আপনার কি মনে হয় রিকশামুক্ত করে ঢাকা শহরের যানজট নিরসন সম্ভব?

রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়ার আগে কি কোন ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছিলো, জনগণের সুবিধা-অসুবিধা বোঝার জন্য?

গত কয়েক দিন ধরেই ঢাকা শহরে রিকশা চলাচল করা উচিৎ কিনা সেনিয়ে পক্ষে বিপক্ষে পুরনো একটি বিতর্ক আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে শাহবাগ, খিলক্ষেত থেকে রামপুরা হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে এবং মিরপুর রোডে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে এই বিতর্ক। রোববার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা শুরু হয়েছে। ঢাকার আরো তিনটি ব্যস্ত সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ হয়েছে গত ৭ই জুলাই থেকে। ঢাকা শহরের যানজট কমাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

এদিকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তিনটি সড়কে রিকশা চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে মঙ্গলবার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেছেন রিকশাচালক ও মালিকেরা। ঢাকার সব সড়কে রিকশা চলাচলের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন তারা।

ঢাকার তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধ করে দেয়ার এ সিদ্ধান্তকে তাদের ‘রুটি-রুজির ওপর আঘাত’ বলে অভিযোগ করছেন রিকশাচালকরা। আর রিকশাচালকের এই অভিযোগকেও সমর্থন করছেন অনেকে।

রিকশাচালকের আয় বন্ধ হয়ে গেলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যেতে পারে। সড়কে রিকশা বন্ধ করা  যানজট নিরসনের কোন উপায় হতে পারে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের স্বমন্বয়ে আরো ফলপ্রসূ চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, যে সিদ্ধান্তে দেশ ও জনগণ বাঁচবে। সবাইকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। রিকশাচালকদের রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হতে পারে। অনেক এলাকায় স্কুল-কলেজ আছে, অফিস আছে। সেখানে তারা যাতায়াত কিভাবে করবে? যেখানে পাব্লিক পরিবহন অপ্রতুল বলাবাহুল্য সবারতো আর নিজস্ব গাড়ি নেই।

রিক্সা তুলে দেয়া হয়তো অনেকগুলো সমাধানের মধ্যে একটি কিন্তু কখনই মূল সমাধান নয়। আরো অনেক সমাধান আছে সেগুলোকে অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার যেমনঃ

  • ছোট রাস্তাগুলোকে যথাসম্ভব দীর্ঘ ও প্রশস্ত করতে হবে।
  • যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে হবে।
  • লাইসেন্স বিহীন যানবাহন বা অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে।
  • ট্রাফিক আইন আরো কার্যকরী ও ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ব্যস্ততম রাস্তায় রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং বন্ধ করতে হবে।
  • অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
  • রাস্তাগুলোকে বহু লেন বিশিষ্ট করে ধীর গতির ও দ্রুত গতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ঢাকা শহরে প্রাইভেট গাড়ির বদলে পাবলিক বাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বিভাগীয় শহরগুলোতে ঢাকা শহরের মতো উন্নয়ন অবকাঠামো বিস্তৃত করতে হবে।
  • ঢাকা শহরের বাইরেও নামী-দামী স্কুল কলেজ স্থাপন করতে হবে।
  • বিভাগীয় শহরেও উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র, হোটেল, রেস্তোরাঁর ব্যবস্থা করতে হবে।
  • মিনিবাসের সংখ্যা কমিয়ে ডাবল ডেকার বাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • রাস্তাগুলোতে পর্যাপ্ত ডিভাইডারের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ব্যাপক কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে যাতে সবাই শহরে জড়ো না হয়।
  • রাজধানী ঢাকার রাস্তা থেকে অবৈধ হকারদের উচ্ছেদ করতে হবে।
  • রেল যোগাযোগ ও নৌ-যোগাযোগের উন্নতি সাধন করতে হবে।
  • রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির যাতায়াতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হবে।
  • প্রাইভেট গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত করতে উচ্চহারে ভ্যাট নির্ধারণ করতে হবে।
  • ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • পরিকল্পিত ফ্লাইওভার ও ফুটভার ব্রিজ নির্মান করতে হবে।
  • সকলকে ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা

অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার ও ফুটভার ব্রিজ

অন্যতম বড় উদ্যোগগুলোর মধ্যে উদাহরন স্বরুপ একটির অবস্থা হলো বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়ক। ১২২ কোটি টাকা খরচে তৈরি করা এই সড়কটি একটি ওভারপাস; বিজয় সরণি মোড় থেকে সোজা পূর্বগামী গাড়িগুলোকে নাবিস্কো মোড়ে নির্বিঘ্নে পৌঁছেদিতে এটা তৈরি করা হয়েছে, বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর স্টেশনে আসা রেলওয়ে সড়কের ওপর দিয়ে সড়কটি নাবিস্কোর কাছে তাজউদ্দীন আহমেদ সরণিতে গিয়ে মিলেছে। সড়কটি চালু হওয়ার পর তার কাছাকাছি সড়কগুলোতে যানজট প্রায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। বিজয় সরণি ধরে পশ্চিম দিক থেকে বা নজরুল এভিনিউ ধরে দক্ষিণ দিক থেকে কিম্বা ওই এভিনিউ ধরে উত্তর দিক থেকে আসা গাড়িগুলো সংযোগ সড়কে উঠতে পারে। যেহেতু এই রাস্তাগুলো থেকে আলাদাভাবে ওভারপাস সড়কটিতে ওঠার সুযোগ নাই, মোড়ের ওপর দিয়ে ওই রাস্তাগুলোর সাথে ওভারপাসটি যুক্ত নয়, ফলে সব গাড়িগুলাকে তাই মোড় পার হয়ে সংযোগ সড়কে উঠতে হয়। যার ফলে যেদিকের রাস্তাই ওভারপাসে যাওয়ার জন্য খোলা থাকুক না কেন, ওই সময় বাকি কমপক্ষে দুটা রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। আর ওভারপাস থেকে গাড়ি নামার পথে সবুজ বাতি থাকলে বাকি সব রাস্তায়ই লাল বাতি থাকে। যার ফলে ওই মোড় থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান- ফার্মগেট- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মোড় পর্যন্ত যানজট আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ব্যস্ত সময়ে যান চলাচল প্রায় বন্ধই থাকে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে পরপর তিনদিন বিকালে নাবিস্কো থেকে সিএনজি স্কুটারে ওভারপাসটি পার হতে সময় লেগেছে গড়ে আটচল্লিশ মিনিট। যার মানে হচ্ছে, যেসব গাড়ি সড়কটি যারা ব্যবহার করে সেগুলো দীর্ঘ সময় জটে আটকে থাকে অন্যদিকে সড়কটির কারণে শহরের যানজটের বিস্তার আরো বেড়েছে।

মালিবাগ ফ্লাইওভারের নীচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয় শুধুমাত্র ফ্লাইওভারের নীচের জায়গা শঙ্কুচিত হয়ে যাবার কারনে। ফ্লাইওভার হওয়ার পর থেকে মালিবাগ রেলগেট থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত পার হতে কখনও ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়।

অর্ধেকের অনেক বেশি নাগরিককে ফ্লাইওভারের দুই প্রান্তে যাত্রীতে ঠাসা পাবলিক বাসে ওঠার জন্য জীবনের ঝুকি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়ার ‘টিকিট বাসে’ও যাত্রীতে ঠাসাঠাসি। পর্যাপ্ত বড় বাস নেই। বাসস্টপে নেমে তারপর নিজের গন্তব্যে, বাসায়, অফিসে, স্কুল কিংবা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়য় গুলোতে পৌঁছানোর জন্য কোনো যানবাহন নাই। ঢাকায় একরকম ‘ট্যাক্সি সার্ভিস’ নাই বললেই চলে, না আছে পর্যাপ্ত সিএনজি স্কুটার না ক্যাব, কোনোটিই যাত্রীর সংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট না, ভাড়াও অধিকাংশ নাগরিকের নাগালে নাই। আর যা আছে তাও ট্যাক্সি হিসেবে যাত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী ও নির্ধারিত ভাড়ায় চলে না। কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা নাই। চলছে চরম নৈরাজ্য। রাজধানীতে ট্যাক্সি সার্ভিস দেয়া যানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যে প্রাচীন রিকশা, সেই রিকশা এখন ঢাকার অধিকাংশ ব্যস্ত রাস্তায় নিষিদ্ধ। বাইসাইকেল চালানো অনিরাপদ, আলাদা লেন নাই সাইকেলের জন্য। হাঁটাপথ মানে ফুটপাথও নাই হাঁটার মতো।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক প্রধান অধ্যাপক শামসুল হক বলেন।

ঢাকায় বেশিরভাগ ফুটভার ব্রিজ অবৈজ্ঞানিকভাবে বানানো হয়েছে, মোড়ের মধ্যে বানানো হয়েছে, আসল কোথায় বানাতে হবে সেটা নিয়ে কিন্তু জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অনেক বয়স্ক মানুষ বা অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এগুলো সহায়ক না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।ফলে তার মতে ফুটওভারব্রিজ তৈরির পেছনে, য়সা খরচ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা কার্যকর হচ্ছে না, পথচারীদের কাজে আসছে না।” “

 ব্যার্থ পরিকল্পনা

গত কয়েক বছর ধরে এই সমস্যা মোকাবিলায় অনেক উদ্যোগের বাস্তবায়ন করেছে কর্তৃপক্ষ। যেমন-

  • দিনের বেলা শহরে ট্রাক ও আন্তঃনগর বাসের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে।
  • দূরগামী যাত্রীর সুবিধা অসুবিধার কথা খেয়াল না রেখে ট্রেন চলাচলের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে ।
  • বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলা বন্ধ করা হয়েছে।
  • পথচারী পারাপারের জন্য রাস্তায় যে জেব্রা ক্রসিং ছিল সেগুলা বাতিল করে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে।
  • ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি চালু করা হয়েছে, সর্বশেষ সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে।

এসবের কোনোটাই কাজে আসে নাই। বরং কিছু কিছু রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়ার মতো এমনসব উদ্যোগের ফলে জনপরিবহন ব্যবস্থা শহরবাসীর জন্য আরো বেশি পেরেশানি তৈরি করেছে।

কর্তৃপক্ষ বর্তমানে জনগণের কথা চিন্তা না করে আগেকার চেয়ে আরো বেশি মস্ত মস্ত সব উপায় বিবেচনা করছেন যা বেশ উদ্যেগজনক।

ঢাকা শহরের সাম্প্রতিক যানজটের আলোক চিত্রের সংগৃহীত কিছু নমুনা নিম্নে দেয়া হলো। চিত্রের কোথাও রিকশা অনুবীক্ষন যন্ত্র দিয়েও দেখা যায়না। এই সমস্যার সমাধান করতে শুধু সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। পরিশেষে, বিষয়গুলো ভেবে দেখার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি।

(ছবি সূত্রঃ পিবিএ, নিউজ ২৪সহ বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল)

লেখক:
ইঞ্জিঃ জুবায়ের বিন লিয়াকত
ফেলো – আই.ই.বি

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» হাতীবান্ধায় বন্যার্তদের পাশে উজ্জ্বল  পাটোয়ারী 

» গ্রামীন জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার উন্নয়নে কমিউনিটি রেডিও শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত

» লটারীর মাধ্যমে ভাগ্য খুলছে ৫১২ কৃষকের

» শিবগঞ্জ সীমান্তে ফেনসিডিলসহ আটক ১

» তাহিরপুরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের ত্রাণসামগ্রী ও জরুরী ওষুধপত্র বিতরণ

» ভারতীয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবী শেঠীর নারায়ণা হেলথের তথ্যসেবা কেন্দ্র এখন খুলনায়

» বৃষ্টি আসলেই লালমনিরহাট পৌরবাসী ভোগান্তিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়

» ময়মনসিংহে বোন হত্যার দায়ে ভাইয়ের যাবজ্জীবন কারাদন্ড

» শৈলকুপায় বাদাম বিক্রেতা বৃদ্ধ প্রতিবন্ধীর পাশে ইউএনও উসমান গনি

» মণিরামপুরে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, দিশেহারা সীমিত আয়ের মানুষ

উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক

ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...
,

আপনার কি মনে হয় রিকশামুক্ত করে ঢাকা শহরের যানজট নিরসন সম্ভব?

রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়ার আগে কি কোন ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছিলো, জনগণের সুবিধা-অসুবিধা বোঝার জন্য?

গত কয়েক দিন ধরেই ঢাকা শহরে রিকশা চলাচল করা উচিৎ কিনা সেনিয়ে পক্ষে বিপক্ষে পুরনো একটি বিতর্ক আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে শাহবাগ, খিলক্ষেত থেকে রামপুরা হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে এবং মিরপুর রোডে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে এই বিতর্ক। রোববার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা শুরু হয়েছে। ঢাকার আরো তিনটি ব্যস্ত সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ হয়েছে গত ৭ই জুলাই থেকে। ঢাকা শহরের যানজট কমাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

এদিকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তিনটি সড়কে রিকশা চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে মঙ্গলবার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেছেন রিকশাচালক ও মালিকেরা। ঢাকার সব সড়কে রিকশা চলাচলের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন তারা।

ঢাকার তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধ করে দেয়ার এ সিদ্ধান্তকে তাদের ‘রুটি-রুজির ওপর আঘাত’ বলে অভিযোগ করছেন রিকশাচালকরা। আর রিকশাচালকের এই অভিযোগকেও সমর্থন করছেন অনেকে।

রিকশাচালকের আয় বন্ধ হয়ে গেলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যেতে পারে। সড়কে রিকশা বন্ধ করা  যানজট নিরসনের কোন উপায় হতে পারে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের স্বমন্বয়ে আরো ফলপ্রসূ চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, যে সিদ্ধান্তে দেশ ও জনগণ বাঁচবে। সবাইকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। রিকশাচালকদের রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হতে পারে। অনেক এলাকায় স্কুল-কলেজ আছে, অফিস আছে। সেখানে তারা যাতায়াত কিভাবে করবে? যেখানে পাব্লিক পরিবহন অপ্রতুল বলাবাহুল্য সবারতো আর নিজস্ব গাড়ি নেই।

রিক্সা তুলে দেয়া হয়তো অনেকগুলো সমাধানের মধ্যে একটি কিন্তু কখনই মূল সমাধান নয়। আরো অনেক সমাধান আছে সেগুলোকে অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার যেমনঃ

  • ছোট রাস্তাগুলোকে যথাসম্ভব দীর্ঘ ও প্রশস্ত করতে হবে।
  • যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে হবে।
  • লাইসেন্স বিহীন যানবাহন বা অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে।
  • ট্রাফিক আইন আরো কার্যকরী ও ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ব্যস্ততম রাস্তায় রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং বন্ধ করতে হবে।
  • অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
  • রাস্তাগুলোকে বহু লেন বিশিষ্ট করে ধীর গতির ও দ্রুত গতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ঢাকা শহরে প্রাইভেট গাড়ির বদলে পাবলিক বাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বিভাগীয় শহরগুলোতে ঢাকা শহরের মতো উন্নয়ন অবকাঠামো বিস্তৃত করতে হবে।
  • ঢাকা শহরের বাইরেও নামী-দামী স্কুল কলেজ স্থাপন করতে হবে।
  • বিভাগীয় শহরেও উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র, হোটেল, রেস্তোরাঁর ব্যবস্থা করতে হবে।
  • মিনিবাসের সংখ্যা কমিয়ে ডাবল ডেকার বাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • রাস্তাগুলোতে পর্যাপ্ত ডিভাইডারের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ব্যাপক কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে যাতে সবাই শহরে জড়ো না হয়।
  • রাজধানী ঢাকার রাস্তা থেকে অবৈধ হকারদের উচ্ছেদ করতে হবে।
  • রেল যোগাযোগ ও নৌ-যোগাযোগের উন্নতি সাধন করতে হবে।
  • রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির যাতায়াতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হবে।
  • প্রাইভেট গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত করতে উচ্চহারে ভ্যাট নির্ধারণ করতে হবে।
  • ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • পরিকল্পিত ফ্লাইওভার ও ফুটভার ব্রিজ নির্মান করতে হবে।
  • সকলকে ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা

অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার ও ফুটভার ব্রিজ

অন্যতম বড় উদ্যোগগুলোর মধ্যে উদাহরন স্বরুপ একটির অবস্থা হলো বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়ক। ১২২ কোটি টাকা খরচে তৈরি করা এই সড়কটি একটি ওভারপাস; বিজয় সরণি মোড় থেকে সোজা পূর্বগামী গাড়িগুলোকে নাবিস্কো মোড়ে নির্বিঘ্নে পৌঁছেদিতে এটা তৈরি করা হয়েছে, বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর স্টেশনে আসা রেলওয়ে সড়কের ওপর দিয়ে সড়কটি নাবিস্কোর কাছে তাজউদ্দীন আহমেদ সরণিতে গিয়ে মিলেছে। সড়কটি চালু হওয়ার পর তার কাছাকাছি সড়কগুলোতে যানজট প্রায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। বিজয় সরণি ধরে পশ্চিম দিক থেকে বা নজরুল এভিনিউ ধরে দক্ষিণ দিক থেকে কিম্বা ওই এভিনিউ ধরে উত্তর দিক থেকে আসা গাড়িগুলো সংযোগ সড়কে উঠতে পারে। যেহেতু এই রাস্তাগুলো থেকে আলাদাভাবে ওভারপাস সড়কটিতে ওঠার সুযোগ নাই, মোড়ের ওপর দিয়ে ওই রাস্তাগুলোর সাথে ওভারপাসটি যুক্ত নয়, ফলে সব গাড়িগুলাকে তাই মোড় পার হয়ে সংযোগ সড়কে উঠতে হয়। যার ফলে যেদিকের রাস্তাই ওভারপাসে যাওয়ার জন্য খোলা থাকুক না কেন, ওই সময় বাকি কমপক্ষে দুটা রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। আর ওভারপাস থেকে গাড়ি নামার পথে সবুজ বাতি থাকলে বাকি সব রাস্তায়ই লাল বাতি থাকে। যার ফলে ওই মোড় থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান- ফার্মগেট- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মোড় পর্যন্ত যানজট আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ব্যস্ত সময়ে যান চলাচল প্রায় বন্ধই থাকে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে পরপর তিনদিন বিকালে নাবিস্কো থেকে সিএনজি স্কুটারে ওভারপাসটি পার হতে সময় লেগেছে গড়ে আটচল্লিশ মিনিট। যার মানে হচ্ছে, যেসব গাড়ি সড়কটি যারা ব্যবহার করে সেগুলো দীর্ঘ সময় জটে আটকে থাকে অন্যদিকে সড়কটির কারণে শহরের যানজটের বিস্তার আরো বেড়েছে।

মালিবাগ ফ্লাইওভারের নীচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয় শুধুমাত্র ফ্লাইওভারের নীচের জায়গা শঙ্কুচিত হয়ে যাবার কারনে। ফ্লাইওভার হওয়ার পর থেকে মালিবাগ রেলগেট থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত পার হতে কখনও ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়।

অর্ধেকের অনেক বেশি নাগরিককে ফ্লাইওভারের দুই প্রান্তে যাত্রীতে ঠাসা পাবলিক বাসে ওঠার জন্য জীবনের ঝুকি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়ার ‘টিকিট বাসে’ও যাত্রীতে ঠাসাঠাসি। পর্যাপ্ত বড় বাস নেই। বাসস্টপে নেমে তারপর নিজের গন্তব্যে, বাসায়, অফিসে, স্কুল কিংবা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়য় গুলোতে পৌঁছানোর জন্য কোনো যানবাহন নাই। ঢাকায় একরকম ‘ট্যাক্সি সার্ভিস’ নাই বললেই চলে, না আছে পর্যাপ্ত সিএনজি স্কুটার না ক্যাব, কোনোটিই যাত্রীর সংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট না, ভাড়াও অধিকাংশ নাগরিকের নাগালে নাই। আর যা আছে তাও ট্যাক্সি হিসেবে যাত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী ও নির্ধারিত ভাড়ায় চলে না। কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা নাই। চলছে চরম নৈরাজ্য। রাজধানীতে ট্যাক্সি সার্ভিস দেয়া যানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যে প্রাচীন রিকশা, সেই রিকশা এখন ঢাকার অধিকাংশ ব্যস্ত রাস্তায় নিষিদ্ধ। বাইসাইকেল চালানো অনিরাপদ, আলাদা লেন নাই সাইকেলের জন্য। হাঁটাপথ মানে ফুটপাথও নাই হাঁটার মতো।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক প্রধান অধ্যাপক শামসুল হক বলেন।

ঢাকায় বেশিরভাগ ফুটভার ব্রিজ অবৈজ্ঞানিকভাবে বানানো হয়েছে, মোড়ের মধ্যে বানানো হয়েছে, আসল কোথায় বানাতে হবে সেটা নিয়ে কিন্তু জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অনেক বয়স্ক মানুষ বা অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এগুলো সহায়ক না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।ফলে তার মতে ফুটওভারব্রিজ তৈরির পেছনে, য়সা খরচ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা কার্যকর হচ্ছে না, পথচারীদের কাজে আসছে না।” “

 ব্যার্থ পরিকল্পনা

গত কয়েক বছর ধরে এই সমস্যা মোকাবিলায় অনেক উদ্যোগের বাস্তবায়ন করেছে কর্তৃপক্ষ। যেমন-

  • দিনের বেলা শহরে ট্রাক ও আন্তঃনগর বাসের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে।
  • দূরগামী যাত্রীর সুবিধা অসুবিধার কথা খেয়াল না রেখে ট্রেন চলাচলের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে ।
  • বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলা বন্ধ করা হয়েছে।
  • পথচারী পারাপারের জন্য রাস্তায় যে জেব্রা ক্রসিং ছিল সেগুলা বাতিল করে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে।
  • ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি চালু করা হয়েছে, সর্বশেষ সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে।

এসবের কোনোটাই কাজে আসে নাই। বরং কিছু কিছু রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়ার মতো এমনসব উদ্যোগের ফলে জনপরিবহন ব্যবস্থা শহরবাসীর জন্য আরো বেশি পেরেশানি তৈরি করেছে।

কর্তৃপক্ষ বর্তমানে জনগণের কথা চিন্তা না করে আগেকার চেয়ে আরো বেশি মস্ত মস্ত সব উপায় বিবেচনা করছেন যা বেশ উদ্যেগজনক।

ঢাকা শহরের সাম্প্রতিক যানজটের আলোক চিত্রের সংগৃহীত কিছু নমুনা নিম্নে দেয়া হলো। চিত্রের কোথাও রিকশা অনুবীক্ষন যন্ত্র দিয়েও দেখা যায়না। এই সমস্যার সমাধান করতে শুধু সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। পরিশেষে, বিষয়গুলো ভেবে দেখার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি।

(ছবি সূত্রঃ পিবিএ, নিউজ ২৪সহ বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল)

লেখক:
ইঞ্জিঃ জুবায়ের বিন লিয়াকত
ফেলো – আই.ই.বি

Facebook Comments
Share

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – আনোয়ার হোসেন জীবন

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তরঃ (দপ্তর সম্পাদক)

উপদেষ্টা -আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক

ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : শেখ মোঃ আতাহার হোসেন সুজন

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

সহযোগী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন

বার্তা সম্পাদক :এ.এইচ.এম.শাহ্জাহান

 

 

 

 

ই-মেইল : dhakacrimenewsbd@gmail.com

মোবাইল : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,০১৯১১৪৯০৫০৫

Design & Developed BY ThemesBazar.Com