খুলনায় তিন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে সার্ভেয়ারদের কমিশন বাণিজ্য

বাস্তবায়নাধীন খুলনা-মংলা রেললাইন, বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ- এই তিন প্রকল্পে হয়েছে হরিলুট! অপকৌশলের মাধ্যমে শুধু যে ক্ষতিপূরণের মোটা অঙ্কের টাকা হরিলুট করা হয়েছে শুধু তা নয়; ৪শ’ ৭৯ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণেও করা হয়েছে কমিশন বাণিজ্য। জমির মালিকদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেয়া হয়েছে। এভাবে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছারিতার মাধ্যমে কোটিপতি বনে গেছে জেলা প্রশাসনের এল এ শাখার সার্ভেয়াররা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান নেটওয়ার্কের সঙ্গে মংলা বন্দরের রেল সংযোগ স্থাপন এবং মংলা বন্দরের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহের (ভারত, নেপাল ও ভুটান) রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় সরকার। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে ২০১০ সালের ২১শে ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় খুলনা-মংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন মেলে। এরপর ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতের সিইজি নিপ্পন কোয়ি জেভি প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালের ১৫ই অক্টোবর রূপসা রেলসেতুর পাইলিংয়ের কাজের উদ্বোধন করেন রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর মধ্যে রেললাইনের জন্য ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৮৯ লাখ এবং সেতুর জন্য ১ হাজার ৭৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

বাকি টাকা জমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ৩৭০ একর জমির মূল্য ধরা হয় ৩শ’ ৮৯ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ও ভারত সরকারের আর্থিক সহায়তায় এই রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তিন ভাগে বিভক্ত এ প্রকল্পে রূপসা নদীর ওপর হচ্ছে রেলসেতু, অপরটি রেললাইন এবং অন্যটি টেলিকমিউনিকেশন ও সিগন্যালিং। প্রকল্পের আওতায় লুপ লাইনসহ রেলওয়ে ট্রাকের দৈর্ঘ্য ৮৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ। আর খানজাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রূপসা নদীর ওপরে যুক্ত হবে ৫ দশমিক ১৩ কিলোমিটার রেলসেতু। এছাড়া ২১ ছোটখাট ব্রিজ ও ১১০ কালভার্ট নির্মিত হচ্ছে। খুলনার ফুলতলা থেকে মংলা পর্যন্ত ৮টি স্টেশন হচ্ছে। স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুলতলা, আড়ংঘাটা, মোহাম্মদ নগর, কাটাখালী, চুলকাঠি, ভাগা, দিগরাজ ও মংলা। সবমিলে এ প্রকল্পের গড় অগ্রগতি ৬০ শতাংশ।

এদিকে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলনায় একটি বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রতি দেন। এ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১২ সালে হাসপাতালটি নির্মাণের জন্য জায়গা খোঁজা শুরু করে গণপূর্ত বিভাগ। তবে জায়গা নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি। প্রথমে খুলনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (মন্নুজান স্কুল) ও লোকস্ট কলোনির সামনের খালি জায়গায় উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভাগীয় সার্কিট হাউস নির্মাণে নির্দিষ্ট থাকায় সেটি বাতিল হয়। পরবর্তীতে সোনাডাঙ্গা সিটি বাইপাস সড়ক সংলগ্ন ময়ূরী আবাসিক এলাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী স্থানের প্রায় পাঁচ একর জমিতে সরকারি শিশু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণ করে গণপূর্ত বিভাগ। এরপর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ ৪.৮০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। এর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের এল এ শাখা সর্বমোট ৫২ কোটি দু’লাখ টাকা দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী জমিও ইতিমধ্যে দখল নিয়ে সিভিল সার্জনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক হাসপাতালের ডিজাইন এখনো না আসায় দরপত্রের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিতে পারছেনা গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের মধ্যে ডিজাইন হাতে পেলে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে দরপত্রের জন্য বিজ্ঞপন দেয়া হবে।

অপরদিকে বটিয়াঘাটার খোলাবাড়ি মৌজায় ৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ট্রেনিং সেন্টারের জন্য ভবন ও ব্যারাকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় অনুমোদনের পর ২০১৮ সালে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। জমির অধিগ্রহণ মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৮ কোটি ২ লাখ টাকা। গত ৪ঠা আগস্ট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি ফায়ার সার্ভিসকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে, মুল প্রকল্পের কাজ কখন শুরু হবে তা কেউ বলতে পারেনি।

খুলনার নিজখামার স্বর্ণা মসজিদের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবন। পলেস্তারা না হওয়া নাম-নম্বরবিহীন ওই ভবনের মালিক গোলাম রহমান। বাস্তবায়নাধীন খুলনা-মংলা রেললাইন প্রকল্পের আওতায় গোলাম রহমানের ওই ভবনটির সামনের জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত জমির সাথে ভবনটির ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে ৭৮ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্পের ৬০ ভাগ অগ্রগতি হলেও ভবনটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে অপসারণ না হওয়ায় ওই পরিবারের সদস্যরা এখনও ভবন দখল করে বসবাস করছে।

বটিয়াঘাটার খোলাবাড়ি মৌজায় ৫ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং সেন্টার। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন ওই জমি অধিগ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি বালু ফেলে ভরাট করে ও গাছ রোপণ করে সার্ভেয়ারদের সহযোগিতায় অধিগ্রহণকৃত জমি বিলানকে বাস্তুভিটা দেখিয়ে অধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে ওই টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। ফলে ক্ষতিপূরণ মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।

জমির মালিকদের অভিযোগ, তিন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে ৫, ৬, ও ৮ শতাংশ কমিশন গ্রহণ করা হয়েছে। জমির দাগ, খতিয়ান ও কাগজপত্রের অবস্থা একটু খারাপ হলে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসনের এল এ শাখার সার্ভেয়াররা। এছাড়া বাস্তবে যারা জমি অধিগ্রহণের টাকা পেয়েছেন তাদের অনেকের নাম রেল, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল সার্জন অফিসে প্রেরণ করা তালিকার সঙ্গে মিল নেই। তারা জানান, ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্নীতি করা হয়েছে। বিশেষ করে মালিকের সাথে যোগসাজশে বিলান জমি রাতারাতি বালু ফেলে ও গাছ রোপণ করে বাস্তুভিটা এবং ভবনের ক্ষতিপূরণ প্রকৃতপক্ষে বাস্তবে যা হওয়ার কথা তার কয়েকগুণ বেশি দেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছের চারা রোপণ করেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। পরে ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে এসব অর্থ। এভাবে বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল প্রকল্পে নিয়োজিত সার্ভেয়ার মো. মোখলেসুর রহমান ও ফায়ার সার্ভিসে প্রকল্পে নিয়োজিত মো. ইসমাইল হোসেনসহ রেললাইন প্রকল্পে নিয়োজিত আরো ৯ জন সার্ভেয়ার কোটিপতি বনে গেছে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে খুলনার নিজখামার স্বর্ণা মসজিদের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত দ্বিতলবিশিষ্ট ওই ভবনের মালিক গোলাম রহমান বলেন, তার বাড়ির ক্ষতিপূরণে ৭৮ লাখ টাকা তিনি বুঝে পেয়েছেন। তবে ভবনের বারান্দার কিছু অংশ ভাঙা হয়েছে কিন্তু সেটি পরিমাণে সামান্য হওয়ায় দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জমির মালিক বলেন, ফায়ার সার্ভিসে ট্রেনিং সেন্টার প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত তার জমির মূল্য দাঁড়ায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কমিশন হিসেবে সার্ভেয়ার মো. ইসমাইল হোসেনকে ৮ শতাংশ টাকা দেয়া লেগেছে। কমিশন ছাড়া ওই সার্ভেয়ার কোনোভাবেই চেক প্রদান করেননি। জেলা প্রশাসনের অফিসের সামনের একটি দোকানে এ টাকা প্রদান করা হয়।

মো. মোখলেসুর রহমান ও মো. ইসমাইল হোসেনসহ জেলা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন সার্ভেয়ারের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনো ধরনের বক্তব্য প্রদান করেননি। খুলনা ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক নূর হাসান আহমেদ বলেন, জমির মালিকরা তাদের কাছে অভিযোগ করেছে। কিন্তু এখানে তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই। কারণ জমি অধিগ্রহণের সব কাজ করে জেলা প্রশাসন। তারা জমি অধিগ্রহণ মূল্য পরিশোধ করেছেন মাত্র।
এ ব্যাপারে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, অভিযোগকারীদের তার কাছে নিয়ে এলে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।মানবজমিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» তোফায়েল ভাই অভিবাদন

» পেয়ারার যত গুণ

» মৃত্যুর জন্য যে শহরে যান মানুষ!

» মজাদার বাদাম মাটন কোরমা রেসিপি

» যেভাবে চিনবেন পদ্মার ইলিশ

» ইমামের পেছনে সুরা ফাতেহা পড়লে কি গুনাহ হবে?

» ‘আধ্যাত্মিক গুরুর’ ছেলের অফিসে ২০ কোটি ডলার, ৯০ কেজি সোনা!

» সংবাদ সম্মেলনে না থাকার কারণ জানালেন মাশরাফি

» বাংলাদেশ-ভারত টেস্ট দেখতে কলকাতা যাচ্ছেন শেখ হাসিনা

» নারী ও শিশু নির্যাতনের গল্পে তানহা তাসনিয়া

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

খুলনায় তিন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে সার্ভেয়ারদের কমিশন বাণিজ্য

বাস্তবায়নাধীন খুলনা-মংলা রেললাইন, বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ- এই তিন প্রকল্পে হয়েছে হরিলুট! অপকৌশলের মাধ্যমে শুধু যে ক্ষতিপূরণের মোটা অঙ্কের টাকা হরিলুট করা হয়েছে শুধু তা নয়; ৪শ’ ৭৯ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণেও করা হয়েছে কমিশন বাণিজ্য। জমির মালিকদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেয়া হয়েছে। এভাবে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছারিতার মাধ্যমে কোটিপতি বনে গেছে জেলা প্রশাসনের এল এ শাখার সার্ভেয়াররা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান নেটওয়ার্কের সঙ্গে মংলা বন্দরের রেল সংযোগ স্থাপন এবং মংলা বন্দরের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহের (ভারত, নেপাল ও ভুটান) রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় সরকার। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে ২০১০ সালের ২১শে ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় খুলনা-মংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন মেলে। এরপর ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতের সিইজি নিপ্পন কোয়ি জেভি প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালের ১৫ই অক্টোবর রূপসা রেলসেতুর পাইলিংয়ের কাজের উদ্বোধন করেন রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর মধ্যে রেললাইনের জন্য ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৮৯ লাখ এবং সেতুর জন্য ১ হাজার ৭৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

বাকি টাকা জমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ৩৭০ একর জমির মূল্য ধরা হয় ৩শ’ ৮৯ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ও ভারত সরকারের আর্থিক সহায়তায় এই রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তিন ভাগে বিভক্ত এ প্রকল্পে রূপসা নদীর ওপর হচ্ছে রেলসেতু, অপরটি রেললাইন এবং অন্যটি টেলিকমিউনিকেশন ও সিগন্যালিং। প্রকল্পের আওতায় লুপ লাইনসহ রেলওয়ে ট্রাকের দৈর্ঘ্য ৮৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ। আর খানজাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রূপসা নদীর ওপরে যুক্ত হবে ৫ দশমিক ১৩ কিলোমিটার রেলসেতু। এছাড়া ২১ ছোটখাট ব্রিজ ও ১১০ কালভার্ট নির্মিত হচ্ছে। খুলনার ফুলতলা থেকে মংলা পর্যন্ত ৮টি স্টেশন হচ্ছে। স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুলতলা, আড়ংঘাটা, মোহাম্মদ নগর, কাটাখালী, চুলকাঠি, ভাগা, দিগরাজ ও মংলা। সবমিলে এ প্রকল্পের গড় অগ্রগতি ৬০ শতাংশ।

এদিকে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলনায় একটি বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রতি দেন। এ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১২ সালে হাসপাতালটি নির্মাণের জন্য জায়গা খোঁজা শুরু করে গণপূর্ত বিভাগ। তবে জায়গা নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি। প্রথমে খুলনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (মন্নুজান স্কুল) ও লোকস্ট কলোনির সামনের খালি জায়গায় উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভাগীয় সার্কিট হাউস নির্মাণে নির্দিষ্ট থাকায় সেটি বাতিল হয়। পরবর্তীতে সোনাডাঙ্গা সিটি বাইপাস সড়ক সংলগ্ন ময়ূরী আবাসিক এলাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী স্থানের প্রায় পাঁচ একর জমিতে সরকারি শিশু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণ করে গণপূর্ত বিভাগ। এরপর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ ৪.৮০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। এর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের এল এ শাখা সর্বমোট ৫২ কোটি দু’লাখ টাকা দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী জমিও ইতিমধ্যে দখল নিয়ে সিভিল সার্জনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক হাসপাতালের ডিজাইন এখনো না আসায় দরপত্রের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিতে পারছেনা গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের মধ্যে ডিজাইন হাতে পেলে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে দরপত্রের জন্য বিজ্ঞপন দেয়া হবে।

অপরদিকে বটিয়াঘাটার খোলাবাড়ি মৌজায় ৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ট্রেনিং সেন্টারের জন্য ভবন ও ব্যারাকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় অনুমোদনের পর ২০১৮ সালে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। জমির অধিগ্রহণ মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৮ কোটি ২ লাখ টাকা। গত ৪ঠা আগস্ট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি ফায়ার সার্ভিসকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে, মুল প্রকল্পের কাজ কখন শুরু হবে তা কেউ বলতে পারেনি।

খুলনার নিজখামার স্বর্ণা মসজিদের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবন। পলেস্তারা না হওয়া নাম-নম্বরবিহীন ওই ভবনের মালিক গোলাম রহমান। বাস্তবায়নাধীন খুলনা-মংলা রেললাইন প্রকল্পের আওতায় গোলাম রহমানের ওই ভবনটির সামনের জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত জমির সাথে ভবনটির ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে ৭৮ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্পের ৬০ ভাগ অগ্রগতি হলেও ভবনটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে অপসারণ না হওয়ায় ওই পরিবারের সদস্যরা এখনও ভবন দখল করে বসবাস করছে।

বটিয়াঘাটার খোলাবাড়ি মৌজায় ৫ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং সেন্টার। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন ওই জমি অধিগ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি বালু ফেলে ভরাট করে ও গাছ রোপণ করে সার্ভেয়ারদের সহযোগিতায় অধিগ্রহণকৃত জমি বিলানকে বাস্তুভিটা দেখিয়ে অধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে ওই টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। ফলে ক্ষতিপূরণ মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।

জমির মালিকদের অভিযোগ, তিন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে ৫, ৬, ও ৮ শতাংশ কমিশন গ্রহণ করা হয়েছে। জমির দাগ, খতিয়ান ও কাগজপত্রের অবস্থা একটু খারাপ হলে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসনের এল এ শাখার সার্ভেয়াররা। এছাড়া বাস্তবে যারা জমি অধিগ্রহণের টাকা পেয়েছেন তাদের অনেকের নাম রেল, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল সার্জন অফিসে প্রেরণ করা তালিকার সঙ্গে মিল নেই। তারা জানান, ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্নীতি করা হয়েছে। বিশেষ করে মালিকের সাথে যোগসাজশে বিলান জমি রাতারাতি বালু ফেলে ও গাছ রোপণ করে বাস্তুভিটা এবং ভবনের ক্ষতিপূরণ প্রকৃতপক্ষে বাস্তবে যা হওয়ার কথা তার কয়েকগুণ বেশি দেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছের চারা রোপণ করেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। পরে ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে এসব অর্থ। এভাবে বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল প্রকল্পে নিয়োজিত সার্ভেয়ার মো. মোখলেসুর রহমান ও ফায়ার সার্ভিসে প্রকল্পে নিয়োজিত মো. ইসমাইল হোসেনসহ রেললাইন প্রকল্পে নিয়োজিত আরো ৯ জন সার্ভেয়ার কোটিপতি বনে গেছে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে খুলনার নিজখামার স্বর্ণা মসজিদের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত দ্বিতলবিশিষ্ট ওই ভবনের মালিক গোলাম রহমান বলেন, তার বাড়ির ক্ষতিপূরণে ৭৮ লাখ টাকা তিনি বুঝে পেয়েছেন। তবে ভবনের বারান্দার কিছু অংশ ভাঙা হয়েছে কিন্তু সেটি পরিমাণে সামান্য হওয়ায় দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জমির মালিক বলেন, ফায়ার সার্ভিসে ট্রেনিং সেন্টার প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত তার জমির মূল্য দাঁড়ায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কমিশন হিসেবে সার্ভেয়ার মো. ইসমাইল হোসেনকে ৮ শতাংশ টাকা দেয়া লেগেছে। কমিশন ছাড়া ওই সার্ভেয়ার কোনোভাবেই চেক প্রদান করেননি। জেলা প্রশাসনের অফিসের সামনের একটি দোকানে এ টাকা প্রদান করা হয়।

মো. মোখলেসুর রহমান ও মো. ইসমাইল হোসেনসহ জেলা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন সার্ভেয়ারের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনো ধরনের বক্তব্য প্রদান করেননি। খুলনা ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক নূর হাসান আহমেদ বলেন, জমির মালিকরা তাদের কাছে অভিযোগ করেছে। কিন্তু এখানে তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই। কারণ জমি অধিগ্রহণের সব কাজ করে জেলা প্রশাসন। তারা জমি অধিগ্রহণ মূল্য পরিশোধ করেছেন মাত্র।
এ ব্যাপারে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, অভিযোগকারীদের তার কাছে নিয়ে এলে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।মানবজমিন

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com