চট্টগ্রাম কারাগারে খুনের আরো রেকর্ড!

‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’-এমন স্লোগান ধারণ করে কারা অধিদপ্তরের যাত্রা। কিন্তু সেই কারাগারের ভেতরেই ঘটছে একের পর এক অপরাধ, খুনের ঘটনা। এখন কোথায় আর নিরাপদ। গত ২৯শে মে রিপন নাথ নামে এক বন্দির হাতে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরি খুনের ঘটনায় এ প্রশ্ন আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এর আগেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আরো খুনের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল সকালে কারাগারের রেকর্ড থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০০০ সালে ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবী হত্যা মামলার আসামি ওসমানকেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ছুরিকাঘাতে খুন করেছিল এক বন্দি। এর আগে ১৯৯৮ সালে কারাগারে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা আলমকেও গলায় ব্লেড চালিয়ে খুন করেছিল আরেক বন্দি।
যেগুলোর প্রতিটির পেছনে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠে।

যার নেপথ্যে কারাগারের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন খুন হওয়া বন্দির পরিবারের অভিভাবকরা।
গত ২৯শে মে অমিত মুহুরি খুনের পেছনেও কারা কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আনেন তার বাবা অরুণ মুহুরি। যার পেছনে কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অরুণ মুহুরির দাবি, জেলখানায় অমিতকে পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলা হয়েছে এবং পুরো জেলখানার কর্মকর্তারা এতে জড়িত। কোটি টাকার লেনদেনে খুন করা হয়েছে আমার ছেলেকে। বিষয়টি অমিত জেনে গিয়েছিল। তাই সে অন্য জেলখানায় স্থানান্তর হতে চেয়েছিল।
তিনি বলেন, খবর পেয়ে ২৯শে মে বুধবার রাত ১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পায় অমিত মুহুরির লাশ পড়ে আছে। তার মাথায় বড় ধরনের আঘাত। পুরো শরীর রক্তাক্ত। মুখ অর্ধেক শেভ করা। কারা কর্তৃপক্ষ বলছেন, রিপন নাথ নামে অন্য এক বন্দি রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ইট দিয়ে আঘাত করে অমিত মুহুরিকে খুন করে।
এখন প্রশ্ন, ইট দিয়ে আঘাত করলে তার মাথায় এত বড় ক্ষত কেন? জেলখানায় ইটই বা আসলো কীভাবে। আর মুখ অর্ধেক শেভ করা কেন? মধ্যরাতে কি কেউ শেভ করে? আর সে তো কখনো ক্লিন শেভ করেনি। জেলখানায় শেভের সময় তো দুপুর ২টা। শুধু ইট দিয়ে আঘাত করলে তার শরীর রক্তাক্ত কেন? যার কোনো সদুত্তর নেই কারা কর্তৃপক্ষের।
তিনি বলেন, জেলখানা তো নিরাপদ জায়গা, সংশোধনের জায়গা। অমিত যাকে খুন করে জেলে গিয়েছিল সেটা তো সে বুঝতে পেরেছিল। সে তো ভালো হতে চেয়েছিল। তাহলে তাকে মেরে ফেলা হলো কেন? এর পেছনে মূল সমস্যা ছিল অমিত ১১ই জুন কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসতো। বের হলে হয়তো কারো ক্ষতি হতো। এ কারণে তাকে ষড়যন্ত্র করে খুন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, অমিতের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির ১৫টি মামলা আছে। তার বিরুদ্ধে আছে পূর্বাঞ্চল রেলের কোটি টাকার দরপত্র নিয়ে জোড়া খুনের মামলাও। এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ই আগস্ট নগরের এনায়েতবাজার এলাকার রানীরদিঘি এলাকা থেকে একটি ড্রাম উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে বোমা রয়েছে ভাবা হলেও ড্রাম কেটে ভেতর থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ গলে যাওয়ায় তখন পরিচয় বের করা যায়নি। পরে এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ৩১শে আগস্ট ইমাম হোসেন ও শফিকুর রহমান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানান, ড্রামের ভেতরে পাওয়া লাশটি অমিতের বন্ধু নগর যুবলীগের কর্মী ইমরানুল করিমের। ৯ই আগস্ট নগরের নন্দনকানন হরিশ দত্ত লেনের নিজের বাসায় ইমরানুলকে ডেকে নেন অমিত। এরপর বাসার ভেতরেই তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর অমিতকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
ওসমানকে হত্যা করা হয় যেভাবে: চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল মেরিটাইম (বিডি) লিমিটেডের প্রিন্সিপাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন জিবরাত তায়েবী। ১৯৯৯ সালের ৯ই জুন অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে আগ্রাবাদের শেখ মুজিব রোডের চুংকিং রেস্টুরেন্টের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় পরদিন ডবলমুরিং থানায় জিবরানের এক সহকর্মী জেমস রায় মামলা করেন।
১৯৯৯ সালের ২২শে নভেম্বর মামলায় আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আট আসামিরা হলেন- ইয়াছিন রহমান টিটু, মো. ওসমান আলী, আলী আকবর ওরফে দিদারুল আলম, জিল্লুর রহমান, জাহিদ হোসেন ওরফে কিরণ, মো. সিদ্দিক, ওমর আলী ওরফে জাহাঙ্গীর কসাই ও আলমগীর।
এরমধ্যে শীর্ষ আসামি ইয়াছিন রহমান টিটু শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ কেডিএসের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমানের ছেলে। এ মামলায় কারাবন্দি ছিলেন ওসমান। কিন্তু ২০০০ সালের ১৭ই জুন ছুরিকাঘাতে খুন করেন আরেক বন্দি।
ওসমানের বড় ভাই সোলায়মান এ সম্পর্কে বলেন, মামলার রহস্য ধামাচাপা দিতে ওসমানকে জেলখানায় পরিকল্পিতভাবে টাকার বিনিময়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার পর তদন্ত কমিটি হলেও এর নেপথ্যে কারা ছিল তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে ২০০২ সালের ১২ই এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলার রায়ে পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু অপর আসামি টিটু, ওমর আলী ও আলমগীর খালাস পান। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করে। আসামিরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ২৮শে মার্চ হাইকোর্ট পলাতক টিটুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একইসঙ্গে নিম্ন আদালতের রায়ে খালাসপ্রাপ্ত ওমর আলী ওরফে জাহাঙ্গীর কসাই ও আলমগীরকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মো. সিদ্দিক খালাস পান। হাইকোর্টের রায়ের পর ২০১১ সালের ৯ই অক্টোবর দেশে ফেরেন টিটু। পরদিন চট্টগ্রাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠান।
আলম হত্যা যেভাবে: যুবলীগ নেতা আলমের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ১৯টি মামলা ছিল। চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে ১৯৯৭ সালের ১৪ই আগস্ট তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৯ই মে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দিন-দুপুরে আলমকে গলায় ব্লেড চালিয়ে খুন করে আরেক বন্দি কেলা কাদের। সে সময় আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত খুন দাবি করে আলমের অনুসারী ও তার পরিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছিল। পরে কেলা কাদেরকে আসামি করে কারা কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করে। আলম খুনের ঘটনায় গঠিত হয়েছিল তদন্ত কমিটিও। সেই কমিটি খুনের কোনো সুসপষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে পারেনি। তবে কেলা কাদেরকে হত্যাকারী চিহ্নিত করা হয় চার্জশিটে। পরে আলম হত্যায় কাদেরকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। তবে হাইকোর্টে আপিল করে জামিনে বেরিয়ে যান কেলা কাদের। এ বিষয়ে আলমের বড় ভাই মো. জাকির বলেন, কারাগারে আলম হত্যার আসামি কেলা কাদেরের বিরুদ্ধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেয় আদালত। পরে হাইকোর্টে আপিল করে সে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আমরা উচ্চ আদালতে মামলা এগিয়ে নিতে পারিনি। যে কারণে খুন করেও মুক্তি পেয়ে যায় কাদের।
তিনি বলেন, কারাগারে একটা কাঁচামরিচ ঢুকতেও কত নজরদারি পেরিয়ে যেতে হয়। আমার প্রশ্ন হলো- কীভাবে আমার ভাই হত্যায় ব্যবহৃত গ্লাস কাটার ছুরি কারাগারে যায়? কীভাবে মুহুরি হত্যায় ব্যবহৃত ইট বা ছুরি কারাগারে যায়? আসলে সব টাকার খেলা।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ নাছির আহমেদ বলেন, কারাগারের সেলে বন্দিরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে তখন সবসময় কারারক্ষীরা তা কন্ট্রোল করতে পারেন না। কারণ কারারক্ষীরা তাদের সেলে থাকে না। এখানে নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই।
হত্যাকাণ্ডগুলো পরিকল্পিত কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অমিত মুহুরিকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে খুন করেছে রিপন নাথ, এ বিষয়ে সেলে থাকা অন্য আসামি বেলাল স্বীকারোক্তি দিয়েছে। রিপন নাথ খুনের পরদিন থেকে কোনো কথা বলছে না। আমরা তাকে আসামি করে মামলা করেছি। পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে জেরা করলে সত্য ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এরপর বিচারের কাজ আদালতের।
মানবাধিকার আইনজীবী এ এম জিয়া হাবীব আহসান বলেন, আসামি যত দুর্ধর্ষই হোক না কেন, কারাগারে এ ধরনের খুন দুঃখজনক। আসামিকে নিরাপদে রাখা কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। যখন ঘটনা ঘটলো, মারামারি হলো তখন কারারক্ষীরা কোথায় ছিল? আর কারাগারে ইট আসল কীভাবে? এটা পরিকল্পিত হত্যার ইঙ্গিত দেয়। তাই পুলিশকে দিয়ে নয়, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে এই খুনের তদন্তের দাবি জানাই আমি।মানবজমিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» আল্লাহর ৯৯ নাম সংবলিত স্তম্ভ মোহাম্মদপুরে

» ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ভোট প্রস্তুতি

» ৩৪ জনের ছাত্রত্ব বাতিল ও কোষাধ্যক্ষ অপসারণে ভিপির আবেদন

» ফুসফুসের অবস্থা কেমন? জানিয়ে দেবে অ্যাপ!

» মেয়েরা যে ৭ জিনিস সবসময় ব্যাগে রাখবেন

» কিছু হলেই অ্যান্টিবায়োটিক, ডেকে আনছেন বিপদ

» আবারও ভিডিওতে খোলামেলা পুনম পাণ্ডে

» কুমিল্লায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ গ্রেফতার ৪

» বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতাকর্মীদের ওপর ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা

» চট্টগ্রামে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

চট্টগ্রাম কারাগারে খুনের আরো রেকর্ড!

‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’-এমন স্লোগান ধারণ করে কারা অধিদপ্তরের যাত্রা। কিন্তু সেই কারাগারের ভেতরেই ঘটছে একের পর এক অপরাধ, খুনের ঘটনা। এখন কোথায় আর নিরাপদ। গত ২৯শে মে রিপন নাথ নামে এক বন্দির হাতে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরি খুনের ঘটনায় এ প্রশ্ন আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এর আগেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আরো খুনের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল সকালে কারাগারের রেকর্ড থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০০০ সালে ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবী হত্যা মামলার আসামি ওসমানকেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ছুরিকাঘাতে খুন করেছিল এক বন্দি। এর আগে ১৯৯৮ সালে কারাগারে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা আলমকেও গলায় ব্লেড চালিয়ে খুন করেছিল আরেক বন্দি।
যেগুলোর প্রতিটির পেছনে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠে।

যার নেপথ্যে কারাগারের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন খুন হওয়া বন্দির পরিবারের অভিভাবকরা।
গত ২৯শে মে অমিত মুহুরি খুনের পেছনেও কারা কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আনেন তার বাবা অরুণ মুহুরি। যার পেছনে কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অরুণ মুহুরির দাবি, জেলখানায় অমিতকে পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলা হয়েছে এবং পুরো জেলখানার কর্মকর্তারা এতে জড়িত। কোটি টাকার লেনদেনে খুন করা হয়েছে আমার ছেলেকে। বিষয়টি অমিত জেনে গিয়েছিল। তাই সে অন্য জেলখানায় স্থানান্তর হতে চেয়েছিল।
তিনি বলেন, খবর পেয়ে ২৯শে মে বুধবার রাত ১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পায় অমিত মুহুরির লাশ পড়ে আছে। তার মাথায় বড় ধরনের আঘাত। পুরো শরীর রক্তাক্ত। মুখ অর্ধেক শেভ করা। কারা কর্তৃপক্ষ বলছেন, রিপন নাথ নামে অন্য এক বন্দি রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ইট দিয়ে আঘাত করে অমিত মুহুরিকে খুন করে।
এখন প্রশ্ন, ইট দিয়ে আঘাত করলে তার মাথায় এত বড় ক্ষত কেন? জেলখানায় ইটই বা আসলো কীভাবে। আর মুখ অর্ধেক শেভ করা কেন? মধ্যরাতে কি কেউ শেভ করে? আর সে তো কখনো ক্লিন শেভ করেনি। জেলখানায় শেভের সময় তো দুপুর ২টা। শুধু ইট দিয়ে আঘাত করলে তার শরীর রক্তাক্ত কেন? যার কোনো সদুত্তর নেই কারা কর্তৃপক্ষের।
তিনি বলেন, জেলখানা তো নিরাপদ জায়গা, সংশোধনের জায়গা। অমিত যাকে খুন করে জেলে গিয়েছিল সেটা তো সে বুঝতে পেরেছিল। সে তো ভালো হতে চেয়েছিল। তাহলে তাকে মেরে ফেলা হলো কেন? এর পেছনে মূল সমস্যা ছিল অমিত ১১ই জুন কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসতো। বের হলে হয়তো কারো ক্ষতি হতো। এ কারণে তাকে ষড়যন্ত্র করে খুন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, অমিতের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির ১৫টি মামলা আছে। তার বিরুদ্ধে আছে পূর্বাঞ্চল রেলের কোটি টাকার দরপত্র নিয়ে জোড়া খুনের মামলাও। এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ই আগস্ট নগরের এনায়েতবাজার এলাকার রানীরদিঘি এলাকা থেকে একটি ড্রাম উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে বোমা রয়েছে ভাবা হলেও ড্রাম কেটে ভেতর থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ গলে যাওয়ায় তখন পরিচয় বের করা যায়নি। পরে এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ৩১শে আগস্ট ইমাম হোসেন ও শফিকুর রহমান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানান, ড্রামের ভেতরে পাওয়া লাশটি অমিতের বন্ধু নগর যুবলীগের কর্মী ইমরানুল করিমের। ৯ই আগস্ট নগরের নন্দনকানন হরিশ দত্ত লেনের নিজের বাসায় ইমরানুলকে ডেকে নেন অমিত। এরপর বাসার ভেতরেই তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর অমিতকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
ওসমানকে হত্যা করা হয় যেভাবে: চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল মেরিটাইম (বিডি) লিমিটেডের প্রিন্সিপাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন জিবরাত তায়েবী। ১৯৯৯ সালের ৯ই জুন অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে আগ্রাবাদের শেখ মুজিব রোডের চুংকিং রেস্টুরেন্টের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় পরদিন ডবলমুরিং থানায় জিবরানের এক সহকর্মী জেমস রায় মামলা করেন।
১৯৯৯ সালের ২২শে নভেম্বর মামলায় আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আট আসামিরা হলেন- ইয়াছিন রহমান টিটু, মো. ওসমান আলী, আলী আকবর ওরফে দিদারুল আলম, জিল্লুর রহমান, জাহিদ হোসেন ওরফে কিরণ, মো. সিদ্দিক, ওমর আলী ওরফে জাহাঙ্গীর কসাই ও আলমগীর।
এরমধ্যে শীর্ষ আসামি ইয়াছিন রহমান টিটু শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ কেডিএসের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমানের ছেলে। এ মামলায় কারাবন্দি ছিলেন ওসমান। কিন্তু ২০০০ সালের ১৭ই জুন ছুরিকাঘাতে খুন করেন আরেক বন্দি।
ওসমানের বড় ভাই সোলায়মান এ সম্পর্কে বলেন, মামলার রহস্য ধামাচাপা দিতে ওসমানকে জেলখানায় পরিকল্পিতভাবে টাকার বিনিময়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার পর তদন্ত কমিটি হলেও এর নেপথ্যে কারা ছিল তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে ২০০২ সালের ১২ই এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলার রায়ে পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু অপর আসামি টিটু, ওমর আলী ও আলমগীর খালাস পান। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করে। আসামিরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ২৮শে মার্চ হাইকোর্ট পলাতক টিটুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একইসঙ্গে নিম্ন আদালতের রায়ে খালাসপ্রাপ্ত ওমর আলী ওরফে জাহাঙ্গীর কসাই ও আলমগীরকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মো. সিদ্দিক খালাস পান। হাইকোর্টের রায়ের পর ২০১১ সালের ৯ই অক্টোবর দেশে ফেরেন টিটু। পরদিন চট্টগ্রাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠান।
আলম হত্যা যেভাবে: যুবলীগ নেতা আলমের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ১৯টি মামলা ছিল। চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে ১৯৯৭ সালের ১৪ই আগস্ট তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৯ই মে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দিন-দুপুরে আলমকে গলায় ব্লেড চালিয়ে খুন করে আরেক বন্দি কেলা কাদের। সে সময় আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত খুন দাবি করে আলমের অনুসারী ও তার পরিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছিল। পরে কেলা কাদেরকে আসামি করে কারা কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করে। আলম খুনের ঘটনায় গঠিত হয়েছিল তদন্ত কমিটিও। সেই কমিটি খুনের কোনো সুসপষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে পারেনি। তবে কেলা কাদেরকে হত্যাকারী চিহ্নিত করা হয় চার্জশিটে। পরে আলম হত্যায় কাদেরকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। তবে হাইকোর্টে আপিল করে জামিনে বেরিয়ে যান কেলা কাদের। এ বিষয়ে আলমের বড় ভাই মো. জাকির বলেন, কারাগারে আলম হত্যার আসামি কেলা কাদেরের বিরুদ্ধে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেয় আদালত। পরে হাইকোর্টে আপিল করে সে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আমরা উচ্চ আদালতে মামলা এগিয়ে নিতে পারিনি। যে কারণে খুন করেও মুক্তি পেয়ে যায় কাদের।
তিনি বলেন, কারাগারে একটা কাঁচামরিচ ঢুকতেও কত নজরদারি পেরিয়ে যেতে হয়। আমার প্রশ্ন হলো- কীভাবে আমার ভাই হত্যায় ব্যবহৃত গ্লাস কাটার ছুরি কারাগারে যায়? কীভাবে মুহুরি হত্যায় ব্যবহৃত ইট বা ছুরি কারাগারে যায়? আসলে সব টাকার খেলা।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ নাছির আহমেদ বলেন, কারাগারের সেলে বন্দিরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে তখন সবসময় কারারক্ষীরা তা কন্ট্রোল করতে পারেন না। কারণ কারারক্ষীরা তাদের সেলে থাকে না। এখানে নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই।
হত্যাকাণ্ডগুলো পরিকল্পিত কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অমিত মুহুরিকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে খুন করেছে রিপন নাথ, এ বিষয়ে সেলে থাকা অন্য আসামি বেলাল স্বীকারোক্তি দিয়েছে। রিপন নাথ খুনের পরদিন থেকে কোনো কথা বলছে না। আমরা তাকে আসামি করে মামলা করেছি। পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে জেরা করলে সত্য ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এরপর বিচারের কাজ আদালতের।
মানবাধিকার আইনজীবী এ এম জিয়া হাবীব আহসান বলেন, আসামি যত দুর্ধর্ষই হোক না কেন, কারাগারে এ ধরনের খুন দুঃখজনক। আসামিকে নিরাপদে রাখা কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। যখন ঘটনা ঘটলো, মারামারি হলো তখন কারারক্ষীরা কোথায় ছিল? আর কারাগারে ইট আসল কীভাবে? এটা পরিকল্পিত হত্যার ইঙ্গিত দেয়। তাই পুলিশকে দিয়ে নয়, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে এই খুনের তদন্তের দাবি জানাই আমি।মানবজমিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Design & Developed BY ThemesBazar.Com