রশিদও ছিলেন না। সেই সময়কার শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও বাস্তবতায় ছিলেন না। সেই না থাকার খেসারত এখন তাদের দিতে হচ্ছে। প্রভাবশালীদের বাঁচানোর জন্য তারা একটি গল্প তৈরি করেছিলেন। সেই গল্প বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেই একাধিক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়ে যায়। আর ওয়ান ইলেভেনের সময় বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। এখনো অনেক কিছু ঘটছে আমাদের চারপাশে যার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এই গল্পকারদের মনে রাখা দরকার, এই দিন দিন না, আরও দিন আছে/এই দিন নিয়ে যাবে সেই দিনেরই কাছে। বাংলাদেশের মানুষকে বোকা মনে করার কারণ নেই। মহলবিশেষের স্বার্থ রক্ষা করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হতে পারে না। আপনার আজকের ভুল আগামী দিনে আপনার জন্যই সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কবি নজরুল বলেছেন, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’ আপনারও এই দিন আগামীতে সমান নাও যেতে পারে। শুভাকাক্সক্ষীর মতো পরামর্শ দিচ্ছি- এই যুগে গল্প তৈরি করে প্রচার করবেন না।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

বিশেষ প্রতিনিধি:মাকসুদা লিসা

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com