টোলারবাগের করোনাক্রান্ত মৃতের চিকিৎসকের হৃদয়বিদারক লেখা

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে গত ৯ দিন ধরে হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সিলেটের সন্তান ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। তিনি বুধবার (২৫ এপ্রিল) তুলে ধরলেন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় মনের অভিব্যক্তি। শুনুন সে কথা তার নিজের বর্ণনায়-

বন্দি জীবনের কথকতা!

হোম কোয়ারেন্টিনে আমি। বুধবার নবম দিন চলছে। রুম বন্ধ। আমি চার দিকে তাকিয়ে নানা কিছু শুধু ভাবি।

খুব সকালে ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে দেখি, ভোর পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। খুব অস্থির লাগছিল। শান্ত হতে অজু করে ফজরের নামাজ পড়তে দাঁড়ালাম।

গত ১৬ মার্চ আমার প্রাইভেট চেম্বার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে এক বয়স্ক রোগীকে দেখি এবং আন্দাজ করি এটি কভিড-১৯ জনিত নিউমোনিয়া। এরপর ওষুধপত্র দিয়ে পরামর্শ দেই, দ্রুত আইইডিসিআরে যোগাযোগ করার জন্য।

১৮ মার্চ সকালে গায়ে সামান্য জ্বর অনুভব করি। তড়িঘড়ি করে বাসায় প্রবেশ করি। সহকর্মীরাও বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

বাসায় ফিরে স্ত্রীর ছল্ ছল্ চোখ আর উদ্বেগ ভরা প্রশ্নের উত্তরে অভয় দেই, এই আইসোলেশন রোগ নয়, রোগী না হবার জন্য আগাম সতর্কতা।

বইপাগল আমি আজ সময় কাটাচ্ছি বহুদিনের জমে থাকা, না পড়া বইয়ে ডুবে আর নেটে বিভিন্ন দেশের করোনা মহামারীর খবর পড়ে।

১৯ মার্চ জানতে পারি, আমার ওই রোগীটি কভিড-১৯ পজেটিভ এবং তিনি ভেন্টিলেটরে!

আমার সন্দেহপ্রবণ মনটিকে ধন্যবাদ দেই, আগাম সতর্ক করার জন্য। দুঃখজনক সত্য হলো, টোলারবাগের সেই রোগীটি পরবর্তীতে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান বলে জানতে পারি।

মানুষ অসুস্থ হলে চায় প্রিয়জনের স্নেহ, স্পর্শ। আর আজ কি না দূরে যাও তুমি, আরো দূরে; যদি হতে চাও মনের কাছাকাছি…! অদৃশ্য এই শত্রু মানবে না কোনো বাধা বারবার হাত ধোয়া আর আইসোলেশনের শৃঙ্খলা ছাড়া।

হায় পজেটিভ! ভাবছি, সারা জীবন পজেটিভ থিংকিং আর পজেটিভ রাজনীতির কথা বলি আমরা। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রে পজেটিভ মানে খারাপ কিছুর অস্তিত্ব প্রকাশ পাওয়া। বাক্য প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে একই শব্দের ভিন্নমুখী দ্বোতনা। এ যেন সার্জনের হাতের ছুরি ঘাতকের অস্ত্র হয়ে যাওয়া!

‘হে প্রভু, হে মহান রাব্বুল আলামীন, তুমি রক্ষা করো আমাদের। চোখের পানিতে অন্তরের এ আকুতি শুধু আমার নয়; সারা দেশের সারা পৃথিবীর মানুষের। ইতালিতে সত্তরোর্ধ কভিড-১৯ আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ৩৫ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে। হায় ইতালি! আধুনিক ইতালির স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আমার দেশের কি অবস্থা হবে?

এখন গাইডলাইন মেনে দুই বেলা শরীরের তাপমাত্রা মাপি। স্বেচ্ছা বন্দিত্বের নবম দিনে অপেক্ষা করি আরো পাঁচ দিন পরের স্বাধীনতার জন্য। অপেক্ষা করি স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানকে আলিঙ্গনের উষ্ণতার জন্য।

সুস্থ থাকলে হয়তোবা আবারও হব কর্মচঞ্চল। কিন্তু আমাদের অপ্রতুল স্বাস্থ্য ক্ষমতা কতটুকু রক্ষা হবে করোনা মহামারী প্রতিরোধের জন্য?

হে প্রভু, হে মহান প্রভু, রক্ষা করো এই দেশ। রক্ষা করো সোনার বাংলাকে।

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» জুন পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডে জরিমানা নয়

» মহামারী ডেকে আনছি, মর্মান্তিক পরিণতির কথাই ভাবছি না!

» করোনায় অসহায়দের পাশে দাঁড়ালেন বৃষ্টি

» দুই হাজার ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

» চাঁদপুরে জ্বর-সর্দি-শ্বাসকষ্টে নারীর মৃত্যু, ৫ বাড়ি লকডাউন

» কোন হাসপাতাল রোগী ফেরত দিচ্ছে, সরকার নজরে রাখছে : তথ্যমন্ত্রী

» কারখানা বন্ধে মালিকদের প্রতি রুবানা হকের অনুরোধ

» রাতে বেপরোয়া চলছে ট্রাক-লরি

» করোনা মোকাবেলায় মমতার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি শাহরুখের

» শবে বরাত বাসা-বা‌ড়ি‌তে পালনের আহ্বান

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি:মাকসুদা লিসা

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

টোলারবাগের করোনাক্রান্ত মৃতের চিকিৎসকের হৃদয়বিদারক লেখা

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে গত ৯ দিন ধরে হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সিলেটের সন্তান ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। তিনি বুধবার (২৫ এপ্রিল) তুলে ধরলেন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় মনের অভিব্যক্তি। শুনুন সে কথা তার নিজের বর্ণনায়-

বন্দি জীবনের কথকতা!

হোম কোয়ারেন্টিনে আমি। বুধবার নবম দিন চলছে। রুম বন্ধ। আমি চার দিকে তাকিয়ে নানা কিছু শুধু ভাবি।

খুব সকালে ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে দেখি, ভোর পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। খুব অস্থির লাগছিল। শান্ত হতে অজু করে ফজরের নামাজ পড়তে দাঁড়ালাম।

গত ১৬ মার্চ আমার প্রাইভেট চেম্বার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে এক বয়স্ক রোগীকে দেখি এবং আন্দাজ করি এটি কভিড-১৯ জনিত নিউমোনিয়া। এরপর ওষুধপত্র দিয়ে পরামর্শ দেই, দ্রুত আইইডিসিআরে যোগাযোগ করার জন্য।

১৮ মার্চ সকালে গায়ে সামান্য জ্বর অনুভব করি। তড়িঘড়ি করে বাসায় প্রবেশ করি। সহকর্মীরাও বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

বাসায় ফিরে স্ত্রীর ছল্ ছল্ চোখ আর উদ্বেগ ভরা প্রশ্নের উত্তরে অভয় দেই, এই আইসোলেশন রোগ নয়, রোগী না হবার জন্য আগাম সতর্কতা।

বইপাগল আমি আজ সময় কাটাচ্ছি বহুদিনের জমে থাকা, না পড়া বইয়ে ডুবে আর নেটে বিভিন্ন দেশের করোনা মহামারীর খবর পড়ে।

১৯ মার্চ জানতে পারি, আমার ওই রোগীটি কভিড-১৯ পজেটিভ এবং তিনি ভেন্টিলেটরে!

আমার সন্দেহপ্রবণ মনটিকে ধন্যবাদ দেই, আগাম সতর্ক করার জন্য। দুঃখজনক সত্য হলো, টোলারবাগের সেই রোগীটি পরবর্তীতে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান বলে জানতে পারি।

মানুষ অসুস্থ হলে চায় প্রিয়জনের স্নেহ, স্পর্শ। আর আজ কি না দূরে যাও তুমি, আরো দূরে; যদি হতে চাও মনের কাছাকাছি…! অদৃশ্য এই শত্রু মানবে না কোনো বাধা বারবার হাত ধোয়া আর আইসোলেশনের শৃঙ্খলা ছাড়া।

হায় পজেটিভ! ভাবছি, সারা জীবন পজেটিভ থিংকিং আর পজেটিভ রাজনীতির কথা বলি আমরা। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রে পজেটিভ মানে খারাপ কিছুর অস্তিত্ব প্রকাশ পাওয়া। বাক্য প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে একই শব্দের ভিন্নমুখী দ্বোতনা। এ যেন সার্জনের হাতের ছুরি ঘাতকের অস্ত্র হয়ে যাওয়া!

‘হে প্রভু, হে মহান রাব্বুল আলামীন, তুমি রক্ষা করো আমাদের। চোখের পানিতে অন্তরের এ আকুতি শুধু আমার নয়; সারা দেশের সারা পৃথিবীর মানুষের। ইতালিতে সত্তরোর্ধ কভিড-১৯ আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ৩৫ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে। হায় ইতালি! আধুনিক ইতালির স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আমার দেশের কি অবস্থা হবে?

এখন গাইডলাইন মেনে দুই বেলা শরীরের তাপমাত্রা মাপি। স্বেচ্ছা বন্দিত্বের নবম দিনে অপেক্ষা করি আরো পাঁচ দিন পরের স্বাধীনতার জন্য। অপেক্ষা করি স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানকে আলিঙ্গনের উষ্ণতার জন্য।

সুস্থ থাকলে হয়তোবা আবারও হব কর্মচঞ্চল। কিন্তু আমাদের অপ্রতুল স্বাস্থ্য ক্ষমতা কতটুকু রক্ষা হবে করোনা মহামারী প্রতিরোধের জন্য?

হে প্রভু, হে মহান প্রভু, রক্ষা করো এই দেশ। রক্ষা করো সোনার বাংলাকে।

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি:মাকসুদা লিসা

 

 

 

১১২৫ পূর্ব মনিপুর , মিরপুর -২ ঢাকা -১২১৬

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com