রাজনৈতিক কৌশলে গুল, গুঞ্জন ও গুজবের মতো বদঅভ্যাসে লিপ্ত মানুষ

নজরুল ইসলাম তোফা:: বর্তমানে বাংলাদেশে খুবই হৈচৈ বা মাতামাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুজব। এই গুজব আসলেই আভিধানিক অর্থ হলো- রটনা, ভুল বা অসঙ্গত তথ্য প্রচার। এমন ”ভুল বা অসঙ্গত তথ্য” নিয়ে প্রতারণার উদ্দেশ্যেই যেন কিছু মানুষ তা ছড়ানোর মতো বদঅভ্যাসে লিপ্ত। আবার মনে করা যেতে পারে, রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে শক্তিশালী হাতিয়ার এই ‘গুজব’। ইতিহাসের আলোকেই বলতে হয়, গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসাবে ব্যবহার করেছে দলিও জণগন ও রাজনীতিবিদরা। এ ক্ষেত্রে প্রতি পক্ষ সম্পর্কে- ইতিবাজক গুজব এর পরিবর্তেই নেতিবাচক গুজব সর্বদা অধিক কার্যকর হতেও দেখা গেছে। জনরব বা মুখেমুখে রটে-যাওয়া কথা কিংবা ভিত্তিহীন প্রচার এবং মিথ্যা রটনা এমন রকম বহু প্রতিশব্দ ব্যবহার করেই যেন কুচক্রী মহল ফায়দা লুটছে। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায়, ‘গুজব’ হলো, এমন কোন বিবৃতি- যার সত্যতা ‘অল্প সময়ের মধ্যে’ অথবা কখনই তা নিশ্চত করাও সম্ভব হয় না। অনেক পন্ডিতের মতে, গুজব হল প্রচারণার একটি উপসেট মাত্র। ‘অক্সফোর্ড’ ডিক্শনারীতে দেখা যায় Rumour শব্দ। এতে বলছে- Report of doubtful accuracy. এ গুলো গুজবের মানে হতে পারে কিন্তু তার সংজ্ঞা বলা যায় না। আসলেই “সংজ্ঞা” ভাবতে গিয়ে সংজ্ঞাহীন হবার যোগাড়। সুতরাং মিথ্যে রটনা বলতেই পারি।

গুজব ৩ অক্ষরের আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ এই শব্দটি কখনো কখনো ভীষণ অপ্রতিরোধ্য। এমন গুজবের গতিবেগ আলোর গতির চাইতেও দ্রুত। তাই প্রখ্যাত মার্কিন কথা সাহিত্যিক- মার্ক টোয়েনের ভাষ্য মতেই বলতে হয়, ‘সত্য তার জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতেই গুজব বা মিথ্যা সমস্ত পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আসতে সক্ষম।’ গুজব অতীতেও হয়েছে এখনও হচ্ছে, তবে তার রূপরেখা আলাদা। অতীতে ‘সাধারণ মানুষ’ যে সব গুজব রটাতো সরল বিশ্বাসেই রটাতো কখনোই ভয়ঙ্কর ছিলনা। ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তি যুগে হয়েছে তা তীব্র ভয়ঙ্কর। বর্তমান সময় তাকে কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি তাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থানকেই ভিন্ন ভাবে উপাস্থপনের জন্য গুজবের আশ্রয় নিচ্ছে। নিশ্চিত ভাবেই গুজবকে মোকাবেলা করতে হবে। কেন না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই গুলো ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সবসময়ে শুনবেন লোকে বলে- গুজবে কান দেবেন না। কান দেবো না তো কি দেবো, নাক দেবো? ‘গুজব’ তো এমন যুগের অনেকের কাছে- Main Job হয়েছে। গুল, গুঞ্জন ও গুজব এই তিন বস্তু বা শব্দ ছাড়া সাধারন লোকেরা কিংবা বিশেষ করে স্ত্রীলোক বাঁচতেই পারে না। গুল থেকে গুঞ্জন আর গুঞ্জন থেকেই গুজব।

তথ্যসূত্র মতেই বলতে হয়, গুজবের কবলে জড়িয়ে পড়ছে এই বাংলাদেশ তার অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একটি মহল আন্দোলনের নামে সকল শিক্ষার্থীদের লেলিয়ে দিয়ে ছিল “গুজব” নামক নগ্ন খেলায়। সকলের জানা বিষয় ছোট ছোট বাচ্চাদের কাঁধে ভর করেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছিল- প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া “রাজনৈতিক বেশ কিছু দল”। তখন তাদের স্লোগান হয়েছিল উই ওয়ান্ট জাস্টিস-কে কলঙ্কিত করে। এই স্লোগানের আড়ালেই তাদের মুল ইস্যু হয়ে যায় ‘উই ওয়ান্ট গভর্মেন্ট ফল’। তারা একের পর এক ‘মিথ্যা লাশের খবর’ ভিডিও করেই সামাজিক সব যোগাযোগ মাধ্যম- ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কয়েকটি মেয়েকে তারা ব্যবহার করে এ প্ল্যান বাস্তবায়নও করেছিল। সে মেয়েগুলো কান্নাকাটি করে এমন ভঙ্গিতে ভিডিওগুলোতে কথা বলেছিল যেনো তারা নিজের চোখেই দেখে আসছে লাশ আর ধর্ষিতদের। ভারতের কয়েকটি লাশ এবং ধর্ষিতদের ছবি এডিট করে সেইগুলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ছবি বলে গুজব ছড়িয়ে ছিল। সুতরাং- সে সময়ে সেই ঘটনা অধিকাংশ মানুষ এ গুজবটাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিল। সবার জানা তখনি সেই আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করেছিল। তার পরেই আনেদালনরত শিক্ষার্থী’রা তাদের সহপাঠীর “মৃত্যুর গুজব” যাচাই বাছাই না করেই যেন আবেগে হামলা করতে চলেও গিয়ে ছিল সেই ধানমন্ডি ঝিগা তলায় অবস্থিত আওয়ামীলীগের দলীয় সভানেত্রীর নিজস্ব কার্যালয়ে। ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিয়েই হামলা করেছিল নেতা কর্মী বা দলীয় কার্যালয়ে। এই দিকে পুলিশ- দলীয় কার্যালয়ে থাকলেও তারা তখন ছিল নির্বিকার। কারণ- নির্দেশনা ছিল, সেই শিক্ষার্থীদের আঘাত করা যাবে না। তাই তারা চুপ করে ছিল। সে দিন সেখানে নেতা, কর্মী থাকায় শিক্ষার্থীদের হামলা বা গুজবের হামলা সর্বোচ্চ সহনশীলতার মনোভাবে প্রতিরোধ করেছিল।

জানা দরকার সে শিক্ষার্থীরা শরীরে সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ করে মিথ্যা আহত হওয়ার ‘ছবি বা ভিডিও’ ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিছু শিক্ষার্থীর ব্যাগে-চাপাতি, ইটের টুকরা এবং পাথর পাওয়া গিয়েছিল। দোকানে দোকানে- সাদা শার্ট বানানোর হিড়িক, রক্ত মেখে রাস্তায় শুয়ে থাকা, ভুয়া আইডি কার্ড ছাপিয়ে গলায় ঝুলিয়ে এই আন্দোলনে অনেকে আগ্রাসী ও উগ্রবাদী আচরণ করতে প্রস্তুত হয়েছিল। এই মিথ্যা-গুজবটা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও চলে গিয়ে ছিল এবং তারা সেই গুজব বিশ্বাস করে ছিল।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো শিক্ষিত মানুষরা এমন এ গুজবে কমবেশি হলেও কান দিয়েছিল। কিন্তু কেউ তখন লাশের সন্ধান দিতেও পারেনি কিংবা যে কেউ ধর্ষিত হওয়ার প্রমাণ দিতে পারেনি, কেউ চোখ তুলে নেয়ার প্রমাণ পায়নি। কারও পরিবার আসেনি সেই দিন অভিযোগ নিয়ে তাদের সন্তান নিখোঁজ হয়েছে। থানায় কোন ব্যক্তি ডায়েরি করেনি- আহত বা নিহত হওয়ার ব্যাপারে। তাহলে শুধু শুধু কেনই এই গুজব ছড়িয়ে মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করবার অপচেষ্টা করেছিল। আমাদের আসলে বুঝতে হবে, অতীতের গুজব আর বর্তমানের গুজব গুলো এক নয়। এখন অতীতের চেয়ে দিনেদিনেই তা যেন বিভিন্ন ধারাতেই রুপ দিয়ে ভয়াবহ গুজবে দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন গুজব অহরহ চোখে পড়ে। যেমন- ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা লাগবে’। অবশ্য ফেসবুকের আগে প্রথম ‘ইউটিউবে’ ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমেই এমন গুজব ছড়ানো হয়। এর জেরে আবার- ছেলেধরা সন্দেহে এ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮ জনকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই গুজবের জেরে প্রায় প্রতি দিনই নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। সুতরাং- এই
গুজব ছড়ানো কিংবা গণপিটুনি নিয়ে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেই সব মানুষকে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকেই গ্রেফতার করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে বলতেই হয়, ক’জন গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকেই যেন তারা জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে। গুজব সৃষ্টিকারী এ দেশের উন্নয়ন কর্ম কাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা সহ অস্থিরতা সৃষ্টির জন্যেই পরিকল্পিত ভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। এর পেছনে হোতাদের চিহ্নিত করার জন্য পুলিশের সাইবার বিভাগগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও যাচ্ছে। এরমধ্যে দুবাইয়ে একজন মাস্টার মাইন্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলতেই হয়, ভাইরাসের মতো এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। এতে করে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। প্রিয় সন্তানটি ছেলেধরার খপ্পরে পড়তে পারে- অনেকে সন্ত্রস্ত এই কারণে; কেউ সন্ত্রস্ত ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ভয়ে। এগুজবকে কাজে লাগিয়েই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ব্যক্তিগত শত্রুদের টার্গেট করতেও পারে- এমন আশঙ্কা হিসাবে রাখা উচিত। অনেকের ধারণা, সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে ও সেটিকে ব্যবহার করে এবং মানুষের অন্ধ বিশ্বাস কিংবা এই কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে এ দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টাটা অস্বাভাবিক হবে না। তাই কোনো মহল পরিকল্পিতভাবেই গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যেন কঠিন আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। পুলিশদের ভাষ্য মতে, আবার যারা “গুজব” বিশ্বাসী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে তারা ফৌজদারি অপরাধে জড়াচ্ছে। সুতরাং, তাদের বিরুদ্ধে যেন কঠোর ব্যবস্থা নিতে চান আইন -শৃঙ্খলা বাহিনী বা বর্তমান সরকার। কোথাও গুজব ছড়ানো সন্দেহজনক হলে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশ বাহিনীকেই জানানো দরকার। গুজবে অপরাধকারী সন্দেহ হলে গণপিটুনিতে হত্যা করার আইনটা হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কাউকে দেননি সরকার।

লেখক:
নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক’।

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ট্রাফিক আইন অমান্যে ২৪ ঘণ্টায় ৫,০১৫ মামলা

» শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রেপ্তার

» প্রতিপক্ষ যুবকের রগ কেটে এবার নিজের হাত-পায়ের রগ হারালেন উসমান

» জঙ্গিবাদের মটিভেটররা ইন্টারনেটে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিচ্ছে : মনিরুল ইসলাম

» এবার পরিণীতির পালা?

» চিলিতে বিক্ষোভ : জরুরি

» ফরিদপুরে ঘুমন্ত ছেলেকে তুলে নিয়ে খুন বাবার!

» ‘বাংলাদেশকে শতবার সহায়তা করবো’

» রাজীবের হাত ধরে শপিং মলে মেহজাবিন, ভিডিও ভাইরাল

» সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ৬ রোহিঙ্গা আটক

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

রাজনৈতিক কৌশলে গুল, গুঞ্জন ও গুজবের মতো বদঅভ্যাসে লিপ্ত মানুষ

নজরুল ইসলাম তোফা:: বর্তমানে বাংলাদেশে খুবই হৈচৈ বা মাতামাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুজব। এই গুজব আসলেই আভিধানিক অর্থ হলো- রটনা, ভুল বা অসঙ্গত তথ্য প্রচার। এমন ”ভুল বা অসঙ্গত তথ্য” নিয়ে প্রতারণার উদ্দেশ্যেই যেন কিছু মানুষ তা ছড়ানোর মতো বদঅভ্যাসে লিপ্ত। আবার মনে করা যেতে পারে, রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে শক্তিশালী হাতিয়ার এই ‘গুজব’। ইতিহাসের আলোকেই বলতে হয়, গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসাবে ব্যবহার করেছে দলিও জণগন ও রাজনীতিবিদরা। এ ক্ষেত্রে প্রতি পক্ষ সম্পর্কে- ইতিবাজক গুজব এর পরিবর্তেই নেতিবাচক গুজব সর্বদা অধিক কার্যকর হতেও দেখা গেছে। জনরব বা মুখেমুখে রটে-যাওয়া কথা কিংবা ভিত্তিহীন প্রচার এবং মিথ্যা রটনা এমন রকম বহু প্রতিশব্দ ব্যবহার করেই যেন কুচক্রী মহল ফায়দা লুটছে। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায়, ‘গুজব’ হলো, এমন কোন বিবৃতি- যার সত্যতা ‘অল্প সময়ের মধ্যে’ অথবা কখনই তা নিশ্চত করাও সম্ভব হয় না। অনেক পন্ডিতের মতে, গুজব হল প্রচারণার একটি উপসেট মাত্র। ‘অক্সফোর্ড’ ডিক্শনারীতে দেখা যায় Rumour শব্দ। এতে বলছে- Report of doubtful accuracy. এ গুলো গুজবের মানে হতে পারে কিন্তু তার সংজ্ঞা বলা যায় না। আসলেই “সংজ্ঞা” ভাবতে গিয়ে সংজ্ঞাহীন হবার যোগাড়। সুতরাং মিথ্যে রটনা বলতেই পারি।

গুজব ৩ অক্ষরের আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ এই শব্দটি কখনো কখনো ভীষণ অপ্রতিরোধ্য। এমন গুজবের গতিবেগ আলোর গতির চাইতেও দ্রুত। তাই প্রখ্যাত মার্কিন কথা সাহিত্যিক- মার্ক টোয়েনের ভাষ্য মতেই বলতে হয়, ‘সত্য তার জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতেই গুজব বা মিথ্যা সমস্ত পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আসতে সক্ষম।’ গুজব অতীতেও হয়েছে এখনও হচ্ছে, তবে তার রূপরেখা আলাদা। অতীতে ‘সাধারণ মানুষ’ যে সব গুজব রটাতো সরল বিশ্বাসেই রটাতো কখনোই ভয়ঙ্কর ছিলনা। ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তি যুগে হয়েছে তা তীব্র ভয়ঙ্কর। বর্তমান সময় তাকে কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি তাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থানকেই ভিন্ন ভাবে উপাস্থপনের জন্য গুজবের আশ্রয় নিচ্ছে। নিশ্চিত ভাবেই গুজবকে মোকাবেলা করতে হবে। কেন না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই গুলো ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সবসময়ে শুনবেন লোকে বলে- গুজবে কান দেবেন না। কান দেবো না তো কি দেবো, নাক দেবো? ‘গুজব’ তো এমন যুগের অনেকের কাছে- Main Job হয়েছে। গুল, গুঞ্জন ও গুজব এই তিন বস্তু বা শব্দ ছাড়া সাধারন লোকেরা কিংবা বিশেষ করে স্ত্রীলোক বাঁচতেই পারে না। গুল থেকে গুঞ্জন আর গুঞ্জন থেকেই গুজব।

তথ্যসূত্র মতেই বলতে হয়, গুজবের কবলে জড়িয়ে পড়ছে এই বাংলাদেশ তার অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একটি মহল আন্দোলনের নামে সকল শিক্ষার্থীদের লেলিয়ে দিয়ে ছিল “গুজব” নামক নগ্ন খেলায়। সকলের জানা বিষয় ছোট ছোট বাচ্চাদের কাঁধে ভর করেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছিল- প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া “রাজনৈতিক বেশ কিছু দল”। তখন তাদের স্লোগান হয়েছিল উই ওয়ান্ট জাস্টিস-কে কলঙ্কিত করে। এই স্লোগানের আড়ালেই তাদের মুল ইস্যু হয়ে যায় ‘উই ওয়ান্ট গভর্মেন্ট ফল’। তারা একের পর এক ‘মিথ্যা লাশের খবর’ ভিডিও করেই সামাজিক সব যোগাযোগ মাধ্যম- ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কয়েকটি মেয়েকে তারা ব্যবহার করে এ প্ল্যান বাস্তবায়নও করেছিল। সে মেয়েগুলো কান্নাকাটি করে এমন ভঙ্গিতে ভিডিওগুলোতে কথা বলেছিল যেনো তারা নিজের চোখেই দেখে আসছে লাশ আর ধর্ষিতদের। ভারতের কয়েকটি লাশ এবং ধর্ষিতদের ছবি এডিট করে সেইগুলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ছবি বলে গুজব ছড়িয়ে ছিল। সুতরাং- সে সময়ে সেই ঘটনা অধিকাংশ মানুষ এ গুজবটাও বিশ্বাস করা শুরু করেছিল। সবার জানা তখনি সেই আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করেছিল। তার পরেই আনেদালনরত শিক্ষার্থী’রা তাদের সহপাঠীর “মৃত্যুর গুজব” যাচাই বাছাই না করেই যেন আবেগে হামলা করতে চলেও গিয়ে ছিল সেই ধানমন্ডি ঝিগা তলায় অবস্থিত আওয়ামীলীগের দলীয় সভানেত্রীর নিজস্ব কার্যালয়ে। ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিয়েই হামলা করেছিল নেতা কর্মী বা দলীয় কার্যালয়ে। এই দিকে পুলিশ- দলীয় কার্যালয়ে থাকলেও তারা তখন ছিল নির্বিকার। কারণ- নির্দেশনা ছিল, সেই শিক্ষার্থীদের আঘাত করা যাবে না। তাই তারা চুপ করে ছিল। সে দিন সেখানে নেতা, কর্মী থাকায় শিক্ষার্থীদের হামলা বা গুজবের হামলা সর্বোচ্চ সহনশীলতার মনোভাবে প্রতিরোধ করেছিল।

জানা দরকার সে শিক্ষার্থীরা শরীরে সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ করে মিথ্যা আহত হওয়ার ‘ছবি বা ভিডিও’ ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিছু শিক্ষার্থীর ব্যাগে-চাপাতি, ইটের টুকরা এবং পাথর পাওয়া গিয়েছিল। দোকানে দোকানে- সাদা শার্ট বানানোর হিড়িক, রক্ত মেখে রাস্তায় শুয়ে থাকা, ভুয়া আইডি কার্ড ছাপিয়ে গলায় ঝুলিয়ে এই আন্দোলনে অনেকে আগ্রাসী ও উগ্রবাদী আচরণ করতে প্রস্তুত হয়েছিল। এই মিথ্যা-গুজবটা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও চলে গিয়ে ছিল এবং তারা সেই গুজব বিশ্বাস করে ছিল।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো শিক্ষিত মানুষরা এমন এ গুজবে কমবেশি হলেও কান দিয়েছিল। কিন্তু কেউ তখন লাশের সন্ধান দিতেও পারেনি কিংবা যে কেউ ধর্ষিত হওয়ার প্রমাণ দিতে পারেনি, কেউ চোখ তুলে নেয়ার প্রমাণ পায়নি। কারও পরিবার আসেনি সেই দিন অভিযোগ নিয়ে তাদের সন্তান নিখোঁজ হয়েছে। থানায় কোন ব্যক্তি ডায়েরি করেনি- আহত বা নিহত হওয়ার ব্যাপারে। তাহলে শুধু শুধু কেনই এই গুজব ছড়িয়ে মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করবার অপচেষ্টা করেছিল। আমাদের আসলে বুঝতে হবে, অতীতের গুজব আর বর্তমানের গুজব গুলো এক নয়। এখন অতীতের চেয়ে দিনেদিনেই তা যেন বিভিন্ন ধারাতেই রুপ দিয়ে ভয়াবহ গুজবে দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন গুজব অহরহ চোখে পড়ে। যেমন- ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা লাগবে’। অবশ্য ফেসবুকের আগে প্রথম ‘ইউটিউবে’ ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমেই এমন গুজব ছড়ানো হয়। এর জেরে আবার- ছেলেধরা সন্দেহে এ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮ জনকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই গুজবের জেরে প্রায় প্রতি দিনই নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। সুতরাং- এই
গুজব ছড়ানো কিংবা গণপিটুনি নিয়ে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেই সব মানুষকে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকেই গ্রেফতার করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে বলতেই হয়, ক’জন গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকেই যেন তারা জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে। গুজব সৃষ্টিকারী এ দেশের উন্নয়ন কর্ম কাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা সহ অস্থিরতা সৃষ্টির জন্যেই পরিকল্পিত ভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। এর পেছনে হোতাদের চিহ্নিত করার জন্য পুলিশের সাইবার বিভাগগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও যাচ্ছে। এরমধ্যে দুবাইয়ে একজন মাস্টার মাইন্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলতেই হয়, ভাইরাসের মতো এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। এতে করে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। প্রিয় সন্তানটি ছেলেধরার খপ্পরে পড়তে পারে- অনেকে সন্ত্রস্ত এই কারণে; কেউ সন্ত্রস্ত ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ভয়ে। এগুজবকে কাজে লাগিয়েই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ব্যক্তিগত শত্রুদের টার্গেট করতেও পারে- এমন আশঙ্কা হিসাবে রাখা উচিত। অনেকের ধারণা, সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে ও সেটিকে ব্যবহার করে এবং মানুষের অন্ধ বিশ্বাস কিংবা এই কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে এ দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টাটা অস্বাভাবিক হবে না। তাই কোনো মহল পরিকল্পিতভাবেই গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যেন কঠিন আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। পুলিশদের ভাষ্য মতে, আবার যারা “গুজব” বিশ্বাসী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে তারা ফৌজদারি অপরাধে জড়াচ্ছে। সুতরাং, তাদের বিরুদ্ধে যেন কঠোর ব্যবস্থা নিতে চান আইন -শৃঙ্খলা বাহিনী বা বর্তমান সরকার। কোথাও গুজব ছড়ানো সন্দেহজনক হলে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশ বাহিনীকেই জানানো দরকার। গুজবে অপরাধকারী সন্দেহ হলে গণপিটুনিতে হত্যা করার আইনটা হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কাউকে দেননি সরকার।

লেখক:
নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক’।

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com