আবরার হত্যা! কেনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হায়নার থাবা?

অ আ আবীর আকাশ:
এক একটি মৃত্যু আমাদের এক একটি চেতনা জাগ্রত করে। উদাহরণ দিলে প্রচুর রয়েছে। নুরহোসেন থেকে প্রীতিলতা এরকম বহু দামি মানুষের জীবনের বিনিময়ে আমাদের এই সভ্য সমাজে রাষ্ট্রে এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিস্তৃতি সঞ্চার করে। এদেশের বহু গর্ভধারিনী মা তার সন্তানকে ঠেলে দিয়েছেন দেশের কল্যাণে। মুক্তিকামী মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন এদেশে অহেতুক ইস্যু তৈরি করে মানুষ হত্যা করার উৎসব চলছে। এসব হত্যার বিচার না হওয়ায় আরো উৎসাহিত হচ্ছে হত্যাকারীরা। রাজনৈতিক প্রটোকলে পার পেয়ে যাচ্ছে খুনিরা। তবে কি এদেশের নিরীহ সাধারণের কোনো দাম নেই? স্বাধীন দেশে কি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে না? তাহলে কেনো স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে গিয়ে আবরারকে খুন হতে হলো? মঞ্চে বিবৃতিতে রাজনৈতিক নেতারা আশার বাণী শোনালেও আদতে তারাই উস্কানি দিয়ে মানুষ হত্যা করাচ্ছে। নইলে কিভাবে এমন একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা সম্পন্ন রাষ্ট্রে উল্লাস করে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে? হত্যা শেষে খুনিরা পার্টি করে, মদ খেয়ে নাচে!
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে গত রবিবার মধ্যরাতে। এই নিয়ে দেশের ভেতরে যেমন উত্তাল তেমনি বহির্বিশ্বেও গণমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। আবরার ফাহাদের দোষ ছিল সে তার ফেসবুক আইডিতে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল। এই স্ট্যাটাসে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার নিয়ে লেখেন- ‘৪৭এ দেশ ভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্র বন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করলো। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেরা মাপার পরামর্শ দিয়েছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষের উদ্বোধনের আগেই মংলাবন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। কাবেরী নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েক বছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশে এক রাজ্য অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড় লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব। কয়েক বছর আগে  নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কল-কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজেদের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাবো। হয়তো এ সুখের খোঁজে কবি লিখেছেন- পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/ এ জীবন মন সকলি দাও,/ তার মতো সুখ কোথাও কি আছে /আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
উপরোক্ত কথাগুলোর জন্য কি একজন মানুষকে মেরে ফেলতে হয়? কয়েক দফায় বিভক্ত হয়ে ছাত্রনামধারী খুনিরা আবরার ফাহাদকে হাত-পা ধরে শূন্যে তুলে তুলোধুনো করে প্রানে মেরে ফেলেছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গা শিউরে উঠেছে বাংলার মানুষের সাথে সারা পৃথিবীর মানুষের। কেঁপে উঠেছে বুক। কিন্তু কি একবারের জন্যও খুনিদের মনে মায়া জমেছে? না। তারা তো খুনি, অসুর। তাদের শাস্তি কি হবে জানিনা। তবে সারাদেশে যে উত্তাল চলছে, তাতে সবারই একই দাবি উত্থাপিত হচ্ছে যে ‘খুনিদের ফাঁসি হোক’। সরকার বা দলের নেতাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ বা আবরার ফাহাদ এর মা-বাবা এমনকি পরিবারের শোকের মাতম কতোটুকু গ্রহণযোগ্যতা পায় তা দেখার বিষয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তার চলছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোণঠাসা হয় পড়েছে।পান থেকে চুন খসলেই ধরে নিয়ে মারধর করাসহ টাকা মোবাইল ঘড়ি এমনকি পরণের বেল্ট পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে যায়। ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টর্চার সেল’ তৈরি করে সেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপর্যুপরি নির্যাতন করে। বিক্ষিপ্ত দু-একটা সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও বহু মারাত্মক মারাত্মক ঘটনা চাপা পড়ে যায়। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
এক্ষেত্রে উদ্যোগের আরেকটি বিষয় হলো ছাত্রদের যদি এতো নির্যাতন করা হয় তাহলে এইসব নরপশুরা ছাত্রীদের নিয়ে কি করে? হয়তো এর উত্তর সাময়িকভাবে এখন হয়না কিন্তু পরক্ষণে ক্যাসিনো ও বালিশ পর্দার ঘটনার মতোই বোম বাস্ট এর মতো বেরিয়ে আসতে থাকবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার বা রাজনৈতিক নেতারা কি জবাব দেবেন?
আবরার ফাহাদ হত্যায় চকবাজার থানায় মামলা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ফাহাদের বন্ধু সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা খুনিদের চিহ্নিত করে নামের তালিকা তৈরি করে দিয়েছেন। সে তালিকা মোতাবেক ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে আবরার ফাহাদ এর বাবা মামলা করেছেন। আসামিদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার পড়েছে গোয়েন্দা বিভাগের উপর। লোক দেখানো নাকি সত্যি সত্যি তদন্ত কমিটি গঠন ও থানায় জিডি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ! ৩৬ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। তখন উপায়ান্তর না পেয়ে নানা আশ্বাস দিয়ে কোনোরকম পার পেয়ে যান।
দেশব্যাপী আরেকটা ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল যে, তিনি লালবাগে থাকেন কিন্তু পলাশীর শেরেবাংলা হল ১০১১ থেকে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নাম্বার মানে ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ধরে নিয়ে পিটানোর সময়ে হল কর্তৃপক্ষ পুলিশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবাই জেনেছেন, দেখেছেনও। সাধারণ শিক্ষার্থীরা সিট হারানোর ভয়ে কোনো প্রতিবাদ না করলেও মনে হচ্ছে পুলিশকে তারাই খবরটা পৌঁছেছিলো। নয়তো পুলিশ তাৎক্ষণিক ওই হলের মুখ পর্যন্ত কিভাবে আসলো! টর্চার সেলের গেট পর্যন্ত এলেও ভেতরে ঢুকতে দেয়নি পুলিশকে ছাত্রলীগ নামধারী খুনিদের সহযোগীরা। পুলিশ ফেরৎ চলে যায়। হল কর্তৃপক্ষ কি ভিসি ও প্রো ভিসিকে জানিয়েছিলো? জানালে ভিসি ও প্রো ভিসি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি কেনো? আবরার ফাহাদের প্রাণবাতি সহপাঠীদের আনা এম্বুলেন্সে উঠানোর আগেই নিভে যায়। তখনও কি হল কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিসি-প্রোভিসি মৃত্যুর খবর পাননি? পেলে কি তাকে দেখতে এসেছিলেন? আসেননি। পরদিন? সকালে? দুপুরে? রাতে? আসেননি।পরদিন দেশব্যাপী ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তাল প্রতিবাদের মুখে ভিসি তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে বোঝাপড়া শেষে ক্যাম্পাসে এলেন। এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন এবং তারা ভিসিকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।
ভিসি-প্রোভিসির এ ধরনের কার্যকলাপে দেশের সচেতন মহল, প্রথিতযশা ব্যক্তিদের মাঝে ধিক্কার ও ঘৃণার ঝড় উঠে। অনেকেই তাদের চাকরীচ্যুত করার দাবি জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। কতো নিচমনা, ছোটলোক হলে ভিসি-প্রোভিসি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করতে পারেন, তাও একজন মেধাবী সাধারণ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়ে। যদি তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হতো তাহলে আবরার ফাহাদ বেঁচে যেতে পারতো। আহত আবরার ফাহাদ বলেছিলো- ‘আমাকে হাসপাতালে নাও, আমি বাঁচবো’। সহপাঠীরা এম্বুলেন্স কল করে নিয়ে আসার আগেই আবরার ফাহাদের প্রাণ উড়ে যায়।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা মনে করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ হয়তো নিরাপদ হবে তাদের সন্তানদের জন্য। আদতে কি তা আছে? এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজনীতির শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন প্রায় অর্ধ শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী। এদের কোনো সঠিক বিচার হয়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ বিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে হত্যার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে। দেশের লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থী মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডারদের হাতে জিম্মি। আবরার ফাহাদকে খুনের মধ্যদিয়ে মুখোশ খুলে গেলো যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জিম্মিদশায় রয়েছেন ছাত্রলীগের কাছে। নইলে হল দখল, বরাদ্দ, সিট বাণিজ্য,অস্ত্র-গোলাবারুদ হলে মজুদ, রাখা ছাত্রলীগের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেনো? এগুলো যদি ছাত্রলীগের হাতে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকে তাহলে হল কর্তৃপক্ষের কাজ কি? হল সুপার কিবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ কি? উত্তর না মিললেও এখন মুখোশ খুলে আমজনতা জেনে গেছে ছাত্রলীগই সব। হল কর্তৃপক্ষ না শুধু, ভিসি প্রো ভিসি, প্রশাসন সবাই ছাত্রলীগকে মানতে বাধ্য হচ্ছেন।
আশার কথা হচ্ছে, আবরার ফাহাদকে খুনের সাথে জড়িত ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদকসহ ১৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আরো অভিযান চলছে। যেহেতু আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ মিলেছে তাহলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে এমনটাই দেশব্যাপী আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সচেতন মহল কামনা করছেন। এতে যেনো কোনোরকম দলীয়করণ, আত্মীয় করন, বৈধকরণ, অবৈধকরণ করা না হয় সরকার ও বিচারব্যবস্থার প্রতি দেশ ও দেশের মানুষের এমনটাই দাবি। স্বাধীন দেশে যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হোক। কারো বলার টুঁটি যেনো আর চেপে ধরা না হয়, কণ্ঠরোধ করা না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে সরকারকে। এমন অপরাজনীতি যারা করেছে, রাজনীতির দোহাই দিয়ে নিরীহ সাধারণ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। যাতে করে আর কারো সাহস না হয় কাউকে হত্যা করার।
লেখক : কবি প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
সম্পাদক : আবীর আকাশ জার্নাল
Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» তোফায়েল ভাই অভিবাদন

» পেয়ারার যত গুণ

» মৃত্যুর জন্য যে শহরে যান মানুষ!

» মজাদার বাদাম মাটন কোরমা রেসিপি

» যেভাবে চিনবেন পদ্মার ইলিশ

» ইমামের পেছনে সুরা ফাতেহা পড়লে কি গুনাহ হবে?

» ‘আধ্যাত্মিক গুরুর’ ছেলের অফিসে ২০ কোটি ডলার, ৯০ কেজি সোনা!

» সংবাদ সম্মেলনে না থাকার কারণ জানালেন মাশরাফি

» বাংলাদেশ-ভারত টেস্ট দেখতে কলকাতা যাচ্ছেন শেখ হাসিনা

» নারী ও শিশু নির্যাতনের গল্পে তানহা তাসনিয়া

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

আবরার হত্যা! কেনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হায়নার থাবা?

অ আ আবীর আকাশ:
এক একটি মৃত্যু আমাদের এক একটি চেতনা জাগ্রত করে। উদাহরণ দিলে প্রচুর রয়েছে। নুরহোসেন থেকে প্রীতিলতা এরকম বহু দামি মানুষের জীবনের বিনিময়ে আমাদের এই সভ্য সমাজে রাষ্ট্রে এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিস্তৃতি সঞ্চার করে। এদেশের বহু গর্ভধারিনী মা তার সন্তানকে ঠেলে দিয়েছেন দেশের কল্যাণে। মুক্তিকামী মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন এদেশে অহেতুক ইস্যু তৈরি করে মানুষ হত্যা করার উৎসব চলছে। এসব হত্যার বিচার না হওয়ায় আরো উৎসাহিত হচ্ছে হত্যাকারীরা। রাজনৈতিক প্রটোকলে পার পেয়ে যাচ্ছে খুনিরা। তবে কি এদেশের নিরীহ সাধারণের কোনো দাম নেই? স্বাধীন দেশে কি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে না? তাহলে কেনো স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে গিয়ে আবরারকে খুন হতে হলো? মঞ্চে বিবৃতিতে রাজনৈতিক নেতারা আশার বাণী শোনালেও আদতে তারাই উস্কানি দিয়ে মানুষ হত্যা করাচ্ছে। নইলে কিভাবে এমন একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা সম্পন্ন রাষ্ট্রে উল্লাস করে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে? হত্যা শেষে খুনিরা পার্টি করে, মদ খেয়ে নাচে!
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে গত রবিবার মধ্যরাতে। এই নিয়ে দেশের ভেতরে যেমন উত্তাল তেমনি বহির্বিশ্বেও গণমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। আবরার ফাহাদের দোষ ছিল সে তার ফেসবুক আইডিতে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল। এই স্ট্যাটাসে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার নিয়ে লেখেন- ‘৪৭এ দেশ ভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্র বন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করলো। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেরা মাপার পরামর্শ দিয়েছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষের উদ্বোধনের আগেই মংলাবন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। কাবেরী নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েক বছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশে এক রাজ্য অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড় লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব। কয়েক বছর আগে  নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কল-কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজেদের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাবো। হয়তো এ সুখের খোঁজে কবি লিখেছেন- পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/ এ জীবন মন সকলি দাও,/ তার মতো সুখ কোথাও কি আছে /আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
উপরোক্ত কথাগুলোর জন্য কি একজন মানুষকে মেরে ফেলতে হয়? কয়েক দফায় বিভক্ত হয়ে ছাত্রনামধারী খুনিরা আবরার ফাহাদকে হাত-পা ধরে শূন্যে তুলে তুলোধুনো করে প্রানে মেরে ফেলেছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গা শিউরে উঠেছে বাংলার মানুষের সাথে সারা পৃথিবীর মানুষের। কেঁপে উঠেছে বুক। কিন্তু কি একবারের জন্যও খুনিদের মনে মায়া জমেছে? না। তারা তো খুনি, অসুর। তাদের শাস্তি কি হবে জানিনা। তবে সারাদেশে যে উত্তাল চলছে, তাতে সবারই একই দাবি উত্থাপিত হচ্ছে যে ‘খুনিদের ফাঁসি হোক’। সরকার বা দলের নেতাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ বা আবরার ফাহাদ এর মা-বাবা এমনকি পরিবারের শোকের মাতম কতোটুকু গ্রহণযোগ্যতা পায় তা দেখার বিষয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তার চলছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোণঠাসা হয় পড়েছে।পান থেকে চুন খসলেই ধরে নিয়ে মারধর করাসহ টাকা মোবাইল ঘড়ি এমনকি পরণের বেল্ট পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে যায়। ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টর্চার সেল’ তৈরি করে সেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপর্যুপরি নির্যাতন করে। বিক্ষিপ্ত দু-একটা সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও বহু মারাত্মক মারাত্মক ঘটনা চাপা পড়ে যায়। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
এক্ষেত্রে উদ্যোগের আরেকটি বিষয় হলো ছাত্রদের যদি এতো নির্যাতন করা হয় তাহলে এইসব নরপশুরা ছাত্রীদের নিয়ে কি করে? হয়তো এর উত্তর সাময়িকভাবে এখন হয়না কিন্তু পরক্ষণে ক্যাসিনো ও বালিশ পর্দার ঘটনার মতোই বোম বাস্ট এর মতো বেরিয়ে আসতে থাকবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার বা রাজনৈতিক নেতারা কি জবাব দেবেন?
আবরার ফাহাদ হত্যায় চকবাজার থানায় মামলা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ফাহাদের বন্ধু সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা খুনিদের চিহ্নিত করে নামের তালিকা তৈরি করে দিয়েছেন। সে তালিকা মোতাবেক ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে আবরার ফাহাদ এর বাবা মামলা করেছেন। আসামিদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার পড়েছে গোয়েন্দা বিভাগের উপর। লোক দেখানো নাকি সত্যি সত্যি তদন্ত কমিটি গঠন ও থানায় জিডি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ! ৩৬ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। তখন উপায়ান্তর না পেয়ে নানা আশ্বাস দিয়ে কোনোরকম পার পেয়ে যান।
দেশব্যাপী আরেকটা ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল যে, তিনি লালবাগে থাকেন কিন্তু পলাশীর শেরেবাংলা হল ১০১১ থেকে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নাম্বার মানে ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ধরে নিয়ে পিটানোর সময়ে হল কর্তৃপক্ষ পুলিশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবাই জেনেছেন, দেখেছেনও। সাধারণ শিক্ষার্থীরা সিট হারানোর ভয়ে কোনো প্রতিবাদ না করলেও মনে হচ্ছে পুলিশকে তারাই খবরটা পৌঁছেছিলো। নয়তো পুলিশ তাৎক্ষণিক ওই হলের মুখ পর্যন্ত কিভাবে আসলো! টর্চার সেলের গেট পর্যন্ত এলেও ভেতরে ঢুকতে দেয়নি পুলিশকে ছাত্রলীগ নামধারী খুনিদের সহযোগীরা। পুলিশ ফেরৎ চলে যায়। হল কর্তৃপক্ষ কি ভিসি ও প্রো ভিসিকে জানিয়েছিলো? জানালে ভিসি ও প্রো ভিসি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি কেনো? আবরার ফাহাদের প্রাণবাতি সহপাঠীদের আনা এম্বুলেন্সে উঠানোর আগেই নিভে যায়। তখনও কি হল কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিসি-প্রোভিসি মৃত্যুর খবর পাননি? পেলে কি তাকে দেখতে এসেছিলেন? আসেননি। পরদিন? সকালে? দুপুরে? রাতে? আসেননি।পরদিন দেশব্যাপী ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তাল প্রতিবাদের মুখে ভিসি তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে বোঝাপড়া শেষে ক্যাম্পাসে এলেন। এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন এবং তারা ভিসিকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।
ভিসি-প্রোভিসির এ ধরনের কার্যকলাপে দেশের সচেতন মহল, প্রথিতযশা ব্যক্তিদের মাঝে ধিক্কার ও ঘৃণার ঝড় উঠে। অনেকেই তাদের চাকরীচ্যুত করার দাবি জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। কতো নিচমনা, ছোটলোক হলে ভিসি-প্রোভিসি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করতে পারেন, তাও একজন মেধাবী সাধারণ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়ে। যদি তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হতো তাহলে আবরার ফাহাদ বেঁচে যেতে পারতো। আহত আবরার ফাহাদ বলেছিলো- ‘আমাকে হাসপাতালে নাও, আমি বাঁচবো’। সহপাঠীরা এম্বুলেন্স কল করে নিয়ে আসার আগেই আবরার ফাহাদের প্রাণ উড়ে যায়।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা মনে করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ হয়তো নিরাপদ হবে তাদের সন্তানদের জন্য। আদতে কি তা আছে? এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজনীতির শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন প্রায় অর্ধ শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী। এদের কোনো সঠিক বিচার হয়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ বিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে হত্যার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে। দেশের লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থী মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডারদের হাতে জিম্মি। আবরার ফাহাদকে খুনের মধ্যদিয়ে মুখোশ খুলে গেলো যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জিম্মিদশায় রয়েছেন ছাত্রলীগের কাছে। নইলে হল দখল, বরাদ্দ, সিট বাণিজ্য,অস্ত্র-গোলাবারুদ হলে মজুদ, রাখা ছাত্রলীগের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেনো? এগুলো যদি ছাত্রলীগের হাতে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকে তাহলে হল কর্তৃপক্ষের কাজ কি? হল সুপার কিবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ কি? উত্তর না মিললেও এখন মুখোশ খুলে আমজনতা জেনে গেছে ছাত্রলীগই সব। হল কর্তৃপক্ষ না শুধু, ভিসি প্রো ভিসি, প্রশাসন সবাই ছাত্রলীগকে মানতে বাধ্য হচ্ছেন।
আশার কথা হচ্ছে, আবরার ফাহাদকে খুনের সাথে জড়িত ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদকসহ ১৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আরো অভিযান চলছে। যেহেতু আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ মিলেছে তাহলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে এমনটাই দেশব্যাপী আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সচেতন মহল কামনা করছেন। এতে যেনো কোনোরকম দলীয়করণ, আত্মীয় করন, বৈধকরণ, অবৈধকরণ করা না হয় সরকার ও বিচারব্যবস্থার প্রতি দেশ ও দেশের মানুষের এমনটাই দাবি। স্বাধীন দেশে যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হোক। কারো বলার টুঁটি যেনো আর চেপে ধরা না হয়, কণ্ঠরোধ করা না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে সরকারকে। এমন অপরাজনীতি যারা করেছে, রাজনীতির দোহাই দিয়ে নিরীহ সাধারণ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। যাতে করে আর কারো সাহস না হয় কাউকে হত্যা করার।
লেখক : কবি প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
সম্পাদক : আবীর আকাশ জার্নাল
Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন, উপশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com