আড়ালে থাকা বিএনপিতে ‘মান্নানের সুস্থতা’ বড় ইস্যু

রাজধানীর আবদুল্লাহপুরের পর তুরাগ সেতু পার হলেই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের শুরু। সেখান থেকে জাতীয় মহাসড়ক ধরে এগোলে দুধারে চোখে পড়ে হরেক রকমের পোস্টার। এর মধ্যে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক দলের মূলত দুই প্রার্থীর ছবিসংবলিত পোস্টারই বেশি। আছে কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোস্টারও। চার মাস আগে চলে যাওয়া খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছার পোস্টার, স্বাধীনতা দিবস, শাসক দল বা এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নতুন কমিটির নানা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছাসংবলিত পোস্টারেরও কমতি নেই। আগামী ১৫ মে এই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের দিন ধার্য হয়েছে। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নেবে বলে ঘোষণাও দিয়েছে। এ দলের অন্তত চার নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী। তাহলে তাঁদের পোস্টার কোথায়?

টঙ্গী থেকে শুরু করে জয়দেবপুর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের কিছু জায়গায় বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের ছবি নিয়ে পোস্টার কদাচ চোখে পড়ে। কিন্তু এ সিটির বিএনপি-দলীয় মেয়র আবদুল মান্নানের কোনো পোস্টার মেলা ভার। কোনাবাড়ীতে মান্নানের বিরুদ্ধে সরকারের ‘ষড়যন্ত্রমূলক মামলার’ প্রতিবাদে কিছু নেতা-কর্মীর পোস্টার আছে বটে; তবে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কিছু নেই। বিএনপির গাজীপুর সদর উপজেলার যুগ্ম সম্পাদক এবং এবারে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী শওকত হোসেন সরকার বলছিলেন, ‘দলের নেতা-কর্মীদের প্রত্যেকের একাধিক মামলা। আমি নিজে তিন মামলা মাথায় নিয়া ঘুরতেছি। পোস্টার তৈরি করবে কে, সাঁটাবে কে? তবে দল নির্বাচনে প্রস্তুত।’

পোস্টার, ব্যানারের মতো দৃশ্যমান প্রচারে না থাকলেও বিএনপির তৎপরতা রয়েছে। মেয়র পদের প্রার্থিতা নিয়ে মূল দুই প্রার্থীর মধ্যে অভিযোগ, পাল্টা-অভিযোগও যথেষ্ট। মেয়র মান্নানের শারীরিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসান সরকারও।

হাসপাতালে থেকে সদ্য বাড়ি ফেরা আবদুল মান্নান বলছেন, মেয়র নির্বাচন করতে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ।

তরুণ নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা কারও কারও থাকলেও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থিতার মূল আলোচনা কিন্তু মান্নান-হাসান সরকারকে নিয়েই। দুজনই তাঁদের প্রার্থিতার বিষয়ে নিশ্চিত। জোর তৎপরতাও চলছে তাদের। মান্নান-হাসান সরকারের দীর্ঘ দিনের বিরোধ এবার নির্বাচনের আগেও প্রকট।

টঙ্গীর কলেজ গেটটির কাছে হাসান সরকারের বাড়িতে গিয়ে নেতা-কর্মীদের ভিড় দেখা গেল। বাড়ির নিচতলার বৈঠকখানায় টেবিলের সামনে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত তিনি। একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিও আসছেন-যাচ্ছেন।

১৯৭৪ সালে টঙ্গী পৌরসভা হলে এর প্রথম চেয়ারম্যান হন হাসান উদ্দিন সরকার। ছাত্রজীবনে গাজীপুর নর্থ মহকুমার ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। পরে শ্রমিক লীগ করেছেন। কাজী জাফর আহমেদের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন তারপর। এরশাদ ক্ষমতায় এলে যান জাতীয় পার্টিতে। দুবার এ দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন জাতীয় পার্টির আমলে। ১৯৯৯ সালে আবার ফেরেন বিএনপিতে। ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করেন। দীর্ঘদিনের বিএনপির নেতা আবদুল মান্নান দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দ্বিতীয় হন। আওয়ামী লীগ জেতে এ আসনে। হাসান সরকার হন তৃতীয়। এই দলবদলকে তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সমালোচনার খোরাক, স্বীকার করেন এ তল্লাটের বনেদি সরকার পরিবারের সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘অনেক নেতাই দলবদল করেন। বাম দল থেকে অনেকেই তো আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।’

এলাকায় অন্তত গোটা পঁচিশ স্কুল করেছেন সরকারেরা। সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি টঙ্গীর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসান সরকারের হাতে তৈরি প্রতিষ্ঠান। তাঁর এসব সামাজিক কর্মকাণ্ড আর এলাকার মাটি কামড়ে পড়ে থাকাকে এবার দল বিবেচনা করবে, যথেষ্ট আশাবাদী হাসান সরকার। হাসান বললেন, ‘দলের পক্ষ থেকে কাজ করার জন্য বলছে। আমি কাজ করছি।’ কোন নেতা বা নেতারা তাঁকে মনোনয়নের নিশ্চয়তা দিয়েছেন এ বিষয়ে কিন্তু তিনি বলেননি। বললেন, ‘আমি খুব আশাবাদী, দলের মনোনয়ন পাব।’ দলীয় প্রতিপক্ষ আবদুল মান্নান অসুস্থ, এ অবস্থায় তিনি কীভাবে নির্বাচন করতে চান, তা নিয়ে বিস্মিত হাসান সরকার। গত নির্বাচনে তিনি মান্নানের হয়ে যথেষ্ট খেটেছেন। তবে এরপরও নেতা-কর্মীরা মেয়রের সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, এমন অভিযোগ হাসান সরকারের। বললেন, ‘এলাকায় থেকেই রাজনীতি করি। ঢাকায় চলে যাই না। চিকিৎসার জন্য হুট করে দেশের বাইরেও ছুটি না।’ এ কথার লক্ষ্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল মান্নান, স্পষ্ট বোঝা যায়।

অসুস্থ হয়ে বেশ কিছুদিন এলাকা থেকে দূরে থেকে, পোস্টার-ব্যানারে অদৃশ্য থেকেও সিটি মেয়র আবদুল মান্নান যে এখনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, তা হাসান সরকারের কথায় স্পষ্ট। সুস্থ মান্নান নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, মানেন আওয়ামী লীগের নেতারাও। বিএনপির নেতাদের বাইরে সাধারণ মানুষেরও ধারণা এমনই। গাজীপুরের গাছার একটি স্টলে কথা হচ্ছিল কয়েকজনের সঙ্গে। আড্ডারত মালেক মিয়া বললেন, ‘মান্নান স্যারের শরীর ভালো থাকলে তাঁর সামনে কেউ খাড়াইতে পারব না।’

টঙ্গী কলেজ এবং পরে গাজীপুরের কাজী আজিউদ্দিন কলেজের রসায়নের সাবেক অধ্যাপক আবদুল মান্নান এলাকার অনেকের কাছে ‘স্যার’। গাজীপুর সদর উপজেলার কাউতিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। গ্রাম সরকারের সদস্য ছিলেন। পরে জেলা বিএনপির নেতা হন। এখন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে দেশে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হন। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হন বিএনপির আমলে। ২০০১ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। পরে দলে ফিরে আসেন। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হন লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। গত প্রায় পাঁচ বছরে ২২ মাস জেল খেটেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এযাবৎ ৩০টি মামলা হয়েছে। জেলখানা থেকে বের হয়ে প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থ। এক মাস আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। আবদুল মান্নান এখন আছেন রাজধানীর বারিধারার বাসায়। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে গত দুই দিনে চার দফায় আবদুল মান্নানের ফোনে কথা হয়। তবে সব সময় ফোন ধরেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী নাহিদুল ইসলাম। গতকাল তিনি জানান, ‘স্যার বলেছেন, তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি নির্বাচন করতে প্রস্তুত।’ গতকাল আবদুল মান্নানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে আজ মঙ্গলবার কথা বলার জন্য বলেন। আজ দুই দফায় ফোন করার পর জানানো হয়, আবদুল মান্নান অসুস্থ বোধ করছেন। কথা বলতে পারবেন না।

হাসান সরকার এবং তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, আবদুল মান্নানের অসুস্থতাই বড় বিষয় নয়। মেয়র হিসেবে তাঁর ব্যর্থতার জন্যই তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত না—এমন মন্তব্য জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বশির উদ্দিনের। তিনি বলেন, জেল খাটার পর মান্নান সাহেব ১০ মাস সময় মেয়র হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময়ে কত কাজ হয়েছে? দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তিনি কতটুকু থেকেছেন? গত পাঁচ বছরে একটি ফোনও তিনি আমাকে করেননি।’

এ প্রসঙ্গে আবদুল মান্নানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের বৈরী আচরণের পর যাঁরা তাঁর সমালোচনা করেন, তাঁরা কতটুকু দলের ভালো চান, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

জেলার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকার বলছিলেন, ‘এখানে অপেক্ষাকৃত কমবয়সী কাউকে বেছে নেওয়া উচিত। দল যাকে দিক, আমরা তার সঙ্গে আছি।’

গাজীপুর জেলা বিএনপির নেতাদের সবারই একটি বিশ্বাস; দলীয় প্রার্থী যে-ই হোন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিজয় নিশ্চিত। সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষুব্ধ মনোভাবই এর কারণ বলে মনে করেন তাঁরা। এরপর আছে প্রতীক। ধানের শীষ প্রতীক পেলে যে-কেউ ভালো করবে বলে তাঁদের ধারণা। গাজীপুর সদর উপজেলার তিন ইউনিয়নের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল তাঁদের এ বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। সদরের মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়ে বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন। পিরুজালিতে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যাওয়া এবং সেখানে বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত প্রার্থী।

বিএনপির আশাবাদী নেতা-কর্মীদের একটি মূল্যায়ন হলো, মান্নান প্রার্থী হিসেবে হাসান সরকারের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি প্রার্থী হলে আর দলীয় নির্দেশনা থাকলে হয়তো হাসান সরকার তাঁর হয়ে কাজ করবেন। কিন্তু হাসান সরকার প্রার্থী হলে মান্নান বা তাঁর অনুসারীরা হাসানের পক্ষে থাকবেন, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। অতীতে তিনি এর নজির রেখেছেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিরও কাছে দুজনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি উদ্বেগের। তাই তাঁরাও নানা-হিসাব নিকাশ করছেন, সময় নিচ্ছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থায়ী কমিটি প্রার্থিতার মনোনয়ন বিবেচনা করছে। ১০ এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে জানা যাবে না।’

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ‘ভিসির নির্দেশে’ গোপালগঞ্জে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

» অতিরিক্ত মেকআপে রয়েছে স্বাস্থ্য-ঝুঁকির আশঙ্কা!

» দরুদ শরিফের অসামান্য বরকত

» লুটেরা ভয়ে আছে, জনগণ স্বস্তিতে

» কফ-কাশির নেপথ্য কারণ

» চকবাজারের যুবলীগ নেতা টিনু গ্রেফতার

» শখ আবার আড়ালে

» টেন্ডার-চাঁদাবাজিতে খালেদের পুরো পরিবার

» সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার আতঙ্ক নিরাপত্তা চেয়ে সিলেটে ৫৬ সাংবাদিকের জিডি

» ২ কর্মকর্তা লাপাত্তা

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

আড়ালে থাকা বিএনপিতে ‘মান্নানের সুস্থতা’ বড় ইস্যু

রাজধানীর আবদুল্লাহপুরের পর তুরাগ সেতু পার হলেই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের শুরু। সেখান থেকে জাতীয় মহাসড়ক ধরে এগোলে দুধারে চোখে পড়ে হরেক রকমের পোস্টার। এর মধ্যে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক দলের মূলত দুই প্রার্থীর ছবিসংবলিত পোস্টারই বেশি। আছে কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোস্টারও। চার মাস আগে চলে যাওয়া খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছার পোস্টার, স্বাধীনতা দিবস, শাসক দল বা এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নতুন কমিটির নানা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছাসংবলিত পোস্টারেরও কমতি নেই। আগামী ১৫ মে এই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের দিন ধার্য হয়েছে। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নেবে বলে ঘোষণাও দিয়েছে। এ দলের অন্তত চার নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী। তাহলে তাঁদের পোস্টার কোথায়?

টঙ্গী থেকে শুরু করে জয়দেবপুর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের কিছু জায়গায় বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের ছবি নিয়ে পোস্টার কদাচ চোখে পড়ে। কিন্তু এ সিটির বিএনপি-দলীয় মেয়র আবদুল মান্নানের কোনো পোস্টার মেলা ভার। কোনাবাড়ীতে মান্নানের বিরুদ্ধে সরকারের ‘ষড়যন্ত্রমূলক মামলার’ প্রতিবাদে কিছু নেতা-কর্মীর পোস্টার আছে বটে; তবে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কিছু নেই। বিএনপির গাজীপুর সদর উপজেলার যুগ্ম সম্পাদক এবং এবারে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী শওকত হোসেন সরকার বলছিলেন, ‘দলের নেতা-কর্মীদের প্রত্যেকের একাধিক মামলা। আমি নিজে তিন মামলা মাথায় নিয়া ঘুরতেছি। পোস্টার তৈরি করবে কে, সাঁটাবে কে? তবে দল নির্বাচনে প্রস্তুত।’

পোস্টার, ব্যানারের মতো দৃশ্যমান প্রচারে না থাকলেও বিএনপির তৎপরতা রয়েছে। মেয়র পদের প্রার্থিতা নিয়ে মূল দুই প্রার্থীর মধ্যে অভিযোগ, পাল্টা-অভিযোগও যথেষ্ট। মেয়র মান্নানের শারীরিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসান সরকারও।

হাসপাতালে থেকে সদ্য বাড়ি ফেরা আবদুল মান্নান বলছেন, মেয়র নির্বাচন করতে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ।

তরুণ নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা কারও কারও থাকলেও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থিতার মূল আলোচনা কিন্তু মান্নান-হাসান সরকারকে নিয়েই। দুজনই তাঁদের প্রার্থিতার বিষয়ে নিশ্চিত। জোর তৎপরতাও চলছে তাদের। মান্নান-হাসান সরকারের দীর্ঘ দিনের বিরোধ এবার নির্বাচনের আগেও প্রকট।

টঙ্গীর কলেজ গেটটির কাছে হাসান সরকারের বাড়িতে গিয়ে নেতা-কর্মীদের ভিড় দেখা গেল। বাড়ির নিচতলার বৈঠকখানায় টেবিলের সামনে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত তিনি। একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিও আসছেন-যাচ্ছেন।

১৯৭৪ সালে টঙ্গী পৌরসভা হলে এর প্রথম চেয়ারম্যান হন হাসান উদ্দিন সরকার। ছাত্রজীবনে গাজীপুর নর্থ মহকুমার ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। পরে শ্রমিক লীগ করেছেন। কাজী জাফর আহমেদের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন তারপর। এরশাদ ক্ষমতায় এলে যান জাতীয় পার্টিতে। দুবার এ দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন জাতীয় পার্টির আমলে। ১৯৯৯ সালে আবার ফেরেন বিএনপিতে। ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করেন। দীর্ঘদিনের বিএনপির নেতা আবদুল মান্নান দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দ্বিতীয় হন। আওয়ামী লীগ জেতে এ আসনে। হাসান সরকার হন তৃতীয়। এই দলবদলকে তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সমালোচনার খোরাক, স্বীকার করেন এ তল্লাটের বনেদি সরকার পরিবারের সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘অনেক নেতাই দলবদল করেন। বাম দল থেকে অনেকেই তো আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।’

এলাকায় অন্তত গোটা পঁচিশ স্কুল করেছেন সরকারেরা। সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি টঙ্গীর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসান সরকারের হাতে তৈরি প্রতিষ্ঠান। তাঁর এসব সামাজিক কর্মকাণ্ড আর এলাকার মাটি কামড়ে পড়ে থাকাকে এবার দল বিবেচনা করবে, যথেষ্ট আশাবাদী হাসান সরকার। হাসান বললেন, ‘দলের পক্ষ থেকে কাজ করার জন্য বলছে। আমি কাজ করছি।’ কোন নেতা বা নেতারা তাঁকে মনোনয়নের নিশ্চয়তা দিয়েছেন এ বিষয়ে কিন্তু তিনি বলেননি। বললেন, ‘আমি খুব আশাবাদী, দলের মনোনয়ন পাব।’ দলীয় প্রতিপক্ষ আবদুল মান্নান অসুস্থ, এ অবস্থায় তিনি কীভাবে নির্বাচন করতে চান, তা নিয়ে বিস্মিত হাসান সরকার। গত নির্বাচনে তিনি মান্নানের হয়ে যথেষ্ট খেটেছেন। তবে এরপরও নেতা-কর্মীরা মেয়রের সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, এমন অভিযোগ হাসান সরকারের। বললেন, ‘এলাকায় থেকেই রাজনীতি করি। ঢাকায় চলে যাই না। চিকিৎসার জন্য হুট করে দেশের বাইরেও ছুটি না।’ এ কথার লক্ষ্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল মান্নান, স্পষ্ট বোঝা যায়।

অসুস্থ হয়ে বেশ কিছুদিন এলাকা থেকে দূরে থেকে, পোস্টার-ব্যানারে অদৃশ্য থেকেও সিটি মেয়র আবদুল মান্নান যে এখনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, তা হাসান সরকারের কথায় স্পষ্ট। সুস্থ মান্নান নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, মানেন আওয়ামী লীগের নেতারাও। বিএনপির নেতাদের বাইরে সাধারণ মানুষেরও ধারণা এমনই। গাজীপুরের গাছার একটি স্টলে কথা হচ্ছিল কয়েকজনের সঙ্গে। আড্ডারত মালেক মিয়া বললেন, ‘মান্নান স্যারের শরীর ভালো থাকলে তাঁর সামনে কেউ খাড়াইতে পারব না।’

টঙ্গী কলেজ এবং পরে গাজীপুরের কাজী আজিউদ্দিন কলেজের রসায়নের সাবেক অধ্যাপক আবদুল মান্নান এলাকার অনেকের কাছে ‘স্যার’। গাজীপুর সদর উপজেলার কাউতিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। গ্রাম সরকারের সদস্য ছিলেন। পরে জেলা বিএনপির নেতা হন। এখন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে দেশে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হন। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হন বিএনপির আমলে। ২০০১ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। পরে দলে ফিরে আসেন। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হন লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। গত প্রায় পাঁচ বছরে ২২ মাস জেল খেটেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এযাবৎ ৩০টি মামলা হয়েছে। জেলখানা থেকে বের হয়ে প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থ। এক মাস আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। আবদুল মান্নান এখন আছেন রাজধানীর বারিধারার বাসায়। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে গত দুই দিনে চার দফায় আবদুল মান্নানের ফোনে কথা হয়। তবে সব সময় ফোন ধরেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী নাহিদুল ইসলাম। গতকাল তিনি জানান, ‘স্যার বলেছেন, তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি নির্বাচন করতে প্রস্তুত।’ গতকাল আবদুল মান্নানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে আজ মঙ্গলবার কথা বলার জন্য বলেন। আজ দুই দফায় ফোন করার পর জানানো হয়, আবদুল মান্নান অসুস্থ বোধ করছেন। কথা বলতে পারবেন না।

হাসান সরকার এবং তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, আবদুল মান্নানের অসুস্থতাই বড় বিষয় নয়। মেয়র হিসেবে তাঁর ব্যর্থতার জন্যই তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত না—এমন মন্তব্য জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বশির উদ্দিনের। তিনি বলেন, জেল খাটার পর মান্নান সাহেব ১০ মাস সময় মেয়র হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময়ে কত কাজ হয়েছে? দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তিনি কতটুকু থেকেছেন? গত পাঁচ বছরে একটি ফোনও তিনি আমাকে করেননি।’

এ প্রসঙ্গে আবদুল মান্নানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের বৈরী আচরণের পর যাঁরা তাঁর সমালোচনা করেন, তাঁরা কতটুকু দলের ভালো চান, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

জেলার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকার বলছিলেন, ‘এখানে অপেক্ষাকৃত কমবয়সী কাউকে বেছে নেওয়া উচিত। দল যাকে দিক, আমরা তার সঙ্গে আছি।’

গাজীপুর জেলা বিএনপির নেতাদের সবারই একটি বিশ্বাস; দলীয় প্রার্থী যে-ই হোন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিজয় নিশ্চিত। সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষুব্ধ মনোভাবই এর কারণ বলে মনে করেন তাঁরা। এরপর আছে প্রতীক। ধানের শীষ প্রতীক পেলে যে-কেউ ভালো করবে বলে তাঁদের ধারণা। গাজীপুর সদর উপজেলার তিন ইউনিয়নের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল তাঁদের এ বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। সদরের মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়ে বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন। পিরুজালিতে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যাওয়া এবং সেখানে বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত প্রার্থী।

বিএনপির আশাবাদী নেতা-কর্মীদের একটি মূল্যায়ন হলো, মান্নান প্রার্থী হিসেবে হাসান সরকারের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি প্রার্থী হলে আর দলীয় নির্দেশনা থাকলে হয়তো হাসান সরকার তাঁর হয়ে কাজ করবেন। কিন্তু হাসান সরকার প্রার্থী হলে মান্নান বা তাঁর অনুসারীরা হাসানের পক্ষে থাকবেন, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। অতীতে তিনি এর নজির রেখেছেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিরও কাছে দুজনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি উদ্বেগের। তাই তাঁরাও নানা-হিসাব নিকাশ করছেন, সময় নিচ্ছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থায়ী কমিটি প্রার্থিতার মনোনয়ন বিবেচনা করছে। ১০ এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে জানা যাবে না।’

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Design & Developed BY ThemesBazar.Com